মানুষের জীবন এক অবিরাম ছুটে চলার গল্প। এই ছুটে চলায় আমরা সম্পদ খুঁজি, সম্মান খুঁজি, খুঁজি একটু সুখ। কিন্তু দিন শেষে আমাদের সবচেয়ে বেশী যা প্রয়োজন হয়, তা হ’ল প্রশান্তি ও নিরাপত্তা। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) উম্মতকে এমন একটি জাদুকরী দো‘আ শিখিয়েছেন, যার মাত্র কয়েকটি শব্দে লুকিয়ে আছে দুনিয়া ও আখেরাতের সকল চাওয়া-পাওয়ার নির্যাস। সেই জাদুকরী দো‘আটি হ’ল-
اَللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ (আল্ল-হুম্মা ইন্নি আসআলুকাল ‘আফিয়াহ)
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ‘আফিয়াহ’ বা সার্বিক নিরাপত্তা ও সুস্থতা চাই’। শব্দটি শুনতে সাধারণ মনে হ’লেও এর গভীরতা ও বিশালতা কল্পনাতীত। আসুন দো‘আটির গভীরে প্রবেশ করে জেনে নেই এর প্রকৃত অর্থ, ফযীলত, তাৎপর্য ও প্রেক্ষাপট।
‘আফিয়াত’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ও বিস্তৃতি :
আরবী ‘আফিয়াত’ (عافية) শব্দটি এসেছে ‘আফউ’ (ক্ষমা বা মুক্তি) থেকে। আমরা সাধারণত একে শুধু ‘সুস্থতা’ বা ‘রোগমুক্তি’ হিসাবে ধরে নিলেও প্রকৃতপক্ষে এর অর্থ আরও ব্যাপক। বিদ্বানদের মতে আফিয়াত জীবনের চারটি প্রধান ক্ষেত্রকে সুরক্ষিত করে :
(১) দ্বীনের আফিয়াত : যাবতীয় গুনাহ, শিরক, বিদ‘আত এবং ভ্রষ্টতা থেকে ঈমানকে সুরক্ষিত রাখা।
(২) দেহের আফিয়াত : যেকোন ধরনের রোগ-ব্যাধি ও শারীরিক বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত থাকা।
(৩) দুনিয়াবী আফিয়াত : পরিবার, সম্পদ, সম্মান এবং সমাজ জীবনে যেকোন অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় থেকে নিরাপদ থাকা।
(৪) আখেরাতের আফিয়াত : কবরের আযাব ও জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি থেকে চূড়ান্ত মুক্তি লাভ।
অর্থাৎ আফিয়াত হ’ল এমন এক সামগ্রিক নিরাপত্তার চাদর, যা মানুষকে সব ধরনের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিপদ থেকে রক্ষা করে।
দো‘আটির প্রেক্ষাপট ও ফযীলত :
১. রাসূল (ছাঃ)-এর আপন চাচা এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব আববাস বিন আব্দিল মুত্তালিব (রাঃ) একবার রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি দো‘আ শিখিয়ে দিন, যা দিয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করব। রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘আপনি আল্লাহর কাছে আফিয়াত (নিরাপত্তা ও সুস্থতা) প্রার্থনা করুন’। কিছুদিন পর আববাস (রাঃ) পুনরায় একই অনুরোধ করলে রাসূল (ছাঃ) উত্তরে বললেন, ‘হে আমার চাচা! আপনি আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের আফিয়াতই প্রার্থনা করুন’ (তিরমিযী হা/৩৫১৪)। এই পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে, ‘আফিয়াত’-ই আল্লাহর কাছে চাওয়ার মতো অন্যতম শ্রেষ্ঠ দো‘আ।
মুবারকপুরী (রহঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) তাঁর চাচা আববাস (রাঃ)-কে বিশেষভাবে এই একটি দো‘আ বারবার শিখিয়েছেন। এর মাধ্যমে মূলত উম্মতের আগ্রহী মানুষদেরকে এই দো‘আটি নিয়মিত পড়ার জন্য প্রবলভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। সাথে সাথে এ শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে যে, মানুষ যেন আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়ার ক্ষেত্রে এটিকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে এবং নিজেদের যেকোন দুশ্চিন্তা ও সংকট দূর করতে এই দো‘আরই আশ্রয় নেয় (তুহফাতুল আহওয়াযী ৯/৩৪৮)।
২. ঈমানের পর শ্রেষ্ঠ নে‘মত : রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও আফিয়াহ প্রার্থনা করো। কারণ ঈমানের পর ‘আফিয়াহ’-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন নে‘মত কাউকে দেওয়া হয়নি (তিরমিযী হা/৩৫৫৮; মিশকাত হা/২৪৮৯, সনদ হাসান ছহীহ)।
৩. সকল দো‘আর সারসংক্ষেপ : কেউ যদি দিনরাত মিলিয়ে শত শত দো‘আ নাও করতে পারে, শুধু এই একটি দো‘আ মন থেকে পড়ে, তবে তার দুনিয়া ও আখেরাতের কোন কল্যাণই আর বাদ থাকে না।
আফিয়াত কেন বড় নে‘মত?
