এখন ২০২৫ সাল। খুব স্বাভাবিকভাবেই ২১২৫ সালে আমরা কেউই দুনিয়াতে থাকব না। আজ আমরা যেমন এই দুনিয়ার রসে সিক্ত হচ্ছি, মোহ-মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি তখনও এই দুনিয়ার মায়ায় অনেকেই আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে। কারণ দুনিয়া চিরযৌবনা। যতদিন যাবে দুনিয়ার যৌবন ততই ঠিকরে পড়বে। আমরা আজ দুনিয়াকে যেমন দেখছি, আমাদের পরের প্রজন্ম দুনিয়াকে আরো বেশী লোভনীয় অবস্থায় পাবে। তারা জানবে না, তাদের বিলাসী বালাখানা যে মাটির ওপর গড়ে উঠেছে সেই মাটির নিচেই কত সহস্র-কোটি দুনিয়া-প্রেমিক মিশে গেছে। আমরা যেভাবে হারিয়ে যাবো, তারাও সেভাবেই হারিয়ে যাবে। দুনিয়ার রূপ-রস উপভোগ করতে করতে অপ্রস্ত্তত অবস্থায় সাক্ষাৎ হবে মালাকুল মাউতের সাথে।
মৃত্যুর পরে আমাদের ঠিকানা হবে কবর। কবর সর্বদাই সংকীর্ণ। আমি কল্পনা করি, আমি সেখানে শুয়ে আছি। আমার শরীর হয়েছে পোকার খাদ্য। যে পোকাগুলো পঁচা-গলা রক্ত-পুঁজ খায়। আমি জানি না, আমি সেখানে কিভাবে থাকব। আমি জানি না, আল্লাহর নাফারমান বান্দারা কবরে কিভাবে আছে। আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, ‘বান্দা মৃত্যুকে যত বেশী স্মরণ করবে, তার উৎফুল্লতা ও প্রতিহিংসা তত বেশী হ্রাস পাবে’।[1] তাই আমি যখন কবরস্থানে যাই তখন, বিভিন্ন কবরের মাথার কাছে খ্যাতিমান ব্যক্তিদের নেমপ্লেট দেখি। সেখানে পাথর খোদাই করে তাদের নাম-পদবী লেখা থাকে। তারা দুনিয়ার বুকে অনেক ক্ষমতাধর ছিলেন। মানুষ তাদেরকে সালাম করত। তারা যেখাছে যেতেন সেখানে মানুষ জমায়েত হ’ত। তবে এখন আর তাদেরকে কেন্দ্র করে মানুষের জমায়েত হয় না। তারা এখন খুব একা। এসব কথা আমার মস্তিস্কে ধাক্কা দেয়। আমি নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি।
ঠিক সে সময়টায় আমার কাছে এই দুনিয়ার সকল রং ধুসর মনে হয়। মনে হয়, তেতো ছাড়া এই দুনিয়াতে কোন স্বাদ নেই। তবে যখন আমি গোরস্থান থেকে বেরিয়ে আসি, বন্ধু-বান্ধবদের আড্ডায় বসি তখন আবার আমি ভুলে যাই কবরের একাকীত্বের কথা। গোরস্থানের সেই নীরবতা আর আমার মাঝে বিরাজ করে না। আবার আমি সিক্ত হই পাপের রসে। আমার চোখে তখন ধরা দেয় দুনিয়ার হরেক রং। এভাবেই আমি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বয়সের মানুষকে নিজ হাতে দাফন করেছি। আমি দেখেছি, তারা আর ফিরে আসেনি। আমার অনেক সাথী ছিল। অনেক ক্লাসমেট মারা গেল। অনেক জুনিয়ররাও মারা গেল। আমি তাদের জানাযায় উপস্থিত হয়েছি। তবে সেখান থেকে গৃহীত শিক্ষা আমার মাঝে স্থায়ী হয়নি।
ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জানে না হঠাৎ কখন তাকে মৃত্যু পেয়ে বসবে, তার অবশ্য কর্তব্য হ’ল যৌবন ও সুস্থতার ধোঁকায় না পড়ে সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্ত্তত থাকা। কেননা বৃদ্ধরা কম মারা যায় আর যুবকরা বেশী মারা যায়। সেজন্য খুব অল্প মানুষকেই বৃদ্ধ হ’তে দেখা যায়’।[2] আমি যখন জানাযার ছালাতে দাঁড়িয়ে দো‘আগুলো পড়ি তখন এই কথাটা বেশ অনুভব করি। তবে ছালাত শেষ করে যখন জীবিতদের সাথে মিলিত হই তখন আমার মন থেকে সবকিছু হারিয়ে যায়। আমি খুব ভালভাবেই জানি যে, আমার দুনিয়ার বাড়ী মাত্র কয়েক দিনের। যেকোন সময় এই পাপে পূর্ণ সফরের ইতি ঘটবে। পরকাল হবে আমার অনন্তকালের ঠিকানা। আমি এটাও জানি যে, সাজানো গোছানো আবাস ছেড়ে কেউই বিরান ভুমিতে যেতে চায় না। মৃত্যুর সময় হয়তো আমিও যেতে চাইব না। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই। সবাইকে যেতে হবে। তারপরও আমি দুনিয়ার পেছনে ছুটে আমার পরকালকে নষ্ট করছি।
আমরা জানি, কোন্ পেশা আমাদের আখেরাতের জন্য উপকারী। কোন্ পেশায় জীবিকা নির্বাহ করলে আমাদের পরকাল সমৃদ্ধ হবে। তবুও প্রফেশন নির্বাচনে জেনে বুঝে আমি দুনিয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছি। ইচ্ছা করেই আমরা পাপের পরিবেশে গিয়েছি। পাপে জড়িয়েছি। এরপর বলছি, আমরা অপারগ। হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন, দুনিয়াবী জীবন তিনদিনের। প্রথমত ‘গতকাল’। যা ইতিমধ্যে চলে গেছে। দ্বিতীয়ত ‘আগামীকাল’। খুব সম্ভবতঃ তুমি তার নাগাল পাবে না এবং সর্বশেষ ‘আজ’। অতএব তোমার যা করার তা আজই কর।[3] আর আমিও জানি, আমাকে যা করার আজই করতে হবে। কারণ কাল এই দুনিয়ার বুকে থাকব কি-না জানি না।
আমি খুবই আশ্চার্য হই, যখন আমরা দ্বীনী প্রয়োজনের যুক্তি দিয়ে দুনিয়া অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই। কারণ দুনিয়া অর্জনের মাঝে আমরা যা খুঁজি তা দুনিয়ার মাঝে নেই। আমি জীবনভর সম্পদের মাঝে প্রাচুর্য অনুসন্ধান করেছি, কিন্তু তা খুঁজে পেয়েছি অল্পে তুষ্টির মাঝে। সুখ-শান্তি তালাশ করেছি আধিক্যের মাঝে, কিন্তু স্বল্পতার মধ্যেই তা পেয়েছি। আমি নৈতিকতার মাঝে মান-মর্যাদা অনুসন্ধান করেছি, কিন্তু তাক্বওয়ার মাঝে সেটা লাভ করেছি। উন্নত খাবার ও পোষাক-পরিচ্ছদের মাঝে নে‘মতের খোঁজ করেছি, কিন্তু তা পেয়েছি আমার দোষ-ত্রুটি গোপন থাকা ও আমি ইসলামের অনুসারী হওয়ার মাঝে। তবুও আমি শান্ত হ’তে পারিনি। তুষ্ট হ’তে পারিনি। আমি নিজের মাঝে কখনো শান্তি খুঁজে পাইনি।
এটা হয়ত আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। কারণ ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, ‘দুনিয়ার অনর্থক বস্ত্তসমূহের পেছনে ছুটে বেড়ানো এক ধরনের শাস্তি। যে শাস্তি আল্লাহ দুনিয়ার বুকে তাওহীদপন্থীদেরকে দিয়ে থাকেন’।[4] আমি হয়তো সেই শাস্তির আওতায় পড়ে গেছি। আমি দুনিয়া পূজারী হয়ে গেছি! যেমনটা সুফিয়ান বিন উয়ায়না (রহঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়া নিয়ে মত্ত থাকে, তার হৃদয় থেকে আখেরাতের ভীতি দূরীভূত করে দেয়া হয়’।[5] তেমনই আমার অন্তর থেকে হয়তো আখেরাতের ভয় দূর হয়ে গেছে। আমি গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি।
