ভূমিকা :
ইলম মহান আল্লাহর অমূল্য নে‘মত ও বিশেষ নূর। এর প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই উদ্ভাসিত হয়, যখন তা কর্মে রূপান্তরিত হয়। প্রাচীন যুগে ইলম হাছিল করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। সুদীর্ঘ সফর ও নিরবচ্ছিন্ন সময় ব্যয় করতে হ’ত একটা হাদীছের জন্য। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই জ্ঞানবিপ্লবের যুগে সেই অবস্থা আর নেই; বরং তথ্যের মহাসমুদ্র আমাদের সর্বদা ঘিরে রেখেছে। একটি ক্লিকেই উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে ছহীহ বুখারী থেকে শুরু করে জগৎসেরা তাফসীর গ্রন্থের দুয়ার। জ্ঞানের এই সহজলভ্যতা নিঃসন্দেহে আল্লাহর এক বিশাল অনুগ্রহ। কিন্তু আফসোসের ব্যাপার হ’ল এই নে‘মতের শুকরিয়া আমরা কতটুকু আদায় করছি? আমাদের জ্ঞানের পরিধি যত বাড়ছে, আল্লাহর ভয়ে আমাদের চোখের অশ্রু কি ততটা ঝরছে? আমাদের বুকশেলফ যত ভারী হচ্ছে, আমাদের সিজদাগুলো কি ততটা দীর্ঘ হচ্ছে? আমাদের অধ্যয়ন যত গভীর হচ্ছে, আমাদের অন্তর কি ততটা নরম হচ্ছে? এই কঠিন প্রশ্নগুলোর মাঝেই লুকিয়ে আছে বর্তমান সময়ের মৌলিক ইলম ও আমলের সমন্বয়হীনতা। এটি এমন এক গোপন ক্ষয়রোগ, যা ঘুণপোকার মতো আমাদের ভেতরটাকে নীরবে খেয়ে ফেলছে। এই আধ্যাত্মিক ব্যাধিই আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়, অন্তর থেকে ঈমান ও তাক্বওয়ার আলো ছিনিয়ে নেয়। আমাদের দাওয়াতকে প্রভাবহীন করে তোলে। জ্ঞানের আলো যখন কর্মের পথকে আলোকিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন তা এক আত্মঘাতী অন্ধকারের জন্ম দেয়। সেই অন্ধকারময় পরিণতি থেকে বাঁচার জন্য বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটির অবতারণা, যাতে আমরা আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হ’তে পারি এবং পরিশুদ্ধির পথে নতুন করে যাত্রা শুরুর প্রেরণা খুঁজে পাই।
ইলম ও আমলের সমন্বয়হীনতার পরিণাম
১. ইলম অনুযায়ী আমল না করা আল্লাহর ক্রোধের কারণ :
জ্ঞানার্জন নিঃসন্দেহে এক মহৎ ইবাদত, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ জ্ঞানীদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেন,قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ، ‘তুমি বল, যারা জানে (বিজ্ঞ) এবং যারা জানে না (অজ্ঞ), তারা কি সমান?’ (যুমার ৩৯/৯)। অন্যত্র তিনি বলেন, يَرْفَعِ اللّٰهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ- ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন’ (মুজাদালা ৫৮/১১)। অত্র আয়াত দু’টির মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের মর্যাদা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু ইলম হাছিলের এই মহৎ ইবাদতটিই এক ভয়াবহ অভিশাপে পরিণত হয়, যখন তা কর্মে রূপান্তরিত না হয়। যে জ্ঞান ব্যক্তিকে আল্লাহর অনুগত করার কথা, আমলের অভাবে সেই জ্ঞানই তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে ক্রোধের পাত্র বানিয়ে দেয়। কথা ও কাজের এই অমিলকে আল্লাহ সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করেন। যেখানে আল্লাহ বলেন, كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ ‘আল্লাহর নিকটে বড় ক্রোধের বিষয় হ’ল, তোমরা যা বল তা কর না?’ (ছফ ১১৪/৩)। এই আয়াতটি আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। আয়াতে উল্লিখিত مَقْتًا শব্দটি সাধারণ অসন্তুষ্টির চেয়েও তীব্র ঘৃণাকে বোঝায়। কারণ মানুষের কথা ও কাজে যখন মিল থাকে না, তার ইলম ও আমলের সমন্বয় থাকে না, তখন সে মিথ্যুক ও ওয়াদা ভঙ্গকারী সাব্যস্ত হয়, যা মুনাফিক্বের বৈশিষ্ট্য। ফলে তার প্রতি আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টিও অত্যন্ত ভয়াবহ হয়।[1]
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ، ‘তোমরা কি লোকদের সৎকাজের আদেশ দাও এবং নিজেদের বেলায় তা ভুলে যাও? অথচ তোমরা আল্লাহর কিতাব (তাওরাত) পাঠ করে থাকো। তোমরা কি বুঝো না?’ (বাক্বারাহ ২/৪৪)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী, ইমাম ইবনে কাছীর, ইমাম বাগাভী সহ প্রমুখ মুফাসসিরীনে কেরাম নিমেণর হাদীছটি উল্লেখ করেছেন। আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, أَتَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِيَ عَلَى قَوْمٍ تُقْرَصُ شِفَاهُهُمْ بِمَقَارِيضَ مِنْ نارٍ، فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ؟، فَقَالَ: هَؤُلَاءِ خُطَبَاءُ أُمَّتِكَ الَّذِينَ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ، وَيَقْرَؤُنَ كِتَابَ اللهِ وَلَا يَعْمَلُونَ بِهِ، ‘মে‘রাজের রাতে আমি এমন একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, যাদের ঠোঁটগুলো আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে জিবরীল! এরা কারা?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘এরা আপনার উম্মতের সেই সব বক্তা, যারা এমন কথা বলত যা তারা নিজেরা করত না। তারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করত, কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করত না’।[2] এই কথাগুলো কোন সাধারণ পাপীর জন্য নয়। এটা একজন ব্যবসায়ীর জন্য নয়, যে মাপে কম দিয়েছে। এটা একজন শ্রমিকের জন্য নয়, যে কাজে ফাঁকি দিয়েছে। এটা সরাসরি সেইসব জ্ঞান বহনকারী, বক্তা ও উপদেশদাতাদের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। যারা অন্যদের জন্য মিম্বর সাজায়, কিন্তু নিজেদের জন্য কোন ইবাদতের আসন পাতে না। যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, তার মর্ম বুঝে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আমল করতে গেলেই তাদের হৃদয় পাথরের মত শক্ত হয়ে যায়। তাদের বলা প্রতিটি কথা, লেখা প্রতিটি অক্ষর, তাদের দেওয়া প্রতিটি নছীহত, ফেইসবুকে দেওয়া প্রতিটি স্ট্যাটাস কি আমাদের মুক্তির জন্য সুফারিশ করবে, নাকি আগুনের কাঁচি হয়ে তাদেরই ধরবে? এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার আগে দুনিয়াতেই তাদের সংশোধন হওয়া উচিত। তারা মানুষকে দেখায়, কীভাবে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে হয়, অথচ তাদের নিজেদের ভেতরের পাপের আগুন নেভানোর কোন চেষ্টা করে না। তারা লোকদের বলে, ‘ছালাত কায়েম কর’। অথচ তাদের নিজেদের ছালাতে সেই খুশূ-খুযূ নেই।
