অর্থনীতি বা রাজনীতি নয় বরং আমাদের সমাজব্যবস্থা মূলত পরিচালিত হয় চেতনা ও আদর্শের দ্বারা। যে জাতি তার আদর্শিক অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে জাতি স্থায়ীভাবে সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণ করে। বর্তমান যুগে এই আদর্শিক সংগ্রামের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে প্রিন্ট ও ইলেট্রনিক মিডিয়া। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, ইউটিউব, এক্স তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সমূহের সবখানেই চলছে ন্যারেটিভ বা বয়ান নির্মাণের এক অদৃশ্য লড়াই। একদিকে চলছে সেক্যুলার বয়ান, যা গণতন্ত্রের নামে পাশ্চাত্যের আগ্রাসন, লুটতরাজ, আধিপত্যবাদ, দুর্নীতি ও অনাচারকে ‘আধুনিকতা’ বলে চালিয়ে দিতে চায়। অন্যদিকে ইসলামী আদর্শ, যা আল্লাহর আইনের ভিত্তিতে সত্য ও ন্যায়ের সমাজ কায়েম করতে চায়।

জাহেলী আরবের প্রধান মিডিয়া ছিল কবিতা। ইসলামী যুগেও উভয় পক্ষে কবিতার লড়াই চলত। বিরোধীরা রাসূল (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধে নানা অপবাদ দিয়ে ১৬টি মিথ্যা ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করেছিল। কিন্তু তার বিপরীতে রাসূল (ছাঃ) শক্তিশালী ঢাল এবং প্রতিরোধ ব্যূহ হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন নিজের আদর্শকে। তিনি আল্লাহ প্রেরিত অহি-র বিধান অনুসরণে অবিচল ছিলেন। ফলে অচিরেই প্রচলিত শিরকী সমাজ পরিবর্তিত হয়ে ইসলামী সমাজে পরিণত হয়। অদ্যাবধি বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব চলছে। রাসূল (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী পৃথিবীর এমন কোন বস্তিঘর বা তাঁবুর ঘর বর্তমানে নেই, যেখানে ইসলামের দাওয়াত প্রবেশ করেনি। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায় দ্বারা পূর্ণ। তাঁর বাণীর পরিবর্তনকারী কেউ নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’। ‘অতএব যদি তুমি জনপদের অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল, তাহ’লে ওরা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুৎ করবে। তারা তো কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং তারা তো কেবল অনুমান ভিত্তিক কথা বলে’ (আন‘আম ৬/১১৫-১১৬)। 

৪৭’-এর চেতনা ও মানচিত্রের উপরেই ৭১’-য়ে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। উভয় চেতনার মূলে ছিল ‘ইসলাম’। অথচ বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই তৈরী করা হয় এক মিথ্যা বয়ান। যার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিতে ইসলামকে বাদ দিয়ে পার্শ্ববর্তী আধিপত্যবাদী শক্তির চেতনা তথা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও জাতীয়তাবাদকে যবরদস্তিভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। যেখানে ইসলামকে কোনঠাসা করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখা হয়। কে না জানে যে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ প্রথমে মানুষকে ইসলামের বন্ধন হ’তে মুক্ত করে। অতঃপর ‘গণতন্ত্র’ তাকে মানুষের গোলাম বানায়। অতঃপর ‘জাতীয়তাবাদ’ তাকে ধর্ম-বর্ণ, ভাষা ও অঞ্চলে বিভক্ত করে। অতঃপর ‘বিভক্ত কর ও শাসন কর’ এই শয়তানী নীতি তাকে স্থায়ীভাবে শোষণ ও দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ জীবে পরিণত করে। সেখান থেকে বের হবার কোন পথ সে খুঁজে পায়না

