ভূমিকা :

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, যা মানুষের পারস্পরিক লেনদেন, আদব-আখলাক এবং সম্মান প্রদর্শনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুষ্পষ্ট নীতিমালা প্রদান করেছে। সামাজিক জীবনে একে অপরকে সম্মান জানানো বা অভ্যর্থনা জানানোর অন্যতম একটি মাধ্যম হ’ল ‘ক্বিয়াম’ বা দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা। তবে এই দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর বিষয়টি সবসময় একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে অতিভক্তি বা জাহেলী রীতিনীতির অনুসরণে মানুষ এমন কিছু করে ফেলে, যা সরাসরি নবী করীম (ছাঃ)-এর সুন্নাহ ও নির্দেশনার পরিপন্থী। বিশেষ করে অহংকার প্রদর্শন বা রাজা-বাদশাহদের মতো কৃত্রিম সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন কখন বৈধ, কখন মাকরূহ আর কখন তা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত তা কিতাব ও সুন্নাহর নিরিখে জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক। মূলত এটি ব্যক্তির প্রতি অতিনির্ভরতা বা অহমিকা সৃষ্টি করে কি-না, সেটিই বক্ষ্যমাণ নিবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়। পবিত্র কুরআন, ছহীহ হাদীছ এবং সালাফে ছালেহীনের কর্মপন্থা পর্যালোচনার মাধ্যমে আমরা এই বিষয়ের শারঈ ও নৈতিক অবস্থান নিরূপণ করতে প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।

কারো সম্মানে দাঁড়ানোর বিধান

কাউকে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা কখনো কখনো হারাম হ’লেও আবার কখনো জায়েয বরং মুস্তাহাব। নিম্নে হারাম ও জায়েযের ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হ’ল।

কারো সম্মানে দাঁড়ানোর নিষিদ্ধ ক্ষেত্রসমূহ :

ক. কেউ বসে থাকা অবস্থায় তার সামনে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে অন্যদের দাঁড়িয়ে থাকা :

বিনা প্রয়োজনে কেবল সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বসে থাকা কোন ব্যক্তির সামনে অন্যদের দাঁড়িয়ে থাকা ইসলামে অনুমোদিত নয়। নবী করীম (ছাঃ) স্পষ্টভাবে এই প্রথাকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এ কারণেই নবী করীম (ছাঃ) যখন বসে ছালাত আদায় করছিলেন, তখন ছাহাবীগণকে তাঁর পেছনে বসে ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা দাঁড়িয়ে গেলে তিনি বলেছিলেন,إِنَّمَا جُعِلَ الإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ فَإِنْ صَلَّى قَائِماً فَصَلُّوا قِيَاماً وَإِنْ صَلَّى جَالِساً فَصَلُّوا جُلُوساً وَلاَ تَقُومُوا وَهُوَ جَالِسٌ كَمَا يَفْعَلُ أَهْلُ فَارِسٍ بِعُظَمَائِهَا، ‘নিশ্চয়ই ইমাম নির্ধারণ করা হয়েছে তাঁকে অনুসরণ করার জন্য। অতএব তিনি যখন দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করেন, তোমরাও দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করো। আর তিনি যখন বসে ছালাত আদায় করেন, তোমরাও বসে ছালাত আদায় করো। তিনি বসে থাকা অবস্থায় তোমরা দাঁড়িয়ে থেকো না, যেভাবে পারস্যের লোকেরা তাদের মহান ব্যক্তিদের সম্মানে (দাঁড়িয়ে) করে থাকে’।[1]

অন্য হাদীছে এসেছে,اشْتَكَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَصَلَّيْنَا وَرَاءَهُ وَهُوَ قَاعِدٌ، وَأَبُو بَكْرٍ يُسْمِعُ النَّاسَ تَكْبِيرَهُ، فَالْتَفَتَ إِلَيْنَا فَرَآنَا قِيَامًا، فَأَشَارَ إِلَيْنَا فَقَعَدْنَا فَصَلَّيْنَا بِصَلَاتِهِ قُعُودًا فَلَمَّا سَلَّمَ قَالَ: إِنْ كِدْتُمْ آنِفًا لَتَفْعَلُونَ فِعْلَ فَارِسَ وَالرُّومِ يَقُومُونَ عَلَى مُلُوكِهِمْ، وَهُمْ قُعُودٌ فَلَا تَفْعَلُوا ائْتَمُّوا بِأَئِمَّتِكُمْ إِنْ صَلَّى قَائِمًا فَصَلُّوا قِيَامًا وَإِنْ صَلَّى قَاعِدًا فَصَلُّوا قُعُودًا ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমরা তাঁর পেছনে ছালাত আদায় করলাম, তখন তিনি বসা ছিলেন। আর আবুবকর (রাঃ) মানুষকে তাঁর তাকবীর শুনাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে আমাদের দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পেলেন। তখন তিনি আমাদের বসার জন্য ইশারা করলেন। আমরা বসে পড়লাম এবং তাঁর সাথে বসে ছালাত আদায় করলাম। যখন তিনি সালাম ফিরালেন, তখন বললেন, তোমরা তো এখন পারস্য ও রোমের অধিবাসীদের মতো কাজ করতে যাচ্ছিলে; তারা তাদের রাজাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে অথচ রাজারা বসে থাকে। তোমরা এমন করো না। তোমরা তোমাদের ইমামদের অনুসরণ করো। ইমাম যদি দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করেন তবে তোমরাও দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করো, আর যদি তিনি বসে ছালাত আদায় করেন তবে তোমরাও বসে ছালাত আদায় করো’।[2]