তাছাড়া কোন ব্যক্তি বা সমাজের ওপর থেকে আল্লাহর রহমত উঠে যাওয়ার একটি স্পষ্ট লক্ষণ হ’ল- তাদের মধ্যে আমলের চেয়ে তর্কের প্রাধান্য বেড়ে যাওয়া। তারা আত্মশুদ্ধি ও কর্মের ময়দান ছেড়ে অপ্রয়োজনীয় বাহাছ ও বিতর্কের চোরাগলিতে হারিয়ে যায়। ইমাম আওযাঈ (৮৮-১৫৭হি.) এই আধ্যাত্মিক ব্যাধিকে চিহ্নিত করে বলেন, إذَا أَرَادَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِقَوْمٍ شَرًّا، فَتَحَ عَلَيْهِمْ الْجِدَالَ، وَمَنَعَهُمْ الْعَمَلَ، ‘মহান আল্লাহ যখন কোন সম্প্রদায়ের অকল্যাণ চান, তখন তাদের মাঝে তর্ক-বিতর্কের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন এবং আমল সম্পাদনের তাওফীক্ব থেকে তাদের বঞ্চিত করেন’।[3] একইভাবে মা‘রূফ আল-কারখী (মৃ. ২০০হি.) বলেছেন, إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا فَتْحَ عَلَيْهِ بَابَ الْعَمَلِ، وَأَغْلَقَ عَنْهُ بَابَ الْجَدَلِ، وَإِذَا أَرَادَ بِعَبْدٍ شَرًّا أَغْلَقَ عَلَيْهِ بَابَ الْعَمَلِ، وَفَتَحَ عَلَيْهِ بَابَ الْجَدَلِ، ‘যখন আল্লাহ কোন বান্দার কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তার জন্য আমলের দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং তার জন্য তর্ক-বিতর্কের দুয়ার বন্ধ করে দেন। আর যখন তিনি কোন বান্দার অকল্যাণের ইচ্ছা করেন, তার জন্য আমলের দরজা বন্ধ করে দেন এবং তর্ক-বিতর্কের দরজা উন্মুক্ত করে দেন’।[4]
আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা সালাফদের এই কথার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাই। ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন গ্রুপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি রাতের পর রাত ধরে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে। কে সঠিক আর কে বেঠিক, তা প্রমাণ করার জন্য যে পরিমাণ মেধা, সময় ও শক্তি ব্যয় করা হয়, তার সামান্য অংশও যদি আত্মশুদ্ধি বা কোন গঠনমূলক কাজে ব্যয় করা হ’ত, তাহ’লে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের চেহারাই পাল্টে যেত। আবার দেখা যায়, অনেকেই ফিক্বহের সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে তর্কে লিপ্ত, কিন্তু নিজেরা পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করতে উদাসীন। অনেকেই অন্যের আক্বীদা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ব্যস্ত, কিন্তু নিজের চরিত্র ও আখলাক সংশোধনে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন। এই অবস্থাই প্রমাণ করে, আমরা তর্কের দ্বার উন্মুক্ত করেছি, কিন্তু আমলের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছি।
সুতরাং আল্লাহ আমাদের কল্যাণ চান নাকি অকল্যাণ, তা যদি আমরা উপলব্ধি করতে চাই তবে আমাদের কর্ম ও কথার অনুপাতই তার প্রধান মানদন্ড হ’তে পারে। কেননা আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তিনি তাকে বেশী বেশী আমল করার তাওফীক্ব দেন এবং অপ্রয়োজনীয় তর্ক থেকে দূরে রাখেন। এই মূলনীতিটি সালাফদের কথায় বারবার উঠে এসেছে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হ’ল- সাধারণ পাপীর চেয়ে একজন আমলহীন জ্ঞানীর পাপ অনেক বেশী ভয়ংকর ও ক্ষতিকর। এজন্য সালাফগণ পাপী আলেম ও ক্বারীদের সবচেয়ে বেশী ভয় করতেন। তাবে‘ঈ আইয়ূব আস-সাখতিয়ানী (৬৬-১৩১ হি.) বলেন, لَا خَبِيثَ أَخْبَثُ مِنْ قَارِئٍ فَاجِرٍ، ‘পাপাচারে লিপ্ত ক্বারী (কুরআনের বাহক ও পাঠক)-এর চেয়ে দুষ্কৃতিকারী আর কেউ নেই’।[5] মালেক ইবনে দীনার (মৃ. ১৪০ হি.) বলেন,لَأَنَا لِلْقَارِئِ الْفَاجِرِ أَخْوَفُ مِنِّي مِنَ الْفَاجِرِ الْمُبْرِزِ بِفُجُورِهِ، إِنَّ هَذَا أَبْعَدُهُمَا غَوْرًا، ‘আমি প্রকাশ্যে পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তির চেয়ে বেশী ভয় করি পাপীকে। কেননা গুনাহগার ক্বারী অধিক ক্ষতিকর’।[6] এর একটি কারণ হ’ল, সাধারণ পাপী তার পাপের কারণে লজ্জিত থাকে, কিন্তু আমলহীন ক্বারী তার জ্ঞানের অহংকারে এমনভাবে ডুবে থাকে যে, সে তার পাপকে তুচ্ছ ভাবতে শুরু করে। আরেকটি কারণ হচ্ছে, সাধারণ পাপীর পাপ তার নিজের ক্ষতি করে। কিন্তু একজন জ্ঞানীর পদস্খলন বহু মানুষকে দ্বীন থেকে বিমুখ করে দেয়। মানুষ তার জ্ঞানের মুখোশের আড়ালে থাকা পাপাচার দেখে হতাশ হয় এবং অনেক সময় মূল দ্বীনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেজন্য একজন আমলহীন জ্ঞানী সমাজের জন্য এক নীরব ঘাতক, যে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর নামে অজ্ঞতা ও পাপাচারের অন্ধকার বিস্তার করে।
সুতরাং আমাদের ভেবে দেখা উচিত যে, অর্জিত জ্ঞান কি আমাদের আরও বিনয়ী ও আল্লাহভীরু করছে, নাকি আমাদেরকে অহংকারী ও তার্কিক বানাচ্ছে? আমাদের কথা ও কাজের মধ্যে কি কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায়? আমাদের জ্ঞান কি আমাদের মুক্তির কারণ হবে, নাকি আল্লাহর কঠিন ক্রোধের কারণ হবে? আল্লাহ আমাদের কথা ও কাজকে এক করে দিন এবং আমলবিহীন জ্ঞানের অভিশাপ থেকে রক্ষা করুন-আমীন!
