তাক্বওয়ার গুরুত্ব ও ফযীলত (পূর্বে প্রকাশিতের পর)

(৩৩) তাক্বওয়াশীলদের জন্য ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য: মহান আল্লাহ বলেন,بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ، ‘হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর ও আল্লাহভীরু হও এবং প্রতিপক্ষ তোমাদের উপর হঠাৎ আপতিত হয়, তাহ’লে তোমাদের পালনকর্তা পাঁচ হাযার চিহ্নিত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন’ (আলে ইমরান ৩/১২৫)

(৩৪) তাক্বওয়া ক্ষমা লাভের মাধ্যম : আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা লাভের অনেক আমল রয়েছে, তার মধ্যে তাক্বওয়া অন্যতম। মহান আল্লাহ বলেন,وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا، ‘বস্ত্ততঃ যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার পাপসমূহ মোচন করেন ও তাকে মহা পুরস্কারে ভূষিত করেন’ (তালাক ৬৫/৫)। আবূ সাঈদ (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, ‘তোমাদের পূর্ব যুগের এক ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তা‘আলা প্রচুর ধন-সম্পদ দান করেছিলেন। যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলো তখন সে তার ছেলেদেরকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করল, আমি তোমাদের কেমন পিতা ছিলাম? তারা বলল, আপনি আমাদের উত্তম পিতা ছিলেন। সে বলল, আমি জীবনে কখনও কোন নেক আমল করতে পারিনি। আমি যখন মারা যাব তখন তোমরা আমার লাশকে আগুনে জ্বালিয়ে ছাই করে দিও এবং প্রচন্ড ঝড়ের দিন ঐ ছাই বাতাসে উড়িয়ে দিও। সে মারা গেল। ছেলেরা অছিয়ত অনুযায়ী কাজ করল। আল্লাহ তা‘আলা তার ছাইগুলো জড়ো করে জিজ্ঞেস করলেন, এমন অছিয়ত করতে কে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করল? সে বলল, مَخَافَتُكَ فَتَلَقَّاهُ بِرَحْمَتِهِ ‘হে আল্লাহ! তোমার শাস্তির ভয়ে। ফলে আল্লাহর রহমত তাকে ঢেকে নিল’।[1]

(৩৫) তাক্বওয়া সফলতা লাভের মাধ্যম : মহান আল্লাহ বলেন, وَاتَّقُوا اللهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ‘আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হ’তে পার’ (বাক্বারাহ ২/১৮৯)। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ، ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ধৈর্যধারণ কর ও ধৈর্যের প্রতিযোগিতা কর এবং সদা প্রস্ত্তত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হ’তে পার’ (আলে ইমরান ৩/২০০)। আল্লাহ আরো বলেন, ‘অতএব হে জ্ঞানীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হ’তে পার’ (মায়েদাহ ৫/১০০)

(৩৬) তাক্বওয়াশীলকে ক্বিয়ামতের দিন ছায়া দেওয়া হবে : আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন, যেদিন আল্লাহর ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের (অথবা আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। তাদের একজন হ’ল- وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللهَ، ‘সে ব্যক্তি, যাকে কোন উচ্চ বংশীয় রূপসী নারী আহবান জানায়, কিন্তু সে এই বলে প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’।[2]

(৩৭) মুত্তাক্বীরা ক্বিয়ামতের দিন উন্নত মর্যাদা লাভ করবে : ক্বিয়ামতের দিন উন্নত মর্যাদা লাভের অন্যতম মাধ্যম হ’ল তাক্বওয়া। আল্লাহ বলেন,زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَيَسْخَرُونَ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ اتَّقَوْا فَوْقَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَاللهُ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ، ‘অবিশবাসীদের জন্য পার্থিব জীবনকে শোভনীয় করা হয়েছে। তারা বিশ্বাসীদের উপহাস করে। অথচ ক্বিয়ামতের দিন মুত্তাক্বীরা অবিশ্বাসীদের উপরে থাকবে। বস্ত্ততঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে অপরিমিত রূযী দান করে থাকেন’ (বাক্বারাহ ২/২১২)

