উৎসব মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এবং চিত্তবিনোদনের এক অনিবার্য মাধ্যম। ইসলাম মানুষের এই স্বাভাবিক চাহিদাকে অস্বীকার করেনি। বরং সুন্নাহ ভিত্তিক ‘দুই ঈদ’-এর মাধ্যমে এক প্রশান্তিময় ও পবিত্র উৎসবের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে উৎসবের নামে বাদ্য-বাজনা, নগ্নতা, নারী-পুরুষের অবাধ মিশ্রণ ও শিরকী কর্মকান্ডের যে সয়লাব চলছে, তা মুমিন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। বিশেষ করে ‘পহেলা বৈশাখ’ বা বর্ষবরণকে যেভাবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ এবং ইসলামী লেবাস পরিয়ে উদযাপিত করা হচ্ছে, তার গভীরে লুকিয়ে আছে মারাত্মক ঈমানবিধ্বংসী উপাদান। সচেতন মুমিন হিসাবে বর্ষবরণের এই অন্ধকার দিকগুলো এবং এর নেপথ্য ইতিহাস জানা আজ সময়ের অপরিহার্য দাবী।

বাংলা সনের উৎপত্তি ও প্রেক্ষাপট : ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, মুঘল সম্রাট আকবর হিজরী ৯৬৩ সালকে ভিত্তি ধরে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এবং তাঁর হিন্দু প্রজাদের সন্তুষ্ট করতে ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ বা ফসলী সনের প্রবর্তন করেন। এটি মূলত সৌরবর্ষের হিসাব।[1] পরবর্তীতে পন্ডিত ফতেহ উল্লাহ সিরাজীর মাধ্যমে এটি বর্তমান ‘বাংলা সন’ হিসাবে পরিচিতি পায়।[2] আধুনিক যুগে ১৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশে ১৪ই এপ্রিলকে পহেলা বৈশাখ হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়। মূলত নববর্ষ কোন উদযাপনের বিষয় নয়। বরং হিসাব কষার দিন।

পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নেপথ্য ইতিহাস : পহেলা বৈশাখের সূচনা মূলত মোঘল সম্রাট আকবরের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত সংস্কারের ফসল। তৎকালীন সময়ে চান্দ্র হিজরী সনের সাথে ফসলের মৌসুমের অমিল হওয়ায় খাজনা আদায়ে যে জটিলতা হত, তা নিরসনে আকবরের সিংহাসনাহরণের বছর ৯৬৩ হিজরীকে ভিত্তি করে সৌরবর্ষের হিসাবে ‘ফসলী সন’ বা বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। চৈত্র সংক্রান্তিতে প্রজারা খাজনা পরিশোধ করত এবং পরের দিন পহেলা বৈশাখে জমিদাররা ‘হালখাতা’র মাধ্যমে নতুন হিসাব শুরু করতেন। তবে এই উৎসবের গভীরে ছিল আকবরের প্রবর্তিত সমন্বয়বাদী ধর্ম ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র প্রভাব। মূলত তাঁর হিন্দু স্ত্রীদের তুষ্ট করা এবং হিন্দু প্রজাদের দাবির প্রেক্ষিতে একটি ‘সার্বজনীন’ বা খিচুড়ি মার্কা উৎসব তৈরি করাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। ফলে পহেলা বৈশাখ নিছক কোন কর আদায়ের মাধ্যম হয়ে থাকেনি; বরং এটি হয়ে ওঠে হিন্দুয়ানি কৃষ্টি ও বিজাতীয় সংস্কৃতির এক সংমিশ্রিত রূপ, যা মুসলিম উম্মাহর স্বকীয়তাকে মলান করে দেয়।

বর্তমান বর্ষবরণের চিত্র : বর্তমানে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান মানেই যেন বিজাতীয় কৃষ্টি ও কুসংস্কারের এক প্রদর্শনী। থার্টি ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি ও নাচ-গানের উন্মত্ততা যেমন বিশ্বজুড়ে প্রচলিত, বাংলাদেশে বৈশাখ বরণের চিত্রও ঠিক তেমনি ভয়াবহ। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গানের মাধ্যমে সূর্যকে স্বাগত জানানো মূলত প্রাচীন সূর্যপূজারই নামান্তর। রমনার অশ্বত্থমূলে (যা প্রচলিত ভুল শব্দে ‘বটমূল’ নামে পরিচিত) ছায়ানটের যে আয়োজনের সূচনা হয়, তার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায় চারুকলার ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র মাধ্যমে। সমৃদ্ধি কামনার দোহাই দিয়ে হাতি, ঘোড়া ও বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তি-মুখোশ নিয়ে যে মিছিল বের করা হয়, তা মূলত পৌত্তলিক সংস্কৃতিরই সফল বিচরণ। অসাম্প্রদায়িকতার দোহাই দিয়ে একশ্রেণীর মুসলিম আজ নিজস্ব ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে হিন্দুয়ানি রীতির লৌহ নিগড়ে আবদ্ধ হচ্ছে। তথাকথিত এই ধর্মনিরপেক্ষ ও মিকশ্চার উৎসবের আড়ালে মূলত শিরকী ও অশ্লীল সংস্কৃতির বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা মুমিনের ঈমানী চেতনার সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক।