২.আলেমের কথার প্রভাব কমে যায় :
আমল হ’ল আলেমের কথার প্রাণ। একজন আমলকারী আলেমের মুখ থেকে নিঃসৃত সাধারণ কথাও মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে, অন্যদিকে আমলহীন আলেমের জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও শ্রোতার কানে প্রবেশ করলেও অন্তরে পৌঁছাতে পারে না। তার কথায় কোন আধ্যাত্মিক প্রভাব বা ‘নূর’ থাকে না। ফলে মানুষ তার দ্বারা বাহ্যিকভাবে প্রভাবিত হ’লেও আত্মিকভাবে উপকৃত হয় না। কথা ও কাজের এই বিচ্ছিন্নতা আল্লাহর কাছে যেমন নিন্দনীয়, মানুষের কাছেও তা গ্রহণযোগ্যতা হারায়। মালেক ইবনু দীনার (রহঃ) এ অবস্থাকে একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, إِنَّ الْعَالِمَ إِذَا لَمْ يَعْمَلْ بِعِلْمِهِ زَلَّتْ مَوْعِظَتُهُ عَنِ الْقُلُوبِ كَمَا يَزَلُّ الْقَطْرُ عَنِ الصَّفَا، ‘যখন আলেম তার ইলম অনুযায়ী আমল করে না তখন তার উপদেশ মানুষের অন্তর থেকে পিছলে যায়, যেভাবে মসৃণ পাথরের ওপর থেকে বৃষ্টি ফোঁটা পিছলে পড়ে’।[7]
এই উপমাটি আজকের ডিজিটাল যুগের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিভিন্ন প্লাটফর্মে আমরা অসংখ্য জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনি। বক্তার উপস্থাপনা, ভাষার মাধুর্য আর তথ্যের গভীরতায় আমরা বিমুগ্ধ হই। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সেই প্রভাব হারিয়ে যায়। কিন্তু এটা হয় কেন? কারণ শ্রোতার অন্তর অবচেতনভাবেই বক্তার কথা ও কাজের মিল খোঁজে। যখন শ্রোতা জানতে পারে বা অনুভব করে যে, যিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে সততা, বিনয় বা আল্লাহর ভয় নিয়ে কথা বলছেন, তার ব্যক্তিগত জীবনে এগুলোর ছিটেফোঁটাও নেই, তখন তার অন্তর সেই উপদেশকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। কথাগুলো মসৃণ পাথরের ওপর পড়া বৃষ্টির ফোঁটার মতই হয়। মুহূর্তের জন্য ভেজা মনে হ’লেও পরক্ষণেই শুকিয়ে যায়, কোন দাগ বা প্রভাব রেখে যায় না। অন্তর সেই কথাকে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তা প্রাণহীন ও কপটতায় পূর্ণ।
আমলহীন আলেমের চূড়ান্ত পরিণতি কতটা ভয়াবহ, তা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এক মর্মান্তিক উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন,مَثَلُ الَّذِي يُعَلِّمُ النَّاسَ الْخَيْرَ وَيَنْسَى نَفْسَهُ، كَمَثَلِ السِّرَاجِ يُضِيءُ لِلنَّاسِ وَيَحْرَقُ نَفْسَهُ، ‘যে ব্যক্তি মানুষকে কল্যাণ শিক্ষা দেয়, কিন্তু নিজেকে ভুলে যায়, তার উদাহরণ হ’ল সেই প্রদীপের মতো, যা অন্যকে আলো দেয়, কিন্তু নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে’।[8]
এর চেয়ে বড় আফসোস আর কী হ’তে পারে? একজন আলেম বা দাঈ, যার কথায় প্রভাবিত হয়ে শত শত মানুষ নিজেদের জীবন পরিবর্তন করেছে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছে। অথচ ক্বিয়ামতের দিন দেখা যাবে, সেই আলেম নিজেই ধ্বংসপ্রাপ্ত। তার জ্ঞান অন্যদের জন্য আলো হ’লেও, নিজের জন্য হয়েছে আগুন। সে ছিল কেবল একটি মাধ্যম, একটি প্রদীপ, যা অন্যকে আলোকিত করতে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকেই জ্বালিয়ে শেষ করে দিয়েছে। এই আত্মপ্রবঞ্চনা ও আত্মঘাতী পরিণতি থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।
আমলহীন জ্ঞানী ব্যক্তি শুধু আল্লাহর কাছেই নয়, মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা হারায়। মানুষের ফিৎরাত বা স্বভাব-প্রকৃতি সত্য ও সততাকে ভালোবাসে। তারা এমন নেতা বা আলেমকে অনুসরণ করতে চায়, যার কথা ও কাজের মধ্যে কোন ফারাক নেই।
এই শাশ্বত সত্যকে তুলে ধরে ইমাম ইবনু শিহাব যুহরী (৫০-১২৪হি.) বলেন,يَرْضَيَنَّ النَّاسُ قَوْلَ عَالِمٍ لَا يَعْمَلُ، وَلَا عَامَلٍ لَا يَعْلَمُ، ‘মানুষ কখনোই এমন আলেমের কথায় সন্তুষ্ট হবে না, যে ইলম অনুযায়ী আমল করে না। অনুরূপ এমন আমলকারীর প্রতিও সন্তুষ্ট হয় না, যার ইলম নেই’।[9] অন্যত্র তিনি বলেন, لَا يُوَثَّقُ لِلنَّاسِ عَمَلُ عَامِلٍ لَا يَعْلَمُ، وَلَا يُرْضَى بِقَوْلِ عَالِمٍ لَا يَعْمَلُ، ‘মানুষের কাছে এমন আমলকারীর কথা গ্রহণযোগ্য হয় না, যে আমল করে না। অনুরূপভাবে আমলহীন আলেমের কথার উপরেও মানুষ সন্তুষ্ট হতে পারে না’।[10] অর্থাৎ শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না, আমলও করতে হবে। আবার শুধু আমল করলেও চলবে না, সেটা হ’তে হবে সঠিক জ্ঞানভিত্তিক।
আমরা যারা দ্বীনের কথা বলি, জ্ঞানের কথা শেয়ার করি, হোক তা পরিবারের ক্ষুদ্র পরিসরে বা সোশ্যাল মিডিয়ার বিশাল জগতে, আমাদের প্রত্যেকের জন্য এই বাণীগুলো এক একটি আয়না। আমাদের কথাগুলো মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করছে, নাকি মসৃণ পাথর থেকে পিছলে পড়ছে? আমরা কি অন্যদের জন্য আলো বিলিয়ে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলছি? সব সময় এই প্রশ্নগুলো মনে রাখা প্রয়োজন। কারণ মানুষের প্রতিটি কথার শক্তি লুকিয়ে থাকে তার আমলের মাঝে। আমল যত বিশুদ্ধ ও আন্তরিক হবে, তার কথার প্রভাবও তত গভীর ও স্থায়ী হবে।
