ঈদে মীলাদুন্নবী

সংজ্ঞা : ‘জন্মের সময়কাল’কে আরবীতে ‘মীলাদ’ বা ‘মাওলিদ’ বলা হয়। সে হিসাবে ‘মীলাদুন্নবী’-র অর্থ দাঁড়ায় ‘নবীর জন্ম মুহূর্ত’। নবীর জন্মের বিবরণ, কিছু ওয়ায ও নবীর রূহের আগমন কল্পনা করে তার সম্মানে উঠে দাঁড়িয়ে ‘ইয়া নবী সালাম ‘আলায়কা’ বলা ও সবশেষে জিলাপী বিতরণ করা- এই সব মিলিয়ে ‘মীলাদ মাহফিল’ ইসলাম প্রবর্তিত ‘ঈদুল ফিতর’ ও ‘ঈদুল আযহা’-র দু’টি বার্ষিক ঈদ উৎসবের বাইরে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ নামে তৃতীয় আরেকটি ধর্মীয় (?) অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

উৎপত্তি : ক্রুসেড বিজেতা মিসরের সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী (৫৩২-৫৮৯ হি.) কর্তৃক নিযুক্ত ইরাকের ‘এরবল’ এলাকার গভর্ণর আবু সাঈদ মুযাফফরুদ্দীন কুকুবুরী (৫৮৬-৬৩০ হি.) সর্বপ্রথম ৬০৪ হিজরীতে মতান্তরে ৬২৫ হিজরীতে মীলাদের প্রচলন ঘটান। যা ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর ৫৯৩ বা ৬১৪ বছর পরে। এই দিন তারা মীলাদুন্নবী উদযাপনের নামে নাচ-গান সহ চরম স্বেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত হ’ত। গভর্ণর নিজে নাচে অংশ নিতেন। আর এই অনুষ্ঠানের সমর্থনে তৎকালীন আলেম সমাজের মধ্যে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন আবুল খাত্ত্বাব ওমর বিন দেহিইয়াহ (৫৪৪-৬৩৩ হি.)। তিনি মীলাদের সমর্থনে বহু জাল ও বানাওয়াট হাদীছ জমা করে বই লেখেন এবং এক হাযার স্বর্ণমুদ্রা বখশিশ পান।[1]

হুকুম : ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন একটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত। যা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগে ছিল না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি আমাদের শরী‘আতে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’।[2] তিনি আরও বলেন,وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ، ‘তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি করা হ’তে বিরত থাক। নিশ্চয়ই প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই বিদ‘আত ও প্রত্যেক বিদ‘আতই গোমরাহী’।[3] অন্য বর্ণনায় এসেছে, وَكُلَّ ضَلاَلَةٍ فِى النَّارِ، ‘এবং প্রত্যেক গোমরাহীর পরিণাম জাহান্নাম’।[4]

মীলাদ বিদ‘আত হওয়ার ব্যাপারে চার মাযহাবের ঐক্যমত : ‘আল-ক্বাওলুল মু‘তামাদ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, চার মাযহাবের সেরা বিদ্বানগণ সর্বসম্মতভাবে প্রচলিত মীলাদ অনুষ্ঠান বিদ‘আত হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। তাঁরা বলেন, এরবলের গভর্ণর কুকুবুরী এই বিদ‘আতের হোতা। তিনি তার আমলের আলেমদেরকে মীলাদের পক্ষে মিথ্যা হাদীছ তৈরী করার ও ভিত্তিহীন ক্বিয়াস করার হুকুম জারী করেছিলেন।[5]

রাসূল (ছাঃ)-এর জন্ম-মৃত্যুর সঠিক তারিখ : জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব মতে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঠিক জন্মদিবস হয় ৯ই রবীউল আউয়াল সোমবার। ১লা রবীউল আউয়াল সোমবার তাঁর মৃত্যুদিবস।[6] অথচ ১২ই রবীউল আউয়াল তাঁর জন্মবার্ষিকী বা ‘মীলাদুন্নবী’র অনুষ্ঠান করা হচ্ছে।

