(১) গত ১৯শে মে মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুর-১১ পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামীসা ২য় শ্রেণীর ছাত্রী স্কুলে যাওয়ার প্রস্ত্ততিকালে পাশের ফ্লাটের প্রতিবেশী ইয়াবা সেবনে অভ্যস্ত সোহেল রানা তার স্ত্রীর সহযোগিতায় কৌশলে তাদের ফ্লাটে নিয়ে যায়। অতঃপর মেয়েটিকে ধর্ষণ করে হত্যা করে। অতঃপর দেহ থেকে মাথা কেটে নিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নির্মমভাবে টুকরা টুকরা করে লুকা তে চেষ্টা করে। ধরা পড়ার পর সে সব কিছু স্বীকার করে। এখন সে হাজতে। ২২.৫.২০২৬ তারিখের খুৎবায় আমরা বলেছিলাম, সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে বিচার শেষ করে আসামীকে ফাঁসিতে ঝুলাতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিচারবিভাগকে ধন্যবাদ যে, তাঁরা মাত্র ১৯ কার্যদিবসে বিচার শেষ করেছেন। এখন জাতি অপেক্ষায় আছে টিভিতে ওদের ঝুলন্ত লাশ দেখার জন্য। যদি এটা হয়, তাহ’লে দেশের ইতিহাসে সেটি রেকর্ড হবে। অপরাধীরাও সাবধান হবে।

(২) গত ১৮ই জুন রাজশাহী সরকারী নার্সিং কলেজের ‘চারু মামা’র ক্যান্টিনে ৩জন নামধারী শিক্ষার্থী মিলে একজন ৩২ বছরের তরতাজা যুবককে চোর সন্দেহে সন্ধ্যায় সকলের সম্মুখে পিটিয়ে হত্যা, (৩) ১৯শে জুন ময়মনসিংহের মুক্তগাছায় মা কর্তৃক নিজ গর্ভজাত ৮ মাস বয়সী শিশুপুত্রকে জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে হত্যা প্রচেষ্টা সমগ্র জাতির বিবেককে হতভম্ব করে দিয়েছে। এরূপ দেশব্যাপী সর্বত্র নিয়মিতভাবে মানবতার পরাজয় ঘটছে।

এগুলি হঠাৎ কোন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক অবক্ষয়েরই অনিবার্য পরিণতি। গণতান্ত্রিক দলীয় সরকার আসার পর নতুন উদ্যমে যেন এসব নোংরামি, চাঁদাবাজি, হত্যা, মাদক, কিশোর গ্যাং, পারিবারিক সহিংসতা, প্রতারণা ও নৈতিক অধঃপতনের ঘটনা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। আইন হয়, বিচার হয়; কিন্তু অপরাধের গ্রাফ আশঙ্কাজনক হারে বাড়তেই থাকে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীদের যেন পোয়া বারো। সরকার ও প্রশাসন এসবের সাময়িক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছেন বটে, কিন্তু রোগের শিকড় ধরে টান দিচ্ছেন না। অথচ এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অপরাধের মূল কারণ উদঘাটন এবং এর স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত যরূরী। এই স্থায়ী সমাধানই হ’ল ইসলামী বিচারব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ।

১৭৫৭-১৯৪৭ পর্যন্ত ১৯০ বছর বৃটিশের ঔপনিবেশিক আইনে আজও দেশ চলছে। যার মূল আদর্শিক ভিত্তি ছিল এই যে, (১) এটি মানবরচিত, যা মানুষের ভবিষ্যত কল্যাণ সম্পর্কে অজ্ঞ। (২) এখানে পারস্পরিক সম্মতিতে সংঘটিত ব্যভিচার, সমকামিতা বা মদ্যপানকে হয় ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হিসাবে দেখা হয় অথবা লঘু দৃষ্টিতে দেখা হয়। (৩) বৃটিশ বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা। (৪) এখানে ব্যক্তির অর্থ ও পদবী বিবেচনা তথা ফেসভ্যালুকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কখনই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

