প্রচলিত জড়বাদী বা পুঁজিবাদী দর্শনে অর্থনীতি মানেই কেবল সম্পদ আহরণ এবং আয়-ব্যয়ের এক যান্ত্রিক হিসাব-নিকাশ। কিন্তু ইসলামের সুমহান ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানে মানবজীবনের প্রতিটি দিক যেমন ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সবকিছুই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। একজন মুমিনের অর্থনৈতিক জীবন শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতা নয়। এটি মহান রবের প্রতি নিঃশর্ত দাসত্ব এবং সৃষ্টির প্রতি গভীর দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। অর্থনৈতিক জীবনের এই তাৎপর্য বোঝাতে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ، ‘আর আমি জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদত করার জন্য’ (যারিয়াত ৫১/৫৬)। এই আয়াতে ব্যবহৃত يَعْبُدُونِ (তারা ইবাদত বা দাসত্ব করবে) শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর অর্থবহ। ইবাদত কেবল নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠান বা ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বিশেষ করে হালাল উপার্জন, সঠিক পথে ব্যয় এবং পারস্পরিক লেনদেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ‘মু‘আমালাত’ বা অর্থনৈতিক আচরণেও এই দাসত্বের প্রতিফলন ঘটা অপরিহার্য। যখন একজন মুমিন আল্লাহর বিধান মেনে সততার সাথে ব্যবসা করেন, শ্রম দেন বা পরিবারকে হালাল রিযিক খাওয়ানোর চেষ্টা করেন তখন তাঁর সেই কর্মটিও ইবাদতে রূপান্তরিত হয়।
সমকালীন অর্থনৈতিক সংকট ও ইসলামী সমাধানের প্রাসঙ্গিকতা : বর্তমান বিশ্ব এক চরম অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বৈষম্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক পুঁজিবাদী ও সূদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মানুষকে অবাধ প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখালেও, বাস্তবে তা জন্ম দিয়েছে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং সম্পদের চরম অসম বণ্টন। অক্সফাম (Oxfam) বা অন্যান্য বৈশ্বিক সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে আজ বাকী ৯৯ শতাংশ মানুষের চেয়ে বেশী সম্পদ কুক্ষিগত।[1] ঋণনির্ভর অর্থনীতি আজ বহু দেশকে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। মানবসৃষ্ট এসব অর্থনৈতিক মতবাদ যখন বৈশ্বিক সংকট সমাধানে চরমভাবে ব্যর্থ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান যখন প্রতিনিয়ত মুখ থুবড়ে পড়ছে ঠিক তখনই একটি নৈতিক, ইনছাফভিত্তিক এবং টেকসই বিকল্প হিসাবে ইসলামী অর্থব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইসলামী অর্থব্যবস্থার কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা : আমরা ব্যক্তিগত ইবাদতে আল্লাহকে ‘ইলাহ’ বা উপাস্য হিসাবে মেনে নিলেও, অর্থনৈতিক জীবনে চরমভাবে পশ্চিমা ভোগবাদী ও সূদভিত্তিক ব্যবস্থার অনুসারী হয়ে পড়েছি। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ অর্থনীতিতে উন্নয়নের একমাত্র মানদন্ড হিসাবে জিডিপি (GDP) ও জিএনপি (GNP)-কে অন্ধভাবে গ্রহণ করতে গিয়ে আমরা হালাল-হারামের মৌলিক সীমারেখাকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছি। পুঁজিবাদ আমাদের শিখিয়েছে বস্ত্তগত প্রবৃদ্ধিই সফলতার মাপকাঠি, অথচ ইসলাম শেখায় সম্পদের পবিত্রতা ও ইনছাফ। যখন অর্থ উপার্জনের মোহ ও প্রতিযোগিতায় মানুষ তার স্রষ্টাকে ভুলে যায়, তখন সেই সম্পদই তার জন্য রহমতের পরিবর্তে