অধীনস্থদের প্রতি ইহসান

প্রত্যেক ওপরের ‘নীচ’ রয়েছে। নীচের রয়েছে ‘ওপর’। আমরা নিজেদের সর্বদা অধীনস্থ বা নীচ হিসাব করে ঊর্ধ্বতনদের বিচার করতে পসন্দ করি। ধারাবাহিকতার শেকলে আমাদেরও যে অধীনস্থ রয়েছে বা আমরাও যে ওপরে রয়েছি তা ভুলে যাই। আমার অধীনে অনেক মানুষ রয়েছে। সেটা পরিবারে হোক বা হোস্টেলে হোক অথবা প্রতিষ্ঠানে হোক। হ’তে পারে তা দলে, মতে বা ভিন্ন কোন পরিসরে। ঊর্ধ্বতনদের বিচার আর গীবত করতে করতে আমি এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, কখনো সেই আয়নার সামনে দাঁড়ানো হয়নি, যে আয়নার সামনে নিজেকে দায়িত্বশীল মনে হয়। ঊর্ধ্বতন হিসাবে দেখা যায়। তবে আমি আজ সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি। ঊর্ধ্বতন হিসাবে আমি দেখতে কেমন, তা একবার দেখা দরকার।

আমি চারিদিকে শুধু দুর্নীতি দেখি, তবে নিজের দায়িত্বে আমি কতটুকু নীতিবান তা কখনো দেখা হয় না। অবিচার হ’তে দেখলে আমার খারাপ লাগে। তবে নিজের অধীনস্থদের ওপর আমি কতটুকু সুবিচার করতে পেরেছি তা ওযন করা হয় না। নিজে যখন বঞ্চিত হই বা কাউকে বঞ্চিত হ’তে দেখি তখন হৃদয়ে কষ্ট অনুভূত হয়। তবে আমার মাধ্যমে কতজন বঞ্চিত হয়েছে তার হিসাব কখনো করা হয় না। এখানে সবাই মাযলূম। সবাই যালেম। এখানে মালিকপক্ষ ম্যানেজারের ওপর যুলুম করে। ম্যানেজার কর্মকর্তার ওপর যুলুম করে। কর্মকর্তা শ্রমিকদের ওপর যুলুম করে। শ্রমিক কাজ থেকে ফেরার সময় রিকশাওয়ালার ওপর যুলুম করে। রিকশাওয়ালা বাড়িতে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানের ওপর যুলুম করে। স্ত্রী আবার প্রতিবেশী বা কাজের লোকের ওপর যুলম করে। এই ধারাবাহিকতায় সবাই যালেম। এটাই যদি উল্টোভাবে শুরু করি তবে সবাই মাযলূম। তাই নিজের বিচার আগে করা দরকার। নিজের সমালোচনাই আগে করা প্রয়োজন।

আমি জ্ঞানার্জনের সীমানা পেরিয়ে এসেছি। এখন আমার মাধ্যমে ইসলামের অনেক কাজ হয়। বিভিন্ন খিদমতে যুক্ত রয়েছি। এখন আমার পদ রয়েছে, ক্ষমতা রয়েছে। আমার অধীনে অনেক মানুষ কাজ করে। তারা আমাকে বড় হুযুর বলে সম্মান করে। মানুষও সম্মান করে। মনে করে, আমি একজন জান্নাতী মানুষ। মারা গেলেই জান্নাতে চলে যাব। কিন্তু আমার ভেতরের অবস্থা আমিই জানি। আমি যদি সেগুলোর বর্ণনা দেই তবে লম্বা এক ফিরিস্তিতে রূপ নিবে। ইলমে অহী অর্জনের সুবাদে আমি সেগুলোর হিসাব-নিকাশ করতে পারি। তবে সেগুলো থেকে বিরত থাকতে পারি না। 

