১. ইয়াতীমের সম্পদ এক পবিত্র আমানত :

আবুল কাসেম ওবায়দুল্লাহ বিন সুলাইমান বলেন, আমি মূসা বিন বুগার (তুর্কী বংশোদ্ভূত আববাসীয় খিলাফতের একজন সামরিক নেতা, মৃ. ৮৭৭খ্রি.) সচিবের দায়িত্ব পালন করতাম। আমরা তখন ‘রায়’ শহরে ছিলাম। সেখানকার বিচারক ছিলেন কুফার আহমাদ বিন বুদাইল (মৃ. ২৫৮ হি.)। মূসা তাঁর একটি জমির বিভিন্ন অংশ একত্র করে সেটিকে আবাদ করতে চাইলেন। সেখানে একজন ইয়াতীমেরও একটি অংশ ছিল।

আমি বিচারক আহমাদ বিন বুদাইলকে ডেকে ইয়াতীমের অংশটি আমাদের কাছে বিক্রি করার অনুরোধ করলাম। কিন্তু তিনি রাজি হ’লেন না। তিনি বললেন, ইয়াতীমের তো এখনই জমি বিক্রি করার কোন প্রয়োজন নেই। আমি আশঙ্কা করছি, তার প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও যদি তার সম্পত্তি বিক্রি করি এবং পরে সেই অর্থের কোন ক্ষতি হয়, তাহ’লে আমি তার সম্পদ নষ্ট করার জন্য দায়ী হব। আমি বললাম, আমরা তার অংশের মূল্যের দ্বিগুণ দেব। তিনি বললেন, এটাও বিক্রির পক্ষে আমার জন্য যথেষ্ট কারণ নয়। সম্পদ বেশী হোক বা কম, ইয়াতীমের সম্পদের ব্যাপারে একই নীতি প্রযোজ্য। আমি নানা উপায়ে তাঁকে সম্মত করানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন। এতে আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, হে বিচারক! আপনি কি জানেন না, তিনি মূসা বিন বুগা? বিচারক উত্তর দিলেন, আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করুন! এখানে বিবেচ্য ব্যক্তি মূসা বিন বুগা নন; বরং আল্লাহ তা‘আলা!

একথা শুনে আমি ভীষণ লজ্জিত হলাম। এরপর আর তাঁকে অনুরোধ করিনি। আমি মূসার কাছে ফিরে গিয়ে জমির বিষয়ে সব ঘটনা খুলে বললাম। তিনি যখন শুনলেন যে, বিচারক বলেছেন, এখানে বিবেচ্য ব্যক্তি মূসা নন, বরং আল্লাহ, তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং কথাটি বারবার বলতে থাকলেন। এরপর তিনি বললেন, এই জমির বিষয়ে আর কোন পদক্ষেপ নিয়ো না। আর ঐ নেককার বিচারকের প্রয়োজনের খোঁজ নাও। তাঁর কোন প্রয়োজন থাকলে তা পূরণ করো।

আমি বিচারককে ডেকে জানালাম, আমীর জমির বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছেন এবং তিনি তাঁর প্রয়োজন পূরণ করতে চান। বিচারক তাঁর জন্য দো‘আ করে বললেন, এ ধরনের আচরণই তাঁর নে‘মতকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য অধিক উপযোগী। আমার ব্যক্তিগত কোন প্রয়োজন নেই। শুধু আমার বেতন নিয়মিত দেওয়া হোক। কয়েক মাস ধরে বেতন বন্ধ রয়েছে, এতে আমি ভীষণ কষ্টে পড়েছি। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমি তাঁর বেতন নিয়মিত করে দিলাম।[1]

শিক্ষা : ইয়াতীমের সম্পদ রক্ষা করা এক পবিত্র আমানত। ক্ষমতাবান ব্যক্তির আর্থিক স্বার্থের চেয়েও ইয়াতীমের সম্পদের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাবে। বিচারক আল্লাহর সন্তুষ্টিকে মানুষের ভয় ও চাপের ঊর্ধ্বে স্থান দিবেন।

২. ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর ন্যায়বিচার ও অসহায় ব্যক্তির প্রতি সহমর্মিতা : একদিন ওমর বিন আব্দুল আযীয (৬১-১০১ হি.) হিমছের বাজার দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় দুইখন্ড মোটা খসখসে কাপড় পরিহিত এক ব্যক্তি তাঁর সামনে এসে বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, কোন ব্যক্তি নির্যাতিত হ’লে সে যেন আপনার কাছে আসে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। লোকটি বলল, তাহ’লে দূরদেশ থেকে আসা একজন নির্যাতিত ব্যক্তি আপনার কাছে উপস্থিত হয়েছে। ওমর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাড়ী কোথায়? লোকটি বলল, ইয়েমেনের এডেনের (আদান) নিকটবর্তী আবইয়ান অঞ্চলে। তখন ওমর বিন আব্দুল আযীয বললেন, আল্লাহর শপথ! তোমার বাড়ী ওমরের বাড়ী থেকে অনেক দূরে। একথা বলে তিনি সেখানেই তাঁর বাহন থেকে নেমে পড়লেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমার প্রতি কি অন্যায় করা হয়েছে?