ভয়াবহ ‘ফিতনা’ হয়ে দাঁড়ায়। বস্ত্তত নীতিহীন অর্থ উপার্জনের নেশা মানুষকে আত্মিক অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেয়। এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ، ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। যারা এরূপ করবে (অর্থাৎ উদাসীন হবে), তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত’ (মুনাফিকূন ৬৩/৯)। একটি ইনছাফভিত্তিক ও শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে ইসলামী অর্থনীতি বেশ কিছু মৌলিক নীতি অনুসরণ করে। নিম্নে ইসলামী অর্থব্যবস্থায় অনুসৃত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা তুলে ধরা হ’ল :
১. হালাল-হারাম বিধিলিপি : ইসলামে উপার্জনের পরিমাণের চেয়ে এর উৎসের পবিত্রতা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা, চাকরি, কৃষি বা অন্য যেকোন পেশায় উপার্জনের পথটি হ’তে হবে সম্পূর্ণ হালাল ও ন্যায়সঙ্গত। হালাল উপার্জন ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত। অপরদিকে হারাম উপার্জন মানুষের আত্মিক মৃত্যু ঘটায় এবং ইবাদতকে বিনষ্ট করে দেয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, يَاأَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ، ‘হে মানবজাতি! তোমরা পৃথিবী থেকে হালাল ও পবিত্র বস্ত্ত ভক্ষণ কর। আর শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (বাক্বারাহ ২/১৬৮)।
মূলত যে ব্যক্তি তার উপার্জনের উৎস যাচাই করে না সে নিজের দ্বীনকেই এক চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। মানুষের আমল বরবাদ হওয়ার এবং সমাজে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ হ’ল হারাম ও অবৈধ উপায়ে অন্যের সম্পদ গ্রাস করা। আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ، ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করোনা পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা ব্যতীত’ (নিসা ৪/২৯)। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সততা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা হ’ল সবচেয়ে বড় মূলধন। যাঁরা সততার সাথে ব্যবসা বা অর্থনৈতিক লেনদেন পরিচালনা করেন, তাঁদের মর্যাদার বিষয়ে রাসূল (ছা.) সুসংবাদ দিয়েছেন, ‘সত্যবাদী ও বিশবস্ত ব্যবসায়ী ক্বিয়ামতের দিন নবী, ছিদ্দীক ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবে’।[2]
অপরপক্ষে, হারাম উপার্জনের ভয়াবহতা সম্পর্কে তাঁর চূড়ান্ত সতর্কবাণী হ’ল, ‘ঐ দেহ জান্নাতে যাবে না, যা হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে’।[3] এ কারণেই পূর্ববর্তী সালাফগণ হারাম থেকে বেঁচে থাকাকে হাযার রাক‘আত নফল ছালাতের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।
এ প্রসঙ্গে ইসলামের ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্মরণ করা যেতে পারে। নবুঅত প্রাপ্তির পূর্বে কা‘বাঘর পুনর্নিমাণের সময় কুরাইশরা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, এই পবিত্র নির্মাণকাজে কোন অবৈধ অর্থ গ্রহণ করা হবে না। শেষ পর্যন্ত হালাল অর্থের সংকুলান না হওয়ায় তারা কা‘বার নির্মাণ অসম্পূর্ণ রেখেই কাজ বন্ধ করে দেয়। যা আজও কা‘বার পাশে হিজর বা হাতীম হিসাবে পরিচিত। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হ’ল- যেখানে আল্লাহর ঘরের পবিত্র কাঠামোতে হারাম অর্থ অগ্রহণযোগ্য, সেখানে একজন মুমিনের রক্ত-মাংসে গড়া ইবাদতকারীর শরীরে হারাম উপার্জনের অনুপ্রবেশ কিভাবে বৈধ ক’তে পারে!
