
ভূমিকা :
কুরআন মাজীদ আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ আসমানী কিতাব। এটি সত্য-মিথ্যার পার্থক্যনিরূপক মানদন্ড ও হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। মহান আল্লাহ বলেন, تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا ‘মহা পবিত্র তিনি যিনি স্বীয় বান্দার প্রতি ফায়ছালাকারী গ্রন্থ নাযিল করেছেন পর্যায়ক্রমে। যাতে সে জগদ্বাসীর জন্য সতর্ককারী হ’তে পারে’ (ফুরক্বান ২৫/১)। তিনি আরো বলেন, قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ ‘বস্তুত: তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হ’তে এসেছে একটি জ্যোতি ও স্পষ্ট বর্ণনাকারী কিতাব’ (মায়েদাহ ৫/১৫)। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে, الر كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ ‘আলিফ লাম র-। এই কিতাব আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে বের করে আনতে পার অন্ধকার হ’তে আলোর পথে, তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। মহা পরাক্রান্ত ও মহা প্রশংসিত আল্লাহর পথে’ (ইবরাহীম ১৪/১)। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের সকল কিছুই এতে বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ ‘এই কিতাবে কোন কিছুই আমরা বলতে ছাড়িনি’ (আন‘আম ৬/৩৮)। তিনি আরো বলেন, وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ ‘আর আমরা তোমার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি সকল কিছুর বিশদ ব্যাখ্যা, পথনির্দেশ, অনুগ্রহ এবং মুসলমানদের জন্য সুসংবাদ হিসাবে’ (নাহল ১৬/৮৯)। সুতরাং কুরআন মাজীদ আল্লাহ প্রদত্ত এক অনন্য উপহার। যা মুসলিম উম্মাহর গর্বের প্রতীক। মহান আল্লাহ বলেন,وَإِنَّهُ لَذِكْرٌ لَكَ وَلِقَوْمِكَ وَسَوْفَ تُسْأَلُونَ ‘আর এই কুরআন তোমার ও তোমার সম্প্রদায়ের জন্য মর্যাদার প্রতীক এবং তোমরা সত্বর এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে’ (যুখরুখ ৪৩/৪৪)।
ত্বালহা বিন মুছাররিফ (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা (রাঃ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, هَلْ كَانَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم أَوْصَى؟ فَقَالَ لاَ، فَقُلْتُ كَيْفَ كُتِبَ عَلَى النَّاسِ الْوَصِيَّةُ أَوْ أُمِرُوا بِالْوَصِيَّةِ قَالَ أَوْصَى بِكِتَابِ اللهِ. ‘নবী করীম (ছাঃ) কি (বিশেষ কোন বিষয়ে) অছিয়ত করেছিলেন? তিনি বললেন, না। তখন আমি বললাম, তাহলে কিভাবে লোকদের উপর অছিয়ত ফরয করা হল, অথবা অছিয়তের নির্দেশ দেওয়া হল? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে অছিয়ত করেছেন’।[1] হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (৭৭৩-৫৮২ হি.) এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন,وَقَول بن أَبِي أَوْفَى أَوْصَى بِكِتَابِ اللَّهِ أَيْ بِالتَّمَسُّكِ بِهِ وَالْعَمَلِ بِمُقْتَضَاهُ... ‘ইবনু আবী আওফার উক্তি : ‘তিনি আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে অছিয়ত করেছেন’ অর্থাৎ কুরআনকে আঁকড়ে ধরতে এবং তদনুযায়ী আমল করতে রাসূল (ছাঃ) অছিয়ত করেছেন। ... কুরআন সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণে অথবা সরাসরি নছ বা ইসতিম্বাতের মাধ্যমে এতে সকল কিছুর বিশদ ব্যাখ্যা থাকার কারণে সম্ভবত আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) শুধু কিতাবের অছিয়ত করেছেন। কারণ মানুষ যখন কুরআনে যা কিছু রয়েছে তার অনুসরণ করবে তখন রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে যা কিছুর আদেশ করেছেন তার প্রতি আমল করবে। কেননা আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও’ (হাশর ৫৯/৭)।[2]