১. সব নে‘মত উপভোগের চাবিকাঠি : আফিয়াত না থাকলে অন্য কোন নে‘মতই উপভোগ করা যায় না। বিপুল সম্পদ বা ক্ষমতা থাকলেও মানুষ যদি রোগশয্যায় কাটায় কিংবা মানসিক অশান্তিতে ভোগে, তবে সেই সম্পদের কোন মূল্য থাকে না।
২. প্রতিরোধমূলক ঢাল : বিপদ আসার পর তা থেকে মুক্তি খোঁজার চেয়ে বিপদ আসার আগেই নিরাপদ থাকা অনেক বেশী প্রশান্তির। এজন্যই বলা হয়, ‘যে ব্যক্তি আফিয়াত পেয়েছে, সে যেন দুনিয়ার সবকিছুই পেয়ে গেছে’।
৩. আত্মিক সুরক্ষা : আফিয়াত শুধু শারীরিক সুস্থতা নয়; এটি একজন মুমিনের চরিত্র ও আমলেরও নিরাপত্তা দেয়। গুনাহকে আত্মার রোগ বিবেচনা করলে, আফিয়াত সেই আত্মিক ব্যাধি থেকে মুক্তির গ্যারান্টি।
বর্তমান জীবনে আফিয়াতের প্রাসঙ্গিকতা :
মানুষের জীবনে এমন বহু বিপদ-আপদ রয়েছে যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আধুনিক যুগে অদৃশ্য রোগ, আকস্মিক দুর্ঘটনা, মানসিক উদ্বেগ, পারিবারিক ভাঙন কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষকে এক চরম অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আফিয়াতের দো‘আ এক পরম রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে। এটি বান্দাকে তার সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে শেখায়। নিয়মিত আফিয়াত প্রার্থনার মাধ্যমে অন্তরে তাওয়াক্কুল ও প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়।
কোন সময় পড়বেন?
এই দো‘আটি পড়ার নির্দিষ্ট কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। দো‘আটি যেকোন সময়ই পড়া যায়। তবে বিশেষ কিছু সময়ে এটি পড়া সুন্নাত। যেমন রাসূল (ছাঃ) সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিত এ আমলটি করতেন (আবূদাঊদ হা/৫০৭৪)। এছাড়া আযান ও ইক্বামতের মধ্যবর্তী সময়ে, সিজদা ও তাহাজ্জুদে, তাশাহহুদে সালাম ফেরানোর পূর্বেও দো‘আটি পাঠ করা যায়।
একটি বিশেষ পরামর্শ : চাইলে দো‘আটিকে আরেকটু বড় করেও পড়া যায়। তা হ’ল-اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ‘আল্ল-হুম্মা ইন্নি আসআলুকাল ‘আফওয়াহ ওয়াল ‘আফিয়াতা ফিদ-দুনিয়া ওয়াল-আখেরাহ। (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষমা এবং নিরাপত্তা চাই) (আবূদাঊদ হা/৫০৭৪)।
উপসংহার : আফিয়াতের দো‘আ জীবনের সামগ্রিক কল্যাণ কামনার এক অনন্য মাধ্যম। দ্বীন, দেহ, মন, পরিবার, সমাজ ও পরকালীন জীবনের প্রতিটি স্তরে নিরাপত্তা পাওয়ার এই দো‘আটি রাসুল (ছাঃ)-এর একটি প্রিয় আমল ছিল। তাই প্রাত্যাহিক জীবনে, নিয়মিত ভাবে আফিয়াতের দো‘আ করা আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত যরূরী। রাববুল আলামীন আমাদেরকে তাওফীক দান করুন- আমীন!