ঈদায়নের ছালাত ১ম হিজরী সনে চালু হয়। এটা সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ। রাসূলুল্ল­াহ (ছাঃ) নিয়মিতভাবে তা আদায় করেছেন এবং নারী-পুরুষ সকল মুসলমানকে ঈদের জামা‘আতে হাযির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এদিন সর্বোত্তম পোষাক পরিধান করতেন ও নিজ স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে ঈদগাহে যেতেন।[1] তিনি একপথে যেতেন ও অন্যপথে ফিরতেন।[2]

ঈদায়নের ছালাত সকল নফল ছালাতের মধ্যে সর্বাধিক ফযীলতপূর্ণ।[3] তা সহ কোন ইবাদতের জন্য নিয়ত মুখে বলতে হয় না। বরং হৃদয়ে সংকল্প করতে হয়।[4] ঈদায়নের ছালাতে সূরায়ে আ‘লা ও গা-শিয়াহ অথবা ক্বাফ ও ক্বামার পড়া সুন্নাত।[5] অবশ্য মুক্তাদীগণ কেবল সূরায়ে ফাতিহা পড়বেন।[6]

ঈদায়নের জন্য প্রথমে ছালাত ও পরে খুৎবা প্রদান করতে হয়।[7] ঈদের ছালাতের আগে পিছে কোন ছালাত নেই, আযান বা এক্বামত নেই। ঈদগাহে বের হবার সময় উচ্চৈকণ্ঠে তাকবীর এবং পৌঁছার পরেও তাকবীরধ্বনি ব্যতীত কাউকে জলদি আসার জন্য আহবান করাও ঠিক নয়।[8] কোন কোন ঈদগাহে ইমাম পৌঁছে যাওয়ার পরেও ছালাতের পূর্বে বিভিন্ন জনে বক্তৃতা করে থাকেন। এটা সুন্নাত বিরোধী কাজ।

ঈদায়নের খুৎবা একটি হওয়াই ছহীহ হাদীছ সম্মত। মাঝখানে বসে দু’টি খুৎবা প্রদান সম্পর্কে কয়েকটি ‘যঈফ’ হাদীছ রয়েছে। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন যে, এটিই প্রমাণিত সুন্নাত যে, আল্ল­াহর রাসূল (ছাঃ) ঈদায়নের ছালাত শেষে দাঁড়িয়ে কেবলমাত্র একটি খুৎবা দিয়েছেন- যার মধ্যে আদেশ, নিষেধ, উপদেশ, দো‘আ সবই ছিল।[9]

মুসলমানদের জাতীয় আনন্দ-উৎসব মাত্র দু’টি- ঈদুল ফিৎর ও ঈদুল আযহা।[10] এই দু’দিন ছিয়াম পালন নিষিদ্ধ।[11] এক্ষণে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ নামে তৃতীয় আরেকটি ঈদ-এর প্রচলন ঘটানো নিঃসন্দেহে বিদ‘আত- যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

ঈদায়নের জামা‘আতে পুরুষদের পিছনে পর্দার মধ্যে মহিলাগণ প্রত্যেকে বড় চাদরে আবৃত হয়ে যোগদান করবেন। প্রত্যেকের চাদর না থাকলে একজনের চাদরে দু’জন আসবেন। খত্বীব ছাহেব নারী-পুরুষ সকলকে লক্ষ্য করে মাতৃভাষায় পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে খুৎবা প্রদান করবেন। ঋতুবর্তী মহিলারা কেবল খুৎবা শ্রবণ করবেন।[12] মিশকাতের খ্যাতনামা ভাষ্যকার ওবায়দুল্ল­াহ মুবারকপুরী (রহঃ) বলেন যে, উক্ত হাদীছের শেষে বর্ণিত دعوة المسلمين কথাটি ‘আম’। এর দ্বারা খুৎবা ও নছীহত বুঝানো হয়েছে। কেননা ঈদায়নের ছালাতের পরে (সম্মিলিত) দো‘আর প্রমাণে রাসূলুল্ল­াহ (ছাঃ) থেকে কোন হাদীছ বর্ণিত হয়নি’।[13]