৩.আমলহীন মানুষ পথভ্রষ্ট হয় :
ইলম বা জ্ঞান হ’ল গন্তব্যে পৌঁছার জন্য মানচিত্র স্বরূপ। কোন মুসাফির যদি মানচিত্র হাতে পেয়েও তদনুযায়ী পথ না চলে, তিনি যেমন গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না, ঠিক তেমনি যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করেন কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করেন না, তিনিও হেদায়াতের পথে থেকেও বিচ্যুত হয়ে যান। এটি এক ভয়ংকর আত্মপ্রবঞ্চনা। কারণ জ্ঞানের অহংকার তাকে ভাবতে বাধ্য করে যে তিনি সঠিক পথেই আছেন, অথচ বাস্তবে তিনি বিভ্রান্তির এক গভীর সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছেন। যাদের কথার সাথে কাজের মিল থাকে না এবং জ্ঞানের সাথে আমলের সমন্বয় থাকে না তাদের উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ বলেন, مَثَلُ الَّذِينَ حُمِّلُوا التَّوْرَاةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ أَسْفَارًا، ‘যারা তাওরাত বহনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, অতঃপর তারা তা বহন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত হ’ল গাধার মত, যে কিতাবের বোঝাসমূহ বহন করে’ (জুম‘আ ৬২/৫)।
অত্র আয়াতটি ইহুদীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে তাকালে বর্তমান সমাজের মুসলিমদের এক অদ্ভুত চিত্রায়ণ দেখা যায় এই আয়াতে। সমাজে এমন অসংখ্য পুরুষকে দেখা যায়, যারা জুম‘আর খুৎবায় সূদকে জাহান্নামের আগুন জেনেও অবলীলায় সূদী লেনদেনে ডুবে থাকে। যারা ছালাতের গুরুত্ব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করেন, কিন্তু ফজরটা তাদের ঘুমের কাছে পরাজিত হয়। মানুষকে ভালো কাজ করার সবক দেন, কিন্তু নিজের জীবনে সেই ভালো কাজের প্রভাব অনুপস্থিত। একইভাবে, এমন অগণিত নারী আছেন, যারা পর্দার প্রতিটি আয়াত ও হাদীছ মুখস্থ জানেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় পর্দার পক্ষে শত শত পোস্ট শেয়ার করেন, কিন্তু পারিবারিক অনুষ্ঠানে বা ব্যক্তিগত জীবনে সেই পর্দার লেশমাত্র অবশিষ্ট থাকে না। তারা উত্তম স্ত্রী ও মায়ের গুণাবলী বিষয়ক লেকচার শুনে চোখে পানি আনেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে স্বামী, সন্তান-সন্ততি এবং শ^শুর-শাশুড়ী, পুত্রবধুর সাথে তাদের আচরণে সেই জ্ঞানের কোন কোমলতা বা ধৈর্য ফুটে ওঠে না। এই মানুষগুলো যেন সেই জ্ঞান বহনকারী গাধার আধুনিক সংস্করণ। তাদের স্মার্টফোনে, ল্যাপটপে আর বইয়ের সেলফে জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার সংরক্ষিত আছে। তারা জ্ঞানের ভারে ন্যুব্জ, কিন্তু সেই জ্ঞানের আলো তাদের অন্তরকে আলোকিত করতে পারেনি, তাদের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করতে পারেনি, তাদের লেনদেনকে পবিত্র করতে পারেনি। গাধা যেমন তার পিঠের ওপর রাখা বইয়ের ভার অনুভব করে মাত্র, বইয়ের ভেতরের জ্ঞান থেকে সে চিরকাল বঞ্চিত, তেমনি এই আমলহীন জ্ঞানীরাও কেবল তথ্যের বোঝা বহন করে বেড়ায়; হেদায়াতের নূর তাদের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছায় না।
সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী (২০৩-২৮৩হি.) বলেন, النَّاسُ كُلُّهُمْ سُكَارَى إِلَّا الْعُلَمَاءُ، وَالْعُلَمَاءُ كُلُّهُمْ حَيَارَى إِلَّا مَنْ عَمِلَ بِعِلْمِهِ، ‘আলেমগণ ছাড়া সকল মানুষ দিকভ্রান্ত। আর অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমলকারী ছাড়া সকল আলেম দিশেহারা’।[11] অর্থাৎ সাধারণ মানুষ অজ্ঞতার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, আর আলেমরা জ্ঞানের বিশালতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই দিশেহারা অবস্থা থেকে কেবল তারাই মুক্তি পায়, যারা তাদের জ্ঞানকে কর্মে রূপান্তরিত করে পথের দিশা খুঁজে নেয়। মালেক ইবনে দীনার (মৃ. ১৪০ হি.) বলেন, إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا طَلَبَ الْعِلْمَ لِلْعَمَلِ كَسَرَهُ عِلْمُهُ، وَإِذَا طَلَبَهُ لِغَيْرِ ذَلِكَ ازْدَادَ بِهِ فُجُورًا أَوْ فَخْرًا، ‘বান্দা যখন আমলের জন্য ইলম অন্বেষণ করে, তখন তার ইলম তাকে চূর্ণবিচূর্ণ (বিনয়ী) করে দেয়। আর যখন সে অন্য কোন উদ্দেশ্যে তা অন্বেষণ করে, তখন এর দ্বারা তার পাপাচার ও অহংকারই বৃদ্ধি পায়’।[12]