অন্যদিকে বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ ‘আমি তোমাদের মাঝে ছেড়ে যাচ্ছি দু’টি বস্ত্ত। যতদিন তোমরা এ দু’টি বস্ত্তকে আঁকড়ে থাকবে ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহর কিতাব ও তার নবীর সুন্নাহ’।[3] এক্ষণে প্রশ্ন হল, আমরা কীভাবে কুরআনকে আঁকড়ে ধরব? আর এর ফায়েদাই বা কি হবে? আলোচ্য প্রবন্ধে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
কুরআন মাজীদকে আঁকড়ে ধরার গুরুত্ব :
মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসাবে এ ধূলির ধরণীতে প্রেরণ করেছেন। গোমরাহীর নিকষকালো অন্ধকার থেকে হেদায়েতের প্রোজ্জ্বল আলোয় বিশ্ববাসীকে উদ্ভাসিত করার জন্য আসমানী গাইডবুক হিসাবে তাঁর উপর অবতীর্ণ করেছেন নিঃসন্দেহ কিতাব ‘আল-কুরআন’ (বাক্বারাহ ২/২)। সেই সাথে কুরআন মাজীদকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ প্রদান করে আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেছেন, فَاسْتَمْسِكْ بِالَّذِي أُوحِيَ إِلَيْكَ إِنَّكَ عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ ‘অতএব তুমি দৃঢ়ভাবে ধারণ কর যা তোমার প্রতি অহি করা হয়। নিশ্চয়ই তুমি সরল পথের উপর প্রতিষ্ঠিত’ (যুখরূফ ৪৩/৪৩)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু জারীর ত্বাবারী বলেন, يقول تعالى ذكره لنبيه محمد صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّم: فتمسك يا محمد بما يأمرك به هذا القرآن الذي أوحاه إليك ربك، (إِنَّكَ عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ) ومنهاج سديد، وذلك هو دين الله الذي أمر به، وهو الإسلام ‘আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদকে বলছেন, হে মুহাম্মাদ! এই কুরআন তোমাকে যা নির্দেশ দেয় তুমি তা আঁকড়ে ধরো। যা তোমার প্রভু তোমার প্রতি অহি করেছেন। নিশ্চয়ই তুমি সরল পথের ও সঠিক পন্থার উপর প্রতিষ্ঠিত। দ্বীন ইসলামের অনুসরণের জন্যই তোমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’।[4]
হাফেয ইবনু কাছীর বলেন, أي: خذ بالقرآن المنزل على قلبك، فإنه هو الحق، وما يهدي إليه هو الحق المفضي إلى صراط الله المستقيم، الموصل إلى جنات النعيم، والخير الدائم المقيم. ‘অর্থাৎ তোমার হৃদয়ে অবতারিত কুরআনকে তুমি আঁকড়ে ধরো। কেননা কুরআনই সত্য এবং সরল পথের দিশারী। যা নে‘মতপূর্ণ জান্নাত ও চিরস্থায়ী কল্যাণের দিকে পৌঁছিয়ে দেয়’।[5]
ইমাম রাযী বলেন, بأن تعتقد أنه حق، وبأن تعمل بموجبه، فإنه الصراط المستقيم الذي لا يميل عنه إلا ضال في الدين ‘তুমি কুরআনকে সত্য গ্রন্থ হিসাবে বিশ্বাস করবে এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করবে। কেননা এটিই সরল পথ। দ্বীনের মধ্যে পথভ্রষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কেউ এত্থেকে বিচ্যুত হ’তে পারে না’।[6]
