শিমুলতলী গ্রাম। প্রতি শুক্রবার বটতলায় হাট বসে। হাট হ’লেও তা যেন বড় কোন মেলার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। ধুলো আর কোলাহলে মুখর চারপাশ। নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর খেলনার দোকানের মনকাড়া বিভিন্ন আওয়াজে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। ভীড়ের মাঝে আট বছরের ছোট্ট ছেলে রেযওয়ানের হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছিলেন রহমতুল্লাহ। হঠাৎ একটি খেলনার দোকানের সামনে থমকে দাঁড়াল রেযওয়ান। দোকানের একপাশে বাঁশের কাঠিতে থরে থরে সাজানো লাল, নীল, হলুদ রঙের চমৎকার সব কাগজের গোলাপ।
রেযওয়ানের চোখ বিস্ময়ে চকচক করে উঠল। পিতার হাত ধরে টান দিয়ে সে বলল, ‘আববু, দেখ! কি দারুণ গোলাপ! আমাদের উঠানের গাছটার চেয়ে কত বড়, আর কি টুকটুকে লাল! আমাকে একটা কিনে দেবে’? রহমতুল্লাহ ছেলের উচ্ছ্বাস দেখে হাসলেন। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘না রে বাজান। আমাদের উঠানের গোলাপটা হ’ল সত্যিকারের গোলাপ। তার নিজস্ব সুবাস আছে, প্রাণ আছে। আর এটা হ’ল কাগজের গোলাপ। দেখতে যতই চকচকে হোক, এর কোন ঘ্রাণ নেই’।
রেযওয়ান গাল ফুলিয়ে বলল, ‘তো কি হয়েছে? দেখো না! দেখতে কত সুন্দর লাগছে’! রহমতুল্লাহ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে বোঝানোর সুরে বললেন, ‘এটা শুধু দিনের পর দিন ঘরের কোণে সাজিয়ে রাখার জন্যই সুন্দর আববু। এই গোলাপ দিয়ে কখনো গোলাপ জল তৈরী হয় না। যা কাজে আসে না, যার ভেতর কোন নির্যাস নেই, তার সৌন্দর্য কেবলই ধোঁকা’। ছোট্ট রেযওয়ান সেদিন বাপের কথার গভীরতা বুঝতে পারেনি। তবে হাট থেকে ফেরার পরও সেই কাগজের ফুলের উজ্জ্বল রং তার মনে গেঁথে ছিল অনেক দিন পর্যন্ত।
রহমতুললাহ শিমুলতলী গ্রামের একজন অতি সাধারণ ভ্যানচালক। পিতা-মাতা শখ করে সুন্দর একটি নাম রাখলেও, সমাজের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন স্রেফ ‘ভেইন্যা রহমত’। কারণ তার কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না, আবার সহায়-সম্পদের দাপটও ছিল না। ফলে পদে পদে তাকে তাচ্ছিল্য আর অবহেলার শিকার হতে হ’ত। এজন্য রহমতুল্লাহর মনে বড় সাধ ছিল, একটা পুত্র সন্তান হ’লে তাকে তিনি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন। এতে তার যতই কষ্ট স্বীকার করতে হোক না কেন।
অভাবের সংসারে একদিন তার কোল আলো করে জন্ম নিল ফুটফুটে রেযওয়ান। রহমতুল্লাহ নিজের জীবনের সব না-পাওয়ার হিসাব ভুলে গেলেন। সবকিছুকে পেছনে ফেলে এখন তার জীবনের একটাই লক্ষ্য, ছেলেকে তিনি অনেক বড় আলেম, একজন বড় দাঈ বানাবেন। এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন, যেন তার দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় জীবনই সুন্দর হয়। সমাজের কেউ যেন তার ছেলেকে অবহেলার চোখে দেখতে না পারে।
