গত ৭ই জুলাই মঙ্গলবার মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া এলাকায় পূর্বঘোষণা ছাড়াই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আকস্মিকভাবে উপস্থিত হন। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোন প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ের সেনা সদস্যদের সঙ্গে এতটা দীর্ঘ সময় কাটালেন। বাংকারে নেমে তাদের সঙ্গে খাবার খেলেন, রণকৌশল নিয়ে কথা বললেন। একইভাবে ১৩ই জুলাই সোমবার বরিশালের বাবুগঞ্জেও তিনি অপর এক প্রশিক্ষণ মহড়া পরিদর্শন করেন। এর আগে ১৮ই জুন বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমীতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান উদ্বোধন করেন ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’, যার চারটি কোম্পানীর নামকরণ হয়েছে ইসলামের মহান চার খলীফা আবুবকর, ওমর, ওছমান ও আলী (রাঃ)-এর নামে। একই সময়ে সেনাপ্রধান নিজে দাড়ি রেখেছেন ও সেনা সদস্যদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার আহবান জানিয়েছেন। অন্যদিকে চীন ও পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির লক্ষ্যে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ যেন এক নতুন বাংলাদেশের ইঙ্গিত, যে বাংলাদেশ তার সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের উক্ত পদক্ষেপ সমূহকে স্বাগত জানাই। সেই সাথে ট্রেইনিংকালে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরকে হাফপ্যান্টের বদলে টাখনুর উপর পর্যন্ত ফুলপ্যান্ট পরিধান করা, সময় মতো পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করা, সুন্নাতী দাড়ি রাখা প্রভৃতি ধর্মীয় বিধি বাস্তবায়নের দিকে নযর দেয়ার আহবান জানাই। 

উল্লেখ্য যে, বর্তমান সরকারের ১৩তম জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরুর আগের দিন ১১ই মার্চ বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে স্পীকারের মাথার উপরে কালেমা শাহাদাতের ক্যালিগ্রাফি স্থাপন করাসহ একটি কল্যাণ রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য তাঁর কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আমাদের আশান্বিত করেছে। ঠিক একইভাবে তাঁর পিতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও ১৯৭৯ সালের ৯ই এপ্রিল সংবিধানের শুরুতে (প্রস্তাবনার ঠিক ওপরে) ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ সংযোজন করেছিলেন। অতঃপর সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্যতম ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ পরিবর্তন করে সেখানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ প্রতিস্থাপন করেন। যদিও শেখ হাসিনার আমলে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে তা পুনরায় পরিবর্তিত হয়ে যায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মূলনীতি পুনঃস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা সেটির আশু বাস্তবায়ন কামনা করি।

আমরা লক্ষ্য করছি যে, ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নে’র চারটি কোম্পানীর নামকরণ ইসলামের মহান চার খলীফার নামে করায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোর গাত্রদাহ তুঙ্গে উঠেছে। যদিও সেদেশের মোট জনসংখ্যার সর্বোচ্চ ১৫.২ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গের ২৯ শতাংশ এবং আসামের ৩৬ শতাংশ জনসংখ্যা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও সে দেশের সর্বত্র হিন্দুত্ববাদের জয়জয়কার। সে দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠ, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ড প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভি. এম. বি. কৃষ্ণন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ প্রধান প্রবীণ কুমার সবাই অমুসলিম। তাদের সেনাবাহিনীর গঠন ও ঐতিহ্যে হিন্দু দেবদেবীদের অত্যন্ত শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। যেমন যুদ্ধের ময়দানে সৈন্যদের উদ্দীপিত করতে তারা তাদের হিন্দু দেবদেবীদের নাম উচ্চারণ করে থাকেন। যেমন (১) বিহার রেজিমেন্ট ‘জয় বজরং বলী’ (ভগবান হনুমানের নামে), (২) দিল্লী সদরের রাজপুতানা রাইফেল্স ‘রাজা রামচন্দ্র কি জয়’ (ভগবান রামের নামে), (৩) উত্তরাখন্ড রাজ্যের গড়ওয়াল রাইফেলস ‘বদ্রী বিশাল লাল কি জয়’ (ভগবান বিষ্ণুর বদ্রীনাথ রূপের উদ্দেশ্যে নিবেদিত), (৪) হিমাচল প্রদেশের ডোগরা রেজিমেন্ট ‘জ্বালা মাতা কি জয়’ (দেবী দুর্গার আরেক নাম ‘জ্বালা মাতা’ বা অগ্নিদেবী), (৫) জম্মু ও কাশ্মীর রাইফেলস ‘দুর্গা মাতা কি জয়’ (দেবী দুর্গার নামে), (৬) মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি ‘হর হর মহাদেব’ (ভগবান শিবের নামে)। অনুরূপভাবে শিখদের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীতে শিখ রেজিমেন্ট ও শিখ লাইট ইনফ্যান্ট্রি নামে সম্পূর্ণ আলাদা রেজিমেন্ট আছে। দাড়ি ও পাগড়ি তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ এ নিয়ে কারো কোন আপত্তি দেখা যায় না। গেরুয়া গামছা গায়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পাগড়ি ও শ্মশ্রুমন্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর ব্যাপারে তাদের কোন কথা নেই।