এর ব্যাখ্যায় আল্লামা আলবানী (রহঃ) বলেন, এই হাদীছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক-নির্দেশনা রয়েছে। আর তা হ’ল নবী করীম (ছাঃ) সেই সুস্থ ব্যক্তিদের যারা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায়ে সক্ষম ছিলেন তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি বসে থাকা অবস্থায় তারাও তাঁর সাথে বসেই ছালাত আদায় করেন। এর অর্থ হ’ল, তিনি তাদের ওপর থেকে ছালাতের অন্যতম একটি রুকন বা ফরয ক্বিয়াম (দাঁড়ানো) রহিত করে দিয়েছিলেন। অথচ বিশ্বজাহানের প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে দাঁড়াও’ (বাক্বারাহ ২/২৩৮)। কেবল একটি বিশেষ কারণে তিনি এই রুকনটি শিথিল করেছিলেন; আর তা হ’ল যেন সেখানে কোন মূর্তিপূজকসুলভ চিত্র ফুটে না ওঠে, যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ত অত্যন্ত সৎ ও নেক ছিল। তিনি মূলত বাহ্যিক অবস্থাকে সংশোধন করতে চেয়েছিলেন। কারণ বাহ্যিক রূপই হচ্ছে অন্তরের বহিঃপ্রকাশ। তিনি চেয়েছিলেন যেন পারস্যের সম্রাট কিসরার সাথে তাঁর কোন সাদৃশ্য প্রকাশ না পায়, যে কিনা অহংকারবশত বসে থাকত আর তার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত।

অথচ নবী করীম (ছাঃ) মা‘যূর বা অসুস্থ হওয়ার কারণে বসেছিলেন, অহংকারবশত নয়। এমনকি ছাহাবীগণও তাঁর পেছনে আল্লাহর ইবাদত ও সম্মানার্থেই দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু এই নিয়তের বড় পার্থক্যের পরেও তিনি তাঁদের বসে পড়ার নির্দেশ দেন। যেন পারস্যের সম্রাটদের সামনে তাদের অনুসারীরা যেভাবে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে, তেমন কোন দৃশ্য তৈরি না হয়। আমরা যদি এই সত্যটি উপলব্ধি করি যে, কেবল মুশরিকদের সাদৃশ্য বর্জন করার জন্য প্রত্যেক মুছল্লীর ওপর ফরয করা ক্বিয়াম বা দাঁড়ানোর বিধানকে শিথিল করা হয়েছে। তবে সেই অবস্থার ভয়াবহতা কতটুকু যেখানে মুসলিমরা আল্লাহর জন্য নয় বরং গায়রুল্লাহর জন্য দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করে? নিঃসন্দেহে নবী করীম (ছাঃ) যখন কোন মজলিসে প্রবেশ করতেন, তখন ছাহাবীদের দাঁড়িয়ে যাওয়াকে অপসন্দ করতেন যদিও তারা ভালোবেসেই তা করতে চাইতেন। বর্তমান প্রেক্ষাপট এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কেবল নেতাদের ক্ষেত্রেই নয়, বরং অনেক আলেমে দ্বীন ও মাশায়েখের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে তাঁরা মজলিসে প্রবেশ করলে মানুষ দাঁড়িয়ে তাঁদের সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন করাকে আবশ্যক মনে করে। অথচ এই ধরনের সম্মান করা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এটা পসন্দ করে যে মানুষ তার সম্মানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকুক, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।[3]

খ. কারো আগমন বা প্রস্থানের সময় কোন কারণ ছাড়াই কেবল সম্মানের খাতিরে দাঁড়িয়ে থাকা :

অর্থাৎ কারো আগমন বা প্রস্থানের সময় মুছাফাহা, সাক্ষাত বা কোন কাজে সহযোগিতার উদ্দেশ্য ছাড়া কেবল ভক্তি প্রদর্শনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা। যেমন ক্লাসরুমে শিক্ষক এলে বা পরীক্ষার হলে পরিদর্শক স্বাক্ষর করতে এলে দাঁড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদি। ছাহাবীগণ নবী করীম (ছাঃ)-এর আগমনে দাঁড়াতেন না, কারণ তারা জানতেন যে, তিনি এটি অপসন্দ করেন। এ মর্মে নিম্নোক্ত হাদীছ সমূহ প্রণিধানযোগ্য-

