বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে শিশুরা এই রোগে বেশী আক্রান্ত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় দ্রুত এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সঠিক সময়ে সচেতনতা অবলম্বন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
হাম কী এবং কেন হয় : হাম মূলত ‘মিজেলস’ (Measles) নামক এক প্রকার অতি-ছোঁয়াচে ভাইরাসের সংক্রমণে হয়ে থাকে। এই ভাইরাসটি প্রথমেই মানুষের শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং পরবর্তীতে রক্তের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য কোষে ছড়িয়ে পড়ে। এটি এতই সংক্রামক যে, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা টিকা না-নেওয়া প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই এই রোগে আক্রান্ত হ’তে পারে। সাধারণত রোগীর হাঁচি-কাশি থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্র তরল ফোটা বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এই ভাইরাস বাতাসে ছড়ায়। পরবর্তীতে কোন সুস্থ মানুষ সেই বাতাস গ্রহণ করলে ভাইরাসটি তার শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে তাকেও সংক্রমিত করে। উল্লেখ্য, হামে সাধারণত ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরাই বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকে।
হামের উপসর্গ ও লক্ষণসমূহ :
ভাইরাস শরীরে প্রবেশের সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন পর রোগটির লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। হামের ক্ষেত্রে সাধারণত পর্যায়ক্রমে নিচের উপসর্গগুলো দেখা যায় :
১. প্রাথমিক লক্ষণ : শুরুতেই রোগীর অত্যধিক ক্লান্তি বা অবসাদ বোধ হয় এবং খাওয়ার রুচি একেবারেই কমে যায়। এর সাথে সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
২. তীব্র জ্বর : প্রথমদিকে জ্বর কিছুটা কম থাকলেও ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। অনেক সময় এই জ্বর ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।
৩. লালচে গুটি বা র¨vশ : জ্বর শুরু হওয়ার ৩ থেকে ৫ দিন পর মুখমন্ডল ও কানের পেছন থেকে ছোট ছোট লালচে দানা বা র¨vশ বের হতে শুরু করে, যা খুব দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
৪. চুলকানিহীন দানা : উল্লেখযোগ্য বিষয় হ’ল, হামের কারণে শরীরে উঠা এই লালচে দানা বা র¨vশে সাধারণত কোন চুলকানি থাকে না।
হামের ক্ষতিকর দিক ও জটিলতা : সঠিক সময়ে যত্ন না নিলে হাম থেকে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে
পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা ও টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে হামের কারণে সিভিয়ার নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের ইনফেকশন, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং অন্ধত্বের মতো ভয়াবহ পরিণতি ঘটতে পারে।
হামের চিকিৎসা ও করণীয় :
সাপোর্টিভ কেয়ার : জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে কুসুম গরম পানি দিয়ে গা মুছে দিতে হবে।
তরল খাবার : প্রচুর পানি, ডাবের পানি, ফলের রস ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে, যাতে পানিশূন্যতা না হয়।
ভিটামিন এ : চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হামের চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্রাম ও আইসোলেশন : রোগীকে আলাদা রুমে বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রচুর আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রতিরোধ : হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত উপায় হ’ল সঠিক সময়ে শিশুকে হাম ও রুবেলার (MR/MMR) টিকা দেওয়া। শিশুর ৯ মাস পূর্ণ হ’লে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
উপসর্গ দেখা দিলে কী করবেন?
হামের উপসর্গ দেখা দিলে ঐ শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখুন এবং দ্রুততম সময়ে নিকটস্থ সরকারী হাসপাতাল বা একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করতে হবে। আক্রান্ত রোগী বুকের দুধ পান করা শিশু হ’লে এ সময় কোনভাবেই তা বন্ধ করা যাবে না। এছাড়া ভাইরাসের বিস্তার রোধে রোগী এবং সেবাদানকারী উভয়কেই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং রোগীকে জনসমাগমপূর্ণ স্থানে নেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
বিপজ্জনক লক্ষণ : ডায়রিয়া, বারবার বমি হওয়া, কান পাকা (কান থেকে পুঁজ বা পানি পড়া), শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা শিশু নিস্তেজ হয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে হাসপাতালে নিতে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়।
পরিশেষে বলব হাম একটি ঝুঁকিপূর্ণ রোগ। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব ইনশাআল্লাহ।
ডা. মেহেদী হাসান মনিম
মেডিসিন চিকিৎসক ও সদস্য, আহলেহাদীছ পেশাজীবী ফোরাম।