অনুরূপভাবে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের পৃথক কোন রণধ্বনি নেই। কিংবা ভারতের স্বতন্ত্র কোন রণধ্বনি নেই। বরং সামগ্রিকভাবে সমগ্র ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং জাতীয় পর্যায়ে যে রণধ্বনি ও শ্লোগানগুলোকে সার্বজনীন বা জাতীয় স্তরের রণধ্বনি হিসাবে ব্যবহার করা হয়, সেগুলো হ’ল ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘জয় হিন্দ’ ও ‘বন্দে মাতরম’। কিন্তু এতেও তাদের কোন সমস্যা হয় না, যদিও সেদেশের ঘোষিত মূলনীতি হ’ল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ!

মূলত প্রতিবেশী দেশের মিডিয়া যখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে ইসলামের চার খলীফার নাম দেখে ‘ইসলামীকরণ’ বলে আতংকিত হয়, তখন বুঝতে হবে যে, সমস্যাটা নীতির নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব ধর্মীয় সত্তার উপর দাঁড়ানোর চেষ্টা দেখেই তাদের এই অস্বস্তি। বাংলাদেশ শতকরা একানববই ভাগের অধিক মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। এই দেশের সেনাবাহিনী তার সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটাবে, এটাই তো স্বাভাবিক। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা কাফেরদের মোকাবিলায় সাধ্যমত শক্তি ও সুসজ্জিত অশ্ববাহিনী প্রস্ত্তত রাখো, যা দিয়ে তোমরা ভীত করবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের এবং অন্যদের যাদেরকে তোমরা জানো না, কিন্তু আল্লাহ তাদের জানেন’ (আনফাল ৬০)। এই শক্তি কেবল অস্ত্রের শক্তি নয়, বরং ঈমানী শক্তিই হ’ল মূল। যেমন আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের জান ও মাল খরীদ করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে’ (তওবা ১১১)। তাই মুসলিম সেনাবাহিনী কেবলমাত্র জান্নাত লাভের উদ্দেশ্যে যুদ্ধের ময়দানে হাসিমুখে জীবন দেয়। সীমান্ত প্রহরা দেয়। তারা আল্লাহর নামে তাকবীর ধ্বনি করে। কোন দেব-দেবীর নামে নয়। যেখানে পূজারী ও পূজ্য দু’টিই ব্যর্থ (হজ্জ ৭৩)। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের অন্তরে যদি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও নিশ্চিন্ত নির্ভরতা থাকে, তবে সেই সেনাবাহিনী কেবল সীমান্ত নয়, বরং দেশের জাতীয় মর্যাদাকে অটুট রাখবে ইনশাআল্লাহ।

সেনাবাহিনীকে কৌশলগত ও নৈতিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সংসদে একাধিক সংসদ সদস্য তরুণদেরকে সরকারীভাবে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা আমাদের কাছে অত্যন্ত সময়োপযোগী মনে হয়েছে। কেননা জাতীয় প্রতিরক্ষা কেবল সেনাবাহিনীর একার দায়িত্ব নয়। এটি সমগ্র জাতির গণপ্রতিরক্ষার বিষয়। রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি সুশৃঙ্খল নাগরিক প্রতিরক্ষা কাঠামো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলাবোধ জাগিয়ে তুলবে ইনশাআল্লাহ। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কসহ ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশ এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

আমরা মনে করি, রাষ্ট্রীয়ভাবে ভৌগলিক প্রতিরক্ষা ও ঈমানী প্রতিরক্ষা উভয়টিই সমান যরূরী। সেনাবাহিনীর মধ্যে ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের উজ্জীবন, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সাথে তার আস্থার সম্পর্ক দৃঢ়করণ, দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকভাবে প্রস্ত্তত করা ইত্যাদি পদক্ষেপগুলো জাতি হিসাবে আমাদের আত্মমর্যাদাকে আরো অনেক বেশী সমুন্নত করবে ইনশাআল্লাহ। আর এভাবে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ মোতাবেক দ্বীনের সঠিক জ্ঞান, সালাফে ছালেহীনের দেখানো পথ ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার সমন্বয়েই আমরা আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণন রাখতে পারব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের দেশ ও জাতিকে হেফাযত করুন- আমীন! (স.স.)






খোশ আমদেদ মাহে রামাযান - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আহলেহাদীছের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আসামে মুসলিম নিধন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আগামীর গন্তব্য
শিশু আয়লানের আহবান : বিশ্বনেতারা সাবধান! - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
বাবরী মসজিদের রায় : ভূলুণ্ঠিত ন্যায়বিচার - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
কল্যাণমুখী প্রশাসন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আল-কুরআনের আলোকে ক্বিয়ামত
সীমান্তে পুশইন : মানবতা তুমি কোথায়? - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
পিওর ও পপুলার - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ওয়াহহাবী সংস্কার আন্দোলন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আরও
আরও
.