(১) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, مَا كَانَ شَخْصٌ أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنْ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا لِمَا يَعْلَمُوا مِنْ كَرَاهِيَتِهِ لِذَلِكَ ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চেয়ে অধিক প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছাহাবীগণের কাছে আর কেউ ছিলেন না, তা সত্ত্বেও তাঁরা যখন তাঁকে আগমন করতে দেখতেন, তখন দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন না; কারণ তাঁরা জানতেন যে, তিনি এটি অপসন্দ করেন’।[4]

(২) আবু মিজলায (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা মু‘আবিয়া (রাঃ) বাইরে বের হ’লেন। তাঁকে দেখে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) এবং ইবনে ছাফওয়ান (রাঃ) দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন মু‘আবিয়া (রাঃ) বললেন, ‘আপনারা বসুন। কারণ আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَتَمَثَّلَ لَهُ الرِّجَالُ قِيَامًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ যে ব্যক্তি এতে আনন্দিত বোধ করে যে, মানুষ তার সম্মানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকুক, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়’।[5] এর ব্যাখ্যায় ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহঃ) বলেন,لِأَن هَذَا الْوَعيد إِنَّمَا توجه للمتكبرين وَإِلَى من يغْضب أَو يسْخط أَن لَا يُقَام لَهُ، ‘কেননা এই ধমকি বা কঠোর সতর্কতা কেবল সেইসব অহংকারী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করেই দেওয়া হয়েছে, যারা তাদের সম্মানে (অন্যরা) দাঁড়িয়ে না থাকলে রাগান্বিত বা অসন্তুষ্ট হন।[6]

(৩) আব্দুল্লাহ ইবনে বুরায়দাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মু‘আবিয়া (রাঃ) বাইরে বের হলেন এবং দেখলেন যে, তাঁর আগমনের কারণে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। তখন তিনি তাদের বললেন, ‘আপনারা বসুন। কারণ রাসূলুল্লাহ বলেছেন, مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَقُومَ لَهُ بَنُو آدَمَ، وَجَبَتْ لَهُ النَّارُ ‘যে ব্যক্তি এতে আনন্দিত হয় যে আদম সন্তান তার সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকুক, তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়’।[7]

(৪) আওযাঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, ওমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর জনৈক দেহরক্ষী আমাকে বলেছেন, এক জুম‘আর দিনে ওমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহঃ) আমাদের সামনে বের হলেন, তখন আমরা তাঁর অপেক্ষায় ছিলাম। যখন আমরা তাঁকে দেখলাম, তখন (সম্মানার্থে) দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি বললেন, إِذَا رَأَيْتُمُونِي فَلَا تَقُومُوا، وَلَكِنْ تَوَسَّعُوا ‘তোমরা যখন আমাকে দেখবে, তখন দাঁড়াবে না; বরং (বসার জন্য) জায়গা প্রশস্ত করে দিও।[8] এর শিক্ষায় আলবানী (রহঃ) বলেন, এই হাদীছটি আমাদের দু’টি বিষয়ের প্রতি দিকনির্দেশনা প্রদান করে। প্রথমত কোন ব্যক্তি মানুষের নিকট আসার সময় তারা তার সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকুক এটি পসন্দ করা হারাম। এ হাদীছের বক্তব্য এতটাই স্পষ্ট যে, এর জন্য বাড়তি কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত আগন্তুকের জন্য বসে থাকা ব্যক্তিদের দাঁড়িয়ে যাওয়া অপসন্দনীয় (মাকরূহ), যদিও আগন্তুক ব্যক্তি নিজে দাঁড়ানো পসন্দ না করেন। এর উদ্দেশ্য হ’ল সৎকর্মে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মন্দের পথ বন্ধ করা’।[9]

(৫) ওমর ইবনু আব্দিল আযীয (রহঃ) বলতেন,أَيُّهَا النَّاسُ، إِنْ تَقُومُوا نَقُمْ، وَإِنْ تَجْلِسُوا نَجْلِسْ، فَإِنَّمَا يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ. ‘হে লোকসকল! তোমরা যদি দাঁড়াও তবে আমরাও দাঁড়াব, আর তোমরা যদি বসো তবে আমরাও বসব। কারণ, মানুষ তো কেবল বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের (ইবাদতের) জন্যই দন্ডায়মান হয়।[10]

(৬) আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একটি লাঠিতে ভর দিয়ে আমাদের সামনে বেরিয়ে আসলেন। তখন আমরা তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি বললেন, لَا تَقُومُوا كَمَا تَقُومُ الْأَعَاجِمُ، يُعَظِّمُ بَعْضُهَا بَعْضًا তোমরা সেভাবে দাঁড়াবে না যেভাবে অনারবরা (অমুসলিমরা) দাঁড়ায়। তারা একে অপরকে (অতিরিক্ত) সম্মান প্রদর্শনের জন্য এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে’।[11]