রেযওয়ান তখন সবেমাত্র প্রাইমারী শেষ করেছে। রহমতুললাহ ভাবলেন, ছেলেকে বড় করতে হ’লে এখন থেকেই কোন ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করাতে হবে। এই বিষয়ে দেরী করলে চলবে না। তিনি একদিন সময় করে শহরে গেলেন। নামজাদা প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দেখলেন। কোথায় ছেলেকে রাখলে ভাল হবে। কোথায় কত খরচ হবে, সবই জানলেন। শহরের প্রতিষ্ঠানগুলো এতই ব্যয়বহুল, তার মত ভ্যানচালকের সেখানে কোন হিসাব-নিকাশ নেই।
তবে রাস্তায় একজন সামান্য ভ্যানওয়ালা হ’লেও এখানে তো তিনি একজন যোদ্ধা। লৌহ-কপাটের মত অভেদ্য যে যোদ্ধার বুক। যেখানে ভয় ও নিরাশার কোন স্থান নেই। যেখানে অদূর ভবিষ্যতের আশাগুলো হিমালয়ের মত স্থির হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই রহমতুল্লাহ তো পিছপা হওয়ার মত মানুষ নন। টাকা যতই লাগুক, তিনি তো এই অসাধ্য সাধন করেই ছাড়বেন। প্রয়োজনে নিজের রক্ত বেচবেন, মানুষের কাছে হাত পাতবেন। কিন্তু ছেলেকে তিনি বড় করবেনই।
ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় রহমতুল্লাহ তাকে শহরের একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করালেন। সেখানে পড়াশোনার খরচ অনেক। যেদিন রেযওয়ান ভর্তি হ’তে গেল সেদিন অফিসে দেখল, তার পিতা অনেকগুলো ৫০০ আর হাযার টাকার নোট বের করে সেই মানুষটিকে দিচ্ছেন। তার পিতার কাছে এত টাকা আছে! সে অবাক হয়। অথচ আগের দিনই আববু আম্মুকে বলছিলেন, বাজারে মাছের কেজি তিনশো টাকা! আমরা কি আর অত টাকা দিয়ে মাছ খেতে পারি! তাহ’লে কি আববু মিথ্যা বলেছিলেন! রেযওয়ানের হিসাব মেলে না।
রেযওয়ান পড়ার টেবিলে বসল। আর পিতা বসলেন ভ্যানের সিটে। রেযওয়ান কলম ধরল, আর পিতা তার রুক্ষ পা জোড়া রাখলেন ভ্যানের প্যাডেলে। শুরু হ’ল সংগ্রাম। একদিকে জীবনে বড় হওয়ার, অন্যদিকে ছেলের বেতন জোগানোর সংগ্রাম। রেযওয়ান যখন খেতে যায়, তখন দেখে বড় একটা মাছের টুকরা, পুরোটাই তার। একটা পূর্ণ ডিম তাকে খেতে দেয়া হয়। অথচ সে বাড়িতে তার বাপ-মাকে একটা ডিম অর্ধেক করে খেতে দেখেছে। সে সপ্তাহে দু’দিন গোশত খায়। অথচ তার বাড়িতে মাস চলে যায়, গোশত রান্না হয় না।
দিনে দিনে সে বুঝতে পারে, তাকে বড় করতে তার পরিবার সামর্থ্যের বাইরে এসে যুদ্ধে নেমেছে। সে জানতে পেরেছে, তার বাপ নাকি এখন অনেক রাত পর্যন্ত ভ্যান চালান। বাড়িতে মা সেলাই মেশিনের কাজ করেন। তবে তাদের যে কষ্ট হয়, এটা তারা কখনোই প্রকাশ করেন না। রেযওয়ান যখন রাতে ঘুমাতে যায়, তখন বাপের হাড়ভাঙা খাটুনি তার চোখে ভাসে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, বাবা-মায়ের এই পরিশ্রম সে কোনভাবেই বৃথা যেতে দেবে না।
রেযওয়ান পড়শোনায় বেশ ভাল। তারপরও সে শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ করেই সবকিছু করে। শিক্ষকদের কাছে জানতে চায়, ‘উস্তায, জীবনে সফল হ’তে হ’লে আমাকে কি করতে হবে? কিভাবে পড়লে আমি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব’? শিক্ষকরা তাকে চিরাচরিত সেই উত্তরই দেন। তারা বলেন, ‘পরীক্ষায় ভালো করতে হবে। পাঠ্যবইগুলো একেবারে মুখস্থ করে ফেলবে। খাতায় যত নিখুঁতভাবে লিখতে পারবে, নম্বর তত বেশী আসবে। আর ভালো ফলাফল মানেই সফল জীবন’।