বর্তমান সময়ে অনেকেই সামান্য জ্ঞান অর্জন করেই নিজেকে অন্যদের চেয়ে জ্ঞানী ভাবতে শুরু করেন। তাদের জ্ঞান তাদেরকে আল্লাহর সামনে নত করার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সামনে অহংকারী করে তোলে। তারা তাদের জ্ঞানকে মানুষের ভুল ধরা এবং নিজেকে যাহির করার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। মূলত এমন ব্যক্তিরাই জ্ঞানের অহংকার করে থাকেন, ফলে এই জ্ঞানের মাধ্যমে তাদের গুনাহের পাল্লা ভারী হ’তে থাকে। যারা খালেছ নিয়তে ইলম শিখে না, তাদের ক্ষেত্রেই সাধারণত এমনটা ঘটে থাকে। অন্যদিকে যারা একনিষ্ঠ নিয়তে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করেন, তারা যতই জানেন ততই নিজের অজ্ঞতা ও দ্বীনতা উপলব্ধি করেন। তাদের জ্ঞান তাদেরকে আল্লাহর বিশালতার সামনে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়, ফলে তারা হন বিনয়ী, কোমল ও ক্ষমাশীল প্রকৃতির মানুষ।
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন,التَّفَاخُرُ بِالْعِلْمِ أَسْوَأُ حَالًا عِنْدَ اللَّهِ مِنَ التَّفَاخُرِ بِالْمَالِ وَالْجَاهِ، فَإِنَّهُ جَعَلَ أَسْبَابَ الْآخِرَةِ لِلدُّنْيَا، وَصَاحِبُ الْمَالِ وَالْجَاهِ اسْتَعْمَلَ أَسْبَابَ الدُّنْيَا لَهَا وَكَاثَرَ بِأَسْبَابِهَا، ‘বিদ্যা নিয়ে গর্ব করা আল্লাহর নিকট সম্পদ ও মর্যাদা নিয়ে গর্ব করার চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা সে (জ্ঞানের অহংকারী) আখেরাতের উপকরণকে দুনিয়ার জন্য ব্যবহার করেছে। আর সম্পদ ও মর্যাদার মালিক তো দুনিয়ার উপকরণকে দুনিয়ার জন্যই কাজে লাগিয়েছে এবং সেখানেই প্রতিযোগিতা করেছে’।[13]
৪.আমল না করলে ইলম থাকে না :
জ্ঞান বা ইলম কোন জড় বস্ত্ত নয় যে, তা অর্জন করার পর আজীবন সিন্দুকে জমা থাকবে। বরং ইলম এক জীবন্ত সত্তার মত, যার প্রাণ হ’ল ‘আমল’। যখন আমলের মাধ্যমে এর যত্ন নেওয়া হয়, তখন তা বৃদ্ধি পায়, আলোকিত হয় এবং ব্যক্তির জীবনে স্থিতি লাভ করে। কিন্তু মানুষ যখন আমল থেকে বিমুখ হয়, তখন অভিমানী অতিথির মত ইলম বিদায় নেয়, রেখে যায় কেবল শূন্যতা আর আফসোস। এজন্য আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলতেন,تَعَلَّمُوا تَعْلَمُوا، فَإِذَا عَلِمْتُمْ فَاعْمَلُوا ‘তোমরা ইলম শেখ, জ্ঞান অর্জন কর। আর যখন ইলম অর্জন হয়ে যাবে, তখন আমল করতে থাক’।[14] সুফিয়ান ছাওরী (৯৭-১৬১ হি.) বলেন, يَهْتِفُ الْعِلْمُ بِالْعَمَلِ، فَإِنْ أَجَابَهُ حَلَّ وَإِلَّا ارْتَحَلَ، ‘ইলম আমলকে কানে কানে আহবান জানায়। আমল যদি তার ডাকে সাড়া দেয়, তবে সে উপস্থিত থাকে, অন্যথা সে (ব্যক্তির কাছ থেকে) প্রস্থান করে’।[15] একবার ভাবুন, কী গভীর কথা! জ্ঞান যেন নিজ থেকেই তার অধিকার দাবী করে। যদি আমরা সেই ডাকে সাড়া দেই, তবে সেই জ্ঞান আমাদের অন্তরে গেঁথে যায়, আমাদের পথ দেখায় এবং বরকতে পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু যদি সাড়া না দেই? তখন জ্ঞান আমাদের থেকে প্রস্থান করে।
একজন ব্যক্তির জীবন থেকে জ্ঞানের প্রস্থান বিভিন্নভাবে হ’তে পারে। যেমন :
(ক) স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়ার মাধ্যমে। কারণ যে জ্ঞান ব্যবহার করা হয় না, মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে তা ভুলে যায়। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম।
(খ) তাওফীক্ব কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে। অনেক সময় জ্ঞান মাথায় থাকে, কিন্তু তদনুযায়ী আমল করার ইচ্ছা বা তাওফীক্ব আল্লাহ কেড়ে নেন। জ্ঞান তখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং পথ দেখানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
(গ) বরকত নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে। জ্ঞানটি হয়ত আমাদের মুখস্থ থাকে, আমরা অন্যদের বলতেও পারি, কিন্তু সেই জ্ঞানের নূর ও আধ্যাত্মিক প্রভাব আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায়। অন্তর সেই জ্ঞানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে না।
আমল না করলে যে ইলম থাকে না, তা উপলব্ধির জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন কেউ অনেক মেহনত করে সকাল-সন্ধ্যার পঠিতব্য দো‘আগুলো মুখস্থ করল। এখন তিনি যদি নিয়মিত এই দো‘আগুলো পাঠের মাধ্যমে জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ না করেন, তবে অল্প দিনের মধ্যেই তিনি সব দো‘আ ভুলে যাবেন। আর এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
৫.আমল ছাড়া ইলমের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না :
ইলম বা জ্ঞানের এক আধ্যাত্মিক স্বাদ রয়েছে, যা বইয়ের পাতায়, মুখস্থের প্রতিযোগিতায় বা বিতর্কের আসরে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই ইলাহী স্বাদ ও তৃপ্তি কেবল তখনই অনুভূত হয়, যখন জ্ঞানকে কর্মে বা আমলে বাস্তবায়ন করা হয়। যে ব্যক্তি তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী নিজের জীবনকে সাজায়, তার অন্তর এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি, আনন্দ এবং নূর দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। এই অনুভূতিটা আমলকারী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ উপলব্ধি করতে পারে না।