(৭) আলী ইবনুল জা‘দ (রহঃ) বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, খলীফা মামুন যখন জহুরিদের (মণি-মুক্তা ব্যবসায়ী) ডেকে আনলেন, তখন তাদের সাথে থাকা মালামাল নিয়ে তিনি দরদাম করছিলেন। এরপর মামুন তাঁর কোন প্রয়োজনে ভেতরে গেলেন এবং পুনরায় (মজলিসে) ফিরে আসলেন। তখন মজলিসে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে গেল, কেবল ইবনুল জা‘দ ছাড়া; তিনি দাঁড়ালেন না। বর্ণনাকারী বলেন, মামুন তাঁর দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকালেন। এরপর তাঁকে একান্তে ডেকে নিয়ে বললেন, হে শায়খ! আপনার সঙ্গীরা যেভাবে দাঁড়ালো, আমাকে দেখে আপনার দাঁড়াতে কিসে বাধা দিল? তিনি বললেন, আমি আমীরুল মুমিনীনকে সেই হাদীছের কারণে (অসম্মান থেকে) রক্ষা করেছি, যা আমরা নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করে থাকি। খলীফা মামুন জিজ্ঞেস করলেন, সেই হাদীছটি কী? আলী ইবনুল জা‘দ বললেন, আমি মুবারক বিন ফাযালাকে বলতে শুনেছি, তিনি হাসান (বছরী) থেকে শুনেছেন যে, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এতে আনন্দিত হয় যে মানুষ তার সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকুক, তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়’। বর্ণনাকারী বলেন, মামুন হাদীছটি নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে মাথা নিচু করে রইলেন। এরপর মাথা তুলে বললেন, এই শায়খ ছাড়া আর কারো কাছ থেকে কোন কিছু কেনা হবে না। অতঃপর তিনি সেদিন তাঁর কাছ থেকে ত্রিশ হাযার দীনার সমমূল্যের মালামাল ক্রয় করলেন।[12]

(৮) আহমদ ইবনে আলী আল-বছরী (রহঃ) বলেন, খলীফা মুতাওয়াক্কিল আহমাদ ইবনুল আদল এবং অন্যান্য আলেমদের কাছে সংবাদ পাঠালেন এবং তাঁদেরকে নিজের প্রাসাদে সমবেত করলেন। এরপর তিনি তাঁদের সামনে বের হলেন (উপস্থিত হলেন)। তখন আহমাদ ইবনুল আদল ছাড়া উপস্থিত সকল মানুষ দাঁড়িয়ে গেল। (এটি দেখে) মুতাওয়াক্কিল ওবায়দুল্লাহকে বললেন, ‘এই ব্যক্তি তো আমাদের আনুগত্যের বায়‘আত স্বীকার করে বলে মনে হচ্ছে না! ওবায়দুল্লাহ (পরিস্থিতি সামাল দিতে) বললেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! বিষয়টি তেমন নয়, বরং তাঁর দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা রয়েছে (তাই তিনি আপনাকে দেখতে পাননি)। তখন আহমাদ ইবনুল আদল (স্পষ্টভাবে) বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমার দৃষ্টিশক্তিতে কোন সমস্যা নেই। বরং আমি আপনাকে আল্লাহ তা‘আলার আযাব থেকে রক্ষা করেছি। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এটি পসন্দ করে যে মানুষ তার সামনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকুক, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়’। (এই কথা শুনে) মুতাওয়াক্কিল এগিয়ে এলেন এবং তাঁর পাশেই বসে পড়লেন।[13]

ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,لَمْ تَكُنْ عَادَةُ السَّلَفِ عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَخُلَفَائِهِ الرَّاشِدِينَ أَنْ يَعْتَادُوا الْقِيَامَ كُلَّمَا يَرَوْنَهُ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَمَا يَفْعَلُهُ كَثِيرٌ مِنْ النَّاسِ؛ ‘নবী করীম (ছাঃ) এবং তাঁর পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সালাফদের (পূর্বসূরীদের) এমন অভ্যাস ছিল না যে, তারা নবী করীম (ছাঃ)-কে যখনই দেখতেন তখনই তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন যেমন বর্তমানে অনেক মানুষ করে থাকে’।[14] এরপর তিনি বলেন, ‘মানুষের জন্য সমীচীন হ’ল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগে সালাফগণ (পূর্বসূরীগণ) যে আদর্শের ওপর ছিলেন, তা অনুসরণ করা। কেননা তাঁরাই হ’লেন সর্বোত্তম প্রজন্ম। আর সর্বোত্তম কথা হ’ল আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশ হ’ল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দেখানো পথ। সুতরাং সৃষ্টির সেরা মানুষের (নবীজি) এবং সর্বোত্তম যুগের মানুষদের আদর্শ ছেড়ে অন্য কোন নিচু স্তরের আদর্শের দিকে কারো ফিরে যাওয়া উচিত নয়। আর যার অনুসরণ করা হয় (যেমন কোন নেতা বা আলেম), তারও উচিত হবে তার সাথীদের মাঝে এই প্রথাকে প্রশ্রয় না দেওয়া; যেন তারা তাকে দেখলেই দাঁড়িয়ে না যায় কেবল সাধারণ সাক্ষাতের সময় (অভ্যর্থনা জানাতে) দাঁড়ানো ছাড়া’।[15]