আমি পরিচালক। তবে আমার হৃদয় নরম নয়। আমার মুখের ভাষাকে সবাই ভয় করে। অধীনস্থরা আতঙ্কে থাকে, যেন কখন কে হেনস্থার শিকার হয়। তারা আমার কাছে আসতে ভয় পায়। এই বিষয়টি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। কারণ হুযায়ফা বিন ক্বাতাদা (রহঃ) বলেন, ‘সবচেয়ে বড় বিপদ হ’ল অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া’।[1] তবে কি ইসলামের খেদমত করতে গিয়েই আমার অন্তর কঠিন হয়ে যাচ্ছে? মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি তো পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছি। একটু কড়া ভাষায় কথা না বললে অধীনস্থরা কথা শুনবে না। একটু বকাঝকা তো আমাকে করতেই হবে। এটা পরিচালনার স্বার্থেই আমি করি। এতে কোন গুনাহ নেই।

আবার মনে হয়, আমিই দুনিয়ার প্রথম পরিচালক নই। আমার পূর্বেও তো অনেক পরিচালক ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) পরিচালক ছিলেন। অনেক ছাহাবী ও তাবেঈ পরিচালক ছিলেন। কেউ রাষ্ট্রের, কেউ গোত্রের, কেউ পরিবারের। তারা কিভাবে পরিচালনা করেছেন? অধীনস্থদের সাথে তাদের আচরণ কেমন ছিল? সেগুলো আমার সম্মুখে রয়েছে। তবুও আমি নিজ অজান্তেই সেই পদাঙ্ক অনুসরণ থেকে সরে এসেছি। আমি তাদের মত হইনি। হ’তে পারিনি। তবে আমার ঊর্ধ্বতন পরিচালকগণ তাদের মত হোক এটা আমি মনে-প্রাণে চাই।

আমার মাঝে জ্ঞানের কমতি নেই। কুরআন-হাদীছ অনেক জানি। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন, ‘যার মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য নেই সে যেন ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায় থেকে নিষেধ করে না। (১) আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে কোমল হওয়া (২) ন্যায়পরায়ণ হওয়া এবং (৩) এ ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান থাকা’।[2] আমি এই বাক্যের আলোকে আমার ঊর্ধ্বতনের যোগ্যতা বিচার করি। কিন্তু আমি কি আমার কথায় কোমল? ন্যায়পরায়ণ? অবিচল? তবে আমি কিসের পরিচালক? আমি কিসের বড় হুযুর? এই পদ-পদবী, মর্যাদা তো আমার জন্য নয়। উল্লেখিত মাপকাঠিতে শুধু আমার ঊর্ধ্বতনই অযোগ্য নন, আমিও পরিচালক হিসাবে অযোগ্য।

আমি হাদীছে পড়েছি, কোন বদমেজাযী কখনো মুমিন হ’তে পারে না। আমি আমার অধীনস্থদের সাথে যে আচরণ করি, কথায় কথায় ধমক দেই, গালি দেই সেটাকে কি বদমেজায বলে? যদি বদমেজায না হয় তবে আরো কতটা কঠোর হ’লে, ভাষা কতটা বিশ্রী হ’লে, শব্দচয়ন কতটা বে-পরওয়া হ’লে সেটা বদমেজায হবে? নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘মুসলিম সেই, যার যবান ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে’।[3] আমার অধীনস্থরা তো মুসলিম। তারা তো আমার হাত ও যবান থেকে নিরাপদ নয়। এখন আমি কোন পথে হাঁটছি? ইসলামের খিদমত করতে গিয়ে যদি মুসলিম থেকেই খারিজ হয়ে যাই তবে এটাই বা কেমন খিদমত হ’ল? ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, ‘সৎকর্ম হ’ল খুবই সহজ বস্ত্ত। সুপ্রসন্ন চেহারা ও নম্র ভাষা’।[4]যা আমার অধীনস্থরা কখনোই আমার মাঝে প্রসন্ন চেহারা দেখেনি। তার এই কথা অনুযায়ী তো আমি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্তই হ’তে পারিনি। ইসলামের বড় খিদমত তো দূর কী বাত!  