২. সূদের বিরুদ্ধ কঠোর সতর্কবার্তা ও বৈশ্বিক শোষণ : ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হ’ল সূদের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি যেখানে সূদের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ইসলাম সূদকে মানবসমাজের সবচেয়ে বড় শোষক হিসাবে চিহ্নিত করেছে। সূদ ধনীকে বিনা পরিশ্রমে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আরও ধনী বানায়। পক্ষান্তরে দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত ঋণগ্রহীতাকে সর্বস্বান্ত করে পথে বসায়। সূদী ঋণের বিষাক্ত জালে আবদ্ধ হয়ে কোন ব্যক্তি বা জাতি আজ অবধি প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি বা ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছে এমন নযীর ইতিহাসে বিরল। এ কারণেই একটি শোষণমূলক সূদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা এবং একটি কল্যাণকামী ইসলামী রাষ্ট্রপ্রকল্প কখনোই একসাথে চলতে পারে না। সূদের এই ভয়াবহ শোষণের পথ রুদ্ধ করতে মহান আল্লাহ তা‘আলা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন, وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন’ (বাকবারাহ ২/২৭৫)। যারা এর পরেও সূদী কারবারে জড়িত থাকবে তাদের পরিণতি সম্পর্কে সবচেয়ে কঠোর এবং ভয়ংকর এক সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে আল-কুরআনে,فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللهِ وَرَسُولِهِ، ‘অতঃপর যদি তোমরা তা না কর, তাহ’লে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্তত হয়ে যাও’ (বাকবারাহ ২/২৭৯)।
শুধু ইসলাম নয়, ঐতিহাসিকভাবে প্রতিটি আসমানী গ্রন্থ এবং বহু দার্শনিক মতবাদেও সূদকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বিখ্যাত দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ সেন্ট থমাস আকুইনাস (Saint Thomas Aquinas) বলেছিলেন, ‘সুদ নেওয়া প্রকৃতির নিয়মের পরিপন্থী। কারণ অর্থ নিজে নিজে বৃদ্ধি পায় না’। এক্ষেত্রে বাইবেলের একটি উক্তি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য, ‘যাদের কাছ থেকে ফেরত পাওয়ার আশা করো, তাদের ঋণ দিলে তোমাদের কী কৃতিত্ব’? (লুক/Luke ৬:৩৪-৩৫)। এমনকি ইহুদী ধর্মেও (তাওরাতের বিধান অনুযায়ী) নিজেদের স্বজাতির মধ্যে সূদ দেওয়া-নেওয়াকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে চরম আক্ষেপের বিষয় হ’ল বর্তমানে যে চরম বৈষম্যমূলক ও সূদভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গোটা মানবজাতিকে শোষণ করে চলেছে তার অন্যতম প্রধান রূপকার ও নিয়ন্ত্রক মূলত ইহুদী পুঁজিপতিরা।
৩. যাকাত, ছাদাকবা ও ইনফাক : ইসলাম সম্পদকে কেবল ব্যক্তিগত মালিকানা বা ভোগের বস্ত্ত হিসাবে দেখে না বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি পবিত্র আমানত। এই আমানতের যথাযথ ব্যবহার করাই মানুষের দায়িত্ব। ইসলামী অর্থনীতিতে যাকাত কেবল ঐচ্ছিক কোন দাতব্য প্রথা (Charity) বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মতো কোন সাধারণ কর (Tax) নয়; এটি একটি অবশ্য পালনীয় ইবাদত এবং সম্পদের পবিত্রতা নিশ্চিত করা ধনীদের জন্য বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। মূলত পুঁজিবাদী সূদ-এর শোষক চরিত্রের ঠিক বিপরীত দর্শন বা বিকল্প মডেল (Alternative Thesis) হিসাবেই ইসলাম যাকাতভিত্তিক এই কল্যাণমুখী বন্দোবস্তের প্রবর্তন করেছে। ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট অংশ দরিদ্রদের অধিকার হিসাবে প্রদান করে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার এক যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা হ’ল যাকাত।
সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষদের অধিকার নিশ্চিত করতে মহান আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেন,وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ، ‘তাদের (ধনীদের) সম্পদে রয়েছে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতের অধিকার’ (যারিয়াত ৫১/১৯)। এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যাকাত দ্বারা দরিদ্রদের প্রতি কোন করুণা নয় বরং এটি গরিবের ন্যায্য পাওনা, যা বুঝিয়ে দেওয়া ধনীদের নৈতিক ও দ্বীনি দায়িত্ব।
যাকাতের পাশাপাশি ছাদাক্বাহ এবং আল্লাহর পথে ব্যয় (ইনফাক) মানুষের আত্মাকে কৃপণতার ব্যাধি থেকে পরিশুদ্ধ করে এবং সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করে। আধুনিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে যাকাত ও ছাদাক্বাহ সমাজে অর্থের প্রবাহ (Velocity of Money) বহুগুণে বৃদ্ধি করে। অর্থ যখন ধনীদের কুক্ষিগত না থেকে সমাজের নিম্নস্তরে প্রবাহিত হয় তখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, সামগ্রিক চাহিদা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (Economic Growth) সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসাবে কাজ করে।
সম্পদের এই নিরাপদ প্রবাহের বদৌলতেই খোলাফায়ে রাশেদা এবং ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ.)-এর শাসনামলে আরব ভূখন্ডে এমন এক বিস্ময়কর অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটেছিল যে, সেসময় যাকাতের অর্থ নেওয়ার মতো অভাবী মানুষও খুঁজে পাওয়া যেত না। অথচ মাত্র কয়েক দশক আগেও সেই একই অঞ্চল ছিল চরম দারিদ্র¨ ও অনাহারে পীড়িত।
৪. সম্পদের সুষম বণ্টন : সম্পদের সুষম ও ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম একটি মৌলিক নির্দেশনা। যে সমাজে দরিদ্র, ইয়াতীম, মিসকীন ও মযলূমের অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত হয় না সেখানে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটলেও প্রকৃত অর্থে কোন টেকসই ও মানবিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোকেও কেবল ক্রয়ক্ষমতার মানদন্ডে বিচার করা হয়। এই সিস্টেমে কেবল সেই ইয়াতীমই মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পায়, যার পিতা অঢেল সম্পদ রেখে গেছেন। কেবল সেই রোগীই উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পায় যার বিপুল অর্থ রয়েছে। অর্থাৎ যার পকেটে টাকা আছে কেবল সে-ই ভোক্তা হিসাবে তার চাহিদা পূরণ করতে পারে। আর যার সামর্থ্য নেই সে নিষ্ঠুর বাজার ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বাইরে ছিটকে পড়ে। পুঁজিবাদের এই নির্মম কাঠামোতে সবার চূড়ান্ত লক্ষ্য (Ultimate Goal) একটাই ‘প্রফিট অ্যান্ড প্রফিট’ বা শুধুই অন্ধ মুনাফা অর্জন।
পক্ষান্তরে ইসলাম এমন এক মানবিক অর্থনীতির রূপরেখা দেয় যেখানে মুনাফার চেয়ে ইনছাফকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দেন, إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন ও অশ্লীলতা, অন্যায় ও অবাধ্যতা হ’তে নিষেধ করেন’ (নাহল ১৬/৯০)। এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা একটি শক্তিশালী ও কল্যাণকামী অর্থনৈতিক বুনিয়াদের তিনটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন- আদল (ন্যায়বিচার বা ইনছাফ), ইহসান (কল্যাণকামিতা বা ছাড় দেওয়া) এবং নিকটাত্মীয়ের হক আদায়। ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না যে সম্পদ কেবল সমাজের গুটি কয়েক ধনকুবের বা এলিট শ্রেণীর সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকুক। সমাজে সম্পদের চক্রাকার ও সুষম প্রবাহ নিশ্চিত করার চূড়ান্ত দর্শন বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন, كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ ‘যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়’ (হাশর ৫৯/৭)। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই ইসলামী অর্থনীতিতে যাকাত, মীরাছ (উত্তরাধিকার আইন), ওয়াকফ এবং ছাদাক্বাহর মতো অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। যা সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্যের পাহাড় ভেঙে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলে।
৫. সততা, স্বচ্ছতা ও চুক্তির গুরুত্ব : ইসলামে অর্থনৈতিক লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং লিখিত দলীলের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যবসা, চাকরি বা যেকোন মাধ্যমে উপার্জনের ক্ষেত্রে মুমিনের প্রধান দায়িত্ব হ’ল সততা বজায় রাখা। ওযনে কারচুপির বিরুদ্ধে সতর্ক করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ ‘দুর্ভোগ মাপে কম দানকারীদের জন্য’ (মুতাফফিফীন ৮৩/১)। প্রতারণা বা অসততা কেবল সামাজিক অপরাধ। এটি সরাসরি আল্লাহর কাছে পরকালীন জবাবদিহিতার বিষয়। আধুনিক অর্থনীতিতে যাকে 'Information Asymmetry' বা তথ্যের অসমতা বলা হয়, ইসলাম তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। লেনদেনে কোন প্রকার অস্পষ্টতা, গোপনীয় প্রতারণা বা তথ্য লুকানো সম্পূর্ণ অবৈধ। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘ক্রেতা-বিক্রেতা যতক্ষণ বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়, ততক্ষণ তাদের চুক্তি ভঙ্গ করার স্বাধীনতা থাকবে। যদি তারা উভয়েই সততা অবলম্বন করে ও পণ্যের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে, তাহ’লে তাদের পারস্পরিক এ ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। আর যদি তারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং পণ্যের দোষ গোপন করে তাহ’লে তাদের এ ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত উঠিয়ে নেয়া হবে’।[4] বোঝা যাচ্ছে, স্বচ্ছতা শুধু ভালো গুণ নয়, এটি রিযিকে বরকত লাভের অন্যতম শর্ত। তাই পণ্যের ত্রুটি গোপন করা বা চটকদার প্রচারণা ইসলামী অর্থনীতির পরিপন্থী।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম প্রতিটি চুক্তিকে অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে বিবেচনা করে। আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দেন, وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا، ‘আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’ (বনু ইসরাঈল ১৭/৩৪)। ভবিষ্যতের বিরোধ এড়াতে কুরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা যখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ লেনদেন করবে, তা লিখে রাখো’ (বাক্বারাহ ২/২৮২)। চুক্তি শুধু দুনিয়াবী সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আখেরাতেও এর হিসাব দিতে হবে। এমনকি রাসূল (ছাঃ) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে মুনাফিকীর লক্ষণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
সততা, স্বচ্ছতা ও চুক্তি-এই তিনটি গুণ একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সহজ সমীকরণে বলা যায় সততা পারস্পরিক আস্থা সৃষ্টি করে, স্বচ্ছতা লেনদেনে বরকত আনে এবং চুক্তি পালন সমাজে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমান বিশ্বে যেখানে প্রতারণা ও ভঙ্গুর বিশ্বাস অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করছে, সেখানে এই নীতিগুলো এক টেকসই সমাধান।