কারো জন্য দাঁড়ানোর বৈধ ক্ষেত্রসমূহ :

ক. আগন্তুকের সাথে সাক্ষাতের জন্য :

আগুন্তুকের সাথে মুছাফাহা করা, তাকে নিজের জায়গা ছেড়ে দেওয়া বা অনুরূপ কোন সৌজন্যমূলক কাজে কোন দোষ নেই। বরং এটি সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত এবং মেহমানদারীর আদব। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, বিদেশী মেহমান বা কোন গণ্যমান্য ব্যক্তি হঠাৎ করে আগমন করলে তার সাথে মুছাফাহা বা স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়ানো ও এগিয়ে যাওয়া জায়েয। যেমন; কা‘ব ইবনে মালেক (রাঃ) যখন মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন, তখন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ ছাহাবীর অন্যতম ত্বালহা বিন ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) মজলিস থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর সাথে মুছাফাহা করেন এবং তাঁকে অভিনন্দন জানান’।[16]

(১) কা‘ব বিন মালেক (রহঃ) বলেন, ‘অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উদ্দেশ্যে রওনা হ’লাম। পথে দলে দলে মানুষ আমার সাথে সাক্ষাৎ করে তওবা কবুল হওয়ার জন্য আমাকে অভিনন্দন জানাতে লাগলেন। তাঁরা বলছিলেন, ‘আল্লাহ যে আপনার তওবা কবুল করেছেন, সেজন্য আপনাকে মোবারকবাদ। কা‘ব (রাঃ) বলেন, অবশেষে আমি মসজিদে (নববীতে) প্রবেশ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বসে ছিলেন এবং তাঁর চারদিকে লোকজন বসা ছিল। (আমাকে দেখে) তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) দ্রুতবেগে হেঁটে আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং আমার সাথে মুছাফাহা করলেন ও অভিনন্দন জানালেন। আল্লাহর কসম! মুহাজিরদের মধ্যে তিনি ছাড়া আর কেউ আমার জন্য উঠে দাঁড়াননি। আমি তালহা (রাঃ)-এর এই সহমর্মিতার কথা কখনো ভুলব না’।[17]

(২) আয়েশা (রাঃ) বলেন,قَدِمَ زَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ المَدِينَةَ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَيْتِي فَأَتَاهُ فَقَرَعَ البَابَ، فَقَامَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عُرْيَانًا يَجُرُّ ثَوْبَهُ، وَاللَّهِ مَا رَأَيْتُهُ عُرْيَانًا قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ، فَاعْتَنَقَهُ وَقَبَّلَهُ যায়েদ ইবনে হারেছা (রাঃ) যখন মদীনায় আসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমার ঘরে ছিলেন। যায়েদ এসে দরজায় করাঘাত করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) (আনন্দে এতটাই দ্রুত) তাঁর দিকে উঠে দাঁড়ালেন যে তাঁর শরীরের চাদরটি ঝুলে যাচ্ছিল। আল্লাহর কসম! আমি এর আগে বা পরে তাঁকে এমন অবস্থায় দেখিনি। এরপর তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং চুম্বন করলেন।[18]

(৩) এছাড়া বর্ণিত আছে যে, রাসূল (ছাঃ) ইকরিমার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন।[19]

(খ) কোন অসুস্থ ব্যক্তিকে সহযোগিতা করার জন্য দাঁড়ানো :

বনু কুরায়যার বিচারক হিসাবে আসার সময় নবী করীম (ছাঃ)-এর নির্দেশে ছাহাবীগণ সা‘দ ইবনে মু‘আয (রাঃ)-কে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন।