আধুনিক মুফাস্সির জামালুদ্দীন কাসেমী (১৮৬৬-১৯১৪) বলেন, يعني دين الله الذي أمر به وهو الإسلام. فإنه كامل الاستقامة من كل وجه. قال الشهاب: هذا تسلية له صلّى الله عليه وسلّم وأمر لأمته أو له، بالدوام على التمسّك. ‘অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীন ইসলামকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেননা সর্বদিক থেকে এটি ত্রুটিমুক্ত। শিহাবুদ্দীন আলূসী বলেন, এটি নবী করীম (ছাঃ)-এর জন্য সান্ত্বনা এবং তাঁর বা তাঁর উম্মতের জন্য সর্বদা কুরআনকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ’।[7]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ‘আর তোমরা সমবেতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ কর এবং (দ্বীনের ব্যাপারে) পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (আলে ইমরান ৩/১০৩)। উক্ত আয়াতে বর্ণিত حَبْلُ اللهِ দ্বারা উদ্দেশ্য হল কুরআন।[8] রাসূল (ছাঃ) বলেন, أَلاَ وَإِنِّى تَارِكٌ فِيكُمْ ثَقَلَيْنِ أَحَدُهُمَا كِتَابُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ هُوَ حَبْلُ اللهِ مَنِ اتَّبَعَهُ كَانَ عَلَى الْهُدَى وَمَنْ تَرَكَهُ كَانَ عَلَى ضَلاَلَةٍ ‘সাবধান! আমি তোমাদের মাঝে দু’টি ভারী জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি। তন্মধ্যে একটি আল্লাহর কিতাব। এটি আল্লাহর রজ্জু। যে এর অনুসরণ করবে সে হেদায়েতের উপর থাকবে। আর যে একে পরিত্যাগ করবে সে পথভ্রষ্ট হবে’।[9]
সুতরাং কুরআন মাজীদকে আঁকড়ে ধরার গুরুত্ব অপরিসীম। এর মধ্যেই নিহিত আছে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ।
কুরআন মাজীদকে আঁকড়ে ধরার স্বরূপ :
১. কুরআনের সত্যতার প্রতি সুদৃঢ় বিশ্বাস : কুরআনকে আঁকড়ে ধরার অন্যতম শর্ত হ’ল, কুরআন মাজীদ যে আল্লাহর কালাম ও তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ অহি সে বিষয়ে সুদৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা। মহান আল্লাহ বলেন, ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ ‘এই কিতাব, যাতে কোনই সন্দেহ নেই। যা আল্লাহভীরুদের জন্য পথ প্রদর্শক’ (বাক্বারাহ ২/২)। সেই সাথে কুরআনের সত্যতা-সঠিকতা এবং এর আনীত বিধি-বিধানের প্রতি পূর্ণ ঈমান ও সুদৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা। যেমন আল্লাহ বলেন,وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَيُؤْمِنُوا بِهِ فَتُخْبِتَ لَهُ قُلُوبُهُمْ وَإِنَّ اللهَ لَهَادِ الَّذِينَ آمَنُوا إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ ‘আর এজন্য যে, জ্ঞানীরা যেন জানে যে, এটা (কুরআন) তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে প্রেরিত সত্য। অতএব তারা যেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন এর প্রতি নিশ্চিন্ত হয়। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বাস স্থাপনকারীদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন’ (হজ্জ ২২/৫৪)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘অর্থাৎ যাদেরকে হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণকারী উপকারী জ্ঞান দেওয়া হয়েছে এবং যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী তারা যেন জানে যে, আমরা তোমার প্রতি যা অহি করেছি তা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য। আল্লাহ তার ইলম থেকে যা অবতীর্ণ করেছেন এবং কুরআনের সাথে অন্য কিছু মিশ্রিত হওয়া থেকে যাকে রক্ষা করেছেন। বরং এটি এক প্রজ্ঞাময় কিতাব।لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ ‘এতে কোন মিথ্যা প্রবেশ করে না সম্মুখ হ’তে বা পশ্চাত হ’তে। এটি মহা প্রজ্ঞাময় ও প্রশংসিত সত্তার পক্ষ হ’তে অবতীর্ণ’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৪২)।[10]