(৩৮) জান্নাতকে তাক্বওয়াশীলদের নিকটবর্তী করা হবে : ক্বিয়ামতের ময়দানে জান্নাতকে আল্লাহ মুত্তাক্বীদের নিকটে নিয়ে আসবেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ ‘সেদিন জান্নাতকে আল্লাহভীরুদের নিকটবর্তী করা হবে’ (শো‘আরা ২৬/৯০)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ غَيْرَ بَعِيدٍ ‘আর জান্নাতকে মুত্তাক্বীদের নিকটবর্তী করা হবে, দূরবর্তী নয়’ (ক্বা-ফ ৫০/৩১)

(৩৯) মুত্তাক্বীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে : মুত্তাক্বীদেরকে আল্লাহ দুশ্চিন্তা, অশান্তি, ভয়ভীতি সবকিছু থেকে নিরাপত্তা দান করবেন। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুরা থাকবে নিরাপদ স্থানে’ (দুখান ৪৪/৫১)। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুত্তাক্বীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে। বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণা সমূহের মধ্যে। তারা সেখানে পরিধান করবে মিহি ও মোটা রেশমের কাপড় সমূহ এবং বসবে মুখোমুখি হয়ে। এটাই হবে সেদিনের বাস্তবতা। আর আমরা তাদেরকে জোড়া বানিয়ে দেব আনতনয়না হূরদের সাথে। সেখানে তারা প্রশান্তচিত্তে বিভিন্ন ফলমূল আনতে বলবে। তারা সেখানে আর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে না, (দুনিয়ার) প্রথম মৃত্যু ব্যতীত। আর আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করবেন জাহান্নামের শাস্তি হ’তে। তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্বরূপ। সেটাই হবে মহা সফলতা’ (দুখান ৪৪/৫১-৫৭)

(৪০) তাক্বওয়াশীলরা চিরকাল পরস্পর বন্ধু থাকবে : মহান আল্লাহ বলেন, الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ ‘বন্ধুরা সেদিন পরস্পরে শত্রু হবে মুত্তাক্বীরা ব্যতীত’ (যুখরুফ ৪৩/৬৭)। জান্নাতেও তারা থাকবে পরস্পর বন্ধু হিসাবে। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ، ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ آمِنِينَ، وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ، ‘নিশ্চয়ই মুত্তাক্বীরা থাকবে জান্নাতে ও ঝর্ণাসমূহের মধ্যে। (বলা হবে) তোমরা এর মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে প্রবেশ কর। (দুনিয়াতে) তাদের পরস্পরের অন্তরে যে বিদ্বেষ ছিল তা আমরা দূর করে দেব। ফলে তারা ভাই ভাই হয়ে পরস্পরে মুখোমুখি আসনে বসবে’ (হিজর ১৫/৪৫-৪৭)

(৪১) মুত্তাক্বীরা আল্লাহর মেহমান : দুনিয়ায় যেমন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকে সম্মান দেওয়া হয়, তেমিন পরকালে মুত্তাক্বীদেরকে সম্মানের সাথে আল্লাহর মেহমান হিসাবে একত্রিত করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন, يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفْدًا ‘সেদিন আমরা আল্লাহভীরুদেরকে দয়াময়ের নিকটে মেহমান রূপে সমবেত করব’ (মারিয়াম ১৯/৮৫)

(৪২) তাক্বওয়াশীলরা যথাযোগ্য আসনে থাকবে : আল্লাহ বলেন,إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَنَهَرٍ، فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيكٍ مُقْتَدِرٍ، ‘নিশ্চয়ই মুত্তাক্বীরা থাকবে জান্নাতে ও নদী সমূহের মাঝে, যথাযোগ্য আসনে সকল ক্ষমতার অধিকারী সর্বোচ্চ মালিকের সান্নিধ্যে’ (ক্বামার ৫৪/৫৪-৫৫)