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, ‘যখন বনু কুরাইযা (গোত্র) সা‘দ ইবনে মুআ‘য (রাঃ)-এর ফয়ছালা মেনে নিতে সম্মত হ’ল, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর কাছে লোক পাঠালেন (তাঁকে ডেকে পাঠালেন)। তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর কাছাকাছিই অবস্থান করছিলেন। অতঃপর তিনি একটি গাধার পিঠে ছওয়ার হয়ে আসলেন। যখন তিনি নিকটে পৌঁছলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উপস্থিত আনছারদের উদ্দেশ্যে বললেন, قُومُوا إِلَى سَيِّدِكُمْ তোমরা তোমাদের নেতার সম্মানে উঠে দাঁড়াও’।[20] অন্য বর্ণনায় রয়েছে- قُومُوا إِلَى سَيِّدِكُمْ فَأَنْزِلُوهُ. فَقَالَ عُمَرُ سَيِّدُنَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ. قَالَ أَنْزِلُوهُ. فَأَنْزَلُوهُ ‘তোমরা তোমাদের নেতার প্রতি উঠে দাঁড়াও এবং তাঁকে (বাহন থেকে) নামাও। তখন উমর (রাঃ) বললেন, ‘আমাদের প্রকৃত নেতা তো মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ। অতঃপর নবী করীম (ছাঃ) পুনরায় বললেন, তাঁকে নামাও। এরপর তাঁরা তাঁকে (বাহন থেকে) নামালেন’।[21]

(গ) ছোটদের স্নেহ ভালোবাসা প্রদর্শন বা বড়দের শ্রদ্ধা প্রদানের জন্য দাঁড়ানো বা এগিয়ে যাওয়া :

ফাতেমা (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর সম্মানে এবং রাসূল (ছাঃ) ফাতেমা (রাঃ)-এর প্রতি স্নেহ প্রদর্শনের জন্য দাঁড়াতেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন,إِذَا دَخَلَتْ عَلَيْهِ قَامَ إِلَيْهَا فَأَخَذَ بِيَدِهَا، وَقَبَّلَهَا، وَأَجْلَسَهَا فِي مَجْلِسِهِ، وَكَانَ إِذَا دَخَلَ عَلَيْهَا قَامَتْ إِلَيْهِ، فَأَخَذَتْ بِيَدِهِ فَقَبَّلَتْهُ، وَأَجْلَسَتْهُ فِي مَجْلِسِهَا ‘ফাতেমা (রাঃ) যখন তাঁর নিকট আসতেন, তখন তিনি তাঁর দিকে উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর হাত ধরতেন, তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার স্থানে তাঁকে বসাতেন। অনুরূপভাবে নবী করীম (ছাঃ) যখন ফাতেমার নিকট যেতেন, তখন তিনিও তাঁর দিকে উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর হাত ধরতেন, তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাঁকে বসাতেন’।[22]

শায়খ বিন বায (রহঃ) বলেন,فهذه الأحاديث صريحة في جواز مثل هذا وأنه لا يدخل في القيام المكروه ‘সুতরাং এই হাদীছগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এই ধরনের (অভ্যর্থনা বা ভালোবাসার জন্য) উঠে দাঁড়ানো জায়েয এবং এটি সেই অপসন্দনীয় বা মাকরূহ দাঁড়ানোর অন্তর্ভুক্ত নয়’।[23]

শায়খ বিন বায (রহঃ) বলেন, ‘আপত্তিজনক বিষয় হ’ল কেবল দাঁড়িয়ে থাকা এবং সেটুকুই (অন্য কিছু না করা)। এটি সমীচীন নয়। অর্থাৎ কেবল সম্মানের খাতিরে দাঁড়িয়ে থাকা। তবে মেহমানকে সম্মান জানানো, তাকে এগিয়ে নিয়ে আসা, তার সাথে মুছাফাহা করা বা অভিবাদন জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া জায়েয।

পক্ষান্তরে অন্য সবাই বসা থাকা অবস্থায় কেবল একজনকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা অথবা মেহমানকে অভ্যর্থনা জানানো বা মুছাফাহা করা ছাড়াই কেবল প্রবেশের সময় দাঁড়িয়ে যাওয়া অনুচিত। আর এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হ’ল, কেউ বসে থাকা অবস্থায় তার পাশে কেবল তাকে সম্মান দেখানোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকা’।[24]

ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,وَأَمَّا الْقِيَامُ لِمَنْ يَقْدَمُ مِنْ سَفَرٍ وَنَحْوِ ذَلِكَ تَلَقِّيًا لَهُ فَحَسَنٌ. وَإِذَا كَانَ مِنْ عَادَةِ النَّاسِ إكْرَامُ الْجَائِي بِالْقِيَامِ وَلَوْ تُرِكَ لَا أَعْتَقِدُ أَنَّ ذَلِكَ لِتَرْكِ حَقِّهِ أَوْ قَصْدِ خَفْضِهِ وَلَمْ يَعْلَمْ الْعَادَةَ الْمُوَافِقَةَ لِلسُّنَّةِ فَالْأَصْلَحُ أَنْ يُقَامَ لَهُ لِأَنَّ ذَلِكَ أَصْلَحُ لِذَاتِ الْبَيْنِ وَإِزَالَةِ التَّبَاغُضِ وَالشَّحْنَاءِ، ‘তবে কেউ সফর থেকে ফিরে আসলে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উঠে দাঁড়ানো একটি উত্তম কাজ। আর যদি মানুষের অভ্যাস এমন হয় যে, তারা আগন্তুককে দাঁড়ানোর মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন করে এবং সেই দাঁড়ানো ত্যাগ করলে যদি আগন্তুক মনে করে যে তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয়নি কিংবা তাকে খাটো করা হয়েছে, আর সে যদি সুন্নাহ সম্মত সঠিক নিয়মটি না জানে তবে এমন পরিস্থিতিতে তার জন্য উঠে দাঁড়ানোই অধিকতর শ্রেয়। কারণ এটি পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এবং একে অপরের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ দূর করার জন্য অধিকতর উপযুক্ত’।[25]