রেযওয়ান এই কথাগুলোকে মাথায় বসিয়ে নেয়। দিন-রাত এক করে সে পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা, প্রতিটি লাইন তোতাপাখির মত মুখস্থ করতে শুরু করে। তার একটাই লক্ষ্য, যেকোন মূল্যে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেতে হবে। তাকে পরীক্ষায় প্রমাণ করতে হবে যে, সে সবচেয়ে মেধাবী। সেসব বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়তে লাগল। কারণ প্রতিটি বিষয়ের পরীক্ষায় রয়েছে ১০০ নম্বর।
অথচ একসময় রেযওয়ানের নিজেরও একটা শখ ছিল। সে যখন গ্রামে ছিল, তখন কাঠ আর কঞ্চি কেটে দারুণ সব খেলনা আর যন্ত্র বানাতে পারত। তার খুব আগ্রহ ছিল নতুন কিছু তৈরী করার। কিন্তু শহরের এই নামীদামী প্রতিষ্ঠানে সেই আগ্রহের কোন মূল্য নেই। একদিন বিজ্ঞানের একটি প্রজেক্টে সে নিজের হাতে তৈরী একটি যন্ত্র নিয়ে গেল। সে ভেবেছিল উস্তায খুব খুশি হবেন। কিন্তু উস্তায তাকে বললেন, ‘এসব খেলনা বানিয়ে সময় নষ্ট করলে পরীক্ষায় গোল্ডেন মার্কস আসবে না। বইয়ের পড়ায় মন দাও’।
সেদিন রেযওয়ান বুঝতে পারল, নিজের আগ্রহ আর সৃজনশীলতা দিয়ে এখানে প্রথম হওয়া যায় না। যে ছেলেটি না বুঝে কেবল মুখস্থ করে খাতায় উগরে দেয়, সেই এখানে সেরা। তাই সেও নিজের ভেতরের সেই কারিগর সত্তাকে গলা টিপে হত্যা করল। সে মনে করে নিয়েছিল, পড়াটাই মূল। ভালভাবে বই পড়লে এর চেয়ে ভাল মানের কাজ আমার মাধ্যমে হবে। তার মাথায় কেবল একটিই টার্গেট, সার্টিফিকেটে গোল্ডেন মার্কস নিয়ে পিতার মুখে হাসি ফোটাতে হবে।
এভাবেই দিন যেতে থাকল। একসময় রেযওয়ানের লেখাপড়ার অধ্যায় শেষ হ’ল। তার হাতে এখন দারুণ সব রেজাল্টের চকচকে সনদপত্র। এবার সময় এসেছে একটা ভালো চাকরি নিয়ে পিতার স্বপ্ন পূরণ করার। গ্রামে তার হারানো সম্মানকে ফিরিয়ে দেয়ার। তিনি যে কষ্ট স্বীকার করেছেন, তার যথাযথ মূল্য বুঝিয়ে দেয়ার। বাপ-মায়ের ঘাড় থেকে পরিশ্রমের বোঝা নামিয়ে তাদেরকে সুখ-শান্তির সন্ধান দেয়ার।
কিন্তু যখনই রেযওয়ান তার সেই স্বপ্নের রঙিন খাম নিয়ে বাস্তবের চাকরির বাজারে পা রাখল, তখনই তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কারণ তার কাছে প্রতিটি বিষয়ই ছিল ১০০ নম্বরের। সব বিষয় সমান তালে পড়ে সে না হয়েছে মাওলানা, না হয়েছে ভিন্নকিছু। সে যেখানেই কাজ নিতে যায়, সেখানেই তার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় তীক্ষ্ণ কিছু প্রশ্ন। তাকে বলা হয়, ‘আপনার পরীক্ষার রেজাল্ট তো চমৎকার, কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল স্কিল কি আছে? এই বিষয়ে আপনার বিশেষত্ব বা দক্ষতা কি? আপনি আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন কি করতে পারবেন’?