জ্ঞান অর্জনের পর তা দু’টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হ’তে পারে। একটি পথ আনন্দের, অন্যটি অহংকারের। আর এই পার্থক্য নির্ভর করে ব্যক্তির নিয়তের ওপর, তিনি কি আমল করার জন্য শিখছেন, নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্যে? এই বিষয়টি তুলে ধরে মালেক ইবনু দীনার (রহঃ) বলেন,إِذَا طَلَبَ الرَّجُلُ الْعِلْمَ لِيَعْمَلَ بِهِ سَرَّهُ عِلْمُهُ، وَإِذَا طَلَبَ الْعِلْمَ لِغَيْرِ أَنْ يَعْمَلَ بِهِ زَادَهُ عِلْمُهُ فَخْرًا، ‘যখন কোন ব্যক্তি আমল করার জন্য ইলম অর্জন করে, তখন তার ইলম তাকে আনন্দিত করে। আর যখন সে আমল করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করে, তখন সেই ইলম তার অহংকার বাড়িয়ে দেয়’।[16]
ধরুন! আপনি শিখলেন যে, কোন ভাইয়ের সাথে মুচকি হেসে কথা বলা ছাদাক্বা।[17] এই জ্ঞানটুকু জানার মধ্যে এক প্রকার আনন্দ আছে। কিন্তু যখন আপনি বাস্তবে একজন ভারাক্রান্ত মুসলিম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আন্তরিকভাবে হাসবেন এবং তার চেহারায় এক ঝলক স্বস্তি ফুটে উঠতে দেখবেন, তখন আপনার অন্তরে যে নির্মল আনন্দ ও প্রশান্তি অনুভূত হবে সেটাই হ’ল ইলমের আসল স্বাদ। আপনার জ্ঞান তখন জীবন্ত হয়ে উঠবে। অন্যদিকে যে ব্যক্তি কেবল বিতর্কে জেতার জন্য, নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণ করার জন্য বা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্ট পাওয়ার জন্য জ্ঞান অর্জন করে, তার জ্ঞান তাকে আনন্দ দেয় না; বরং অহংকারী করে তোলে। সে হয়তো কুরআন-হাদীছের অসংখ্য রেফারেন্স মুখস্থ বলতে পারে, কিন্তু তার আচরণে বিনয় থাকে না, ক্ষমা থাকে না, দয়া থাকে না। তার জ্ঞান তার জন্য এক ভারী বোঝা, যা তাকে আল্লাহর কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয় এবং তাকে অহংকারী বানায়।
তবে নতুন কিছু জানা, অজানাকে বোঝা- এতে এক ধরনের দুনিয়াবী আনন্দ আছে। কিন্তু সেই আনন্দকে যখন আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে জুড়ে দেওয়া হয়, তখন তা আখেরাতের সীমাহীন আনন্দের পাথেয় হয়ে যায়। সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী (২০৩-২৮৩হি.) বলেন, الْعِلْمُ أَحَدُ لَذَّاتِ الدُّنْيَا، فَإِذَا عُمِلَ بِهِ صَارَ لِلْآخِرَةِ، ‘জ্ঞান দুনিয়ার অন্যতম উপভোগ্য বিষয়। আর সেই জ্ঞান অনুযায়ী যদি আমল করা হয়, তবে সেটা আখেরাতের জন্যও উপভোগ্য হয়ে যায়’।[18] যেমন কোন বান্দা তাহাজ্জুদের ফযীলত সম্পর্কে জানল, সেটা তার জন্য দুনিয়ার একটি জ্ঞানগত আনন্দ। কিন্তু যখন তিনি নিশুতি রাতে অলসতা ছুড়ে ফেলে ছালাতে দাঁড়াবেন, সিজদায় আল্লাহর সাথে একান্তে কথা বলবেন, হৃদয় খুলে নিজের আর্জিগুলো সৃষ্টিকর্তার কাছে ব্যক্ত করবেন, তখন তিনি যে অপার্থিব স্বাদ ও প্রশান্তি পেলেন, তা সরাসরি আখেরাতের সাথে যুক্ত হয়ে গেল।
বান্দা যখন অর্জিত জ্ঞানের আলোকে আমল করেন এবং এর জ্ঞানের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন, তখন তিনি তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতির ময়দানে বিচরণ করতে পারেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সেই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেম বা জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে’ (ফাতির ৩৫/২৮)। এই আয়াত প্রমাণ করে, সত্যিকারের জ্ঞানের চূড়ান্ত ফলাফল হ’ল আল্লাহভীতি বা পরহেযগারিতা, যা অন্তরের একটি আমল এবং বাহ্যিক সকল আমলের চালিকাশক্তি। যার জ্ঞান তাকে আল্লাহর ভয়ে ভীত করতে পারে না, সে ইলমের প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়।
সুতরাং ইসলামে জ্ঞান অর্জন কোন বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা নয়; বরং এটি একটি পবিত্র আমানত এবং একটি গুরু দায়িত্ব। এই আমানতের হক তখনই আদায় হয়, যখন জ্ঞানকে আমলে রূপান্তরিত করা হয়। নতুবা সেই জ্ঞানই ব্যক্তির জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাত্বার আল-ওয়ার্রাক (মৃ. ১২৯ হি.) বলেন,خَيْرُ الْعِلْمِ مَا نَفَعَ، وَإِنَّمَا يَنْفَعُ اللّٰهُ بِالْعِلْمِ مَنْ عَلِمَهُ وَعَمِلَ بِهِ، وَلَا يَنْفَعُ بِمَنْ عَلِمَهُ ثُمَّ تَرَكَهُ، ‘সর্বোত্তম জ্ঞান সেটাই, যা উপকার করে। আর আল্লাহ তো কেবল সেই ব্যক্তিকেই জ্ঞানের দ্বারা উপকৃত করেন, যে তা শিখেছে এবং সে অনুযায়ী আমল করেছে। তিনি সেই ব্যক্তিকে এর দ্বারা উপকৃত করেন না, যে তা শিখেছে, কিন্তু পরে তা পরিত্যাগ করেছে’।[19] অর্থাৎ জ্ঞানের পরিমাণ দিয়ে তার উপকারিতা মাপা হয় না; বরং তার প্রভাব ও আমল দিয়ে মাপা হয়। যে জ্ঞান ব্যক্তিকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, তার চরিত্রকে সুন্দর করে এবং তাকে আরও বিনয়ী করে তোলে, সেটাই প্রকৃত উপকারী জ্ঞান।