আমি এত দুনিয়া অর্জন করেছি যা ভোগ করার সাধ্য আমার নেই। তবুও আমি স্থির হ’তে পারিনি। এক সময় ভয় হ’ত যে, দুনিয়াতে কি খাব! কি পরব! কোথায় থাকব! আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে রিযিকের সন্ধান করেছি। এরপর আল্লাহ আমাকে অঢেল সম্পদ দান করেছেন। কিন্তু আমি নিজেকে আজও থামাতে পারিনি। আমি এখনো ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারিনি। আজ পর্যন্ত আমি নিজের প্রয়োজন বুঝতে শিখিনি। প্রয়োজন ও বিলাসিতার মাঝে পার্থক্য করতে শিখিনি। আমি এটাও জানি না মানুষ কেন খায়। ক্ষুদা পেলে খায়, নাকি সকাল, দুপুর, রাত হ’লে খায়।
সবাই খায়, তাই আমিও খাই। সবাই টাকা-কড়ি জমায়, তাই আমিও জমাই। সবাই যা করে, আমিও তাই করি। সবাই কৌশলের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাত একসাথে অর্জন করতে চায়, আমিও তাই চাই। তবে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে দুনিয়াকে ভালবাসবে তার আখেরাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যে আখেরাতকে ভালবাসবে তার দুনিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে’।[6] ওয়াহ্হাব ইবনু মুনাবিবহ (রহঃ) বলেন, ‘দুনিয়া ও আখেরাতের তুলনা হ’ল দুই সতীনের মতো। তুমি যদি তাদের একজনকে সন্তুষ্ট রাখ, তাহ’লে অপরজনকে অবশ্যই অসন্তুষ্ট করতে হবে’।[7] দুনিয়া ও আখেরাতের এই দোটানার মাঝে দুনিয়ার ক্ষতি কেউ মেনে নিতে পারেনি, তাই আমিও মেনে নিতে পারিনি। আমি অজুহাত দিয়ে পাপে লিপ্ত হয়েছি। আমি অপারগতার দোহাই দিয়ে হারাম খেয়েছি।
আমি কখনো জীবন নিয়ে চিন্তা করিনি। আমি কখনো রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনী পড়ে সেখান থেকে শিক্ষাগ্রহণের চেষ্টা করিনি। আমি কখনো ভেবে দেখিনি যে, এই দুনিয়ার ঐশ্বর্য যদি কোন গর্বের বিষয় হ’ত, কোন কল্যাণের বিষয় হ’ত তবে আল্লাহ এই দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে বেশী সম্পদ দান করতেন হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে। অথচ আয়েশা (রাঃ) বলছেন, ‘রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবার মদীনায় আসার পর থেকে একাধারে তিন দিন গমের রুটি পেটভরে খাননি। এ অবস্থায় রাসূল (ছাঃ) মৃত্যুবরণ করেছেন’।[8] আহ! এই হাদীছগুলো কখনো আমার অন্তরে দাগ কাটেনি।
ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করলাম। তিনি তখন খেজুর পাতার চাটাইয়ের উপর শুয়ে ছিলেন। তাঁর পরিধানে ছিল শুধু একটি লুঙ্গি। তাঁর পাঁজরে চাটাইয়ের দাগ বসে গিয়েছিল। আমি দেখলাম যে, তাঁর ঘরের এক কোণে ছিল প্রায় এক ছা‘ গম, বাবলা গাছের কিছু পাতা এবং একটি ঝুলন্ত পানির মশক। এ অবস্থা দেখে আমার দু’চোখে অশ্রু প্রবাহিত হ’ল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে খাত্ত্বাবের পুত্র! তুমি কাঁদছো কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আমি কেন কাঁদবো না! এই চাটাই আপনার পাঁজরে দাগ কেটে দিয়েছে। আর এই হচ্ছে আপনার ধনভান্ডার। অথচ আজ কিসরা ও কায়সার বিরাট বিরাট উদ্যান ও ঝর্ণা সমৃদ্ধ অট্টালিকায় বিলাস-ব্যসনে জীবন-যাপন করছে। আর আপনি হ’লেন আল্লাহর নবী এবং তাঁর মনোনীত প্রিয় বান্দা। আপনার ধনভান্ডারের অবস্থা এই! তিনি বললেন, হে খাত্ত্বাবের পুত্র! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আমাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের স্থায়ী সুখ-শান্তি এবং ওদের জন্য রয়েছে পার্থিব ভোগবিলাস? তখন আমি বললাম, হ্যাঁ।[9] আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, একবার রাসূল (ছাঃ) আমার কাঁধের ওপর দুই হাত রেখে বলেছিলেন, ‘তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে থাক যেন তুমি একজন মুসাফির বা পথযাত্রী’।[10] আফসোস! আমিও যদি আমার চোখ থেকে দুনিয়ার রঙ্গিন চশমা সরিয়ে ফেলতে পারতাম! আমিও যদি দুনিয়াকে সেভাবেই দেখতে পারতাম যেভাবে রাসূল (ছাঃ) দেখেছেন। হয়তো আজ আমার জীবনটা প্রাচুর্যে ভরে যেত।
আমি জীবনে অল্পেতুষ্ট থাকার পরিবর্তে সর্বদা দরিদ্রতারই অভিযোগ করে এসেছি। আমি তো ঐ ব্যক্তির মত হয়ে গেছি যে ইউনুস ইবনে ওবায়েদ (রহঃ)-এর কাছে এসে তার অভাব-অনটনের অভিযোগ করেছিল। তখন ইউনুস তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি যে চোখ দিয়ে দেখ, এই চোখের বিনিময়ে যদি তোমাকে এক লক্ষ দিরহাম দেওয়া হয়, তুমি কি তাতে আনন্দিত হবে? সে বলেছিল, না। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমার দুই হাতের বিনিময়ে যদি তোমাকে এক লক্ষ দিরহাম দেওয়া হয়, তাতে কি খুশি হবে?’ সে বলেছিল, না। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি তোমার দুই পায়ের বিনিময়ে এটা দেওয়া হয়?’ সে বলেছিল, না। তখন ইউনুস (রহঃ) তার প্রতি আল্লাহর এই নে‘মতগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তো দেখতে পাচ্ছি তোমার কাছে লক্ষ লক্ষ দিরহামের সম্পদ আছে, অথচ তুমি দরিদ্রতার অভিযোগ করছ’![11] ঠিক এই অভিযোগকারীর মতই আমারও জীবনটা শুধু দারিদ্রতার অভিযোগ করতে করতেই কেটে গেল। আমি আমার জীবনের দিকে তাকালে শুধু শুন্যতাই দেখি। কোন প্রাপ্তি খুঁজে পাই না।
দুনিয়ার খেলাঘরে আমি এক পাগলের ভূমিকায় অভিনয় করছি! কারণ সবকিছু জানার পরেও যে দেহ কবরস্থ করার পরে পোকা-মাকড়ের খাবার হবে সেই দেহকে ঘিরেই আমার সকল আয়োজন। আমি জানি, কোন্ তৈল খেলে পেট ভাল থাকে। তবে কোন্ কাজে আমার রূহ সুস্থ থাকে তা আমি জানি না। আমাদের দেহ তো মাটি থেকে তৈরি। তার খাবারও মাটি থেকেই আসে। তবে আমার রূহ মাটির তৈরি নয়। এটা তো আসমান থেকে এসেছে। সুতরাং সে মাটির রসে সিক্ত হয় না। তার খাবার মাটি থেকে আসে না। ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘তুমি নিজ রূহকে তিনটি স্থানে খোঁজ কর। কুরআন শ্রবণের সময়, যিকির-আযকারের মজলিসে এবং নিরিবিলি সময়। যদি এই তিন স্থানে তোমার মাঝে রূহ খুঁজে না পাও, তবে আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা কর, তিনি যেন তোমাকে রূহ দান করেন। কেননা তোমার মাঝে কোন রূহ নেই’। [12]