বর্ষবরণের অন্ধকার দিকসমূহ : বর্তমানে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে যেসব অনুষঙ্গ যোগ হয়েছে, তা সরাসরি ইসলামী আক্বীদার সাথে সাংঘর্ষিক। যেমন-

সূর্যপূজা ও মঙ্গল কামনা : সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো মূলত প্রাচীন সূর্যপূজারই নামান্তর। মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে হাতি, ঘোড়া, হুতুম পেঁচা ও বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তি-মুখোশ প্রদর্শন করা হয়, যাকে মঙ্গলের প্রতীক মনে করা হয়। অনেকের বিশ্বাস বছরের প্রথম দিন ভালো খেলে বা ভালো পরলে পুরো বছর ভালো যাবে। অথচ রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘কুলক্ষণে বিশ্বাস করা শিরক’।[3] দুর্ভাগ্য, মুসলিমরা আজ এসব শিরকী তকমাযুক্ত মূর্তিকে কল্যাণের বাহন মনে করছে।

মূর্তি ও রেপ্লিকার মিছিল : ১৯৮৬ সালে যশোরের ‘চারুপীঠ’ থেকে শুরু হওয়া ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বর্তমানে শিরকের এক মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। শুরুতে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পশুপাখি ও ভূতের রেপ্লিকা ব্যবহৃত হ’লেও বর্তমানে এটি ‘মঙ্গল কামনার’ ধর্মীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত হাতি, ঘোড়া ও বিভিন্ন মুখোশ সরাসরি হিন্দুয়ানি কৃষ্টির অনুকরণমাত্র। যা মুসলিম তাওহীদী চেতনার সম্পূর্ণ বিরোধী। ছবি ও মূর্তির ব্যাপারে ইসলামের বিধান অত্যন্ত কঠোর। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একটিমাত্র ছবি তৈরী করবে তাকে শাস্তি দেয়া হবে এবং তাতে আত্মা দিতে বাধ্য করা হবে। কিন্তু তার জন্য এটি কখনোই সম্ভব নয়’[4]

গান-বাজনা ও অপসংস্কৃতি : বর্ষবরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে গান-বাজনা। অথচ কুরআন ও সুন্নাহতে বাদ্যযন্ত্রকে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে (লোকমান ৩১/৬; মিশকাত হা/৪৫০৩)

বেহায়াপনা ও নারী-পুরুষের মিশ্রণ : উৎসবের নামে তরুণ-তরুণীদের অবাধ মেলামেশা ও অশালীন পোষাক পরিধান সমাজকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এ জাতীয় নারীদের সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেল, ‘দুই শ্রেণীর জাহান্নামী রয়েছে, যাদের আমি এখনও দেখিনি। এর মধ্যে একটি শ্রেণী হ’ল- নগ্ন পোষাক পরিধানকারী নারী, যারা পুরুষদেরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করে এবং নিজেরাও পুরুষের দিকে আকৃষ্ট হয়। তাদের মাথা বক্র উঁচু কাঁধ বিশিষ্ট উটের ন্যায়। এই নারীরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না। অথচ তার সুগন্ধি এত এত দূর থেকে পাওয়া যায়’।[5] উল্লেখ্য, যে সকল পুরুষ অভিবাবক তার পরিবারে বেহায়া-বেলাল্লাপনা ও অশ্লীলতার সুজোগ দেন হাদীছৈ তাদেরকে ‘দাইয়ূস’ বলা হয়েছে। আর দাইয়ূস কখনো জান্নাতে যাবে না।[6]

পান্তা-ইলিশ ও অপচয় : বর্তমানে পান্তা-ইলিশকে বৈশাখের হাযার বছরের ঐতিহ্য দাবী করা হ’লেও এর ইতিহাস অত্যন্ত নবীন ও কৃত্রিম। ১৯৮৩ সালে ৫ সেগুনবাগিচায় এক আড্ডার মধ্য দিয়ে জনৈক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ও তাঁর সঙ্গীদের হাত ধরে এর সূচনা হয়।[7] অথচ ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে এক দিনে পান্তা-ইলিশ ভোজনের নামে যে বিপুল অর্থ ব্যয় ও উৎসবের উন্মত্ততা তৈরি করা হয়, তা বিজাতীয় প্রথার অন্ধ অনুকরণ এবং সময়ের চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। এরূপ অহেতুক কর্মকান্ড ও অপচয় মুমিনের বৈশিষ্ট্য হ’তে পারে না।