শায়খ উছায়মীন (রহঃ) বলেন, ‘আর কারো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিষিদ্ধ; অর্থাৎ কোন ব্যক্তি বসে আছে আর অন্যজন তার সম্মানে পাশে দাঁড়িয়ে আছে এমনটি করা নিষেধ। তবে যদি কোন বিশেষ কল্যাণ (মাছলাহাত) বা প্রয়োজন থাকে, তবে তা ভিন্ন কথা। সেই বিশেষ কল্যাণের একটি উদাহরণ হ’ল যদি দাঁড়িয়ে থাকার মাধ্যমে কাফের শত্রুদের মনে ত্রাস বা বিরক্তি সৃষ্টি করা যায়। যেমনটি মুগীরা ইবনে শু‘বা (রাঃ) করেছিলেন। তিনি নবী করীম (ছাঃ)-এর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। যখন কুরাইশদের প্রতিনিধিরা তাঁর সাথে সন্ধি বা আলোচনার জন্য আসত। এমতাবস্থায় মুগীরা (রাঃ) হাতে তলোয়ার নিয়ে নবী করীম (ছাঃ)-এর মাথার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এতে একটি বিশেষ কল্যাণ নিহিত ছিল, আর তা হ’ল কাফেরদের মনে ভয় সৃষ্টি করা এবং তাদের সামনে নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি তাঁর অনুসারীদের গভীর শ্রদ্ধা ও মার্যাদা ফুটিয়ে তোলা’।[26]

আবুল ওয়ালীদ ইবনুল রুশদ (রহঃ) বলেন, কারো সম্মানে ক্বিয়াম বা দাঁড়িয়ে যাওয়া চার প্রকারের হয়ে থাকে; যার মধ্যে প্রথমটি হ’ল-

১. নিষিদ্ধ বা হারাম : এটি ঐ ব্যক্তির জন্য যার মনে এই আকাঙ্ক্ষা থাকে যে, মানুষ তার সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকুক; আর সে এর মাধ্যমে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের ওপর নিজের অহংকার ও বড়ত্ব প্রকাশ করতে চায়।

২. মাকরূহ বা অপসন্দনীয়: এটি ঐ ব্যক্তির জন্য যে নিজে কোন অহংকার বা বড়ত্ব প্রকাশ করে না, কিন্তু ভয় থাকে যে মানুষের এই দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তার মনে আত্মঅহংকার বা কুপ্রবৃত্তি প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া এতে স্বৈরাচারী শাসকদের সাথে সাদৃশ্য তৈরি হওয়ার ভয় থাকে।

৩. জায়েয বা অনুমোদিত: এটি ঐ ব্যক্তির জন্য যাকে সম্মান ও সদাচারের খাতিরে দাঁড়ানো হয়, অথচ সে নিজে তা চায় না এবং এতে স্বৈরাচারীদের সাথে সাদৃশ্য হওয়ার কোন সম্ভাবনাও থাকে না।

৪. মানদূব বা মুস্তাহাব : কেউ সফর থেকে ফিরে আসলে তার আগমনে খুশী হয়ে তাকে সালাম দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া; অথবা কারো কোন নে‘মত লাভ হ’লে তাকে অভিনন্দন জানাতে কিংবা কোন বিপদে পড়লে তাকে সান্ত্বনা (তাযিয়াহ) দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া। এই অভিমতকে হাফেয ইবনু হাজার আসকবালানী, আইনী, ছাহেবে মির‘আত ও ছাহেবে তোহফা সমর্থন করেছেন।[27]