২. কুরআনের উপর আমল করা :
কুরআন নিছক পাঠের জন্য অবতীর্ণ হয়নি। বরং এর আনীত বিধান সমূহের প্রতি আমলের মাধ্যমে তা সার্বিক জীবনে বাস্তবায়নের জন্য নাযিল হয়েছে। কুরআনের উপর আমল কুরআনের অন্যতম বড় হক। মহান আল্লাহ বলেন, وَهَذَا كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ‘বস্তুত: এই কিতাব (কুরআন) আমরা নাযিল করেছি যা বরকতমন্ডিত। সুতরাং তোমরা এটির অনুসরণ কর। আর আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হ’তে পার’ (আন‘আম ৬/১৫৫)।
ইহূদীরা তাওরাত শুধু পাঠ ও শ্রবণ করতো। কিন্তু এর প্রতি আমল করতো না। সেজন্য কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাদেরকে গাধার সাথে তুলনা করে বলেছেন, مَثَلُ الَّذِينَ حُمِّلُوا التَّوْرَاةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ أَسْفَارًا بِئْسَ مَثَلُ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِ اللهِ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ‘যারা তাওরাত বহনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, অতঃপর তারা তা বহন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত হ’ল গাধার মত, যে কিতাবের বোঝাসমূহ বহন করে। কতই না মন্দ সেই সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত, যারা আল্লাহর আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করে। বস্তুত: আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না’ (জুম‘আ ৬২/৫)। হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা ইহূদীদেরকে- যাদেরকে তাওরাত দেওয়া হয়েছিল এবং যারা এর উপর আমল করার জন্য একে বহনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, কিন্তু তারা তাওরাতের উপর আমল করেনি, তাদেরকে নিন্দা করে বলছেন, এক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টান্ত হল গাধার মতো যে কিতাবের বোঝাসমূহ বহন করে। অর্থাৎ গাধা যেমন কিতাব বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় জানে না তার মধ্যে কি আছে, সে কেবল বাহ্যিকভাবে বহন করে নিয়ে যায়। তার পিঠের ওপরে কি আছে তা সে জানে না। তেমনি ইহূদীরাও তাদেরকে প্রদত্ত কিতাব বহন করার ব্যাপারে ঐ গাধার মতো। তারা তাওরাতের শব্দ মুখস্থ করেছে কিন্তু এর অর্থ বুঝেনি এবং তদনুযায়ী আমলও করেনি। বরং তারা তাওরাতের অপব্যাখ্যা ও বিকৃতি সাধন করে একে পরিবর্তন করে ফেলেছে। এদের অবস্থা গাধার চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা গাধার তো কোন জ্ঞান-বুদ্ধি নেই। কিন্তু এদের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক সবই রয়েছে, কিন্তু তারা তা কাজে লাগায়নি। এজন্য অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ ‘ওরা হল চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তার চাইতেও পথভ্রষ্ট। ওরা হল উদাসীন’ (আ‘রাফ ৭/১৭৯)।[11]