আফসোস! আমি আমার রূহের পরিচর্যা কখনো করিনি। আমি আমার রূহের খোরাক কখনো প্রদান করিনি। এভাবে চলতে চলতে আমার রূহের অবস্থা এতটাই নাজুক হয়ে গেছে যে, কখনো আমি নিজের মাঝে তার উপস্থিতি বুঝতে পারিনি। আমি জানি, ছিয়াম, ক্বিয়াম, যিকর, ইস্তেগফারে রূহ সবল হয়। ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, আমি ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘সর্বদা আল্লাহর যিকির করা রূহের জন্য সেরূপ, মাছের জন্য পানি যেরূপ। মাছ যখন পানি থেকে পৃথক হলে তার অবস্থা যেমন হয ঠিক তেমনি রূহ যিকর থেকে পৃথক হলে তারও অবস্থা এমনই হয়।[13] আমি এই সবকিছুই জানি। তবে কখনো এই ইবাদতগুলোর প্রতি যত্নবান হইনি।
আমি জানি, আমার অস্তিত্বের একমাত্র সফলতার সংজ্ঞা কী! একমাত্র সফলতা হ’ল হাশরের ময়দানে জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতে প্রবেশ করা। সেদিন যদি আমি সফল হ’তে পারি তবে আমার জীবনভর ব্যর্থতার গ্লানি নিমিষেই ধুয়ে যাবে। সারা দুনিয়ার পূর্বাপর সকল মানুষ চেয়ে দেখবে আমার সফলতা। আর সেদিন যদি আমি সফল হ’তে না পারি তবে... কি হবে আমার নোবেল! কি হবে আমার বাদশাহী! সারা দুনিয়া সেদিন মানবাকৃতির এক পশুকে দেখবে। যাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তাই আমি বলেছি, আমি এক পাগল। দুনিয়ায় ক্ষণিকের জন্য এসে আমাকে যে অভিনয়গুলো করতে দেখছ এগুলো আমার পাগলামি।
আমি এগুলোকে পাগলামী না বলে আর কি বলব! কারণ আমি জানি, সালাফদের চোখে কেমন ছিল এই রঙ্গিন দুনিয়া। হাসান বাছরী (রহঃ) যুবকদেরকে প্রায়ই বলতেন, ‘হে যুব সমাজ! তোমরা আখেরাতের সন্ধানে নিয়োজিত থাকবে। কেননা অধিকাংশ সময় আমি দেখেছি, যে আখেরাতের জীবন প্রত্যাশা করে, সে আখেরাত তো অর্জন করেই, পাশাপাশি পার্থিব কল্যাণও লাভ করে। কিন্তু আমি কখনো এমন কাউকে দেখিনি, যে দুনিয়াবী জীবন অন্বেষণ করেছে এবং দুনিয়ার সাথে আখেরাতের কল্যাণও হাছিল করতে পেরেছে’।[14] আওন বিন আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, ‘অন্তরে দুনিয়া ও আখেরাতের তুলনাটা যেন দাড়িপাল্লার মত। এক পাশের পাল্লা যতটা ভারী হয়, অপর পাল্লাটি ঠিক ততটাই হালকা হয়ে যায়’।[15]
মালেক ইবনু দীনার (রহঃ) বলেন, ‘তুমি দুনিয়া নিয়ে যতটুকু পেরেশান হবে, তোমার হৃদয় থেকে ততটুকু আখেরাতের চিন্তা উধাও হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে আখেরাতের ব্যাপারে তুমি যতটুকু চিন্তা-ভাবনা করবে, সেই পরিমাণ পার্থিব দুশ্চিন্তা তোমার হৃদয় থেকে বের হয়ে যাবে’।