মানুষের জীবন আনন্দ ও বেদনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই, যাকে কোন বিপদ বা প্রিয়জন হারানো বেদনার স্বাদ গ্রহণ করতে হয় না। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে কখনো সম্পদ কমিয়ে, কখনো রোগব্যাধি দিয়ে, আবার কখনো প্রিয়জনকে কেড়ে নিয়ে পরীক্ষা করেন। কিন্তু চরম শোক ও হারানোর এই বেদনাবিধুর মুহূর্তে যেন একজন মুমিন ভেঙে না পড়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তার এক অমোঘ মহৌষধ শিখিয়েছেন প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)। দো‘আটি হ’ল-
إِنّٰا ِللهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اَللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا
উচ্চারণ : ইন্না লিল্লা-হি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিঊন; আল্ল-হুম্মা’জুরনী ফী মুছীবাতী, ওয়াখলিফ লী খইরাম মিনহা।
অর্থ : নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁর দিকেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আপনি আমাকে প্রতিদান দিন এবং এর বিনিময়ে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন’ (মুসলিম হা/৯১৮; মিশকাত হা/১৬১৮)।
দো‘আটির মর্মস্পর্শী প্রেক্ষাপট :
ইসলামের ইতিহাসের এক অশ্রুভেজা অথচ পরম প্রাপ্তির উপাখ্যান জড়িয়ে আছে এই দো‘আটির প্রেক্ষাপটে। উম্মে সালামা (রাঃ) এবং তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বামী আবূ সালামা (রাঃ) ছিলেন ইসলামের ঊষালগ্নের এক ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ দম্পতি। দ্বীনের প্রদীপে নিজেদের সঁপে দিয়ে তাঁরা জন্মভূমি মক্কার মায়া ত্যাগ করে প্রথমে হাবশা এবং পরে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, নির্ভরতা ও ভালোবাসাই ছিল তাঁদের এই দীর্ঘ সংগ্রামের পাথেয়।
কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল ভিন্ন। ওহোদের প্রান্তরে আবূ সালামা (রাঃ) মারাত্মকভাবে আহত হন। ফলে চতুর্থ হিজরীতে তিনি চিরতরে বিদায় নিলেন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। প্রিয়তম স্বামীকে হারিয়ে শোকে ও বেদনায় মুহ্যমান উম্মে সালামা (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এখন কি দো‘আ পড়তে পারি। তখন রাসূল (ছাঃ) উক্ত দো‘আটি শিখিয়ে দিয়ে বললেন, কোন মুমিন যদি এই দো‘আটি পাঠ করে, তবে রাববুল ‘আলামীন তাকে তার হারানো বস্ত্তর চেয়েও উত্তম কিছু দান করেন’ (আবূদাঊদ হা/৩১১৫)।
উম্মে সালামা (রাঃ) দো‘আটি পড়লেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর ব্যাকুল হৃদয় ভাবছিল ‘আমার আবূ সালামার চেয়ে উত্তম মানুষ এই পৃথিবীতে আর কে হ’তে পারে? তিনি যে প্রথম হিজরতকারী, যিনি সব কিছু ছেড়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন!’ তবুও তিনি তাঁর রবের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে দো‘আটি পাঠ করতে থাকলেন।
এরপরের ইতিহাস যেন এক ঐশী অলৌকিকতার গল্প, যা মানুষের ক্ষুদ্র কল্পনারও অতীত। শোকের চাদর সরিয়ে একদিন তাঁর দুয়ারে এসে দাঁড়াল এক অভাবনীয় বার্তা। স্বয়ং রাসূল (ছাঃ) তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন! বিস্ময়ে হতবাক উম্মে সালামা (রাঃ) তখন উপলব্ধি করলেন, পরম করুণাময় আল্লাহ কত নিপুণভাবে তাঁর বান্দার আর্তনাদ শোনেন। কোথায় আবূ সালামা, আর কোথায় দু’জাহানের সরদার! আল্লাহ তাঁর জন্য শ্রেষ্ঠতম মানবকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।