অথচ সূর্য-চন্দ্র, নদী-সাগর ও বায়ু প্রবাহের কল্যাণকারিতা যেমন সকল প্রাণীর জন্য সমান, ইসলামের ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সামাজিক কল্যাণের শিক্ষা তেমনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য কল্যাণকর। এই অমোঘ সত্য ও বাস্তবতাকে জ্ঞান, যুক্তি ও মিডিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরা যরূরী। এজন্য কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বিশুদ্ধ শিক্ষা, ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস এবং মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে সামনে রেখে একটি ইতিবাচক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বয়ান নির্মাণ করা আবশ্যক। এজন্য আমাদের আদর্শিক চেতনার মূল বয়ান হ’ল ‘সকল বিধান বাতিল কর, অহি-র বিধান কায়েম কর’। ‘আমরা চাই এমনটি ইসলামী সমাজ, যেখানে থাকবে প্রগতির নামে কোন বিজাতীয় মতবাদ; থাকবে না ইসলামের নামে কোনরূপ মাযহাবী সংকীর্ণতাবাদ’। আমরা বলেছি, ‘মুক্তির একই পথ, দাওয়াত ও জিহাদ’। আমাদের লক্ষ্য হ’ল, নির্ভেজাল তাওহীদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে কিতাব ও সুন্নাতের যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আক্বীদা ও আমলের সংশোধনের মাধ্যমে সমাজের সার্বিক সংস্কার সাধন আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য’।

উপরোক্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও চেতনা বিনির্মাণের জন্য এখন বিশেষভাবে প্রয়োজন একদল প্রশিক্ষিত, তাক্বওয়াশীল ও আল্লাহর পথের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। যারা একদিকে কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর জ্ঞান দ্বারা সমৃদ্ধ হবেন, অন্যদিকে সমকালীন বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, গণমাধ্যম ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে পরিচিত থাকবেন। তারা হবেন জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এমন চিন্তাশীল নেতৃত্ব-যারা প্রখর দায়িত্ববোধ নিয়ে যুক্তির ভাষায় কথা বলবেন। যারা ঈমান ও নৈতিকতার বর্মে সুরক্ষিত থাকবেন। এই দলটি হবেন মাদ্রাসা-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে অনলাইন প্লাটফরম পর্যন্ত সর্বত্র সক্রিয়। যারা ফেসবুক-ইউটিউবে শুধু বক্তৃতা দিবেন না, বরং তথ্য-প্রমাণসহ সেক্যুলার মিথ্যা বয়ানকে পরাজিত করবেন। এছাড়া সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অনাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামও ইসলামী দাওয়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আমরা সেই পথেই সমাজের তরুণ, যুবক ও সচেতন নাগরিকসমাজকে আহবান জানাই। 

‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ ধৈর্য ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে সার্বিক সমাজ সংস্কারের আহবান জানায়। আমাদের রাসূল (ছাঃ)-কে ক্ষমতা ও নেতৃত্বের টোপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। সেকারণ প্রচার, সংগঠন, প্রশিক্ষণ ও এর মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের ধারাবাহিক পদ্ধতিতেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই। বাতিলের সুসংগঠিত মিথ্যা বয়ান সমূহের বিরুদ্ধে আদর্শিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সামাজিক সংস্কারের নিরন্তর প্রচেষ্টাই হ’ল আমাদের স্থায়ী কর্মসূচি।

অতএব বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের কর্তব্য হবে, বাতিলের চতুর্মুখী হামলার বিপরীতে ইসলামের চিরন্তন সত্যের ঝান্ডাকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা। বাতিলের সাথে আপোষ নয়, বরং বাতিলকে হক দিয়ে সর্বোতভাবে মোকাবিলা করা। এই পথেই একদিন মানুষ সত্যকে উপলব্ধি করবে ইনশাআল্লাহ এবং চুড়ান্তভাবে বুঝতে পারবে যে, আধুনিকতার নামে প্রচলিত গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নয়, বরং ইসলামের খেলাফত ব্যবস্থাই মানবজাতির চূড়ান্ত ঠিকানা। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন।-আমীন! (স.স.)






ভারত ভাগ হয়ে যাচ্ছে - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
বাঁচার পথ - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
দেশ ধ্বংসে সর্ববৃহৎ অস্ত্রের চালান : হিংসাত্মক রাজনীতির ফল - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
হে আল্লাহ! সৎ ও সাহসী নেতা দাও - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আগামীর গন্তব্য
নিহত আবরার নিহত দেশপ্রেম - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
তবে কি বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র? - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
কুরবানীর সংজ্ঞা - .
হালাকু-র পুনরাবির্ভাব ও আমাদের করণীয় - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
বিজয়ের মাস ও পার্বত্য চুক্তি - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
সার্বভৌমত্ব দর্শন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
গণজোয়ার ও গণঅভ্যুত্থান - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আরও
আরও
.