লোকটি বলল, আমার একখন্ড জমি ছিল। একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি জোরপূর্বক আমার কাছ থেকে সেটি ছিনিয়ে নিয়েছে। ওমর বিন আব্দুল আযীয উরওয়া বিন মুহাম্মাদকে (মৃ. ১২০হি.) চিঠি লিখে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন লোকটির সাক্ষ্য-প্রমাণ শুনে বিচার করেন। তার অধিকার প্রমাণিত হ’লে জমিটি তাকে ফিরিয়ে দেন। চিঠি লেখা শেষ হ’লে লোকটি চলে যেতে উদ্যত হ’ল। তখন ওমর বিন আব্দুল আযীয তাকে বললেন, একটু অপেক্ষা করো। তুমি তো অনেক দূর থেকে আমাদের কাছে এসেছ। তোমার কতটুকু খাবার-সামগ্রী খরচ হয়েছে, আসতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং তোমার পোষাক কতখানি পুরোনো হয়েছে-সেগুলোর হিসাব করো। লোকটি হিসাব করে দেখল, তার মোট এগারো দীনার খরচ হয়েছে। ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) তাকে সেই অর্থ দিয়ে দিলেন।[2]

শিক্ষা : ন্যায়বিচার শুধু অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ন্যায়বিচার পেতে গিয়ে একজন নির্যাতিত ব্যক্তির যে যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যয় হয়, সেগুলোর প্রতিও দায়িত্বশীল শাসকের দৃষ্টি রাখা উচিত।

৩. পরস্পরের হক আদায়ে সচেতনতা মামলার সংখ্যা হ্রাস করে :

ছালেহ বিন মুসলিম তাবেঈ আবু ওয়ায়েল শাকীক বিন সালামাহ (১-৮২ হি.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি সালমান বিন রাবী‘আকে মাদায়েন শহরে বিচারকের আসনে বসে থাকতে দেখেছি। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) তাঁকে চল্লিশ দিনের জন্য সেখানকার বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। এ সময় আমি তাঁর সামনে দু’জন মানুষকেও ছোট-বড় কোন বিষয়ে বিবাদ করতে দেখিনি। আমরা আবু ওয়ায়েলকে জিজ্ঞেস করলাম, এর কারণ কি? তিনি বললেন, মানুষ পরস্পরের অধিকার আদায়ে ন্যায়নিষ্ঠ ছিল বলেই এমনটি ঘটেছিল।[3]

শিক্ষা : সমাজে মানুষ যখন পরস্পরের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং ন্যায়বিচার ও ইনছাফের সঙ্গে আচরণ করে, তখন বিরোধ-বিবাদ কমে যায়। তাই শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু ন্যায়পরায়ণ বিচারকই যথেষ্ট নন; বরং প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধ, আমানতদারিতা ও অন্যের অধিকার রক্ষার মানসিকতা গড়ে তোলা যরূরী।


[1]. খতীব বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ ৫/৮০।

[2]. আবু নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া ৫/২৮০।

[3]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক ২১/৪৬৮; তারীখু বাগদাদ ১০/২৮৫।






ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্ত - আবু রাযিয়া, নিয়ামতপুর, নওগাঁ
হারামাইন প্রাঙ্গনের শীতলতার রহস্য - আত-তাহরীক ডেস্ক
পরিবর্তনের জন্য চাই দৃঢ় সংকল্প - নাজমুন নাঈম
পৃথিবীর বৃহত্তম রাষ্ট্রের খলীফা হারূণুর রশীদের প্রতি ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর ঐতিহাসিক পত্র - আত-তাহরীক ডেস্ক
খলীফা হারূণুর রশীদের নিকটে প্রেরিত ইমাম মালেক (রহঃ)-এর ঐতিহাসিক চিঠি (শেষ কিস্তি) - ইহসান ইলাহী যহীর
স্ত্রী নির্বাচনে নিয়তের গুরুত্ব - আব্দুত তাওয়াব
একজন কৃষ্ণকায় দাসের পরহেযগারিতা - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
নীলনদের প্রতি ওমর (রাঃ)-এর পত্র - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
মহামারী থেকে আত্মরক্ষায় বিদ‘আতী আমলের পরিণতি - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
তাতারদের আদ্যোপান্ত (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ন্যায়বিচারের মূর্তপ্রতীক কাযী শুরাইহ (রহঃ) - ড. নূরুল ইসলাম
খলীফা হারূনুর রশীদের নিকটে প্রেরিত ইমাম মালেক (রহঃ)-এর ঐতিহাসিক চিঠি - ইহসান ইলাহী যহীর
আরও
আরও
.