মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন চারদিকের সমস্ত দরজা বন্ধ মনে হয়। শত্রুর ষড়যন্ত্র, যালেমের যুলম, মিথ্যা অপবাদ বা পাহাড়সম বিপদের সামনে মানুষ নিজেকে চরম অসহায় ভাবে। দুনিয়ার কোন শক্তি যখন আর ভরসা দেওয়ার মতো থাকে না, তখন একজন মুমিন সরাসরি আরশের মালিকের দিকে তাকিয়ে এমন একটি বাক্য উচ্চারণ করে, যা তার ভেতরের সমস্ত ভয়কে মুহূর্তেই শক্তিতে পরিণত করে। এটি নিছক কোন বাক্য নয়; এটি হ’ল চরম বিপদে মহান আল্লাহর ওপর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক অমোঘ ঘোষণা। ঈমানোদ্দীপক সেই দো‘আটি হ’ল-

حَسْبُنَااللهُوَنِعْمَالْوَكِيلُ

উচ্চারণ : হাসবুনাল্ল-হু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল।

অর্থ : ‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম তত্ত্বাবধায়ক! (আলে ইমরান ৩/১৭৩)।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : এই দো‘আটির সাথে জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের দু’টি অগ্নিপরীক্ষার ঘটনা।

প্রথমত হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর ঘটনা। যালেম শাসক নমরূদ কর্তৃক যখন ইব্রাহীম (আঃ)-কে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন জিব্রীল (আঃ) এসে তাঁকে সাহায্য করতে চাইলেন। কিন্তু ইব্রাহীম (আঃ) সৃষ্টির সাহায্য প্রত্যাখ্যান করে স্রষ্টার ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে বলে উঠলেন, ‘হাসবুনাল্লহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল’। ফলাফল হ’ল আল্লাহ সাথে সাথে আগুনকে নির্দেশ দিলেন, ‘হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও’ (আম্বিয়া ২১/৬৯)। ফলে আগুন তাঁর জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে গেল।

দ্বিতীয়ত ওহোদ যুদ্ধ পরবর্তী কঠিন মুহূর্তে মুসলিম বাহিনী যখন চরম পরিশ্রান্ত এবং রক্তাক্ত, তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, আবু সুফিয়ানের বাহিনী পুনরায় আক্রমণ করতে পারে। এই ভীতিকর সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সহ ছাহাবায়ে কেরাম ভয় পাওয়ার বদলে দ্বীপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘হাসবুনাল্ল-হু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল’। আল্লাহ তাদের এই তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা) এতই পসন্দ করলেন যে, শত্রুদের অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন এবং মুসলিম বাহিনী কোন যুদ্ধ ছাড়াই পূর্ণ নিরাপত্তা ও আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে মদীনায় ফিরে আসলেন (আলে-ইমরান ৩/১৭৩-১৭৪; বুখারী হা/৪৫৬৩)।

গুরুত্ব ও তাৎপর্য :

একক সত্তার ওপর ভরসা : ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট’ এ কথার মাধ্যমে বান্দা দুনিয়ার সমস্ত ক্ষমতা, অর্থ, প্রভাব ও মানুষের সাহায্য থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে একমাত্র আল্লাহর শক্তির ওপর নিজের পুরো অস্তিত্ব সঁপে দেয়। অর্থাৎ আল্লাহই আমার সকল প্রয়োজন, সমস্যা ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কেননা তিনিই সর্বোত্তম ব্যবস্থাপক।

দায়িত্ব হস্তান্তর : ‘সর্বোত্তম তত্ত্বাবধায়ক’ বলার অর্থ হ’ল, নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সমস্যার ফাইলটি বান্দা নিজের দুর্বল হাত থেকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর হাতে তুলে দেয়। আর আল্লাহ যার অভিভাবক হয়ে যান, তাকে হারানোর শক্তি পৃথিবীর কারো নেই।

এখানে দু’টি বিষয় একসাথে প্রকাশ পায়, (১) আল্লাহর যথেষ্টতার উপর দৃঢ় বিশ্বাস (২) সকল বিষয় তাঁর হাতে সমর্পণ। এই দু’য়ের সমন্বয়ই একজন মুমিনকে প্রকৃত শান্তি ও সাহস এনে দেয়।

কখন পড়বেন?