ক্বিয়াম প্রথা : সপ্তম শতাব্দী হিজরীতে মীলাদ প্রথা চালু হওয়ার প্রায় এক শতাব্দীকাল পরে আল্ল­ামা তাক্বিউদ্দীন সুবকী (৬৮৩-৭৫৬ হি.) কর্তৃক ক্বিয়াম প্রথার প্রচলন ঘটে বলে কথিত আছে।[7] তবে এর সঠিক তারিখ ও আবিষ্কর্তার নাম জানা যায় না।[8]

ক্বিয়ামী মীলাদকারীদের যুক্তি হ’ল, তারা রাসূল (ছাঃ)-এর ‘সম্মানে’ উঠে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের ধারণা যে, মীলাদের মাহফিলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর রূহ মুবারক হাযির হয়ে থাকে। এই ধারণা সর্বসম্মতভাবে কুফরী।[9] ‘তুহফাতুল কুযাত’ কিতাবে এই ধারণাকে স্পষ্ট শিরক বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় জীবদ্দশায় তাঁর সম্মানার্থে উঠে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর ধম্কি প্রদান করেছেন।[10] অথচ মৃত্যুর পর তাঁরই কাল্পনিক রূহের সম্মানে দাঁড়ানোর উদ্ভট যুক্তি ধোপে টেকে কি? আর একই সাথে লাখো মীলাদের মজলিসে হাযির হওয়া কারু পক্ষে সম্ভব কি?

অতএব এগুলির বিরুদ্ধে সাধ্যমত প্রচার করুন এবং এগুলি থেকে চোখ-কান বন্ধ রাখুন ও পরিবারকে রক্ষা করুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন!


[1]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (দারুল ফিকর, ১৯৮৬) পৃ. ১৩/১৩৭।

[2]. মুসলিম হা/১৭১৮; বুখারী হা/২৬৯৭; মিশকাত হা/১৪০।

[3]. আবূদাঊদ হা/৪৬০৭; তিরমিযী হা/২৬৭৬; মিশকাত হা/১৬৫।

[4]. নাসাঈ হা/১৫৭৮ ‘কিভাবে খুৎবা দিবে’ অনুচ্ছেদ।

[5]. মীলাদুন্নবী ৩৫ পৃ.; ইবনু তায়মিয়াহ, ইক্বতিযাউছ ছিরাত্বিল মুস্তাক্বীম (১ম সংস্করণ : ১৪০৪ হি./১৯৮৪ খৃ.) ৫১ পৃ.।

[6]. সীরাতুর রাসূল (ছাঃ), ৩য় মুদ্রণ ৫৬ পৃ.।

[7]. আবু ছাঈদ মোহাম্মাদ, মিলাদ মাহফিল (ঢাকা ১৯৬৬), ১৭ পৃ.।

[8]. তাজুদ্দীন সুবকী, তাবাক্বাতু শাফেঈয়াহ কুবরা (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ, তাবি, ১৩২২ হি. ছাপা হ’তে ফটোকৃত) ৬/১৭৪।

[9]. মুহাম্মাদ জুনাগড়ী, (মউ, ইউ পি ১৯৬৭)মীলাদে মুহাম্মাদী ২৫, ২৯ পৃ.।

[10]. তিরমিযী হা/২৭৫৫; আবূদাঊদ হা/৫২২৯; মিশকাত হা/৪৬৯৯ ‘আদব’ অধ্যায়।






সুন্নাত আঁকড়ে ধরার ফযীলত (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান
জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপনের আবশ্যকতা (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ঈদায়নের কতিপয় মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
হাদীছের অনুবাদ ও ভাষ্য প্রণয়নে ভারতীয় উপমহাদেশের আহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকা - ড. নূরুল ইসলাম
ইলম ও আমলের সমন্বয় - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
দো‘আয় ভুল-ভ্রান্তি ও তা কবুলে দেরী হ’লে করণীয় - আসাদুল্লাহ আল-গালিব
জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপনের আবশ্যকতা (৫ম কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ইসলামের আলোকে জ্ঞান চর্চা (প্রথম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ আজিবার রহমান
ঈদে মীলাদুন্নবী : প্রাসঙ্গিক কিছু কথা - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
মাদ্রাসার পাঠ্যবই সমূহের অন্তরালে (৪র্থ কিস্তি) - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের বিধান (২য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
আদালত পাড়ার সেই দিনগুলো (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - শামসুল আলম
আরও
আরও
.