[16] ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, ‘ভ্রাতৃমন্ডলী! তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক হও। কেননা এটা হারূত ও মারূতের চেয়েও দক্ষ যাদুকর। কারণ তারা স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতো। আর দুনিয়া বান্দা ও তার রবের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়’।[17] ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, ‘দুর্ভোগ সেই ব্যক্তির জন্য, দুনিয়া যার আশা-আকাঙ্ক্ষার স্থল এবং পাপ করাই তার কাজ। সে অত্যন্ত ভোজন রসিক, স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী। সে পার্থিব বিষয়ে বিজ্ঞ হ’লেও আখেরাতের ব্যাপারে অজ্ঞ’।[18]
ইয়াহ্ইয়া ইবনে মু‘আয (রহঃ) বলেন, ‘যে দুনিয়া তালাশ করে, দুনিয়া তার আমীর বা পরিচালক হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে পরিত্যাগ করে, দুনিয়া তার খাদেম হয়ে যায়। দুনিয়া হচ্ছে আখেরাতের সাঁকো। তোমরা এই সাঁকো পার হয়ে চলে যাও। এখানে বসতি স্থাপন করতে যেয়ো না। কেননা সাঁকোর উপরে প্রাসাদ নির্মাণ করা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়’।[19] তিনি আরো বলেন, ‘দুনিয়া হ’ল শয়তানের মাদক। যে ব্যক্তি এই মাদকে আসক্ত হবে, সে ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে মৃতদের দলভুক্ত হওয়া ছাড়া হুঁশ ফিরে পাবে না’।[20] আমি এই সবকিছুই জানি। তারপরও আমি দুনিয়াকে পরিত্যাগ করতে পারিনি।
আমাকে এই দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে বড় ধোঁকা দিয়েছে যে শব্দটি তা হ’ল, ‘লাইফ সেটেলমেন্ট’। যখন ছাত্র ছিলাম তখন মনে হ’ত, কর্ম জীবনে যাই, লাইফ সেটেলমেন্ট হোক, তারপর দুনিয়ার সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আখেরাত গুছানো শুরু করব। কর্ম জীবনে এসে মনে হ’ল, কিছু টাকা জমাই, বাড়ী-গাড়ী করি। তারপর আখেরাত গুছানোর কাজে হাত দেব। বাড়ী-গাড়ী হওয়ার পরে মনে হ’ল ছেলে-মেয়ের বিয়ে দেই। এখনো তো অনেক কাজ বাকী। ছেলে-মেয়ের বিয়ে হ’ল। তাদেরও সন্তান-সন্ততি হ’ল। হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম, আমার নাতি-নাতনিরা বলছে, কর্ম জীবনে যাই, লাইফ সেটেলমেন্ট হোক, তখন আখেরাত গুছানো শুরু করব। আমার ছেলে-মেয়েরা বলছে, ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেই...।
মনে পড়ে গেল, এই একই কথা আমার বাবাও বলেছিলেন। তবে তিনি আখেরাত গুছানোর সুযোগ পাননি। এখন আমিও মৃত্যু থেকে মাত্র এক কদম দূরে। আখেরাত গুছানোর কোন সুযোগ আমারও হয়নি। এর মাঝেই আমি বৃদ্ধ হয়েছি। আমার শরীর এখন রোগের বাসা। ফরয ইবাদতগুলোও করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জীবনের এই ক্লান্তিলগ্নে আমি ভাবছি, হায় আফসোস! জীবনে কতবার কুরআন পড়েছি! আল্লাহ বার বার বলেছেন, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। তবে কখনো বুঝতে পারিনি যে, ক্ষণস্থায়ী শব্দটির সাথে ‘সেটেলমেন্ট’ শব্দটা কোনভাবেই যায় না। দুনিয়ায় কখনোই ‘লাইফ সেটেলমেন্ট’ সম্ভব নয়। একটুকু বুঝতেই আমার এক জীবন সময় লেগে গেল!