যামাখশারী বলেছেন, ‘ইহূদীরা তাওরাতের ধারক-বাহক, পাঠক ও হিফযকারী হওয়া সত্ত্বেও এর প্রতি আমল না করার এবং এর আয়াত সমূহের দ্বারা উপকৃত না হওয়ার কারণে তাদেরকে গাধার সাথে তুলনা করা হয়েছে। যে গাধা ইলমের বড় বড় কিতাব বহন করে। সে এগুলো পিঠে নিয়ে পথ চলতে থাকে। কিন্তু কিতাব বহনের কষ্ট-ক্লান্তি ছাড়া তার পিঠে কি আছে তা সে জানে না। সুতরাং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে তার ইলম অনুযায়ী আমল করে না তার দৃষ্টান্ত এই গাধার মতো। কতইনা মন্দ এই উপমা(وكل من علم ولم يعمل بعلمه فهذا مثله، وبئس المثل)।[12]
মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, وَالَّذِينَ يُمَسِّكُونَ بِالْكِتَابِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُصْلِحِينَ ‘বস্তুত: যারা কিতাবকে মযবুতভাবে ধারণ করে ও ছালাত কায়েম করে, নিশ্চয়ই আমরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কার বিনষ্ট করি না’ (আ‘রাফ ৭/১৭০)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আধুনিক মুফাস্সির আব্দুর রহমান বিন নাছির আস-সা‘দী (১৮৮৯-১৯৫৭) বলেন, ‘অর্থাৎ যারা ইলম ও আমলগতভাবে কিতাবকে আঁকড়ে ধরে। ফলে তারা কুরআনের বিধি-বিধান ও ঘটনাসমূহ জানে, যা জানা সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ জ্ঞান। তারা কিতাবের আদেশ সমূহের প্রতি আমল করে। যেগুলি চোখের শীতলতা, অন্তরের প্রফুল্লতা, আত্মার আনন্দের উপলক্ষ্য এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের ফল্গুধারা। কুরআনের যে সকল নির্দেশকে আঁকড়ে ধরা আবশ্যক তন্মধ্যে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ হ’ল, গোপনে ও প্রকাশ্যে ছালাত প্রতিষ্ঠা করা। ছালাতের ফযীলত, মর্যাদা এবং তা ঈমানের মানদন্ড হওয়ার কারণে আল্লাহ এখানে বিশেষভাবে ছালাতের কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ ছালাত প্রতিষ্ঠা অন্যান্য ইবাদত প্রতিষ্ঠার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। তাদের সকল আমল যেহেতু সৎ, তাই আল্লাহ বলেছেন, আমরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কার বিনষ্ট করি না। যারা তাদের কথায়, কাজে ও নিয়তে সৎ। তারা যেমন নিজেরা সৎকর্মশীল, তেমনি অন্যদেরকেও সংস্কার-সংশোধন করে। এই আয়াত ও এ জাতীয় অন্য আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, আললাহ তাঁর রাসূলগণকে মানবতার কল্যাণের জন্য প্রেরণ করেছেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও শান্তি বিনষ্টের জন্য পাঠাননি। তাদেরকে মানুষের উপকার করার জন্য প্রেরণ করেছেন, ক্ষতি করার জন্য নয়। তারা ইহ ও পরকালীন কল্যাণের জন্য প্রেরিত হয়েছেন। সুতরাং যে যত বেশী সৎকর্মপরায়ণ হবে, সে তত বেশী নবীদের অনুসরণকারী বলে গণ্য হবে (فكل من كان أصلح، كان أقرب إلى اتباعهم) ।[13]
সুতরাং কুরআন যা হালাল করেছে তাকে হালাল এবং যা হারাম করেছে তাকে হারাম সাব্যস্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে কুরআনের বিরোধিতা করা বা কম-বেশী করা আল্লাহর প্রতি সরাসরি মিথ্যারোপ। মহান আল্লাহ বলেন, وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ- مَتَاعٌ قَلِيلٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ‘তোমরা তোমাদের যবানে যেভাবে মিথ্যা বলে থাক, সেভাবে আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে বলো না যে, এটি হালাল ও এটি হারাম। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে, তারা সফলকাম হয় না। (হারামের) সুখ-সম্ভোগ অতীব নগণ্য। অথচ (পরিণামে) তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (নাহল ১৬/১১৬-১১৭)।