সেদিন একটি বড় কোম্পানীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ভাইভার জন্য ডাক পড়েছিল রেযওয়ানের। বোর্ড মেম্বার তার রেজাল্ট দেখে বেশ মুগ্ধই হয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ একজন অফিসার তাকে একটি প্রজেক্টের ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনার তো রেজাল্ট চমৎকার। আচ্ছা, আমাদের এই প্রজেক্টের একটি সমস্যা এখানে দেওয়া আছে। আপনি যদি আমাদের কর্মী হ’তেন, তবে কিভাবে এটি সমাধান করতেন’? রেযওয়ানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কারণ বইয়ের পাতায় সে এরকম কোন সমস্যার কথা পড়েনি।
সে আমতা আমতা করে বইয়ের কিছু মুখস্থ থিওরী আওড়ানোর চেষ্টা করল। অফিসার মুচকি হেসে ফাইলটা টেনে নিয়ে বললেন, ‘আমরা থিওরী শুনতে চাইনি তরুণ, আমরা সমাধান চেয়েছিলাম’। রেযওয়ান সেদিন মাথা নীচু করে বেরিয়ে এসেছিল। কারণ সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা তাকে শুধু তথ্য গিলতে শিখিয়েছে, তা প্রয়োগ করতে শেখায়নি। তাই নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী অসংখ্য জায়গায় আবেদন করেও সে বারবার প্রত্যাখ্যাত হ’তে লাগল।
সে বুঝতে পারল, কর্মজীবন বড় নিষ্ঠুর। সে আবেগকে চেনে না। সে জানে না, কে রেযওয়ান আর কে রহমতুল্লাহ। তাদের গল্প শোনার কোন আগ্রহ তার নেই। সে চিনে কেবল যোগ্যতা, দক্ষতা আর নতুনত্ব। সে কাগজের সনদপত্র চেনে না। সে কেবল চেনে সময় অনুযায়ী কর্মীর উপযুক্ততা। এখানে কেউ যদি জায়গা করে নিতে চায়, তবে যোগ্যতার হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে জায়গা দখল করতে হবে। অন্যথা এক বিঘত জায়গাও কেউ কাউকে ছেড়ে দেবে না। বরং দখলে নেয়া জায়গাও ছিনিয়ে নিতে হাযার জোড়া চোখ সবসময় উৎসুক হয়ে থাকবে।
দিনটি ছিল কাঠফাটা রোদ্দুরের এক ভরদুপুর। টানা কয়েকটি ইন্টারভিউ থেকে রেযওয়ান আজকেও রিজেক্ট হয়েছে। ক্লান্ত, শ্রান্ত আর হতাশ রেযওয়ান রাস্তার ধারের একটি টং দোকানে বসে এক কাপ চা আর একটা শুকনো পাউরুটি চিবোচ্ছিল। হঠাৎ ঢং ঢং করে ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল। রাস্তার ওপাশেই একটি বড় মাদ্রাসা। গেট খুলে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল একঝাঁক প্রাণোচ্ছল ছাত্র। তাদের চোখেমুখে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন। একে অপরের সাথে খোশগল্পে মেতে আছে তারা।
রেযওয়ান চায়ে চুমুক দিয়ে তাদের দিকে একমনে তাকিয়ে রইল। নিজের অতীতের কথা মনে পড়ে গেল। একসময় সেও ঠিক এভাবেই হাসিমুখে গেট দিয়ে বের হ’ত। এই ছেলেগুলোও হয়ত এখন ভাবছে, বইয়ের পাতাগুলো ঠিকঠাক মুখস্থ করে গেলেই পড়াশোনা শেষে এক জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় তাদের জীবন সুখের হয়ে যাবে। ওরা জানে না, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার শেষে কত বড়, কত নির্মম এক পরীক্ষা এই পৃথিবীর পথে পথে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