৬. অপচয় ও কৃপণতার নিষেধাজ্ঞা : ইসলামী অর্থনীতিতে সম্পদকে মহান আল্লাহ প্রদত্ত পবিত্র ‘আমানত’ হিসাবে গণ্য করা হয়। এই আমানতের সঠিক ব্যবহারের জন্য একজন ইসলামী ভোক্তার প্রধান দায়িত্ব হ’ল নিজের ও পরিবারের বৈধ প্রয়োজন মেটানো, সমাজের অধিকার আদায় করা এবং আল্লাহর নির্দের্শিত পথে ব্যয় করা। তবে এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাকে একটি সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য বা মধ্যমপন্থা বজায় রাখতে হবে।
অপচয় হ’ল সম্পদের অপব্যবহার। এর ফলে ব্যক্তির নিজের যেমন ক্ষতি হয় তেমনি সমাজে সম্পদের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, দারিদ্র¨ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে। এ কারণেই অপচয়কারীদের কঠোর ভৎর্সনা করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ، ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’ (বনু ইসরাঈল ১৭/২৭)। অন্যদিকে কৃপণতা হ’ল আল্লাহর দেওয়া আমানতের একপ্রকার খিয়ানত। কৃপণতা মানুষের হৃদয়কে সংকীর্ণ করে এবং সামাজিক সহমর্মিতাকে ধ্বংস করে দেয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কৃপণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হ’ল এটি বাজারে অর্থের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে অর্থনীতিতে স্থবিরতা নিয়ে আসে। কৃপণদের সতর্ক করে মহান আল্লাহ বলেন,وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ، ‘আল্লাহ যাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ থেকে কিছু দান করেছেন, তাতে যারা কার্পণ্য করে, তারা যেন এটাকে তাদের জন্য কল্যাণকর মনে না করে। বরং এটা তাদের জন্য ক্ষতিকর’ (আলে-ইমরান ৩/১৮০)।
এই দুই প্রান্তিকতার (অপচয় ও কৃপণতা) মাঝে ইসলাম এক টেকসই ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রূপরেখা দিয়েছে। আর তা হ’ল ‘মধ্যমপন্থা’। চরম ভোগবাদ এবং কৃপণতার বিপরীতে একজন প্রকৃত মুমিনের ব্যয়নীতির পরিচয় তুলে ধরে মহান আল্লাহ বলেন,وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يَقْتُرُوْا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا- ‘আর যখন তারা ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করেনা বা কৃপণতা করেনা। বরং এ দু’য়ের মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করে’ (ফুরকবান ২৫/৬৭)। মূলত, এই ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যমপন্থাই হ’ল ব্যক্তি ও সমাজের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর এবং একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
৭. ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি : প্রবাদ আছে, 'Money is brighter than sunshine and sweeter than honey' ‘অর্থ সূর্যের আলোর চেয়েও উজ্জ্বল এবং মধুর চেয়েও সুমিষ্ট’। অর্থের এই সুমিষ্ট স্বাদ গ্রহণ করতে গিয়ে অনেকেই আজ নৈতিকতার গন্ডি পেরিয়ে ঘুষ, দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনৈতিক কোন কর্মকান্ড কখনোই বৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রম হিসাবে বিবেচিত হ’তে পারে না। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি- এই তিনটিই অত্যন্ত গুরুতর এবং সমাজ বিধ্বংসী অপরাধ। ঘুষ সম্পূর্ণ হারাম এবং অভিশপ্ত কাজ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঘুষদাতা, ঘুষ গ্রহীতা ও ঘুষের দালাল সকলের উপর লা‘নত করেছেন’।[5] দুর্নীতি হ’ল আমানতের চরম খিয়ানত। দুর্নীতির মূল উৎপাটনে দায়িত্বশীলতার চূড়ান্ত গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাসূল (ছা.) ইরশাদ করেন, ‘সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের (দায়িত্ব) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’।