এভাবেই জানি না কখন মালাকুল মাউত এসে সামনে উপস্থিত হবে। তখন আমি বলব, হায়! আমার তো এখনো অনেক কাজ বাকী! আমি তো ভেবেছিলাম, জীবনটা একটু গুছিয়ে নিই তারপর আখেরাতের কাজ শুরু করব। এর মাঝেই আমার সময় ফুরিয়ে গেল! আমাকে আর একটু সময় দাও! তবে তখন আমাকে কোন সময় দেয়া হবে না। হাশরের মাঠে যখন জাহান্নাম নিজ চোখে দেখব তখন আমি অনুনয়-বিনয় করে আল্লাহকে বলব, আর একবার আমাকে দুনিয়ায় ফেরত পাঠান! আমি আমার সকল সম্পদ ছাদাক্বা করে দিব। আমি সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। তখনও আমার এই অনুরোধ আর রাখা হবে না। আমার ‘লাইফ সেটেলমেন্ট’ হবে জাহান্নামের নিকৃষ্টতম স্থানে। সেখানে আমি অনাদী-অনন্তকাল থাকব।
এই সকল ধোঁকার জাল ছিঁড়ে আমি এখন থেকেই আমার পরকাল গুছাতে চাই। সে জীবনে আমি কোথায় থাকব, কিভাবে থাকব তা এখন থেকেই নিশ্চিত করতে চাই। আমি আজই একটি খাতায় হিসাব করব, আমার কাছে কার কি পাওনা আছে। আমি কার কোন হক নষ্ট করেছি। তাদেরকে আমি সেই প্রাপ্যগুলো ফিরিয়ে দিব। তাদের কাছে মাফ চেয়ে নিব। হাশরের ময়দানে ছওয়াবের বিনিময়ে ঋণ পরিশোধ করার চেয়ে এটা আমার কাছে অনেক সহজ। হারাম খাওয়ার চেয়ে না খেয়ে থাকা আমার কাছে অনেক সহজ। এখন থেকে আমি সারাদিন এটাই ভাবব যে, কোন্ কাজ করলে আমি কয়টা ছওয়াব পাব। কারণ এটাই আমার সঞ্চয়। আমি প্রতিটি মুহুর্তকে যিকর ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে মূল্যায়ন করব। হালাল উপার্জনে নিম্নবিত্ত জীবনই আমার কাছে অধিক আনন্দের। মানুষের মন্তব্যকে আমি আর পরোয়া করি না।
মানুষ কি বলল, কি করল এটা দেখে আমার কোন লাভ নেই। কারণ আমার কবরে তারা থাকবে না। আমার পরকাল আমাকেই সুন্দর করতে হবে।
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, আল্লাহ যখন কোন বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে নিজের পাপ স্বীকারের যোগ্যতা এবং অন্যের পাপ অন্বেষণ করা থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান করেন। আর সে আপন সম্পদ নিয়েই প্রাচুর্য বোধ করে ও অন্যের সম্পদ থেকে বিমুখ থাকে এবং অন্যের দুঃখ-কষ্টের ভার বহন করে। আর যখন কারো অকল্যাণ চান, তখন বিপরীতটাই ঘটে।[21] সুতরাং হে পাপিষ্ঠ নফস! এই দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। একটু স্থির হও। একটু শান্ত হয়ে ভাব, যেকোন সময় আমাকে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। কবরের একাকীত্ব সহ্য করতে হবে। জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি কাজের হিসাব আল্লাহ আমার কাছে চাইবেন। সেদিনের জন্য আমাকে প্রস্ত্ততি গ্রহণ করতে হবে। আমার কাছে সময় খুবই কম!
সারওয়ার মিছবাহ
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।
[1]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/৩৫৭২৫; গাযযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন ৩/১৮৯।
[2]. ইবনুল জাওযী, ছায়দুল খাত্বের, পৃ. ২০৬।
[3]. ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আয-যুহুদ, ১৯৭ পৃঃ।
[4]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১০/৯৭, ইমাম শাফেঈর জীবনী দ্র.।
[5]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৭/২৬৮ পৃঃ.।
[6]. মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১০/২৪৯ সনদ ছহীহ।
[7]. হিলয়াতুল আউলিয়া, ৪/৫১।
[8]. বুখারী হা/৬৪৫৪।
[9]. ইবনু মাজাহ হা/৪১৫৩।
[10]. বুখারী হা/৬৪১৬।
[11]. হিলয়াতুল আওলিয়া ৩/২২।
[12]. আল-ফাওয়ায়েদ ১৪৯ পৃঃ ।
[13]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-ওয়াবেলুছ ছাইয়িব ৪২ পৃঃ।
[14]. বায়হাক্বী, আয-যুহদুল কাবীর, পৃঃ ৬৫।
[15]. জামে‘উল ‘উলূম ওয়াল হিকাম ২/৮৯০।
[16]. আহমাদ ইবনু হাম্বল, আয্-যুহ্দ, পৃ. ২৫৯।
১০. ইবনুল জাওযী, আল-মুদহিশ, পৃ: ৩৮৬; তাসলিয়াতু আহলিল মাছায়েব, পৃ: ২৪৮।
[18]. আল-আশবিলী, আল-‘আক্বিবাহ ফী যিকরিল মাওত, পৃ. ৯০।
[19]. আবূ নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ১০/৫৩।
[20]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া ৪/৬৭।
[21]. আল-ফাওয়ায়েদ, ৯৯ পৃঃ ।