অধীনস্থদের ভুল তো হবেই। ভুল হবে বলেই তারা আমার অধীনস্থ। তাছাড়া দেখভালের জন্য আমাকে প্রয়োজনই ছিল না। তারা দায়িত্ব পালনে কোন ভুল করলে আমি তাদের ওযর গ্রহণ করি না। অথচ ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘কেউ যদি তোমার সাথে খারাপ আচরণ করে, তারপর ক্ষমা চাইতে আসে, তাহ’লে বিনয়ের দাবী হ’ল তার ওযর গ্রহণ করা। তার ওযর সত্য হৌক বা মিথ্যা। আর তার অন্তরের বিষয়টা আল্লাহ তা‘আলার দিকে ন্যস্ত করা’।[5] আমি সেটা করতে পারিনি, ধমক দিতে পেরেছি। মনে করেছি, এটাই ইসলামের খিদমত। এর বিনিময়েই জান্নাতে যাব। অথচ কোনদিন আল্লাহর এই ঘোষণা আমার সামনে পড়েনি যে, এই আসমান ও যমীনের চাইতেও বড় জান্নাত আল্লাহ এমন মুত্তাকবীদের জন্য প্রস্ত্তত করেছেন যারা শুধুমাত্র তিনটা গুণের অধিকারী, (১) আর্থিক সংকীর্ণতা এবং প্রশস্ততায় ছাদাক্বা করে (২) রাগ দমন করে (৩) মানুষকে ক্ষমা করে দেয় (আলে ইমরান ৩/১৩৩-১৩৪)। আমার সকল খিদমতের বিপরীতে আমি যদি এই গুণগুলো অর্জন করতাম, সেটাই হয়তো আমার সৌভাগ্য হ’ত।

আমি দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের যেকোন স্তরের দায়িত্বশীল। এখানে আমার এমন কিছু গুণ অর্জনের দরকার ছিল যা আমি কখনো প্রয়োজন মনে করিনি। আর আমার ঊর্ধ্বতনরাও আমাকে এই বিষয়ে তখনো তাকীদ দেননি। যেমন জা‘ফর বিন মুহাম্মাদ (রহঃ) বলেন, ‘যখন তোমার ভাইয়ের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি অপসন্দনীয় কিছু পৌঁছে, তখন এর পিছনে তার এক থেকে সত্তরটি ওযর খোঁজ কর। যদি না পাও, তবে নিজেকে বল, হয়তো তার এমন কোন ওযর রয়েছে, যা আমি জানি না’।[6] ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর শাসনামলে জনৈক ব্যক্তি তাঁকে উপদেশ দিয়ে বলেছিল, ‘আপনি বয়স্ক মুসলমানদেরকে পিতা, ছোটদেরকে সন্তান এবং সমবয়সীদেরকে ভাই হিসাবে গ্রহণ করুন। তাহ’লে কার সাথে আপনার মন্দ আচরণ করার ইচ্ছা হবে? [7] ফুযায়েল বিন আয়ায (রহঃ) বলেন, ‘মুমিন তো সেই, যে (অপর মুসলিমের) দোষ গোপন রাখে এবং তাকে নছীহত করে। আর পাপী তো সেই, যে অন্যের মানহানি করে এবং লজ্জিত করে’।[8] এই শিক্ষাগুলো আমি কখনোই গ্রহণ করিনি।

আমি প্রতিষ্ঠান প্রধান। বিশেষ প্রয়োজনে কোন কর্মকর্তা ছুটি চাইলে আমি তাকে খুব অপমান করি। এটা আমি নিজের ক্ষমতাবলেই করি। এজন্য কারো কাছে আমার কোন জবাবদিহীতা নেই। তবে আমি এই ক্ষমতাবলেই তাদের ছুটি দিতেও পারি। এখানে কারো কোন ক্ষতি হবে না। মাঝ থেকে তারা হয়তো কিছুটা উপকৃত হবে। আমি শিক্ষক। আমার ক্লাসে একজন ছাত্র বই ছাড়া উপস্থিত হয়েছে। আমি জানি, তার পিতা তাকে বই কিনে দেয়নি। তবুও আমি তাকে ক্লাস থেকে বের করে দিলাম। কারণ প্রতিষ্ঠানের নিয়ম হ’ল, বই ছাড়া ক্লাসে বসা অনুমোদিত নয়। সে ক্লাস না করে বাসায় চলে গেল। তার কিছু বলার নেই। তবে আমি চাইলে তাকে ক্লাস করার সুযোগ করে দিতে পারতাম। তাতে কারোই কোন ক্ষতি হ’ত না। সে একটু উপকৃত হ’ত।