(৪৩) তাক্বওয়া ক্বিয়ামতের আযাব থেকে মুক্তি দিবে : মহান আল্লাহ বলেন,وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ تَرَى الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى اللهِ وُجُوهُهُمْ مُسْوَدَّةٌ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْمُتَكَبِّرِينَ، وَيُنَجِّي اللهُ الَّذِينَ اتَّقَوْا بِمَفَازَتِهِمْ لَا يَمَسُّهُمُ السُّوءُ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ، ‘আর যারা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে, ক্বিয়ামতের দিন তুমি তাদের চেহারা কালিমালিপ্ত দেখবে। বস্ত্ততঃ দাম্ভিকদের ঠিকানা কি জাহান্নামে নয়? আর যারা আল্লাহভীরু তাদেরকে আল্লাহ নাজাত দিবেন তাদের সাফল্যগাথা সহ। কোন মন্দই তাদের স্পর্শ করবে না এবং তারা চিন্তান্বিত হবে না’ (যুমার ৩৯/৬০-৬১)

(৪৪) তাক্বওয়াশীলরা পুলছিরাত সহজে পার হয়ে যাবে : পুলছিরাত হবে অন্ধকার। প্রত্যেকে তাদের ঈমান অনুযায়ী আলো পাবে (হাদীদ ৫৭/১২)। আর সমস্ত মানুষকে পুলছিরাত অতিক্রম করেই জান্নাতে যেতে হবে। যা জাহান্নামের উপর স্থাপন করা হবে এবং প্রত্যেকে তাদের আমল অনুপাতে অতিক্রম করবে।[3] মুত্তাক্বীরা সহজেই সেটা পার হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন,وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا، ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا، ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে সেখানে (পুলছিরাত) পৌঁছাবে না। এটা তোমার পালনকর্তার অমোঘ সিদ্ধান্ত। অতঃপর আমরা আল্লাহভীরুদের মুক্তি দিব এবং সীমালংঘনকারীদের নতজানু অবস্থায় তার মধ্যে ছেড়ে দিব’ (মারিয়াম ১৯/৭১-৭২)

(৪৫) মুত্তাক্বীদের জন্য রয়েছে ভীতিহীন জীবন : মহান আল্লাহ বলেন,فَمَنِ اتَّقَى وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ‘যারা আল্লাহভীরু হয় ও নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তাম্বিতও হবে না’ (আ‘রাফ ৭/৩৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘মনে রেখ (আখেরাতে) আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তাম্বিত হবে না। যারা ঈমান আনে ও সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে’ (ইউনুস ১০/৬২-৬৩)। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মাঝে এমন কিছু লোক আছে যারা নবী নন এবং শহীদও নয়। ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর দরবারে তাদের মর্যাদার কারণে নবীগণ ও শহীদগণ তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হবেন। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমাদের অবহিত করুন, তারা কারা? তিনি বলেন, তারা ঐসব লোক যারা আল্লাহর মহানুভবতায় পরস্পরকে ভালোবাসে অথচ তারা পরস্পর আত্মীয়ও নয় এবং পরস্পরকে সম্পদও দেয়নি। আল্লাহর শপথ! তাদের মুখমন্ডল যেমন নূর এবং তারা নূরের আসনে উপবেশন করবে। তারা ভীত হবে না, যখন মানুষ ভীত থাকবে। তারা দুশ্চিন্তায় পড়বে না, যখন মানুষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকবে। তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন, ‘মনে রেখ (আখেরাতে) আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তাম্বিত হবে না’ (ইউনুস ১০/৬২)[4]

(৪৬) তাক্বওয়া পরিত্রাণ দানকারী: জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে তাক্বওয়া। আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

وثلاثٌ مُنجياتٌ : خشيةُ اللهِ في السِّرِّ والعلانيةِ، والقصْدُ في الفقرِ والغنى، والعدلُ في الغضبِ والرِّضا

‘পরিত্রাণ দানকারী তিনটি বিষয় হচ্ছে গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করা, সচ্ছলতা ও দারিদ্রের মধ্যে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং সন্তোষ ও অসন্তোষে ন্যায়বিচার করা’।[5]