[6] অপরদিকে চাঁদাবাজি এমন এক ভয়ংকর যুলুম, যার মাধ্যমে সরাসরি বান্দার হক নষ্ট করা হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,اتَّقُوْا الظُّلْمَ، فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‘কারো উপর অত্যাচার করা থেকে বিরত থাকো। কারণ এ অত্যাচার কিবয়ামতের দিন ঘোর অন্ধকার রূপেই দেখা দিবে’।[7] আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে চাঁদাবাজিকে যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক অশুভ চেষ্টা চলছে। এ যেন নতুন বোতলে পুরোনো মদেরই নির্যাস! দেশে শরী‘আ আইন বলবৎ থাকলে নিঃসন্দেহে বহু চাঁদাবাজ এবং দুর্নীতির বরপুত্রদের হাত কাটা যেতো। সেই নিরিখে শরী‘আ আইনের বিরোধিতা করার কথা ছিল চোর, ডাকাত, ধর্ষক এবং দুর্নীতিবাজদের। কিন্তু বাস্তবে তার বিরোধিতা করছে দেশীয় এলিট শ্রেণী। মূলত এখানকার সরল সমীকরণটি হ’ল- নিজেদের অপরাধের দীর্ঘ ফিরিস্তি ঢেকে রাখতেই কেবল শরী‘আহ আইন ব্যতিরেকে তারা ব্রিটিশ কমন আইনের প্রতি নিঃসঙ্কোচ অবনমন প্রদর্শন করে। কেননা পূজিবাদপীড়িত থার্ড ওয়াল্ডের দেশগুলোর একটা বড় সমস্যা হ’ল এখানে অর্থনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হয় এবং রাজনৈতিক সমস্যার অর্থনৈতিক সমাধান খোঁজা হয়। ফলত মাকড়সার জাল সদৃশ আইনী ফাঁকফোকরে ছোট ছোট কীট-পতঙ্গ আটকাতে পারলেও রাঘব বোয়ালরা ঠিকই পার পেয়ে যায়। সেজন্যে সার্বিক জীবনে আল্লাহর দাসত্ব মেনে না নিলে অপরাধের দুষ্ট চক্র থেকে বের হওয়া কখনোই সম্ভব না।
উপসংহার : ইসলাম মহান আল্লাহর দেওয়া এক সুশৃঙ্খল ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। যা অনুসরণ করলে মানবজাতি প্রকৃত কল্যাণ লাভ করে। সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম এমন এক অর্থব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল যা ক্রীতদাস থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু-সবার জন্য সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করেছিল। ইসলামী অর্থনীতি একটি নৈতিক ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা। যেখানে উপার্জন, ব্যয় ও লেনদেন-সবকিছুই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।
আমাদের বর্তমান সংকট হ’ল আমরা মুখে কালিমার স্বীকৃতি দিলেও কর্মজীবনে এর বাস্তব প্রয়োগ থেকে দূরে সরে গেছি। অথচ ইসলামে দ্বীন ও দুনিয়া অভিন্ন এবং দুনিয়া হ’ল আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। অল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা প্রতিটি হালাল কাজই ইবাদত। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী মুমিনরা ছালাত শেষে অল্লাহর দেওয়া রিযিক তালাশে যমীনে ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং আমাদের অর্থনৈতিক জীবনও হ’তে হবে পূর্ণাঙ্গরূপে আল্লাহর দাসত্বপূর্ণ। পরিশেষে আমাদের এই দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করতে হবে- আসমানে যিনি আমাদের রব, যমীনের সকল বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেও তিনিই আমাদের একমাত্র রব।
আব্দুল্লাহ আল-মুছাদ্দিক
বিএসএস (সম্মান), এমএস, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
[1]. প্রথম আলো, ১৭ই জানুয়ারী ২০২৩।
[2]. তিরমিযী হা/১২০৯, মিশকাত হা/২৭৯৬; ছহীহুত তারগীব হা/১৭৮২।
[3]. বায়হাক্বী-শু‘আব, মিশকাত হা/২৭৮৭; ছহীহাহ হা/২৬০৯।
[4]. বুখারী হা/২০৭৯; মুসলিম হা/১৫৩২।
[5]. আহমাদ, তিরমিযী, বায়হাক্বী মিশকাত হা/৩৭৫৩-৫৫, সনদ ছহীহ ।
[6]. বুখারী হা/৮৯৩।
[7]. মুসলিম হা/২৫৭৮।