ইয়াহ্ইয়া ইবনে মু‘আয আর-রাযী (মৃ. ২৫৮ হি.) বলেন, مِسْكِينٌ مَنْ كَانَ عِلْمُهُ حَجِيجُهُ، وَلِسَانُهُ خَصِيمُهُ، وَفَهْمُهُ الْقَاطِعُ بِعُذْرِهِ ‘সেই ব্যক্তি কতই না দুর্ভাগা, যার জ্ঞানই (কিবয়ামতের দিন) তার বিপক্ষে বিতর্ককারী হবে, যার জিহবা তার প্রতিপক্ষ হবে এবং যার বোধশক্তিই তার (আমল না করার) পক্ষে চূড়ান্ত অজুহাত পেশকারী হবে’।[20] সুতরাং আমরা যেন জ্ঞানকে কেবল মস্তিষ্কের অলংকার না বানাই; বরং এটাকে আত্মার খোরাক ও কর্মের চালিকাশক্তিতে পরিণত করি। প্রতিটি জ্ঞানের পর যেন আমাদের একটি আমল বৃদ্ধি পায়। তবেই আমরা ইলমের সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাদ লাভ করতে পারব, যা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতকেই আলোকিত করবে।
৬. আমল ছাড়া ইলমের নূর নিভে যায় :
ইলম কোন সাধারণ জাগতিক বস্ত্ত নয়। এটি আসমান থেকে নেমে আসা এক ইলাহী নূর, যা আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত বান্দাদের অন্তরে দান করেন। এই পবিত্র নূরকে ধারণ করার জন্য আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে একটি পাত্র দিয়েছেন। আর তা হ’ল আমাদের ক্বলব বা হৃদয়। আর ‘আমল’ বা কর্ম হ’ল সেই পাত্রের যত্নশীলতা ও পবিত্রতা রক্ষা করার মাধ্যম। যখন কর্মবিমুখতার পাপ, অলসতার কালিমা আর অহংকারের ধুলো সেই হৃদয়পাত্রকে কলুষিত ও অন্ধকার করে ফেলে, তখন ইলাহী জ্ঞানের পবিত্র আলো আর সেখানে স্থির থাকতে পারে না, ধীরে ধীরে সে আলো নিভে যায়, রেখে যায় কেবল জ্ঞানের খোলসটুকু। জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদ বাগদাদী (২১৫-২৯৮হি.) বলেন,مَتَى أَرَدْتَ أَنْ تَشَرَّفَ بِالْعِلْمِ وَتُنْسَبَ إِلَيْهِ، وَتَكُونَ مِنْ أَهْلِهِ قَبْلَ أَنْ تُعْطِيَ الْعِلْمَ مَالَهُ عَلَيْكَ، احْتَجَبَ عَنْكَ نُورُهُ وَبَقِيَ عَلَيْكَ وَسْمُهُ وَظُهُورُهُ، ذَلِكَ الْعِلْمُ عَلَيْكَ لَا لَكَ، وَذَلِكَ أَنَّ الْعِلْمَ يُشِيرُ إِلَى اسْتِعْمَالِهِ، وَإِذَا لَمْ يُسْتَعْمَلِ الْعِلْمُ فِي مَرَاتِبِهِ رَحَلَتْ بَرَكَاتُهُ، ‘যখন তুমি ইলমের ওপর তোমার যে হক রয়েছে তা আদায় করার আগেই ইলমের মাধ্যমে সম্মানিত হ’তে চাইবে, এর সাথে সম্পর্কিত হ’তে চাইবে এবং এর ধারক-বাহক হিসাবে পরিচিত হ’তে চাইবে, তখন ইলমের নূর তোমার থেকে আড়ালে চলে যাবে এবং তোমার ওপর কেবল তার বাহ্যিক রূপ ও প্রকাশই অবশিষ্ট থাকবে (যেমন সার্টিফিকেট, লক্বব, উপাধি, মানুষের প্রশংসা)। সেই ইলম তোমার পক্ষে না হয়ে, তোমার বিপক্ষের দলীল হবে। কারণ ইলম তো তার ওপর আমল করার দিকেই ইঙ্গিত করে। যখন তুমি ইলমের বিভিন্ন স্তরে আমল করবে না, তখন তার বরকতসমূহ চলে যাবে’।[21]
দুঃখজনক হ’লেও সত্য যে, আমাদের সমাজে ইলমের খোলসের অন্বেষী অনেক, কিন্তু তার নূরের অন্বেষণকারী খুবই কম। একজন ছাত্র যখন মাদ্রাসায় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন এই নিয়তে ভর্তি হয় যে, সে একজন বড় আলেম হবে, মানুষ তাকে সম্মান করবে, তার অনেক ফ্যান-ফলোয়ার বা অনুসারী থাকবে, চারদিকে নাম-ডাক থাকবে- তখন সে মূলত ইলমের হক (আমল ও ইখলাছ) আদায়ের আগেই তার সম্মানটুকু চেয়ে বসে। এর ফলে আল্লাহ তার থেকে ইলমের নূর কেড়ে নেন। তার কাছে তখন শুধু খোলস অবশিষ্ট থাকে। সে হয়তো বড় আলেম বা বক্তা হয়, বড় লেখক হয়, কিন্তু তার কথায় বা লেখায় সেই আধ্যাত্মিক প্রভাব থাকে না, যা মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করতে পারে এবং নিজের ব্যক্তি জীবনে বাস্তবায়িত হয়। তার জ্ঞান তখন তাকে বিনয়ী করতে পারে না; বরং তার অহংকার বৃদ্ধি করে।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ মুনাফিকদের একটি উদাহরণ দিয়েছেন, যা আমলহীন আলেমের অবস্থার সাথে মিলে যায়। আল্লাহ্ বলেন,مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَا يُبْصِرُونَ، ‘তাদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন জ্বালালো। অতঃপর যখন তা চারদিক আলোকিত করল, তখন আল্লাহ সে আলো ছিনিয়ে নিলেন ও তাদেরকে এমন গাঢ় অন্ধকারে নিক্ষেপ করলেন যে তারা আর কিছুই দেখতে পায় না’ (বাক্বারাহ ২/১৭)। আমলহীন আলেমের অবস্থাও তাই। সে জ্ঞানের আলো জ্বালায়, কিন্তু তার কপটতা ও আমলহীনতার কারণে আল্লাহ সেই আলোর নূর কেড়ে নেন। তার কাছে কেবল জ্ঞানের শব্দ আর তথ্য অবশিষ্ট থাকে, কিন্তু হেদায়াতের পথ দেখার ক্ষমতা থাকে না। সে অন্ধকারে পথ হাতড়ে বেড়ায়।