পক্ষান্তরে ইসলামী বিচার ব্যবস্থা আদর্শিক ভিত্তি হ’ল- (১) এটি আল্লাহ প্রেরিত। (২) এটি চিরন্তন কল্যাণের উৎস। (৩) এখানে বিচার নিরপেক্ষ হয় এবং বাদী ও বিবাদী উভয়ের যথাযথ প্রাপ্য দিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য সাক্ষ্য দানে অবিচল থাক এবং কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে অবিচারে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর, যা আল্লাহভীতির সর্বাধিক নিকটবর্তী। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত’ (মায়েদাহ ৫/৮)। (৪) এখানে অপরাধীর ব্যক্তিগত পরিচয় নয় বরং অপরাধের পরিমাণ অনুযায়ী বিচার হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমরা তাদের উপর বিধিবদ্ধ করেছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখম সমূহের বদলে যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সেটি তার জন্য কাফফারা হয়ে যায়। বস্ত্তত যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়ছালা করে না, তারাই যালেম’ (মায়েদাহ ৫/৪৫)। তিনি বলেন, ‘চোর পুরুষ হৌক বা নারী হৌক তার হাত কেটে দাও তার কৃতকর্মের ফল স্বরূপ। আল্লাহর পক্ষ হ’তে এটাই তার দন্ড। আর আল্লাহ মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’। ‘অতঃপর যে ব্যক্তি সীমালংঘনের পর তওবা করে ও সংশোধিত হয়, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (মায়েদাহ ৫/৩৮-৩৯)। কুরায়েশ নেতা আবু জাহলের সম্ভ্রান্ত মাখযূম গোত্রের জনৈকা মহিলা চুরির আসামী হয়। তাকে বাঁচানোর জন্য নেতাদের পক্ষে নাতি উসামা বিন যায়েদকে দিয়ে সুফারিশ করানো হয়। রাসূল (ছাঃ) বললেন, তুমি আমার নিকট আল্লাহর দন্ডবিধির ব্যাপারে সুফারিশ করছ? অতঃপর তিনি খুৎবা দিয়ে বলেন, তোমাদের পূর্বেকার উম্মত ধ্বংস হয়েছে একারণে যে, যখন তাদের মধ্যেকার কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোন দুর্বল শ্রেণীর লোক চুরি করত, তখন তাকে দন্ড দিত। আল্লাহর কসম! যদি আজ মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমাও চুরি করত, আমি তার হাত কেটে দিতাম’ (বুঃ মুঃ মিশকাত হা/৩৬১০)

(৫) ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতা নেই। যেমন আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য সাক্ষ্য দানে অবিচল থাক, যদিও সেটি তোমাদের নিজেদের কিংবা তোমাদের পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়। (বাদী-বিবাদী) ধনী হৌক বা গরীব হৌক, আল্লাহ তাদের সর্বাধিক শুভাকাংখী। অতএব ন্যায়বিচারে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল অথবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে জেনে রেখ আল্লাহ তোমাদের সকল কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত’ (নিসা ৪/১৩৫)

(৬) এখানে পরকালীন মুক্তির আশ্বাস দিয়ে অপরাধীকে সংশোধন ও তাকে আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ করা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তবে তারা ব্যতীত, যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন। বস্ত্তত আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু’ (ফুরক্বান ২৫/৭০)। সেকারণ অপরাধী নিজে তার শাস্তি চেয়ে নেয়। যেমন মা‘এয আসলামী ও গামেদী মহিলাকে তাদের স্বীকারোক্তিতে প্রদত্ত রজমের ঘটনা (মুসলিম হা/১৬৯৫; মিশকাত হা/৩৫৬৫)। 

বর্তমানে মানবতা বিধ্বংসী কর্মকান্ডে উস্কানিদাতা হিসাবে প্রধানত দায়ী হ’ল, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না থাকা এবং ইসলামী দন্ডবিধি সমূহের প্রয়োগ না থাকা। এর বাইরে আরো প্রভার বিস্তার করছে মিডিয়া, অপসংস্কৃতি, জুয়া, মাদক, পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাব, অফিস-আদালতে ব্যাপক ঘুষ ও দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়া। এগুলি দূর করার জন্য রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা অত্যন্ত যরূরী। সমাজনেতাদেরকে এবং সরকারকে অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, দল ও সরকার এক বস্ত্ত নয়। দল কেবল দলের, কিন্তু সরকার সবার। তাই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের আল্লাহভীরুতা নিয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রতি পদে পদে আল্লাহ তাকে দেখছেন ও তার কথা শুনছেন, এই দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে।

