বর্তমানে আমরা এমন এক সংকটাপন্ন সময়ে বাস করছি, যেখানে পৃথিবীর এক প্রান্তের ক্ষত অন্য প্রান্তে রক্ত ঝরাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে হিংসাত্মক রাজনৈতিক সংঘাত, ইসলামী দলগুলোর বিভক্তি ও লক্ষ্যহীনতা, মধ্যপ্রাচ্যে পরাশক্তিগুলোর আধিপত্যের লড়াই, ইউক্রেনে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ এবং ইউরোপের রাজপথে উগ্র অভিবাসী বিদ্বেষ। প্রতিটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সবকিছুর মূলে রয়েছে একটি অভিন্ন ও নির্মম সত্য। আর তা হ’ল, মানুষের জান-মাল-ইযযত ও মৌলিক নিরাপত্তা আজ ক্ষমতা, আধিপত্য আর ক্ষুদ্র পার্থিব স্বার্থের কাছে অতীব সস্তা পণ্যে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট তথা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতির সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল, হিংসা ও প্রতিহিংসার দুষ্টচক্র ভেঙে একটি নিরাপদ, সহনশীল ও মানবিক রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা হ’ল, ফেলে আসা হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থামেনি; বরং আহত-নিহত ও চাঁদাবাজদের পরিচয় বদলেছে মাত্র। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন (জানুয়ারী-জুন ২০২৬) অনুযায়ী, বিগত ছয় মাসে দেশে ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫৬ জন নিহত এবং ৫,২৪৬ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। যার ৮১ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে ক্ষমতাসীন দলের অন্তর্কলহ ও অপরাপর রাজনৈতিক দলের মুখোমুখি সংঘাতের কারণে। নির্বাচনকেন্দ্রিক ৩৯৬টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ২,৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ১৪৪টি মামলায় ২৪,৫১৮ জনকে ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামী করে হয়রানির পুরনো রীতি বজায় রাখা হয়েছে। এইচআরএসএসের অপর এক পরিসংখ্যানে প্রকাশ, ১৭ মাসে মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন অন্তত ২৫৯ জন। রাজপথের এই অশুভ সংঘাত ও আইনের চরম অপপ্রয়োগ মূলত একইসাথে নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মধ্যপ্রাচ্যের চিত্র আজ ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক। ২০২৬ সালে মার্কিন-ইস্রাঈল বনাম ইরান যুদ্ধ হরমুয প্রণালীকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি-নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। জুলাইয়ে চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ইরান-সমর্থিত হূতি বিদ্রোহীরা সঊদী আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করেছে। ১৯শে সেপ্টেম্বর রিয়াদে তাদের প্রথম হামলার দাবী আসে। যাতে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-সংলগ্ন জ্বালানি ডিপোতে আগুন ধরে যায়। ১০ই অক্টোবর একই বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও ৩০০-এর অধিক মানুষ আহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতে সঊদীর পাঁচটি বিমানবন্দরে হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা ১৯ ও আহতের সংখ্যা ৩৬৪ বলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দু’জন বাংলাদেশী। আহত হয়েছেন আরও ২৪ বাংলাদেশী, যাদের ১৩ জন ওমরাহ যাত্রী এবং ১১ জন প্রবাসী কর্মী। কয়েকজন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। এসব হামলায় বাস্তবতা হ’ল-আজ মুসলিম ভূখন্ডে মুসলিমের হাতেই মুসলিমের রক্ত ঝরছে, আর এর পূর্ণ সুবিধা হাছিল করছে অমুসলিম পরাশক্তিগুলো। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মহাসংকট।