পরকালে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা হবে সর্বাধিক মুত্তাক্বী ব্যক্তিকে। আল্লাহ বলেন,وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى، الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى، وَمَا لِأَحَدٍ عِنْدَهُ مِنْ نِعْمَةٍ تُجْزَى، إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَى، وَلَسَوْفَ يَرْضَى- ‘নিশ্চয়ই এ থেকে দূরে রাখা হবে আল্লাহভীরু ব্যক্তিকে, যে তার ধন-সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য এবং কারু জন্য তার নিকটে কোন অনুগ্রহ থাকে না যা প্রতিদান যোগ্য। কেবলমাত্র তার মহান প্রতিপালকের চেহারা অন্বেষণ ব্যতীত। আর অবশ্যই সে অচিরেই সন্তোষ লাভ করবে’ (লায়েল ৯২/১৭-২১)

(৪৭) তাক্বওয়াশীলরা দলে দলে জান্নাতে প্রবেশ করবে : মহান আল্লাহ বলেন, وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِينَ- ‘আর যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করত, তাদেরকে দলে দলে নিয়ে যাওয়া হবে জান্নাতের দিকে। অবশেষে যখন তারা সেখানে উপস্থিত হবে ও তার দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হবে। জান্নাতের দার রক্ষীরা তখন বলবে, তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হৌক, তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ কর চিরকাল বসবাসের জন্য’ (যুমার ৩৯/৭৩)

আবূ উমামা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বিদায় হজ্জের ভাষণে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,اتَّقُوا اللهَ رَبَّكُمْ وَصَلُّوا خَمْسَكُمْ وَصُومُوا شَهْرَكُمْ وَأَدُّوا زَكَاةَ أَمْوَالِكُمْ وَأَطِيعُوا ذَا أَمْرِكُمْ تَدْخُلُوا جَنَّةَ رَبِّكُمْ‏ ‘তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় কর, রামাযান মাসের ছিয়াম পালন কর, তোমাদের ধন-সম্পদের যাকাত আদায় কর, তোমাদের আমীরের অনুসরণ কর, তোমাদের রবের জান্নাতে প্রবেশ কর।[6]

(৪৮) তাক্বওয়াশীলদের জন্য রয়েছে উত্তম আবাস : মহান আল্লাহ বলেন, وَإِنَّ لِلْمُتَّقِينَ لَحُسْنَ مَآبٍ ‘আর নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুদের জন্য রয়েছে সুন্দর আবাসস্থল’ (ছোয়াদ ৩৮/৪৯)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘পক্ষান্তরে যারা আল্লাহভীরু ছিল তাদের যখন বলা হ’ত, তোমাদের প্রতিপালক কি নাযিল করেছেন? তারা বলত, উত্তম বস্ত্ত। বাস্তবিকই যারা সৎকর্ম করে, তাদের জন্য ইহকালে রয়েছে কল্যাণ এবং তাদের পরকালের গৃহ অবশ্যই উৎকৃষ্ট। আর আল্লাহভীরুদের আবাসস্থল কতই না উত্তম!’ (নাহল ১৬/৩০)। আল্লাহ বলেন,وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى ‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর সম্মুখে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় করে এবং নিজেকে প্রবৃত্তির গোলামী হ’তে বিরত রাখে’ হবে জান্নাত তার ঠিকানা’ (নাযে‘আত ৭৯/৪০-৪১)

(৪৯) তাক্বওয়াশীলদের জন্য শুভ পরিণাম : মহান আল্লাহ বলেন, تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ‘আখেরাতের এই গৃহ আমরা প্রস্ত্তত করে রেখেছি ঐসব মুমিনের জন্য, যারা দুনিয়াতে ঔদ্ধত্য ও অশান্তি কামনা করে না। বস্ত্ততঃ শুভ পরিণাম কেবল আল্লাহভীরুদের জন্য’ (ক্বাছাছ ২৮/৮৩)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এর উত্তরাধিকারী করেন। আর শুভ পরিণাম কেবল আল্লাহভীরুদের জন্যই’ (আ‘রাফ ৭/১২৮)