দো‘আটি জীবনের যেকোন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়া যায়। যেমন-

  • বিপদ-আপদ ও কঠিন পরিস্থিতিতে, যখন কোন সমস্যার সমাধান মানুষের ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
  • যুলুমের শিকার হ’লে, যখন প্রতিকারের কোন পথ থাকে না।
  • শত্রু বা প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হ’লে, যখন সংখ্যায় বা শক্তিতে নিজেকে দুর্বল মনে হয়।
  • ঋণ, দারিদ্র্য বা আর্থিক দুশ্চিন্তায়, জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ যখন মনকে ভারাক্রান্ত করে।
  • অসুস্থতা ও রোগ-ব্যাধির সময়, যখন চিকিৎসা সত্ত্বেও ফলাফল অনিশ্চিত মনে হয়।
  • গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে, সর্বোচ্চ চেষ্টা ও পরামর্শের পর আল্লাহর উপর ফলাফল ছেড়ে দেওয়ার সময়।
  • কারো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের আশঙ্কা থাকলে, যখন গোপনে কেউ ক্ষতি করার চেষ্টা করছে বলে অনুভূত হয়।

স্মর্তব্য যে, এই দো‘আ আমলহীনতার অযূহাত নয়। বরং যথাসাধ্য পরিশ্রম, প্রস্ত্ততি ও উপায়-উপকরণ অবলম্বনের পর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত তাওয়াক্কুল। অর্থাৎ কর্ম ও তাওয়াক্কুল একসাথে চলে, একটি অন্যটির বিকল্প নয়।

মানব জীবনে এর প্রভাব :

১. মানসিক প্রশান্তি ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি। যখন বান্দা উপলব্ধি করে যে তার বিষয়গুলো এক অসীম ক্ষমতাবান সত্তার হাতে ন্যস্ত, তখন অহেতুক দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও অস্থিরতা কমে আসে।

২. ভয় ও আতঙ্ক থেকে মুক্তি। শত্রু যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসাকারী ব্যক্তি অন্তরে দৃঢ়তা অনুভব করেন।

৩. আত্মবিশ্বাস ও কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি। তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করে ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া। এতে মানুষ দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করার সাহস পায়, ব্যর্থতার ভয়ে অথর্ব হয়ে থাকে না।

৪. যুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা। যখন কেউ অন্যায়ভাবে নিপীড়িত হয় এবং প্রকাশ্যে প্রতিকার পাওয়ার কোন পথ থাকে না, তখন এই দো‘আ অন্তরে ধৈর্য ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা তৈরি করে।

৫. আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর হওয়া। বারবার এই দো‘আ পাঠের মাধ্যমে বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা ও ভালোবাসা ক্রমশ দৃঢ় হয়, যা তার সামগ্রিক ঈমানী জীবনকে সমৃদ্ধ করে।

উল্লেখ্য, উক্ত দো‘আর সাথে ‘নি‘মাল মাওলা ওয়া নি‘মান নাছীর’ (তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক এবং কতই না উত্তম সাহায্যকারী) (আনফাল ৮/৪০; হজ্জ ২২/৭৮) বাক্যটি যুক্ত করে পাঠ করা যায়।

পরিশেষে বলব, দুনিয়ার হিসাব-নিকাশে যখন আপনি শূন্য, যখন চারপাশের মানুষ আপনাকে ভয় দেখায় বা আপনার পতন কামনা করে, তখন মানুষের দিকে না তাকিয়ে আসমানের দিকে তাকান। হৃদয় থেকে সমস্ত ভয় ঝেড়ে ফেলে পূর্ণ আস্থার সাথে দো‘আটি উচ্চারণ করুন! বিশ্বাস রাখুন, যে মহান সত্তা ইব্রাহীম (আঃ)-এর জন্য জ্বলন্ত আগুনকে ফুলের বাগানে পরিণত করেছিলেন, যিনি ওহোদের ময়দানে মুসলিম বাহিনীর মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন, তিনি আজও আপনার যেকোন বিপদে আপনার জন্য যথেষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। শুধু প্রয়োজন ইব্রাহীম (আঃ)-এর মতো পাহাড়সম বিশ্বাস এবং ইস্পাতকঠিন তাওয়াক্কুল নিয়ে দো‘আটি পাঠ করা। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!!






বিষয়সমূহ: দো‘আ
আরও
আরও
.