দল ও জনগণ ছাড়াও সবার উর্ধে আল্লাহর নিকটে তাকে কৈফিয়ত দেয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। যেমন খলীফা ওমর (রাঃ) বলেছিলেন, ‘যদি ফোরাত নদীর কূলে একটি বকরীর বাচ্চাও হারানো অবস্থায় মারা যায়, তাতে আমি বিশ্বাস করি যে, সেজন্য আল্লাহ আমাকে ক্বিয়ামতের দিন প্রশ্ন করবেন’। অর্থাৎ শাসক প্রজাসাধারণের দ্বীন ও দুনিয়ার পাহারাদার হবেন। এজন্য মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হ’তে হবে। মিডিয়াকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ইসলামী শিক্ষা অপরিহার্য করতে হবে। পরিবার ও সমাজে ইসলামী নৈতিকতা বাস্তবায়নে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। পশ্চিমা দাসত্ব পরিত্যাগ করে দেশে বিচার বিভাগের মাধ্যমে ইসলামী দন্ডবিধি সমূহ প্রয়োগ করতে হবে। সূদী অর্থনীতি বাতিল করে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক বিশুদ্ধ ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। যার বরকতে ওমর (রাঃ)-এর যুগে ইয়ামন সহ ইসলামী খেলাফতের কোথাও যাকাত নেওয়ার মতো কোন হকদার খুঁজে পাওয়া যেত না (দ্র. লেখক প্রণীত ‘যাকাত ও ছাদাক্বা’ বই পৃ. ১১, ৫৩ ও ১০৯)। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন।-আমীন! (স.স.)

১. মিডিয়া, অপসংস্কৃতি এবং অনৈতিক উন্মাদনা : সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অনুঘটক হ’ল মিডিয়া ও অপসংস্কৃতির লাগামহীন বিস্তার। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পর্দার আড়ালে যে বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও সহিংসতা তরুণ সমাজের মন-মগজে প্রতিনিয়ত প্রবেশ করানো হচ্ছে, তা তাদেরকে পাশবিকতায় প্ররোচিত করছে। সামান্য বিশ্বকাপ ফুটবল বা ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সর্বমহলে যে চরম উন্মাদনা চলছে, তা কোন সভ্য সমাজে কাম্য নয়। খেলার নামে জুয়াসহ এই উন্মাদনা এখন আর বিনোদন নেই। বরং তা রীতিমত এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। রাত জেগে হৈ-হূল্লোড়, ছালাতে অবহেলা, অর্থের অপচয়, ভিনদেশী পতাকায় দেশ ঢেকে ফেলা, অনলাইন জুয়া, বেটিং এবং এর জেরে সৃষ্ট সহিংসতা ও মারামারি যুবসমাজকে চরম নৈতিক অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের মধ্যে জন্ম দিচ্ছে সমাজের প্রতি দায়িত্বহীনতা, বল্গাহীন উগ্রতা, অপরাধপ্রবণতা আর হতাশা। অপরদিকে সীমাহীন অশ্লীলতা, সহিংসতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অনৈতিক সম্পর্ক, ভোগবাদ এবং নিকৃষ্ট অপরাধকে বিনোদনের উপাদান হিসাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা মানুষের ফিৎরাত ও লজ্জাবোধকে চূড়ান্তভাবে ক্ষয় করছে। প্রযুক্তি আল্লাহর একটি নে‘মত; কিন্তু যখন সেটি নৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তখন তা সমাজ ধ্বংসের পারমাণবিক অস্ত্রে পরিণত হ’তে পারে।

২. জুয়া ও মাদকের সর্বনাশা ছোবল : অপসংস্কৃতির সাথে সমাজে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বেটিং বা জুয়া। স্মার্টফোনের পর্দায় অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে হাযারো তরুণ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। জুয়ার টাকার জোগান দিতে গিয়ে তারা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই এবং হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদকের সর্বগ্রাসী বিস্তার। মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না; একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয়। অসংখ্য হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই ও পারিবারিক সহিংসতার পিছনে মাদকের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন এবং আপোষহীন রাষ্ট্রনীতি। মাদকের সহজলভ্যতা আজ সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজের পিতা-মাতা থেকে শুরু করে যেকোন মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচার বা ধর্ষণ করতে দ্বিধাবোধ করে না। রামিসা হত্যাকান্ডের মতো অধিকাংশ পাশবিক ঘটনার নেপথ্যে এই মাদক ও জুয়ার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব লক্ষণীয়।

৩. পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাব : পরিবার হ’ল একজন মানুষের প্রথম শিক্ষাগার। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ পরিবারগুলোতে দ্বীনী শিক্ষার চরম অভাব। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী দেখছে, কাদের সাথে মিশছে, সেদিকে অভিভাবকদের কোন খেয়াল নেই। বস্ত্তবাদী শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের সন্তানদের ক্যারিয়ারমুখী করলেও, তাদেরকে একজন নীতিবান মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। পরকালীন জবাবদিহিতা বা ‘আখিরাত’-এর ভয় অন্তরে না থাকার কারণেই মানুষ অবলীলায় অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া সহজ; কিন্তু তার অন্তরে আল্লাহভীতি, লজ্জাশীলতা, সততা ও মানবিকতা সৃষ্টি করা কঠিন। এই কঠিন কাজটিই আজ অধিকাংশ পরিবার এড়িয়ে যাচ্ছেন। অভিভাবকরা সন্তানের পরীক্ষার ফল নিয়ে যত উদ্বিগ্ন, তার চরিত্র ও দ্বীনি শিক্ষার ব্যাপারে ততটা সচেতন নন। অথচ রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে (ক্বিয়ামতের দিন) স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’ (বুঃ মুঃ মিশকাত হা/৩৬৮৫)। তাই পরিবারে ইসলামী আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ ছাড়া কোন আইনই দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে নিরাপদ করতে পারবে না।