এই অশুভ বিভাজনের ছায়া আজ দেশের ইসলামপন্থী অঙ্গনেও সুগভীর। নেতৃত্ব, পদ-পদবী, দাওয়াতী কৌশল ও চিন্তাধারা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু মতপার্থক্যকে আত্মবিনাশী শত্রুতায় রূপ দেওয়া, পরস্পরের বিরুদ্ধে গীবত-তোহমত ছড়ানো কিংবা ব্যক্তি স্বার্থে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের ন্যূনতম জায়গাটুকুও ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। আর আপোষে ঝগড়া করো না। তাহ’লে তোমরা শক্তিহীন হবে ও তোমাদের প্রতিপত্তি উবে যাবে’ (আনফাল-মাদানী ৮/৪৬)। এই ঐক্য মানে মোটেই সত্য-মিথ্যার পার্থক্য মুছে ফেলা নয়; বরং সত্যের অনুসরণে পরস্পরকে সহযোগিতা করা, মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে দলীল ও ইসলামী শিষ্টাচার বজায় রাখা এবং উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণকে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। ইসলামী নেতৃত্বের মর্যাদা প্রতিপক্ষকে ছোট বা পরাজিত করার মধ্যে নয়; বরং মানুষকে চিরন্তন সত্য ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করার মধ্যেই নিহিত।
ইসলাম মানবজীবনের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ প্রাণের বদলে প্রাণ অথবা জনপদে অনর্থ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করল, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারু প্রাণ রক্ষা করে, সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল’ (মায়েদাহ-মাদানী ৫/৩২)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা যুলুম থেকে বেঁচে থাকো। কেননা যুলুম ক্বিয়ামতের দিন ঘোর অন্ধকার হয়ে দেখা দিবে’ (মুসলিম হা/২৫৭৮; মিশকাত হা/১৮৬৫)। অতএব, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থের অজুহাতে কোন অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং সার্বজনীন সহমর্মিতা ও দয়ার পথনির্দেশ দিয়ে রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যমীনবাসীর প্রতি দয়া কর, আসমানবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন’ (আবুদাঊদ হা/৪৯৪১; মিশকাত হা/৪৯৬৯, সনদ ছহীহ)।
পূর্বের ন্যায় বর্তমানে দেশের নির্বাচিত নেতারা পুনরায় পূজা মন্ডপে যাচ্ছেন এবং বলছেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। অথচ ইসলাম বিশ্ব মানবতার কল্যাণে আল্লাহ মনোনীত একমাত্র ধর্ম (মায়েদাহ ৩)। ইসলামে মূর্তিপূজার কোন স্থান নেই। তাই নেতাদের আদৌ সমীচীন নয় অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে গিয়ে তাদেরকে শিরকী কাজে উৎসাহিত করা। বরং উচিত হবে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়া এবং জনকল্যাণে বিশেষ করে সর্বস্বহারা নদী ভাঙা লোকদের হৃদয়ের কান্না শোনা। ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অশোক কুমার গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, রাম কেবল মহাকাব্যে আছেন’। বাস্তবে নেই।...‘দূর্গা অনুরূপ একটা ভিত্তিহীন বিশ্বাস মাত্র। ঋগ্বেদে যার কোন উল্লেখ নেই’ (কলিকাতা, দৈনিক আনন্দবাজার, ৯ই নভেম্বর ২০১৯)। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হ’ল ইসলাম। আর ইসলামে ধর্মের ব্যাপারে কারুর প্রতি কোন যবরদস্তি নেই (বাক্বারাহ ২৫৬; স.স.)।
সুতরাং বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের প্রতি আমাদের আহবান- (১) গণতন্ত্রের নামে সহিংস রাজনীতি পরিহার করতে হবে। (২) হারামাইনের নিরাপত্তা রক্ষায় মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধভাবে বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। (৩) ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত বাংলাদেশী প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় দূতাবাসগুলোকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। (৪) ভারতে মুসলিম নির্যাতন ও তাদের মসজিদ সমূহ দখলের বিরুদ্ধে সরকারকে সোচ্চার হ’তে হবে। (৫) ওলামায়ে কেরামকে সমাজে তাওহীদী চেতনার বিস্তার এবং সুন্নাতে নববী প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হ’তে হবে এবং শিরক ও বিদ‘আতের ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে মুসলিম উম্মাহকে সজাগ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সমগ্র মানবজাতিকে জাহেলিয়াতের থাবা থেকে রক্ষা করুন -আমীন! (স.স.)।