চোখের সামনে পড়ে আছে মৃতদেহ। ধরছে না পরিবারের লোকজনও। প্রতিবেশীরাও দরজা বন্ধ করে রেখেছে। ফোন পেয়ে মৃতের বাসায় লাশ নিতে এসে দেখেন স্ত্রী আর সন্তানরা অন্য একটি ঘর থেকে মৃত পিতার ঘর দেখিয়ে দিয়ে বলছে ‘ওই রুমে লাশ পড়ে আছে, নিয়ে যান’। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকা এসব মৃতদেহের জানাযা করতে এগিয়ে আসছেন একজন। তিনি হলেন, ১৭ বছর যাবৎ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালনরত মাকছূদুল আলম খন্দকার ওরফে খোরশেদ। এ পর্যন্ত ৬ জন হিন্দুর সৎকার সহ ৩৫ জনের কাফন-দাফন করেছেন তিনি। স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমানের ভাষায়, খোরশেদ ‘বীর বাহাদুর’।

করোনা ভাইরাস শুধুমাত্র মানুষের স্বার্থপরতার দিকটি উন্মোচন করেনি। খুঁজে পেতে সহায়তা করেছে মাকছূদুল আলমদের মত কিছু মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষকেও।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা সহ সব চিকিৎসকরাই বলছেন, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে ভাইরাস থাকা কিংবা এ থেকে সংক্রমণের কোনো সম্ভাবনা নেই। তারপরও সংক্রমণের শঙ্কায় মৃত ব্যক্তির কাছে কেউ আসছে না। প্রতিবেশী দূরের কথা, স্বজনরাও কাছে আসে না।

মানুষের এমন মনুষ্যত্বহীনতা দেখে মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করে কাউন্সিলর খোরশেদ বলেন, আমরাও মানুষ, আপনারাও মানুষ। আমরা যদি পারি, আপনারা কেন পারবেন না! তিনি বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমি এ কাজে এসেছি। আমি মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ যেন আমারও জানাযা নছীব করেন। আল্লাহ  যে আমাকে এ কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন, এজন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। একইসঙ্গে ধন্যবাদ জানাই আমার আহবানে সাড়া দিয়ে আমাকে সহযোগিতার জন্য ক্ষুদ্র পেশার যেসব লোকজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে এসেছেন তাদেরকেও।

তিনি বলেন, এত মৃত আক্রান্তের সংস্পর্শে যাওয়ার পরও আইইডিসিআর থেকে পাঠানো আমার করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে। তাই সবার প্রতি অনুরোধ জানাই- মাস্ক পরে, গ্লাভস পরে যেকোন করোনা রোগীর সেবা করতে পারবেন। কোন ভয়ের কারণ নেই।

কাউন্সিলর খোরশেদের কর্মতৎপরতা বিস্মিত সর্বস্তরের জনসাধারণ। কেবল দেশেই নয়, বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে তার প্রশংসা। সম্প্রতি তার কাজের প্রশংসা করেছেন নেদারল্যান্ডসের সাবেক এক সংসদ সদস্য। জোরাম ভ্যান ক্লাভেরে নামের সাবেক ওই পার্লামেন্ট সদস্য তার ফেইসবুক পেজে করোনা সঙ্কটকালে খোরশেদের মানবিক কাজের কিছু ছবি তুলে ধরে লিখেছেন, এই ছবিগুলি বাংলাদেশ থেকে তোলা হয়েছে, যেখানে কোভিড-১৯ সংক্রমিত জনৈক হিন্দু বৃদ্ধা মারা গিয়েছিলেন। তবে তার সম্প্রদায়ের কিংবা পরিবারের কেউই তার সৎকারের কাজে এগিয়ে আসেনি। একদল মুসলমান তা সম্পন্ন করেছিলেন। এটি ইসলামের সম্প্রীতি ও শিক্ষার বাস্তব দৃষ্টান্ত। কিছুদিন আগে আমি ভারত থেকে অনুরূপ সংবাদ পড়েছি।

বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি বেশী কিছু জানি না। শুধু এটুকু জানি যে, এটি ১৬৫ মিলিয়ন মানুষের একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। তারা ধনী নয়, তবে তাদের হৃদয় সমুদ্রের মতো। তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। এই দেশে ও তার জনগণের প্রতি আমার সালাম! ভারত কি তাদের কাছ থেকে কিছু শিখবে!

উল্লেখ্য, একসময় ঘোর ইসলামবিরোধী এই এমপি ২০১৮ সালে ইসলামবিরোধী বই লেখার অর্ধেক পথে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এখন তিনি মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ নামে পরিচিত।

[আমরা খোরশেদ ছাহেবকে অভিনন্দন জানাই এবং তার ও তার সাথীদের হেফাযতের জন্য দো‘আ করি। সাথে সাথে আল্লাহর নিকট তাদের ইহকাল ও পরকালের সর্বোত্তম জাযা দানের জন্য প্রার্থনা করি। আর আল্লাহ যেন ঐ নওমুসলিম বিদেশী ভাইটিকেও সর্বোত্তম পুরস্কারে ভূষিত করেন (স.স.)।







আরও
আরও
.