১৯শে জুলাই শেষ হ’ল ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। আতশবাজির ঝলকানি আর বিজয়ের উল্লাসে বিশ্বকাপের পর্দা নেমেছে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা এখনও অর্জন করতে না পারলেও সম্ভবত তামাম দুনিয়ার মধ্যে এদেশেই বিশ্বকাপের আমেজ-উন্মাদনা সর্বাধিক। দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল যে, ঘোরলাগা হরিণের মতো ছুটে চলেছে কোটি তরুণের হৃদয়। প্রায় ১৫ হাযার কিলোমিটার দূরত্বকে ছাপিয়ে পতাকার প্রতিযোগিতা, মিছিল-মিটিং, শোডাউন, বাক যুদ্ধ থেকে মারামারি, সময় ও অর্থের বিলাসিতা এক অর্থহীন উন্মাদনায় মেতেছিল আমাদের তরুণ সমাজ। যে তারুণ্যের দায়িত্ব ছিল দেশের খেটে খাওয়া মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া, যাদের কর্তব্য ছিল দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, ইলম ও আমলের আলোয় সমাজকে আলোকিত করা, সেই সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ আজ ভিনদেশী পতাকার নীচে নিজেদের বিবেক বন্ধক রেখেছে। বিবেকের এই চরম দেউলিয়াত্ব কেবল সময় বা অর্থের অপচয়েই থেমে থাকেনি, বরং তা জন্ম দিয়েছে লাশের এক দীর্ঘ সারি।
আত্মহননের মিছিল : বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ফুটবল-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অন্তত ২০ জন ভক্তের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১২ জনই বাংলাদেশের। তাদের মধ্যে তিনজনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া পতাকা টাঙাতে গিয়ে বহুতল ভবন থেকে পড়ে এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে তিনজন। আবার প্রিয় দলের পরাজয়ের ক্ষোভে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছে কয়েকজন এবং কুষ্টিয়ায় ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এছাড়াও আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন।[1] যে জীবন আল্লাহর দেওয়া পবিত্র আমানত, যে জীবন দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাত জয় করার কথা ছিল, তা বেঘোরে শেষ হয়ে গেল কেবল একটা খেলার জন্য? এই আত্মহনন কেবল ১২টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং ১২টি পরিবারকে চিরতরে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।
পতাকার প্রতিযোগিতা ও বিবেকের দেউলিয়াত্ব : হাযার হাযার টাকা খরচ করে ভিনদেশের আকাশচুম্বী পতাকা ওড়ানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের অন্ধ বিবেকের সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষ সাক্ষী। যে অর্থ দিয়ে ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া যেত, নেয়া যেত কোন দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষার দায়িত্ব, সেই অর্থ দিয়ে মাগুরার আমজাদ হোসাইন বানিয়েছেন সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানীর পতাকা। স্রেফ এক মুহূর্তের জোশ আর দেখনদারির নামে উড়িয়ে দিলেন ১০ শতাংশ জমির বিক্রিত ৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে কোটি কোটি অন্ধ ভক্ত পাড়া-মহল্লার অলিতে-গলিতে আর বাড়ীর ছাদে ভিনদেশী পতাকা উড়ানোর নামে অপচয়ের এক নির্লজ্জ লীলা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ নির্মম বাস্তবতা হ’ল, আজকের বিশ্বে প্রায় ৬৬ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী অনাহারে ভুগছে।[2] এমনকি নিজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যায় মানবতা যখন ডুবছে, তখনও কোটি কোটি পতাকাপ্রেমীদের বিবেক জাগ্রত হয় না। হায় আফসোস! শতকোটি আফসোস এই অন্ধ বিবেকের প্রতি!
সময়ের মহাধ্বংসযজ্ঞ : এবারের বিশ্বকাপের সময়সূচিগুলো ছিল ঠিক ফজরের ওয়াক্তের আশেপাশেই। একটি ম্যাচের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্ঘুম রাত কাটানো, ফজরের পবিত্র মুহূর্তে ছালাত বাদ দিয়ে গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে টিভি স্ক্রীনের সামনে অধীর নেত্রে বসে থাকার দৃশ্যগুলো যেকোন ঈমানদার মানুষের হৃদয়ে চরম আক্ষেপের জনম দিয়েছে। এই উন্মাদনা দেখে অনেকে বলেছিলেন, ইস! এই তরুণরা যদি আজকে ফজরে মসজিদে আসতো! যদি তাদের এই সময়ের কুরবানীগুলো ইসলামের তরে হ’ত; তবে কি আমরা আজ বিদেশী প্রভুর গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ থাকতাম? কি অদ্ভূত ঘোরে নিপতিত জীবন! যে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান নে‘মত ‘সময়’, তা আজ স্রেফ বিনোদনের নামে গিলে খাচ্ছে ভিনদেশী সংস্কৃতির এই আসক্তি। এই সময়ের হিসাব কি ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে দিতে হবে না?