(৫০) মুত্তাক্বীদের পুরস্কার জান্নাত : মুত্তাক্বীদের পুরস্কার হিসাবে আল্লাহ জান্নাত দান করবেন। যার প্রতিশ্রুতি তিনি তাদেরকে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,قُلْ أَذَلِكَ خَيْرٌ أَمْ جَنَّةُ الْخُلْدِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ كَانَتْ لَهُمْ جَزَاءً وَمَصِيرًا، ‘তুমি বল, ওটাই উত্তম, না চিরস্থায়ী বসবাসের জান্নাত উত্তম, যার ওয়াদা মুত্তাক্বীদের দেওয়া হয়েছে? সেটাই হবে তাদের জন্য প্রতিদান ও ঠিকানা’ (ফুরক্বান ২৫/১৫)। যে সকল আমলের কারণে মানুষ বেশী জান্নাতে যাবে তাক্বওয়া তার অন্যতম। আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রশ্ন করা হ’ল, কোন কর্মটি মানুষকে সবচাইতে বেশী পরিমাণ জান্নাতে নিয়ে যাবে। তিনি বললেন, تَقْو‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏وَسُئِلَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ فَقَالَ ‏الْفَمُ وَالْفَرْجُ،‏ ‘আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র। আবার প্রশ্ন করা হ’ল, কোন কাজটি সবচাইতে বেশী পরিমাণ মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। তিনি বললেন, মুখ ও লজ্জাস্থান’।[7] মহান আল্লাহ বলেন,تِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي نُورِثُ مِنْ عِبَادِنَا مَنْ كَانَ تَقِيًّا، ‘এটা সেই জান্নাত, যার অধিকারী করব আমরা আমাদের বান্দাদের মধ্যে যারা আল্লাহভীরু হবে তাদেরকে’ (মারিয়াম ১৯/৬৩)

(৫১) তাক্বওয়াশীলদের জন্য স্তর বিশিষ্ট সুউচ্চ প্রাসাদ: মহান আল্লাহ বলেন,لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِنْ فَوْقِهَا غُرَفٌ مَبْنِيَّةٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَعْدَ اللهِ لَا يُخْلِفُ اللهُ الْمِيعَادَ ‘কিন্তু যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে স্তরের উপর স্তর বিশিষ্ট সুউচ্চ প্রাসাদ। যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। এটাই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। আর আল্লাহ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না’ (যুমার ৩৯/২০)। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘অবশ্যই জান্নাতবাসীরা তাদের উপরের বালাখানার বাসিন্দাদের এমনভাবে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আকাশের পূর্ব অথবা পশ্চিম দিকে উজ্জ্বল দীপ্তিমান নক্ষত্র দেখতে পাও। এটা হবে তাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্যের কারণে। ছাহাবীগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এতো নবীগণের জায়গা। তাদের ব্যতীত অন্যরা সেখানে পেŠঁছতে পারবে না। তিনি বললেন, হ্যাঁ, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! যেসব লোক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং রাসূলগণকে সত্য বলে স্বীকার করবে।[8]

(৫২) তাক্বওয়াশীলদের আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ : তাক্বওয়াশীল বান্দাকে আল্লাহ জান্নাত দেওয়ার পাশাপশি আরেকটি নে‘মত দান করবেন, সেটা হ’ল তাঁর সন্তুষ্টি। আল্লাহ বলেন,لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللهِ وَاللهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ ‘(আর তাহ’ল) যারা আল্লাহভীরুতা অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার নিকট রয়েছে জান্নাত। যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল এবং থাকবে পবিত্রা স্ত্রীগণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি সার্বক্ষণিক দ্রষ্টা’ (আলে ইমরান ৩/১৫)। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ জান্নাতীদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন,

হে জান্নাতীগণ! তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! হাযির, আমরা আপনার খেদমতে হাযির। এরপর আল্লাহ

বলবেন, তোমরা কি খুশি হয়েছ? তারা বলবে, কেন খুশি হব না, আপনি আমাদেরকে এমন বস্ত্ত দান করেছেন যা আপনার সৃষ্টি জগতের আর কাউকেই দেননি। তখন তিনি বলবেন, আমি এর চেয়েও উত্তম বস্ত্ত তোমাদেরকে দান করব। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! এর চেয়েও উত্তম সে কোন বস্ত্ত? আল্লাহ্ বলবেন, তোমাদের ওপর আমি আমার সন্তুষ্টি অবধারিত করব। অতঃপর আমি আর কখনো তোমাদের ওপর নাখোশ হব না’।[9]