উপসংহার

উপরোক্ত আলোচনা হ’তে এটি সুস্পষ্ট যে, কারো সম্মানে দাঁড়ানো বা ‘ক্বিয়াম’ সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ নয়, বরং এর বৈধতা ও অবৈধতা নির্ভর করে ব্যক্তির নিয়ত, কাজের ধরন এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর। যদি দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য হয় কেবল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে কাউকে রাজা-বাদশাহদের সদৃশ সম্মান জানানো, তবে তা শরী‘আতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পক্ষান্তরে আগন্তুককে অভ্যর্থনা জানানো, মুছাফাহা করা বা মেহমানদারীর উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া কেবল বৈধই নয়, বরং এটি সুন্নাহ ও সালাফদের আদর্শের অন্তর্ভুক্ত। মুমিন হিসাবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অতিভক্তি বা লৌকিকতা বর্জন করে প্রতিটি ক্ষেত্রে নবী করীম (ছাঃ)-এর সুন্নাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বিশেষ করে যাদের অনুসরণ করা হয়, সেই আলেম, শিক্ষক ও নেতাদের উচিত মানুষকে সুন্নাহর সঠিক আদব শিক্ষা দেওয়া, যেন সমাজ থেকে অহংকার ও বিজাতীয় সংস্কৃতির মূলোৎপাটন ঘটে এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব সুন্নাহর ভিত্তিতে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ আমাদের সর্বক্ষেত্রে সঠিক বুঝ দান করুন-আমীন!


[1]. মুসনাদে আহমাদ হা/১৪২৪৩; ছহীহুল জামে‘ হা/২৩৫৬।

[2]. মুসলিম হা/৪১৩; নাসাঈ হা/১২০০।

[3]. তিরমিযী হা/২৭৫৫; মিশকাত হা/৪৬৯৯, সনদ ছহীহ।

[4]. আহমাদ হা/১৩৬৪৮; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৯৪৬।

[5]. তিরমিযী হা/২৭৫৫; মিশকাত হা/৪৬৯৯, সনদ ছহীহ।

[6]. উমদাতুল ক্বারী ১৪/২৮৯।

[7]. মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান, আল মুখাল্লিছিয়াত হা/২৯৫৫; ছহীহাহ হা/৩৫৭-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য, সনদ ছহীহ

[8]. তারীখে দিমাশক হা/৯১১৭, ৬৮/১৮৪; ছহীহাহ হা/৩৫৭-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য, সনদ ছহীহ

[9]. তারীখে দিমাশক হা/৯১১৭, ৬৮/১৮৪; ছহীহাহ হা/৩৫৭-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য, সনদ ছহীহ

[10]. ইবনু রজব, ফাৎহুল বারী ৬/১৫৮।

[11]. আবুদাউদ হা/৫২৩০ সনদ যঈফ হ’লেও মর্ম ছহীহ।

[12]. ছহীহাহ হা/৩৫৭-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য

[13].ছহীহাহ হা/৩৫৭-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য

[14]. মাজমূউল ফাতাওয়া ১/৩৭৪।

[15]. মাজমূউল ফাতাওয়া ১/৩৭৪।

[16]. বুখারী হা/৪৪১৮; মুসলিম হা/২৭৬৯।

[17]. বুখারী হা/৪৪১৮।

[18]. আবুদাউদ হা/২৭৩২; মিশকাত হা/৪৬৮২, সনদ হাসান।

[19]. মাজমূউল ফাতাওয়া ১/৩৭৫।

[20]. বুখারী হা/৩০৪৩; মিশকাত হা/৪৬৯৫

[21]. আহমাদ হা/২৫১৪০; ছহীহাহ হা/৬৭।

[22]. আবুদাউদ হা/৫২১৭; মিশকাত হা/৪৬৮৯, সনদ ছহীহ।

[23]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২/৯২।

[24]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২৪/৫২-৫৩।

[25]. মাজমূউল ফাতাওয়া ১/৩৭৪।

[26]. ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব ২৪/০২।

[27]. ফাৎহুল বারী ১১/৫১; উমদাতুল ক্বারী ২২/২৫২; তোহফাতুল আহওয়াযী ৮/২৭।






বিষয়সমূহ: বিবিধ
জামা‘আত ও বায়‘আত সম্পর্কিত সংশয়সমূহ পর্যালোচনা (শেষ কিস্তি) - গবেষণা বিভাগ, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
আল-কুরআনে আয়াত সংখ্যা : একটি পর্যালোচনা - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
পীরতন্ত্র! সংশয় নিরসন (পূর্বে প্রকাশিতের পর) - মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী
প্রতারণা হ’তে সাবধান থাকুন!
সাংবাদিক নির্মল সেন-কে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
মাযহাবের পরিচয় (৪র্থ কিস্তি) - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
জামা‘আত ও বায়‘আত সম্পর্কিত সংশয়সমূহ পর্যালোচনা - আত-তাহরীক ডেস্ক
মোযার উপর মাসাহ : একটি পর্যালোচনা - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
কা‘বাগৃহের নীচে কবরস্থান! সংশয় নিরসন - মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী
ইছলামী জামাআত-বনাম আহলেহাদীছ আন্দোলন - মোহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কোরায়শী
প্রসঙ্গ : সারা বিশ্বে একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
আহলেহাদীছ ফিৎনা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ কোর্স! - আত-তাহরীক ডেস্ক
আরও
আরও
.