৪. অপরাধ দমনে ইসলামী দন্ডবিধির প্রয়োজনীয়তা : রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হ’ল মানুষের জান, মাল ও ইয্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ বা প্রভাবের কারণে আইনের নাগালের বাইরে থাকার আশা করে, তখন অপরাধের সাহস বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই অপরাধ দমনে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কোন ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী নয়-অপরাধই হবে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ। সরকার ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবে প্রতিফলিত হলেই কেবল জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জুয়া এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধের পেছনে প্রায়শই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী চক্র জড়িত থাকে। এজন্য আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। অপরাধী যেই হোক, কোন রাজনৈতিক পরিচয় যেন তাকে বিচারের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তাই মানব রচিত কোন দুর্বল আইন নয়, বরং ইসলামী দন্ডবিধি (হুদূদ ও ক্বিছাছ) বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল সমাজ থেকে এসব অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব।

ইসলামে অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করাকে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর হে জ্ঞানীগণ! হত্যার বদলে হত্যার মধ্যে তোমাদের জীবন নিহিত রয়েছে, যাতে তোমরা সতর্ক হও’ (বাক্বারাহ ২/১৭৯)। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নিশ্চিত বিচারই সম্ভাব্য অপরাধীকে অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করে এবং নিরপরাধ মানুষের জীবনকে নিরাপদ করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগ এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে বিচারব্যবস্থার মূলনীতি ছিল আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। কোন ক্ষমতাবান ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে ছাড় দেওয়া হ’ত না। নবী করীম (ছাঃ) ঘোষণা করেছিলেন, যদি আজ মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা চুরি করত, আমি তার হাত কেটে দিতাম’ (বুঃ মুঃ মিশকাত হা/৩৬১০)। এই ন্যায়পরায়ণতাই ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল।

আজ আমাদের মানবিক মূল্যোবোধ ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন কেবল অপরাধীর শাস্তি নয়; বরং অপরাধের উৎস নির্মূল করা। মিডিয়ায় নৈতিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা, অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতির বিস্তার রোধ, পর্ণোগ্রাফী, জুয়া ও অনলাইন বেটিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, মাদক নির্মূলে সর্বাত্মক অভিযান, পরিবারভিত্তিক নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরিত্র গঠনমূলক পাঠক্রম এবং সর্বোপরি দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা। এসব একসঙ্গে বাস্তবায়িত হ’লেই কাংখিত পরিবর্তন আসতে পারে ইনশাআল্লাহ। রামিসা আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার রক্ত যেন আরেকটি সংখ্যা মাত্র হয়ে না যায়। প্রতিটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সামনে কেবল এই প্রশ্নই রেখে যায়-আমরা কি শুধু শোক প্রকাশ করব আর বিচার দাবী করব? নাকি সমাজকে বদলানোর সাহস দেখাব? বাংলাদেশের মানুষ একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ চায়। সেই সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে না কেবল নতুন আইন প্রণয়নে। বরং আল্লাহভীতি, নৈতিকতা, পারিবারিক শিক্ষা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ইসলামী শাসনব্যস্থা ও ন্যায়বিচারের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে। এ পথই অপরাধমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশের সর্বাধিক বাস্তবসম্মত পথ। রাববুল আলামীন আমাদের সমাজকে সকল প্রকার মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে হেফাযত করুন এবং ইসলামী আদর্শের আলোকে একটি নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ার তাওফীক দান করুন।-আমীন! (স.স.)






আন্তঃধর্ম শান্তি সম্মেলন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
হালাকু-র পুনরাবির্ভাব ও আমাদের করণীয় - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ইরাকে মার্কিন হামলা : বিশ্ব বিবেক জেগে ওঠ - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ইসলামী খেলাফত : জাতির নিকটে আমাদের প্রস্তাব - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
মানুষকে ভালবাসুন! - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিন! - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করুন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছাড়েন না! - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
মযলূমের বিজয় ও যালেমের পরাজয় অবধারিত - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
সত্যদর্শন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
জাতীয় সংসদ নির্বাচন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
দেশ ধ্বংসে সর্ববৃহৎ অস্ত্রের চালান : হিংসাত্মক রাজনীতির ফল - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আরও
আরও
.