অন্ধ ভালোবাসার মোহ : প্রিয় দলের বিজয়োল্লাসে সিজদায় লুটিয়ে পড়া, ছালাতে তাদের জন্য দো‘আ করা অথবা দান-ছাদাক্বা করার মতো পবিত্র ইবাদতগুলোকেও আজ স্রেফ তামাশায় পরিণত করা হয়েছে। জন্মদাতা পিতাকে ভুলে গিয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতির ভিনদেশী কোন খেলোয়াড়কে ‘মেসি আমার আববা’ বলে সম্বোধন করা আমাদের যুবসমাজের ঈমানী চেতনার চরম দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। শুধু তাই নয়, প্রিয় দলের পরাজয়ে কিংবা প্রিয় খেলোয়াড়ের বিদায়ে তরুণ-তরুণীদের চোখের পানি যেন আজ বাঁধ মানছে না। তারা ডুকরে কান্নায় ভেঙে পড়ছে। হায় আফসোস! বিশ্বজুড়ে মযলূম মুসলিমদের আর্তনাদ শুনে কিংবা নিজেদের জীবনের পর্বতসম পাপের অনুশোচনায় যে চোখ কখনো ভেজে না, আল্লাহর ভয়ে যে চোখে এক ফোঁটা পানিও আসে না, সেই চোখ আজ অঝোরে কাঁদছে ভিনদেশী খেলোয়াড়ের জন্য।
জুয়া ও পতিতাবৃত্তির অন্ধকার থাবা : এই উন্মাদনার সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি হ’ল পর্দার আড়ালে চলা ‘জুয়া’ বা বাজি ধরার আসর। খেলার জয়-পরাজয় নিয়ে পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে অনলাইনে চলে কোটি কোটি টাকার জুয়ার আসর। অন্যদিকে আয়োজক দেশগুলোতে চলছে পতিতাবৃত্তির মহোৎসব। এদিকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠগুলোতে চলছে নারী-পুরুষের অবাধ অংশগ্রহণে বিশ্বকাপ দেখার নগ্ন প্রতিযোগিতা। যা তরুণদের নৈতিক ও মানবিক পঙ্গুত্ব যেমন নিশ্চিত করেছে, তেমনি হরণ করছে তাদের সততা ও আত্মমর্যাদার সৌন্দর্য।
হে প্রিয় তরুণ সমাজ! পরজীবী উন্মাদনার এই ঘোর থেকে বেরিয়ে এখন নিজেদের আত্মপরিচয় খোঁজার সময় এসেছে। একটি চামড়ার বলের পেছনে জীবনের মূল্যবান সময়, অর্থ আর তাজা প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া কোন বীরত্ব নয়, বরং তা চরম কাপুরুষতা। আয়োজক ও খেলোয়াড়েরা নিজেদের লাভের হিসাব ঠিকই বুঝে নিয়েছে, কিন্তু বিশ্বকাপকে ঘিরে যে ১২টি তাজা প্রাণ চিরতরে ঝরে গেল বা যে কোটি কোটি অর্থের নির্মম অপচয় হ’ল, তা কি আর কোনদিন ফিরে আসবে? দুনিয়া ও আখেরাতের চূড়ান্ত হিসাবের খাতায় এই উন্মাদনার ফলাফল একটি ফাঁকা বৃত্ত বা ‘শূন্য’ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই অন্য সব কোলাহল থামিয়ে নিজের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আজ শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজুন: যে ট্রফি অন্যের ঘরে যায়, তার উল্লাসে আমরা যে জীবনের অমূল্য সময়টুকু হারিয়ে ফেললাম-হাশরের ময়দানে এই শূন্য হাতের হিসাব আমরা কিভাবে মেলাব?
[1]. দৈনিক সময়ের আলো, ১৪ই জুলাই ২০২৬।
[2]. www.surl.li /kvhhck।