নিস্তব্ধ রজনীর গভীরে যখন চরাচরের সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায় তখন গুনাহের ভারে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত এক অনুতপ্ত হৃদয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয় হয়ে উঠে মহান রবের দরবার। জীবনের সকল গুনাহ মুছে ফেলে রবের নৈকট্য লাভের এক অনন্য পাথেয় হ’ল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর শেখানো একটি অমূল্য দো‘আ। মহিমান্বিত লায়লাতুল ক্বদরে তিনি তঁার প্রিয়তম পত্নী মা আয়েশা (রাঃ)-কে শিখিয়েছিলেন ক্ষমা প্রার্থনার এই বাক্যগুলো। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা দো‘আটির তাৎপর্য ও আধ্যাত্মিক শক্তি অন্বেষণ করব, যা একজন গুনাহগার বান্দাকে তার রবের প্রিয়ভাজন বান্দায় পরিণত করবে ইনশাআল্লাহ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :
এই দো‘আটির উৎস অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। কোন এক রামাযানের শেষ দশকে যখন মুসলিম উম্মাহ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে হাযার মাসের চেয়েও উত্তম সেই মহিমান্বিত রজনী লায়লাতুল ক্বদরের জন্য। তখন বুদ্ধিমতী ও দূরদর্শী নবীপত্নী মা আয়েশা (রাঃ) চিন্তা করলেন, আমি যদি সেই সৌভাগ্যময় রাতটি পেয়ে যাই তবে আল্লাহর কাছে কী চাইব? পরামর্শের জন্য তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর শরণাপন্ন হ’লেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! যদি আমি বুঝতে পারি যে আজই লায়লাতুল ক্বদর, তবে আমি সেই রাতে কী প্রার্থনা করব? উত্তরে তিনি তাকে সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত সারগর্ভ এই দো’আটি শিখিয়ে দিলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
‘আল্ল-হুম্মা ইন্নাকা ‘আফুববুন তুহিববুল ‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নী’।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব আমাদের ক্ষমা করে দিন’ (তিরমিযী হা/৩৫১৩, মিশকাত হা/২০৯১)।
দো‘আটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য :
আসুন! ছোট্ট এই দো‘আটির প্রতিটি অংশের গভীরে প্রবেশ করি।
১. ‘আল্ল-হুম্মা ইন্নাকা ‘আফুববুন (হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল)। এখানে আল্লাহর একটি বিশেষ গুণবাচক নাম ব্যবহার করা হয়েছে। আরবীতে ক্ষমাকারী বোঝাতে ‘গফূর’ শব্দটিও ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ- যিনি গুনাহ ঢেকে রাখেন বা গোপন করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে আমলনামায় পাপের লিপি থেকে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে ‘আফুববুন’ অর্থ হ’ল, যিনি গুনাহকে কেবল ক্ষমাই করেন না, বরং মরুভূমির প্রবল ঝড় যেমন বালুর উপর থেকে পায়ের ছাপ সম্পূর্ণ মিটিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি তিনি আমলনামা থেকে পাপের প্রতিটি দাগ চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেন। যেন বান্দা সেই গুনাহটি কখনো করেইনি! যখন আমরা বলি ‘ইন্নাকা আফুববুন’, তখন আমরা আল্লাহর নিকট সেই পর্যায়ের ক্ষমা ভিক্ষা করছি, যেখানে আমাদের পাপের কোন চিহ্নই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
২. ‘তুহিববুল ‘আফওয়া’ (আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন)।
এটি এই দো‘আর সবচেয়ে আবেগময় অংশ। এখানে আমরা আল্লাহর স্বভাবের প্রতি ইঙ্গিত করছি। আমরা বলছি, হে আমার রব! ক্ষমা করা আপনার পসন্দ। আপনি তো সেই সত্তা, যিনি শাস্তি দেওয়ার চেয়ে ক্ষমা করতে বেশী ভালোবাসেন। একজন অপরাধী যখন বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘মাননীয় বিচারক, আমি জানি আপনি দয়ালু এবং ক্ষমা করতে ভালোবাসেন’, তখন বিচারকের হৃদয়ে করুণার উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। ঠিক তেমনি এটি আল্লাহর কাছে তঁার নিজ গুণের অসীলায় চাওয়ার এক শক্তিশালী পদ্ধতি।
৩. ‘ফা‘ফু ‘আন্নী’ (অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন)। অর্থাৎ যেহেতু আপনি পাপ সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে সক্ষম এবং আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই এই অধম বান্দাকেও ক্ষমা করে দিন। আমার পাপরাশিকে নিশ্চিহ্ন করে দিন।
কখন পড়বেন : দো‘আটি যেকোন সময় পাঠ করা যায়। তবে এর বিশেষ সময় হ’ল রামাযানের শেষ দশক। বিশেষত এই দশকের বেজোড় রাতগুলিতে ছালাতে, মুনাজাতে দো‘আটি বারবার পড়ুন। এছাড়া তাহাজ্জুদের সময়, ফরয ছালাতের পর এবং যখনই গুনাহের ভারে মন ভারাক্রান্ত হয় তখন এই দো‘আটি পড়ুন মিনতি সহকারে, হৃদয় নিংড়িয়ে।
যেভাবে পড়বেন :
১. দো‘আটি পড়ার সময় নিজেকে একজন চরম অপরাধী ও ভিখারী হিসাবে কল্পনা করুন! ভাবুন, আপনি মহান বিচারকের সামনে দঁাড়িয়ে আছেন, আপনার আমলনামা গুনাহে পরিপূর্ণ। এখন ক্ষমা ছাড়া আপনার বাঁচার কোন উপায় নেই।
২. অর্থের দিকে খেয়াল রাখুন! যখন বলবেন ‘ইন্নাকা আফুববুন’, তখন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করুন যে, আল্লাহ আপনার পাহাড়সম গুনাহ মুহূর্তেই মুছে ফেলতে পারেন। যখন বলবেন ‘তুহিববুল আফওয়া’, তখন আল্লাহর অসীম দয়ার কথা স্মরণ করে ক্ষমার ব্যাপারে আশাবাদী হৌন।
৩. যান্ত্রিক বা অভ্যাসগতভাবে না পড়ে, আবেগময় কণ্ঠে অশ্রুসজল চোখে পাঠ করুন! সম্ভব হ’লে নির্জনে, অন্ধকারে একাকী বসে পড়ুন।
৪. বারবার পুনরাবৃত্তি করুন! একবার পড়েই শেষ করবেন না। বলতে বলতে যখন চোখ ভিজে আসবে, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসবে, হৃদয়ে গভীর আকুতি সৃষ্টি হবে তখনই বুঝবেন দো‘আটি সম্ভবত আরশে ‘আযীমে পৌঁছেছে।
পরিশেষে বলব, দো‘আটি পাপী বান্দার জন্য এক পরম আশার আলো। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আমাদের গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর ক্ষমার সাগর তার চেয়েও বিশাল। আসুন, আমরা এই রামাযান থেকে এই দো‘আটিকে আমাদের হৃদয়ের সঙ্গী বানিয়ে নিই। হয়তো এই একটি বাক্যের অসীলাতেই আমাদের জীবনের সমস্ত পাপ-পঙ্কিলতা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে। আমরা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হ’তে পারব। রাববুল আলামীন আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!