ঈদায়নের ছালাত আল্ল­াহর নবী (ছাঃ) বৃষ্টির কারণে একবার ব্যতীত সর্বদা ময়দানে পড়েছেন। এই ময়দানটি মদীনার মসজিদে নববীর পূর্ব দরজা বরাবর পাঁচশ’ গজ দূরে ‘বাত্বহান’ সমতল ভূমিতে অবস্থিত।[14] সুতরাং বৃষ্টি বা অন্য কোন যরূরী কারণে ময়দানে যাওয়া অসম্ভব হ’লে মসজিদে ঈদের জামা‘আত করা যাবে।[15] কিন্তু বিনা কারণে বড় মসজিদের দোহাই দিয়ে মহানগরী বা অন্যত্র মসজিদে ঈদের ছালাত আদায় করা সুন্নাত বিরোধী আমল। জামা‘আত ছুটে গেলে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে নিবে। ঈদগাহে আসতে না পারলে বাড়ীতে মেয়েরা সহ বাড়ীর সকলকে নিয়ে ঈদগাহের ন্যায় তাকবীর সহকারে জামা‘আতের সাথে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে।[16]

জুম‘আ ও ঈদ একই দিনে হওয়াতে রাসূলুল্ল­াহ (ছাঃ) দু’টিই পড়েছেন। তবে যারা ঈদ পড়েছেন, তাদের জন্য জুম‘আ অপরিহার্য করেননি।[17]

ঈদের দিন ছাহাবায়ে কেরাম পরস্পরে সাক্ষাৎ হ’লে বলতেন ‘আল­­াহুম্মা তাক্বাববাল মিন্না ওয়া মিনকা’ (অর্থ: আল­­াহ আমাদের ও আপনার পক্ষ হ’তে কবুল করুন!)।[18] এদিন নির্দোষ খেলাধুলা করা যাবে।[19] কিন্তু তাই বলে পটকাবাজি, মাইকে ক্যাসেটবাজি, চরিত্র বিধ্বংসী ভিডিও প্রদর্শন, বাজে সিনেমা দেখা, খেলাধুলার নামে নারী-পুরুষের অবাধ সমাবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

ঈদায়নের ছালাতে অতিরিক্ত তাকবীর : প্রথম রাক‘আতে তাকবীরে তাহরীমা ও ছানা পড়ার পরে ক্বিরাআতের পূর্বে সাত ও দ্বিতীয় রাক‘আতে ক্বিরাআতের পূর্বে পাঁচ মোট বার তাকবীর দেওয়া সুন্নাত। এরপরে ‘আঊযুবিল্ল­াহ’ পাঠ অন্তে ক্বিরাআত পড়বে। প্রতি তাকবীরে দু’হাত উঠাবে। তাকবীর বলতে ভুলে গেলে বা গণনায় ভুল হ’লে তা পুনরায় বলতে হয় না বা ‘সিজদায়ে সহো’ লাগে না।[20]


[1]. ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩১৭-১৮।

[2]. বুখারী, মিশকাত হা/১৪৩৪।

[3]. তাফসীরে কুরতুবী ১৫/১০৮।

[4]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১।

[5]. নায়লুল আওত্বার ৪/২৫১।

[6]. ঐ ৩/৫৫।

[7]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৪২৬, ১৪৩১।

[8]. মুসলিম, মিশকাত হা/১৪৫১; নায়ল ৪/২৫১; ফিক্ব্হুস সুন্নাহ ১/৩১৯।

[9]. মির‘আৎ ২/৩৩০-৩১।

[10]. আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৪৩৯।

[11]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২০৪৮।

[12]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৪৩১।

[13]. মির‘আৎ ২/৩৩১।

[14]. ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩১৮-১৯; মির‘আৎ ২/৩২৭।

[15]. ফিক্ব্হুস সুন্নাহ ১/৩১৮।

[16]. বুখারী, ফৎহসহ ২/৫৫০-৫১।

[17]. ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩১৬, নায়ল ৪/২৩১।

[18]. ফিক্ব্হুস সুন্নাহ ১/৩১৫।

[19]. ফিক্ব্হুস সুন্নাহ ১/৩২২।

[20]. মির‘আৎ হা/১৪৫৭, ২/৩৩৮-৮১, হাকেম ১/২৯৮।





সমাজ সংস্কারে তাবলীগী ইজতেমা - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
হজ্জের ক্ষেত্রে প্রচলিত কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি - মুহাম্মাদ ইমদাদুল্লাহ
শিক্ষকের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য, শিশুর পাঠদান পদ্ধতি ও শিখনফল নির্ণয় - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
কুরআন তেলাওয়াতের আদব সমূহ - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জীবনীর আয়নায় নিজেকে দেখ - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
ছিয়ামের ফাযায়েল ও মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
ইয়াতীম প্রতিপালন - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
বাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ - ড. মুহাম্মাদ কামরুয্যামান
আমাদের পরিচয় কি শুধুই মুসলিম? - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
গীবত : পরিণাম ও প্রতিকার (৩য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
তাহরীকে জিহাদ : আহলেহাদীছ ও আহনাফ (৪র্থ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
ক্বিয়ামতের আলামত সমূহ (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
আরও
আরও
.