‘ইসলামীকরণের’ নামে ভ্রান্ত সমন্বয়বাদ ও সাংস্কৃতিক জালিয়াতি : সাম্প্রতিককালে কিছু ইসলামী নামধারী দল বা গোষ্ঠী পহেলা বৈশাখকে ইসলামী লেবাস পরিয়ে বৈধ করার এক অদ্ভুত কসরত করছে। তারা মঙ্গল শোভাযাত্রার বিপরীতে বিভিন্ন ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নামছে, বাদ্যযন্ত্রের বদলে ইসলামী সঙ্গীত বা দফের ব্যবহার করছে এবং ‘শুভ নববর্ষ’-এর পরিবর্তে বাংলা নবযাত্রা বা ‘ইসলামী নববর্ষ’ হিসাবে এটিকে জায়েয করার চেষ্টা করছে। এটি মূলত দ্বীনের মৌলিক আদর্শের সাথে এক ধরণের চতুরতা ও ‘সাংস্কৃতিক জালিয়াতি’।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন সেখানে প্রচলিত ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ উৎসব দু’টিকে তিনি সংস্কার বা ইসলামীকরণ করেননি; বরং সেগুলো সরাসরি বাতিল করে সম্পূর্ণ পৃথক ও পবিত্র দু’টি ঈদের প্রচলন করেছেন। মূলত পহেলা বৈশাখের ভিত্তি যেখানে সম্রাট আকবরের ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র সমন্বয়বাদী চিন্তা এবং পৌত্তলিক সূর্যপূজার আবহে তৈরি, সেখানে ইসলামী লেবাস পরানো মানে হ’ল সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটানো। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না’ (বাক্বারাহ ২/৪২)

বিজাতীয় উৎসবের দিনে পাল্টা মিছিল বা সমাবেশ করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সেই দিনটিকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা মুসলিম উম্মাহর স্বতন্ত্র পরিচয়কে ধ্বংস করে দেয়। এটি প্রকারান্তরে রাসূল (ছাঃ)-এর সেই হুঁশিয়ারিরই অন্তর্ভুক্ত ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে’।[8] সারকথা হ’ল পহেলা বৈশাখকে ইসলামীকরণ করার চেষ্টা বিষাক্ত পাত্রকে পবিত্র পানি দিয়ে ধুয়ে পান করার নামান্তর। মুমিনের কাজ বিজাতীয় সংস্কৃতির সংস্কার বা অনুকরণ নয়, বরং তা বর্জন করে নিঃশর্তভাবে কুরআন ও সুন্নাহর সংস্কৃতিতে ফিরে আসা।

উপসংহার: বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ইসলামী শরী‘আতের সাথে সাংঘর্ষিক একটি বিজাতীয় সংস্কৃতি। অপরদিকে মুমিন জীবন এলাহী বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগে যা পালনীয় ছিল না, এ যুগেও তা ইবাদত বা সংস্কৃতির অংশ হ’তে পারে না। পহেলা বৈশাখের নামে যে শিরকী কর্মকান্ডে অর্থের অপচয় এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মহড়া চলে, তা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক ভয়াবহ ফিৎনা। সচেতন মুমিনদের উচিত এই অপসংস্কৃতির থাবা থেকে নিজে বাঁচা এবং নিজের পরিবার ও সমাজকে মুক্ত রাখা। নতুন বছর মানেই হায়াত থেকে একটি বছর হারিয়ে যাওয়া এবং কবরের নিকটবর্তী হওয়া। তাই উৎসবের উন্মত্ততায় না মেতে বিগত জীবনের ভুল-ভ্রান্তির জন্য তওবা করা এবং আগামী দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার সংকল্প করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন- আমীন!

 

[1]. বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ এপ্রিল ২০১৪, পৃ. ৭

[2]. গোলাম আহমাদ মোর্তাযা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃ. ১০৫।

[3]. আবূদাউদ হা/৩৯১২; ইবনু মাজাহ হা/৩৫৩৮; মিশকাত হা/৪৫৮৪।

[4]. বুখারী, মিশকাত হা/৪৪৮৯।

[5]. মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫২৪।

[6]. ছহীহুল জামে‘ হা/৩০৫২।

[7]. বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ই এপ্রিল ২০১৪

[8]. আবূদাঊদ হা/৪০৩১; মিশকাত হা/৪৩৪৭।






বিষয়সমূহ: বিধি-বিধান
আরও
আরও
.