নিঃস্বের আর্তনাদ ও এলাহী সাহায্য মূসা (আঃ)-এর ঐতিহাসিক দো‘আ

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবীদের জীবনী থেকে প্রাপ্ত দো‘আগুলো কেবল ইতিহাসের অংশ নয় বরং এগুলো মুমিন জীবনের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তের চূড়ান্ত সমাধান। যুগে যুগে আম্বিয়ায়ে কেরাম ও আল্লাহর নেককার বন্দারা বিপদে আপদে একমাত্র আল্লাহর কাছে নিবেদন পেশ করতেন। এমনই একটি শক্তিশালী ও কবুলযোগ্য দো‘আ হ’ল- ‘রাবিব ইন্নি লিমা আনযালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাক্বীর’। যখন বিপদমুক্তির সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়, চারদিকে কেবল হতাশা আর শূন্যতা বিরাজ করে তখন এই দো‘আটি আল্লাহর রহমতের দরজা খোলার চাবিকাঠি হিসাবে কাজ করে। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে হযরত মূসা (আঃ)-এর এই ঐতিহাসিক দো‘আটির প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব এবং আমল সম্পর্কে আলোকপাত করা হ’ল।-

পরিচিতি : সূরা ক্বাছাছ-এর ২৪নং আয়াতে এই দো‘আটি বর্ণিত হয়েছে। যেখানে হযরত মূসা (আঃ) বলেছেন,

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ-

‘রবিব ইন্নী লিমা আনযালতা ইলাইয়া মিন খায়রিন ফাক্বীর’

অর্থ : ‘হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমার উপর যে কল্যাণই নাযিল করো না কেন, আমি তার মুখাপেক্ষী’ (ক্বাছাছ ২৮/২৪)

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : এই দো‘আটির গভীরতা বুঝতে হ’লে আমাদের ফিরে যেতে হবে হযরত মূসা (আঃ)-এর জীবনের সেই কঠিন সময়ে, যখন ফেরাউনের রাজপ্রাসাদে লালিত-পালিত মূসা (আঃ) এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক হত্যাকান্ডের আসামী হয়ে জীবনের ভয়ে মিসর ছাড়তে বাধ্য হন। তাঁর কোন পূর্বপ্রস্ত্ততি ছিল না। সাথে ছিল না কোন খাবার, বাহন বা সঙ্গী। এমতাবস্থায় তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মাদায়েন শহরে পৌঁছেন। মাদায়েন পৌঁছে তিনি দেখলেন একটি কূয়ার পাশে মানুষ পশুদের পানি পান করাচ্ছে। ভিড়ের পিছনে দু’টি মেয়ে তাদের পশুদের আগলে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লান্ত শরীরেও মূসা (আঃ) তাদের সাহায্য করলেন এবং পশুদের পানি পান করালেন। এরপর তিনি ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিলেন। তখন তাঁর অবস্থা ছিল এমন যে মাথার ওপর আশ্রয় নেই, পেটে খাবার নেই, পকেটে অর্থ নেই, নিজ দেশে ফেরার কোন উপায় নেই এবং অচেনা শহরে পরিচিত কোন মানুষও নেই। ঠিক এই চরম অসহায় ও নিঃস্ব অবস্থায় তিনি গাছের ছায়ায় বসে মহান প্রতিপালকের কাছে আকুল ফরিয়াদ জানিয়ে উক্ত দো‘আটি পাঠ করেন।

তাৎপর্য ও শিক্ষা : মূসা (আঃ)-এর এই দো‘আটি মহান আল্লাহর উপর নিরঙ্কুশ আস্থা, আদব ও বিনয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মূসা (আঃ) বলেননি, হে আল্লাহ! আমাকে খাবার দিন, আবাসন দিন অথবা আমাকে নিরাপত্তা দিন। তিনি নির্দিষ্ট করে কোন কিছুই চাননি। কেননা এসময় তার কি প্রয়োজন সেটা তার প্রভুই সর্বাধিক অবগত। তাই তিনি সিদ্ধান্তের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং নিজেকে আল্লাহর দয়ার ভিখারী হিসাবে পেশ করে বলেছিলেন, আপনি আমার জন্য যে কল্যাণই বরাদ্দ করবেন তাতেই আমি সন্তুষ্ট। এর মধ্যে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে যে, আল্লাহর উপরে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দিলে আল্লাহ তাঁর নেককার বান্দাদের সব দায়িত্ব নিজে নিয়ে থাকেন।

দো‘আর ফলাফল : এই দো‘আটি পড়ার পর আল্লাহর সাহায্য কত দ্রুত এসেছিল তা কুরআনের পরের আয়াতগুলোতেই বর্ণিত আছে। এই দো‘আর বরকতে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে একইসাথে তিনটি বড় নে‘মত দান করেছিলেন (১) আশ্রয় ও জীবিকা : শোয়াইব (আঃ) তাকে নিরাপদ আশ্রয় এবং ৮-১০ বছরের জন্য নিশ্চিত চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। (২) জীবনসঙ্গী : সেই দু’টি মেয়ের মধ্যে একজনকে তাঁর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন। (৩) নিরাপত্তা : তিনি ফেরাঊনের ভয় থেকে মুক্ত হ’লেন। অর্থাৎ তিনি চাইলেন কেবল ‘কল্যাণ’। আর আল্লাহ তাকে দিলেন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, চাকরি ও স্ত্রী।

দো‘আটি যখন পড়বেন : যেকোন কঠিন মুহূর্তে দো‘আটি পাঠ করা যেতে পারে। এছাড়াও কারো যদি চাকরীর প্রয়োজন হয় বা আর্থিক সংকটে পতিত হন তাহ’লে এ দো‘আটি পাঠ করতে পারেন। বিবাহযোগ্য নারী-পুরুষ নেককার স্ত্রী বা স্বামী লাভের আশায় এই দো‘আটি নিয়মিত পাঠ করতে পারেন। সর্বোপরি যখন মনে হবে পৃথিবীতে আপনার কেউ নেই, আপনজনরা পর হয়ে গেছে, আপনার একটা অবলম্বন প্রয়োজন তখন হৃদয়ের আকুতি নিয়ে এই দো‘আটি পাঠ করলে অন্তরে প্রশান্তি পাবেন, হৃদয়ে আশার আলো খুঁজে পাবেন, গায়েবী মদদ নেমে আসবেই ইনশাআল্লাহ।

আমল করার নিয়ম : এই দো‘আর জন্য নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা বা সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে দো‘আ কবুলের বিশেষ সময়গুলোতে এটি পাঠ করা উত্তম। যেমন ছালাতের সিজদায়, শেষ তাশাহুদে, সালাম ফিরানোর পর, তাহাজ্জুদ ছালাত বা ছালাতুল হাজতে। সর্বোপরি যেকোন সময় এটি পড়া যেতে পারে।

পরিশেষ বলব দো‘আটি আমাদেরকে শেখায় যে, নিজের অক্ষমতা ও অসহায়ত্ব আল্লাহর কাছে প্রকাশ করার নামই ইবাদত। আমরা যখন নিজেদের ভিখারী মনে করে রাজাধিরাজ আল্লাহর দরবারে হাত পাতব, তখন তিনি আমাদের খালি হাতে ফেরাবেন না ইনশাআল্লাহ। তাই জীবনের কঠিন সময়গুলোতে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এই দো‘আটি পড়ুন। তিনি আপনার জন্য এমন কল্যাণ নাযিল করবেন যা আপনি কল্পনাও করেননি।






আরও
আরও
.