ছাহাবায়ে কেরাম কুরআনের প্রতি আমলের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক-সজাগ ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, كانَ الرجل مِنَّا إذا تعلَّم عَشْر آياتٍ لم يجاوزهُنّ حتى يعرف معانيهُنَّ، والعملَ بهنَّ ‘আমাদের মধ্যে একজন ছিলেন, যিনি ১০টি আয়াত পাঠ করার পর আর সামনে অগ্রসর হতেন না। যতক্ষণ না তার মর্ম অনুধাবন করতেন ও তদনুযায়ী আমল করতেন’।[14]
আবু আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ বিন হাবীব আস-সুলামী বলেন, حدثنا الذين كانوا يُقرِئوننا: أنهم كانوا يستقرِئون من النبي صلى الله عليه وسلم، فكانوا إذا تعلَّموا عَشْر آيات لم يخلِّفوها حتى يعملوا بما فيها من العمل، فتعلَّمنا القرآن والعمل جميعًا ‘আমাদেরকে যারা কুরআন পাঠ করিয়েছেন তারা বলতেন, তারা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট থেকে যখন কুরআন শিখতেন, তখন ১০টি আয়াত জানলে তারা আর তাঁর পিছে পড়তেন না, যতক্ষণ না ঐ আয়াতগুলির উপর তারা আমল করতেন। এভাবে আমরা কুরআন ও তদনুযায়ী আমল সবই শিখতাম’।[15]
কুরআনের প্রতি আমলকারীদের উচ্চমর্যাদা সম্পর্কে নাওয়াস বিন সাম‘আন (রাঃ) বলেন, سَمِعْتُ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ يُؤْتَى بِالْقُرْآنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَهْلِهِ الَّذِينَ كَانُوا يَعْمَلُونَ بِهِ تَقْدُمُهُ سُورَةُ الْبَقَرَةِ وَآلُ عِمْرَانَ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ أَوْ ظُلَّتَانِ سَوْدَاوَانِ بَيْنَهُمَا شَرْقٌ ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, ক্বিয়ামতের দিন কুরআন ও তার বাহককে আনা হবে। যারা তার উপর আমল করেছিল। যাদের সম্মুখে থাকবে সূরা বাক্বারাহ ও আলে ইমরান। সে দু’টি হবে মেঘমালা অথবা দু’টি কালো শামিয়ানা সদৃশ। যার মধ্যে থাকবে চমক’।[16]
ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, إنا صعب علينا حفظ ألفاظ القرآن وسهل علينا العمل به وإن من بعدنا يسهل عليهم حفظ القرآن ويصعب عليهم العمل به. ‘আমাদের উপর কুরআনের শব্দসমূহ মুখস্থ করা কঠিন কিন্তু এর প্রতি আমল করা সহজ ছিল। আর আমাদের পরবর্তীদের জন্য কুরআন মুখস্থ করা সহজ কিন্তু এর প্রতি আমল করা কঠিন হবে’।[17]
৩. কুরআন তেলাওয়াত ও অনুধাবন :
কুরআন তেলাওয়াত দুই প্রকার। যথা: ১. تلاوة لفظية বা শাব্দিক তেলাওয়াত। স্রেফ কুরআন পাঠ করা এ প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনের প্রত্যেক হরফ পাঠে একটি করে নেকী লিপিবদ্ধ করা হয়।[18] ২. تلاوة حكمية বা হুকুমগত তেলাওয়াত। কুরআন মাজীদের আদেশকৃত বিষয়গুলো পালন ও নিষেধগুলো বর্জন করা, কুরআনে প্রদত্ত সংবাদগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং এর বিধি-বিধানগুলো অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করা হুকুমগত তেলাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত।[19] শায়েখ উছায়মীন বলেন,وهذا النوع هو الغاية الكبرى من إنزال القرآن ‘এটাই কুরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য’।[20] যেমন মহান আল্লাহ বলেন, ‘এটি এক বরকতমন্ডিত কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে লোকেরা এর আয়াত সমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে’(ছোয়াদ ৩৮/২৯)।
