জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর সবার কাম্য ছিল কমপক্ষে একটি বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রকাঠামোর। অন্তর্বতীকালীন সরকার সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও সে পথে কিছুটা এগিয়েছিলেন। কিন্তু গত ১২ই ফেব্রুয়ারীতে গণতান্ত্রিক দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর যথারীতি ফেলে আসা দলীয়করণ পুনরায় বিপুল বিক্রমে ফিরে এসেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ভিসি-রেজিষ্ট্রার নিয়োগ থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ, সরকারী নিয়োগ পরীক্ষা ইত্যাদি হেন কোন জায়গা নেই, যেখানে যোগ্যতার বদলে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। যা জুলাই পরবর্তী জাতির ইচ্ছা-আকাংখাকে গলা টিপে হত্যা করা ও জাতির ভবিষ্যৎ মেধা-সম্পদকে ধ্বংস করার এক নীরব প্রক্রিয়া মাত্র।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত সর্বশেষ দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫-এ ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর হয়েছে ১০০-তে ২৪, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন স্কোরগুলোর একটি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর সর্বনিম্ন। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মন্তব্য করেছেন যে, জুলাই অভ্যুত্থান-উত্তর সংস্কার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি অব্যাহত থাকায় সামগ্রিক অবস্থানের অবনতি ঘটেছে। ফলে একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। অর্থাৎ অভ্যুত্থানের পর যে সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে হয়েছে তার বিপরীত।
সম্প্রতি নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে সরকার ঘোষিত সিদ্ধান্তে একই দ্বিচারিতা লক্ষণীয়। শীর্ষ পর্যায়ের বিসিএস পরীক্ষায় স্বচ্ছতার দাবিতে ভাইভার নম্বর কমানো হলেও, ১১ থেকে ২০ গ্রেডের বিপুলসংখ্যক পদে ঠিক উল্টো পথে হাঁটা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, এসব গ্রেডে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো এবং লিখিত পরীক্ষায় পাসের ন্যূনতম নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বুঝা যায় যে, এই পরিবর্তন নিয়োগ-বাণিজ্যকে আরও সহজলভ্য করারই মাধ্যম। প্রশ্ন হচ্ছে, যে জুলাইয়ের সূচনাই হয়েছিল মেধার বৈষম্য দূর করার জন্য, সেই বৈষম্য পুনরায় ফিরে আসতে চলেছে অতীতের চেয়ে আরো নগ্ন চেহারায়!
শুধু নিয়োগ ও পদায়নে দলীয়করণেই সংকট সীমাবদ্ধ নয়; সরকারের অনেক নীতিগত সিদ্ধান্তও প্রায় নীরবে নেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী প্রমাণিত হ’তে পারে। আইন-শৃংখলার ক্রমাবনতি যখন সকলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, ঠিক তখনই তেলের মূল্য আরো একদফা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা মে মাসের মূল্যবৃদ্ধির পর ২য় দফা বৃদ্ধি। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে গেছে। একইভাবে, ২০২৭ সালের দাখিল ও এসএসসি পরীক্ষায় সাধারণ ও মাদ্রাসা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। যার বিরুদ্ধে অভিজ্ঞজনদের পক্ষ থেকে বহু আপত্তি উঠেছে। এর ফলে বিগত সরকারের মত মাদ্রাসা শিক্ষার গুরুত্ব কমানোর মিশনই অব্যাহত রাখা হবে।
সরকার সম্প্রতি নবম জাতীয় বেতনস্কেল অনুমোদন করেছে। যেখানে বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। এটির বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাযার ৫৮০ কোটি টাকা। এতে প্রায় সাড়ে চৌদ্দ লাখ সরকারি কর্মচারীদের খুশী করা গেলেও বাজারে সবকিছুর দাম বাড়বে। ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপে পুরো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো বিশৃংখল হয়ে পড়বে। একই সময়ে মেগা প্রকল্পগুলোতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতাও বাড়ছে। ঢাকার নতুন মেট্রোরেল লাইন এমআরটি-৫ (উত্তর)-এর ব্যয় ৪১ হাযার ২৩৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাযার ৮৪৮ কোটি টাকায়। যা ভবিষ্যতে দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
ইসলাম আমানতদারিতা ও ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক ভিত্তি হিসাবে নির্ধারণ করেছে (নিসা ৪/৫৮)। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, যখন অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব ন্যস্ত করা হবে, তখন তুমি ক্বিয়ামতের অপেক্ষা কর (বুখারী হা/৬৪৯৬; মিশকাত হা/৫৪৩৯)। তিনি সতর্ক করেছেন যে, পূর্ববর্তী জাতিগুলি ধ্বংস হয়েছিল এ কারণে যে, তাদের মধ্যে কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি অপরাধ করলে ছাড়া পেত এবং দুর্বল ব্যক্তি অপরাধ করলে শাস্তি পেত (বুঃ মুঃ মিশকাত হা/৩৬১০)। এই নীতি-নৈতিকতার অভাবই আজকের রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার পিছনে মূল কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
আমরা সরকারের প্রতি জোরালো আহবান জানাই, জনগণের আমানত নিয়ে আর ছিনিমিনি খেলা নয়, জুলাইপূর্ব অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে এবার একটি আদর্শ দেশ গড়ার শপথ নিন। এক্ষণে দেশকে দুর্নীতি ও অনাচারের শীর্ষস্থান থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের প্রস্তাব সমূহ নিম্নরূপ : (১) সর্বত্র দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে রাজনীতির উর্ধ্বে রাখতে হবে। (২) সর্বস্তরে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। (৩) বাজার অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারী কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করতে হবে। (৪) মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে হবে। (৫) জনজীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে এমন প্রতিটি সিদ্ধান্তত সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে নিতে হবে। নিছক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নয়। (৬) সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষার সমন্বয়ের নামে মাদ্রাসা শিক্ষাকে গুরুত্বহীন ও অকার্যকর করার নীতি বন্ধ করতে হবে।
সর্বোপরি রাষ্ট্রক্ষমতায় যারাই থাকুক না কেন, প্রকৃত জবাবদিহিতা, আমানতদারিতা ও মেধাভিত্তিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোন সংস্কারই টেকসই হবে না। আল্লাহ আমাদের দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত সকলকে ন্যায়বিচার ও সততার সাথে দায়িত্ব পালনের তাওফীক দিন এবং দেশকে দুর্নীতির অভিশাপ থেকে হেফাযত করুন-আমীন! (স.স.)