আমি দ্বীনী অঙ্গনের একজন খাদেম। এই মানসিকতা হঠাৎই হারিয়ে গেল কেন? কে আমার মাথায় দিল যে, অধীনস্থদের শাসন করতে হবে? অধীনস্থদের শাসন নয়, পরিচালনা করতে হয়। কে নিয়ম মানল না, কে সময় মত উপস্থিত হ’ল না, কে ঠিকমত কাজ করল না, এটা দেখে অনিয়মিতদের একটু বকাঝকা করার জন্য, বেতন কাটার জন্য তো একটা রোবট রাখলেও চলবে। অশিক্ষিত মানুষ রাখলেও চলবে। কারণ এটাকে পরিচালনা বলে না। পরিচালনা হ’ল, কোন কর্মচারির কাজ করতে কী সমস্যা হচ্ছে সেটা জেনে সেই সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেয়া। সেটা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা হ’তে পারে, সামর্থ্যগত হ’তে পারে, আবার পারিবারিকও হ’তে পারে। কেউ ছুটি চাইলে তার অনুপস্থিতির সময় কিভাবে তার দায়িত্বগুলো চালিয়ে নেয়া যায়। কারো কোন সাপোর্ট প্রয়োজন হ’লে সেটা কিভাবে ব্যবস্থা করা যায়। কর্মচারীদের দায়িত্বগুলো আরো হালকা করার সার্বিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণের নামই পরিচালনা। এটা এত সহজ কাজ নয়। এদিকে আমি শুধু কিছু নিয়ম মুখস্থ করে নিয়ে তার বাইরে অধীনস্থরা গেলে তাদের কিভাবে বকা দেব আর বেতন কাটবো সেই যোগ্যতা নিয়ে পরিচালক হয়েছি।

আমার অনেক অধীনস্থকে আমি ঠুনকো বিষয়ে ধমক দিয়েছি। ধমক না দিলেও হয়তো হ’ত। অনেকের অপারগতা জানার পরেও অপমান করেছি। অপমান না করলেও তেমন কোন ক্ষতি হ’ত না। তারা হয়তো আড়ালে কেঁদেছে। ছালাত আদায়ের পরে যখন তারা আল্লাহর দরবারে দো‘আয় হাত তুলেছে তখন হয়তো দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছে। তারা হয়তো কারো কাছে অভিযোগ করেনি। বিচার চায়নি। কারণ তাদের সেই সামর্থ্য নেই। তাই বলে কি এর বিচার হবে না? এর কোন বদলা গ্রহণ করা হবে না? অবশ্যই হবে। আমার দায়িত্ব যদি আমাকে দায়বদ্ধ করে তবে সেই দায়িত্ব আমার জন্য নে‘মত নয়, অভিশাপ। সেই দায়িত্ব যদি হয় বায়তুল্লাহর প্রধান ইমাম হওয়া, তবুও তা আযাব। হয় নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে, নয় এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি মুক্ত হওয়া যায় ততই ভাল।

কোমল হৃদয় আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নে‘মত। পরিচালক হওয়ার কারণে আমি সেই নে‘মত থেকে মুখ ফিরাতে চাই না। আমি এমন পদ-মর্যাদা চাই না, যা আমাকে বিপদে ঠেলে দিবে। যে ক্ষমতা আমার অন্তরকে কঠোর করে তুলবে সে ক্ষমতা আমার প্রয়োজন নেই। আওন ইবনে আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, ‘তোমার অহংকারী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তুমি অন্যদের চেয়ে তোমাকে উত্তম মনে করবে’।[9] আমি অহংকারী হ’তে চাই না। আল্লাহর বান্দাদের প্রতি কোমল হ’তে চাই। যে কোমলতার বিষয়ে ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) বলেন, ‘তিনটি বিষয় আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পসন্দনীয়- (১) প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়া (২) পর্যাপ্ত সচ্ছলতার মাঝেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং (৩) আল্লাহর বান্দাদের প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করা’।[10]