সুতরাং কুরআনকে আঁকড়ে ধরতে হলে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে, এর উদ্দেশ্য-মর্ম অনুধাবন করতে হবে, এর বিধি-বিধান ও আইন সমূহকে জানতে হবে এবং তদনুযায়ী আমল করতে হবে। অন্যথায় কিয়ামতের দিন রাসূল (ছাঃ) আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলবেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার উম্মত এই কুরআনকে পরিত্যক্ত গণ্য করেছিল’ (ফুরক্বান ২৫/৩০)।
হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘মুশরিকদের নিকট কুরআন তেলাওয়াত করা হলে তারা হৈচৈ করত এবং অন্য প্রসঙ্গে কথা বলত। যাতে মানুষেরা কুরআন শুনতে না পারে। তাদের এহেন কর্ম কুরআনকে পরিত্যক্ত ঘোষণার শামিল। কুরআনের জ্ঞান ও হিফয পরিত্যাগ, কুরআনের প্রতি ঈমান না আনা ও একে সত্যায়ন না করা, এর অর্থ-মর্ম না বুঝা, এর প্রতি আমল বর্জন করা এবং কুরআনের আদেশ সমূহ বাস্তবায়ন ও নিষেধ সমূহ বর্জন না করা কুরআনকে পরিত্যাগ করা হিসাবে পরিগণিত হবে। কুরআনকে বাদ দিয়ে কবিতা, কারো উক্তি, গান-বাজনা, ক্রীড়া-কৌতুক, কথা বা কুরআন থেকে গৃহীত নয় এমন কোন তরীকার দিকে ঝুঁকে পড়াও কুরআনকে পরিত্যাগের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে’।[21]
মহান আল্লাহ বলেন,أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا ‘তবে কি তারা কুরআন অনুধাবন করে না? যদি এটা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট থেকে আসত, তাহ’লে তারা এর মধ্যে বহু অসঙ্গতি দেখতে পেত’ (নিসা ৪/৮২)। তিনি আরো বলেন,أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا ‘তবে কি তারা কুরআন অনুধাবন করে না? নাকি তাদের হৃদয়গুলি তালাবদ্ধ’? (মুহাম্মাদ ৪৭/২৪)।
আধুনিক মুফাস্সির আব্দুর রহমান সা‘দী বলেন, ‘অর্থাৎ এইসব কুরআন বিমুখ ব্যক্তিরা কেন সত্যিকার অর্থে কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে না? কারণ তারা যদি কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করত তাহলে সেটি তাদেরকে সকল কল্যাণের দিকে পথনির্দেশ করত এবং সকল অকল্যাণ-অনিষ্টতা থেকে সতর্ক করত। তাদের অন্তরগুলো ঈমান ও নিশ্চন্ত বিশ্বাসে পরিপূর্ণ হয়ে যেত। আর কুরআন-ই তাদেরকে মহৎ উদ্দেশ্য ও মূল্যবান অনুগ্রহের দিকে পৌঁছিয়ে দিত। আল্লাহ ও জান্নাতের দিকে পৌঁছার পথ বাৎলে দিত এবং কোন পথ জাহান্নামের আযাবের পানে নিয়ে যায় এবং কোন বিষয় থেকে বেঁচে থাকতে হবে সেটিও নির্দেশ করত। উপরন্তু তাদেরকে তাদের প্রতিপালক, তাঁর নাম ও গুণাবলী এবং অনুগ্রহের সাথে পরিচয় করে দিত। তাদেরকে অফুরন্ত পুণ্য লাভের প্রতি উদ্বুদ্ধ করত এবং কঠিন শাস্তির ভয় দেখাত’। অতঃপর তিনি أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا অংশের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘অর্থাৎ অন্তরে অনিষ্টতা থাকার কারণে তাদের অন্তর তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সেখানে কখনোই কল্যাণ প্রবেশ করবে না। এটাই হল বাস্তবতা’।[22]
৪. কুরআন হিফয করা :