তবে তিনি বার্তাবাহক হাতেব বিন আবী বালতা‘আ (রাঃ)-কে নিজের কিছু মানবিক দুর্বলতা ও শঙ্কার কথা অকপটে তুলে ধরলেন। বিনীত ভাবে জানালেন, ‘আমার তো একটি কন্যাসন্তান রয়েছে, আর আমার স্বভাবের মধ্যে যিদ ও অভিমান বেশী। তার এই সরল স্বীকারোক্তির জবাবে রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘তার কন্যার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে দো‘আ করব, যেন আল্লাহ তাকে সেই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেন। আর তার যিদ বা অভিমানী স্বভাবও যেন দূর করে দেন’।
রাসূল (ছাঃ)-এর জবাবে উম্মে সালামা (রাঃ)-এর হৃদয়ের সমস্ত সংশয় নিমিষেই উবে গেল। নিজেকে সঁপে দিলেন এই পবিত্রতম বন্ধনে। এভাবেই চোখের পানির বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা উম্মে সালামা (রাঃ)-এর সেই চরম বিপদের মুহূর্তের দো‘আ কবুল করেছিলেন। তিনি যে কেবল স্বামী হিসাবে সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবকে পেয়েছিলেন তা-ই নয়; বরং পৃথিবীর বুকে ‘উম্মুল মুমিনীন’ হওয়ার কালজয়ী মর্যাদা লাভ করেছিলেন।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য : এই দো‘আটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে নিখাদ তাওহীদ বিশ্বাস এবং মানসিক প্রশান্তির এক অদ্ভুত শক্তি।
1 ‘আমরা আল্লাহর জন্যই, আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে’ এই কথার মাধ্যমে বান্দা স্বীকার করে নেয় যে, আমরা পৃথিবীতে যা কিছু পাই- সম্পদ, সম্পর্ক, প্রিয়জন সবকিছুই আল্লাহর দেওয়া আমানত। যা কিছু হারিয়েছি, তার প্রকৃত মালিক আমি নই, আল্লাহ। তিনি তাঁর জিনিস নিয়ে গেছেন, এতে অভিযোগের কিছু নেই। এই উপলব্ধি হারানোর তীব্র যন্ত্রণাকে প্রশমিত করে এবং হৃদয়কে শান্ত করে।
2. ‘আমাকে প্রতিদান দিন’ এই অংশের মাধ্যমে বান্দা নিজের শোককে ইবাদতে পরিণত করে। দুনিয়ার মানুষ বিপদে কেবল কাঁদে, আর মুমিন বিপদে কেঁদেও আখেরাতের ছওয়াব লুফে নেয়। কারণ মুমিন বিশ্বাস করে একটি কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহ তার বিনিময়ে গুনাহ মাফ করেন বা মর্যাদা বৃদ্ধি করেন (বুখারী হা/৫৬৪০)।
3. দো‘আটির সবচেয়ে সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হ’ল শেষের বাক্যটি- ‘এর বিনিময়ে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন’। এই দো‘আ আমাদেরকে শেখায় অন্ধকারের পর আলোর স্বপ্ন দেখতে। আল্লাহ যদি একটি দরজা বন্ধ করেন, তবে তিনি আরও সুন্দর ও প্রশস্ত আরেকটি দরজা খুলে দিতে পারেন। এই অগাধ বিশ্বাস হতাশার মেঘ সরিয়ে হৃদয়ে আশার সঞ্চার করে।
কখন পড়তে হবে?
অনেকেই মনে করেন, এই দো‘আটি কেবল কেউ মারা গেলেই পড়তে হয়। এটি একটি ভুল ধারণা। বরং যেকোন ছোট বা বড় বিপদে এটি পড়া যায়। কোন প্রিয়জন মারা গেলে, চাকরী বা ব্যবসায়ে হঠাৎ বড় কোন ক্ষতি হ’লে, মূল্যবান কোন জিনিস হারিয়ে গেলে বা চুরি হয়ে গেলে, এমনকি সামান্য কোন শারীরিক আঘাত পেলে বা কোন কাজে ব্যর্থ হ’লেও দো‘আটি পাঠ করা মুস্তাহাব।
পরিশেষে বলা যায়, মুমিনের ডিকশনারিতে ‘হতাশা’ বলে কোন শব্দ নেই। মুমিনের জীবনে হারানো মানেই হ’ল নতুন করে, আরও উত্তমরূপে ফিরে পাওয়ার সূচনা। কোন বিপদে যখন চারদিক অন্ধকার মনে হয়, বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়, তখন চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে পূর্ণ ইয়াক্বীনের সাথে এই দো‘আটি পাঠ করুন। বিশ্বাস রাখুন, যে আল্লাহ উম্মু সালামা (রাঃ)-এর ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগিয়ে তাঁকে শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দিয়েছিলেন, সেই আল্লাহ আজও আপনার হারানো বস্ত্ত বা প্রিয়জনের শূন্যস্থান তার চেয়েও উত্তম কিছু দিয়ে পূর্ণ করে দেওয়ার জন্য প্রস্ত্তত আছেন।