(৫৩) তাক্বওয়াশীলদের জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার : আল্লাহ দুনিয়াতে যেমন তাক্বওয়াশীলকে দ্বিগুণ পুরস্কার দিবেন (হাদীদ ৫৭/২৮) তেমনি আখেরাতেও দ্বিগুণ পুরস্কার দিবেন। মহান আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِنْ رَحْمَتِهِ، ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি স্বীয় অনুগ্রহে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দিবেন’ (হাদীদ ৫৭/২৮)। আর তাক্বওয়াশীল ব্যক্তিকেও পরকালেও দ্বিগুণ পুরস্কার তথা দু’টি জান্নাত দিবেন (রহমান ৫৫/৪৬)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘দু’টি জান্নাতের একটির সকল তৈজসপত্র ও সেখানে যা কিছু আছে সবই হবে রৌপ্য নির্মিত এবং অপরটির হবে স্বর্ণ নির্মিত’।[10]

পরিশেষে বলব, আল্লাহ আমাদেরকে প্রকৃত তাক্বওয়াশীল হয়ে দুনিয়াতে আল্লাহর বিধান যথাযথ পালন করতঃ পরকালে জান্নাতবাসী হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

তুলাগাঁও নোয়াপাড়া, দেবিদ্বার, কুমিল্লা।


[1]. বুখারী হা/৩৪৭৮।

[2]. বুখারী হা/৬৬০; মুসলিম হা/১০৩১।

[3]. বুখারী হা/৬০১৩, তিরমিযী, মিশকাত হা/৫৩৬৬।

[4]. আবু দাউদ হা/৩৫২৭।

[5]. ছহীহুল জামে’ হা/৩০৩৯; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৮০২।

[6]. তিরমিযী হা/৬১৬; সিলসিলা ছহীহা হা/৮৬৭।

[7]. তিরমিযী হা/২০০৪; ইবনে মাজাহ হা/৪২৪৬; ছহীত তারগীব হা/২৬৪২।

[8]. বুখারী হা/৩২৫৬; মুসলিম হা/২৮৩১।

[9]. বুখারী হা/৬৫৪৯; মুসলিম হা/২৮২৯।

[10]. তিরমিযী হা/২৫২৮; ইবনু মাজাহ হা/১৮৬।






বিষয়সমূহ: আমল
আল্লামা আলবানী সম্পর্কে শায়খ শু‘আইব আরনাঊত্বের সমালোচনার জবাব (৪র্থ কিস্তি) - আহমাদুল্লাহ - সৈয়দপুর, নীলফামারী
পেরেনিয়ালিজম এবং ইসলাম - প্রফেসর ড. শহীদ নকীব ভূঁইয়া
ইসলামে একাধিক বিবাহ : বিধান, তাৎপর্য ও শর্তাবলী - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে ভালবাসা - ইহসান ইলাহী যহীর
আহলেহাদীছ একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম (৬ষ্ঠ কিস্তি) - আহমাদুল্লাহ - সৈয়দপুর, নীলফামারী
আল-কুরআনে বিজ্ঞানের নিদর্শন (৪র্থ কিস্তি) - ইঞ্জিনিয়ার আসিফুল ইসলাম চৌধুরী
জামা‘আতে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব, ফযীলত ও হিকমত (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
আল্লামা আলবানী সম্পর্কে শায়খ শু‘আইব আরনাঊত্বের সমালোচনার জবাব (২য় কিস্তি) - আহমাদুল্লাহ - সৈয়দপুর, নীলফামারী
জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছালাত (৯ম কিস্তি) - মুযাফফর বিন মুহসিন
আক্বীদা ও আহকামে হাদীছের প্রামাণ্যতা (৮ম কিস্তি) - মীযানুর রহমান মাদানী
তালাক সংঘটিত হওয়ার কারণ ও প্রতিকারের উপায় (ফেব্রুয়ারী’২২ সংখ্যার পর) - মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম
চিন্তার ইবাদত (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
আরও
আরও
.