যখন আমরা কোন মাসআলা শিখি বিতর্কে জেতার জন্য, অথবা কোন একটি আয়াত বা হাদীছ মুখস্থ করি মানুষকে চমকে দেওয়ার জন্য, তখন মূলত আমরা ইলমের হক আদায় করি না। ফলে সেই জ্ঞান আমাদের অন্তরকে আলোকিত করে না। আমাদের মুখস্থের ভান্ডার বাড়ে, কিন্তু অন্তরের অন্ধকার দূর হয় না। উপরন্তু এই ইলম আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়ে যায়। কা‘ব ইবনে মালেক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ طَلَبَ العِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ العُلَمَاءَ، أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ، أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ، أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ، ‘যে ব্যক্তি আলেমদের সাথে তর্ক বাহাছ করা
অথবা জাহেল-মূর্খদের সাথে বাকবিতন্ডা করার জন্য এবং মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে ইলম অন্বেষণ করেছে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে জাহানণামে নিক্ষেপ করবেন’।[22] তাই আসুন! আমরা ইলমের খোলসের পেছনে না ছুটে তার নূরের সন্ধান করি। আমাদের উদ্দেশ্য যেন ‘আলেম’ উপাধি অর্জন না হয়, বরং ‘আব্দুল্লাহ’ বা আল্লাহর প্রকৃত বানদা হওয়াই যেন মূল উদ্দেশ্য হয়। আমরা যেন ইলমের হক তাকবওয়া, ইখলাছ ও আমল আগে আদায় করি, আর সম্মান ও স্বীকৃতির বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেই। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহই তাকে সম্মান প্রদান করেন। মহান আল্লাহ আমাদের অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন! [ক্রমশঃ]
-আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
এম.ফিল গবেষক, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[1]. জামালুদ্দীন কাসেমী, মাহাসিনুত তা’বীল (তাফসীরে কাসেমী) ৯/২১৫।
[2]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৪৬১৩; ছহীহুত তারগীব হা/১২৫।
[3]. ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার‘ঈয়্যাহ (দামেশক : মাকতাবাতু ‘আলামিল কুতুব, তাবি), ১/২০২।
[4]. আবূ নু‘আইম আস্ফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ৮/৩৬১।
[5]. হাফেয শামসুদ্দীন যাহাবী, মীযানুল ই‘তিদাল, তাহক্বীক্ব : আলী মুহাম্মাদ বাজাভী (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ, ১ম প্রকাশ, ১৩৮২হি./১৯৬৩খৃ.) ২/১৮১।
[6]. আবূ হাতেম রাযী, আয-যুহদ (রিয়াদ, সঊদী আরব : দারু আত্বলাস, ১ম প্রকাশ, ১৪২১হি./২০০০খৃ.) পৃ. ৫৫।
[7]. আহমাদ ইবনে হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাশিয়া: মুহাম্মাদ আব্দুস সালাম শাহীন (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, প্রথম মুদ্রণ, ১৯৯৯খৃ.), পৃ. ২৬২; ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া,তাহক্বীক: আহমাদ ইবনে আলী (কায়রো: দারুল হাদীছ, ২০০০খ্রিঃ), ২/১৬৭।
[8]. ছহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১৩১; সনদ হাসান। রাবী সামুরা ইবনে জুনদুব (রাঃ)।
[9]. খত্বীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলমি ওয়াল-আমাল, মুহাক্কিক্ব: নাছিরুদ্দীন আলবানী (বৈরূত : আল-মাকতাব আল-ইসলামী, ৫ম মুদ্রণ, ১৪০৪হি./১৯৭৪খৃ.), পৃ. ২৫।
[10]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব, তাহক্বীক : আমর আল-আমরী (বৈরূত : দারুল ফিক্র, ১৪১৫হি./১৯৯৫খৃ.) ৪৯/২১৬।
[11]. আব্দুর রঊফ মুনাভী, ফায়যুল ক্বাদীর (মিসর : আল-মাকাবাতুত তিজারিইয়াহ আল-কুবরা, ১ম মুদ্রণ, ১৩৫৬হি.) ৫/৫১০; ইক্বতিযাউল ইলমি ওয়াল আমাল, পৃ. ২৮।
[12]. ইক্বতিযাউল ইলমি ওয়াল আমাল, পৃ. ৩২।
[13]. ইবনুল ক্বাইয়িম, উদ্দাতুছ ছাবেরীন (মদীনা মুনাওয়ারা : মাকতাবাতুত তুরাছ, ২য় সংস্করণ, ১৪০৯হি./১৯৮৯খৃ.), পৃ. ১৭১।
[14]. ইবনু আব্দিল বার্র, জামে‘উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহী (সঊদী আরব : দারু ইবনিল জাওযী, ১ম মুদ্রণ, ১৪১৪হি./১৯৯৪খৃ.) ১/৭০৫।
[15]. ইবুল ক্বাইয়িম, মিফতাহু দারিস সা‘আদাত (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, তাবি), ১/১০০; ইবনু কুতাইবা আদ্দীনওয়ারী, উয়ূনুল আখবার (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, ১৪১৮হি.), ২/১৪০।
[16]. ইবনু হিববান (আবূ হাতেম বুস্তী), রাওযাতুল উক্বালা (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, তাবি), পৃ. ৩৫।
[17]. মুসলিম হা/২৬২৬; মিশকাত হা/১৯১০।
[18]. ইক্বতিযাউল ইলমি আল-আমাল, পৃ. ২৯।
[19]. বায়হাক্বী, আল-মাদখাল ইলা সুনানিল কুবরা, পৃ. ৩২৬।
[20]. খতীব বাগদাদী, ইক্বতিযাউল ইলমি আল আমল, পৃ. ৫৩।
[21]. আবূ নু‘আইম ইস্ফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ১৩/২৬৯।
[22]. তিরমিযী হা/ ২৬৫৪; ছহীহুত তারগীব হা/১০৬; সনদ হাসান।