রেযওয়ান চোখ নামিয়ে নিল। চোখ গেল নিজের পাশে রাখা প্লাস্টিকের ফাইলটির দিকে। ফোল্ডারের ভেতর থেকে যেন উঁকি দিচ্ছে তার জীবনের এত বছরের সাধনার চকচকে সব সনদপত্র। নম্বর আর গ্রেডে ভরপুর এই কাগজগুলো আজ তার কাছে বড়ই অচেনা, বড়ই অর্থহীন মনে হচ্ছে। হঠাৎ তার স্মৃতির মণিকোঠায় ভেসে উঠল বহু বছর আগের সেই বটতলার হাটের দৃশ্য। পিতার সেই মায়াবী কণ্ঠস্বর যেন তার কানের কাছে অনুরণিত হ’তে লাগল, ‘কাগজের গোলাপ দিয়ে কখনো গোলাপ জল তৈরী হয় না বাবা। যা কাজে আসে না, তার সৌন্দর্য কেবলই ধোঁকা’।
ততক্ষণ রেযওয়ানের চোখ বেয়ে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তার এই কাড়ি কাড়ি সনদপত্রগুলো আজ সেই কাগজের ফুলের মতই মূল্যহীন। এগুলো দেখতে সুন্দর। ফ্রেমবন্দি করে সাজিয়ে রাখার মত। তবে এর ভেতরে বাস্তব জীবনের কোন ঘ্রাণ নেই। কোন নির্যাস নেই। সে মনে মনে ভাবল, আমি বা আমার পিতা কেউই হয়ত শিক্ষা সম্পর্কে বুঝতাম না। কিন্তু আমার শিক্ষকগণও কি বুঝতেন না? নাকি তারাও এই অন্ধ শিক্ষাব্যবস্থার কাছে যিম্মি ছিলেন? তারা তো কেবল এই বিশাল কারখানার এক একজন শ্রমিক মাত্র, যে কারখানা দিনের পর দিন কেবল কাগজের ফুলই তৈরী করে যাচ্ছে। আমার পিতা তাদের কি ক্ষতি করেছিলেন? একটা গোটা পরিবারের পরিশ্রম শুধু একটি ভুল পদ্ধতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নষ্ট হয়ে গেল! আশ্চর্যের বিষয় হ’ল, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংস করে দেয়া এই বিশাল ক্ষতির ক্ষতিপূরণের কোন আইনও সংবিধানে নেই!
তার চোখদু’টো আবার ঝাপসা হয়ে আসে। সে দূর আকাশের নীল দিকে তাকায়। হয়ত নীলের ঐপাশে কি আছে, সেটা দেখার চেষ্টা করে। তার চোখে ভাসে পিতার বুড়িয়ে যাওয়া মুখখানা। যে চেহারা একসময় কত চঞ্চল থাকত। ভবিষ্যতের গল্প শোনাত। সেই মুখখানা আজ অনেকটাই নীরব হয়ে গেছে। চোখে ভাসে মায়ের কোমরব্যথার দামী দামী ঔষধগুলো। আর নিজের জীবনের অনেকগুলো নির্ঘুম রাত আর রিক্ত-নিঃশ্ব দু’টি হাত।
টং দোকানদারের কথায় সম্বিত ফিরে আসে রেজয়ানের। ‘মামা! এত মন দিয়া কি ভাবেন? আর কিছু লইবেন’? রেযওয়ান না সূচক মাথা নাড়ায়। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। চা-পাউরুটির বিল চুকিয়ে রাস্তা ধরে হেঁটে চলে যায়। কিছু দূরে রাস্তার বাঁকটা পার হয়ে রেযওয়ান হারিয়ে যায়। রেযওয়ানেরা হারিয়ে যায়। সত্যিই হারিয়ে যায়। ওদিকে রাস্তার ঐপাশের ইট-পাথরের নামীদামী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন রেযওয়ানের অপেক্ষায় থাকে।