আজ আমি নিজেকে বিধ্বস্ত দেখতে পাচ্ছি। আমার লজ্জা করছে। যে দোষগুলোর জন্য আমি অপরের গীবত করেছি সেই দোষগুলোই আমার মাঝে আরো বেশী রয়েছে। আল্লাহ যদি এর চেয়ে বড় পদ আমাকে দান করতেন তবে অবিচার আর বে-ইনছাফীতে হয়তো আমি তাদেরকেও ছাড়িয়ে যেতাম। শেখ সা‘দী গুলিস্তাঁয় লিখেছেন, ‘হে বুলবুলি! তুমি বসন্তের সংবাদ নিয়ে এসো। খারাপ সংবাদগুলো পেঁচার জন্য রেখে দাও’। এখন বিবেকের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছি, আমার অধীনস্থদের কাছে আমি নিতান্তই হুতুম পেঁচা। আমি মুখ খুললেই শুধু খারাপ সংবাদ। আমি তো এমন ঊর্ধ্বতন হ’তে চাইনি। তাই আজ থেকেই আমি নিজেকে পরিবর্তন করব। অধীনস্থদের প্রতি ইনছাফ করব। যতদূর সম্ভব নিজের পক্ষ থেকে ইহসান করব।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাদের প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করে, আল্লাহও তার প্রতি কোমল হন। যে তাদের প্রতি দয়া করে, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন। যে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করে, তিনিও তার উপর অনুগ্রহ করেন।

যে তাদেরকে দান করে, তিনিও তাকে দান করেন। যে তাদেরকে উপকার করে, তিনিও তাকে উপকৃত করেন। যে তাদের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে, তিনিও তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন। যে তাদেরকে কল্যাণের পথে বাধা দান করে, তিনিও তাকে কল্যাণের পথে বাধাপ্রাপ্ত করেত মোটকথা কোন ব্যক্তি আল্লাহর সৃষ্টিকূলের সাথে যেমন আচরণ করে, দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহও তার সাথে সেইরূপ আচরণ করেন। সুতরাং সৃষ্টিকূলের সাথে বান্দার ব্যবহারের মাত্রা অনুযায়ী তার প্রতি আল্লাহর ব্যবহারের ধরণ নির্ণিত হয়’।[11]

আমরা দো‘আ করি, আল্লাহ যেন আমাদের প্রশান্ত ও উদার হৃদয় দান করেন। যে হৃদয় হবে এই আকাশের চেয়েও কয়েকগুণ বড়, শান্ত ও নির্মল। আমি যেন সবাইকে তার প্রাপ্যের চেয়ে বেশী দিতে পারি। কারো কাছে যেন আমার কোন ঋণ না থাকে। হাবীব আবূ মুহাম্মাদ (রহঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষের অন্যতম সৌভাগ্যবান হ’ল সেই ব্যক্তি, যার মৃত্যুর সাথে সাথে তার পাপগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়’।[12] আমিও এমনই একটি মৃত্যু কামনা করি। যে মৃত্যুর মাধ্যমে আমার সাথে এই দুনিয়ার সকল লেন-দেন শেষ হয়ে যাবে। আমার জানাযার ছালাতে কোন পাওনাদার উপস্থিত হবে না। হাশরের ময়দানে যখন আমার হিসাব নেয়া হবে তখন কেউ এসে বলবে না, এই ব্যক্তি আমার অমুক হক নষ্ট করেছে। আমি যেন সেদিন আল্লাহকে বলতে পারি, আমি দুনিয়ার বুকে মানুষের প্রতি ইহসান করেছি। আজ আমি আপনার ইহসানের প্রত্যাশী। 

সারওয়ার মিছবাহ

শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।


[1]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, জীবনী নং ১৩৯২

[2]. আহমাদ বিন হাম্বল, আল-ওয়ার‘ঊ পৃঃ ১৬৬, জামেঊল ঊলূম ওয়াল হিকাম ২/২৫৬।

[3]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৬।

[4]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৭৭০২, সনদ জাইয়িদ।

[5]. মাদারিজুস সালেকীন ২/৩২১।

[6]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৭৯৯১।

[7]. ইবনু রজব, জামেঊল উলূম ওয়াল হিকাম ২/২৮৩।

[8]. জামেঊল ঊলূম ওয়াল হিকাম ১/২২৫।

[9]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া, ২/৫৮।

[10]. সামারকান্দী, তাম্বীহুল গাফেলীন, পৃ. ৩৮৭।

[11]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-ওয়াবিলুছ ছাইয়িব, পৃঃ ৩৫।

[12]. আবূ নু‘আইম ইছফাহানী, হিলয়াতুল আউলিয়া ৬/১৫৩।






আরও
আরও
.