এখানে হিফয দ্বারা কুরআন মুখস্থ ও লিপিবদ্ধ করণ এবং মুদ্রণের মাধ্যমে একে ধ্বংস, হ্রাস-বৃদ্ধি ও অযত্ম-অবহেলা থেকে সংরক্ষণ করা উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহ কুরআন হেফাযতের দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ ‘আমরাই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরাই এর হেফাযতকারী’ (হিজর ১৫/৯)।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু জারীর ত্বাবারী বলেন,وإنا للقرآن لحافظون من أن يزاد فيه باطل مَّا ليس منه، أو ينقص منه ما هو منه من أحكامه وحدوده وفرائضه، ‘কুরআনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন বাতিল জিনিস তাতে বৃদ্ধি করা থেকে এবং কুরআনের অন্তর্ভুক্ত বিধি-বিধান, দন্ডবিধি ও ফরয সমূহের কোন কিছু কম করা থেকে আমরা কুরআনকে হেফাযতকারী’।[23] আধুনিক মুফাস্সির তানতাবী বলেন, ‘কুরআনের মর্যাদা বিনষ্টকারী সকল কিছু থেকে আমরা কুরআনকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত হেফাযত করব। যেমন, অপব্যাখ্যা, পরিবর্তন-পরিবর্ধন, হ্রাস-বৃদ্ধি, পরস্পর বিরোধিতা ও মতভেদ। অলৌকিকতার মাধ্যমেও আমরা কুরআনকে হেফাযত করব। ফলে কেউ এর বিরোধিতা করতে বা এর মতো একটি সূরা রচনা করতে সক্ষম হবে না। অনুরূপভাবে কিয়ামত পর্যন্ত এই উম্মতের একদল মানুষের কুরআন মুখস্থকরণ ও এর প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত হওয়ার মাধ্যমেও আমরা কুরআনের হেফাযত করব’।[24]
মসজিদ-মক্তবে বাচ্চাদের জন্য কুরআন মুখস্থ করার ব্যবস্থা গ্রহণ, হিফয মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কুরআন বিভাগ বা অনুষদ খোলা কুরআন সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম। আধুনিক উন্নত প্রেসে কুরআন ছাপিয়ে বিশ্ববাসীর মধ্যে বিতরণও কুরআন সংরক্ষণের একটি কার্যকর পন্থা। মদীনা মুনাউওয়ারায় অবস্থিত ‘বাদশাহ ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স’ যার অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
(চলবে)
[1]. বুখারী হা/২৭৪০; মুসলিম হা/১৬৩৪, ‘অছিয়ত’ অধ্যায়।
[2]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী (রিয়াদ : দারুস সালাম, ১৪২১ হি./২০০০), ৫/৪৪৩।
[3]. মুওয়াত্ত্বা মালেক হা/৩৩৩৮; মিশকাত হা/১৮৬।
[4]. তাফসীরে ত্বাবারী ২১/৬১০।
[5]. ইবনু কাছীর, তাফসীর ইবনে কাছীর (কায়রো : দারুল হাদীছ, ১৪২৩ হি./২০০২খৃ.), ৭/২৩০।
[6]. তাফসীরে কাবীর ৯/৬৩৪।
[7]. তাফসীরে কাসেমী ৮/৩৯২।
[8]. তাফসীর ইবনে কাছীর ২/৯৬-৯৭।
[9]. মুসলিম হা/২৪০৮।
[10]. তাফসীর ইবনে কাছীর ৫/৪৬০।
[11]. তাফসীর ইবনে কাছীর ৮/৯০।
[12]. যামাখশারী, তাফসীরে কাশশাফ (বৈরূত : দারু ইবনে হাযম, ১ম প্রকাশ, ১৪৩৩হি./২০১২খৃ), অখন্ড, পৃ. ১৩৮৪।
[13]. তাফসীরে সা‘দী (বৈরূত : মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪২৩হি./২০০২খৃ.), পৃ. ৩০৮।
[14]. তাফসীরে ত্বাবারী ১/৮০।
[15]. মাজালিসু শাহরি রামাযান, পৃ. ৫৪।
[16]. মুসলিম হা/৮০৫; মিশকাত হা/২১২১।
[17]. তাফসীরে কুরতুবী ১/৪০।
[18]. তিরমিযী, হা/২৯১০; মিশকাত হা/২১৩৭, সনদ ছহীহ।
[19]. শায়েখ উছায়মীন, মাজালিসু শাহরি রামাযান (মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪২৩ হি.), পৃ. ২১ ও ৫৪।
[20]. ঐ, পৃ. ৫৪।
[21]. তাফসীর ইবনে কাছীর ৬/১২০।
[22]. তাফসীরে সা‘দী, পৃ. ৭৮৮-৮৯।
[23]. তাফসীরে ত্বাবারী ১৭/৬৮।
[24]. তাফসীরে তানতাবী ১/২৪৫৬।