গত ৪ঠা মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি দলের যে গেরুয়া বিপ্লব ঘটেছে, তা আমাদের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক সংবাদ নয়, বরং একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশেষ করে তারা ক্ষমতায় গিয়েই যেভাবে বাংলাদেশের সীমান্তে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে যে নিশ্ছিদ্র কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং মুসলমানদেরকে নাগরিক তালিকা বা এনটিআরসি থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তা স্পষ্ট করে দেয় যে, সেখানকার প্রায় ৩০% নাগরিক তথা প্রায় ৩ কোটি মুসলিম কত বড় হুমকির মুখে রয়েছে। নির্বাচনের পূর্বেই সেদেশের নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন করতে গিয়ে বহু ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। আল-জাযীরার প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, প্রায় ৯ কোটি ৬০ লাখের মধ্যে প্রায় ৯০ লাখ ভোটার (১২ শতাংশ) এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যাদের অধিকাংশ মুসলিম ও সংখ্যালঘু। গোবিন্দপুর, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, মালদহ প্রভৃতি শহরে বঞ্চিতদের অধিকাংশই মুসলিম। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়াটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা লক্ষ্য করেই করা হয়েছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর এসব এলাকায় ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পত্রিকা সমূহের প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ৪ঠা মে থেকে ৭ই মের মধ্যে আট যেলায় কমপক্ষে ৩৪টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। মুসলমানদের বাড়িঘর, মসজিদ, গরুর হাট, গোশতের আড়ত এবং দোকানপাটে আক্রমণসহ মুসলিমদের প্রতি যথেচ্ছ হামলা হয়েছে। এখনও তার জের চলছে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে। মুসলিম জনপদগুলিতে বিরাজ করছে ভয়-আতংক।

এই পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ১৯৪৭ সালে মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি গঠন কেন অপরিহার্য ছিল। দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশের একদল বুদ্ধিজীবী সুকৌশলে ৪৭-এর ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে চান। ইতিহাসের লুকোচুরির আশ্রয় নিয়ে তারা অবিরাম প্রচার করেন যে, এপার বাংলা ও ওপার বাংলার ঐক্যের ভিত্তি হ’ল বাংলা ভাষা। অথচ আজকের পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের বাস্তবচিত্র বলছে, ভাষা এক হলেও কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সেখানে মুসলমানরা বাস্তবে বহিরাগত নাগরিকে পরিণত হয়েছে। এতে পরিষ্কার যে, আমাদের জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি কেবল ভাষা নয় বরং ইসলাম। যার উপরে ভিত্তি করেই এদেশের মানচিত্র অাঁকা হয়েছিল। যদিও সেখান থেকে নেহেরু-প্যাটেলদের চক্রান্তে পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ ও মালদহ যেলা এবং সিলেটের করিমগঞ্জ যেলাকে সুকৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সত্যটি মুছে ফেলার যে ষড়যন্ত্র চলমান রয়েছে, তার নামই সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ।

উক্ত চক্রান্তের অংশ হিসাবে আড়াল করা হয়েছে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রকৃত বীরদের। মাওলানা আকরম খাঁ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল্লাহেল বাকী ও কাফী ভ্রাতৃদ্বয়ের মত নেতাদের ত্যাগ ও দূরদর্শিতাকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে। কারণ তাঁরা মুসলিম জাতির স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী ছিলেন। ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল এম. এ. জি. ওসমানীকে ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আসতে দেওয়া হয়নি। কারণ তিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদ মেনে নিতে পারেননি এবং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপোষ করতে চাননি। একই কারণে মেজর এম এ জলিলকে যুদ্ধের পরপরই কারারুদ্ধ করা হয়েছিল এবং তিনিই ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। কারণ তিনি ভারতীয় বাহিনীর অবাধ লুট-পাটে বাধা দিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর মতো মযলূম জননেতা, যিনি সারাজীবন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীনভাবে লড়াই করেছেন এবং কবি ফররুখ আহমদের মতো ইসলামী আদর্শের কবিদের দেশের পাঠ্যক্রম ও আলোচনা থেকে প্রায় নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে।

সেক্যুলার এই গোষ্ঠীটি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে পুরোপুরিভাবে একটি ধর্মহীন বা সেক্যুলার রূপ দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। ’৭২-এর সংবিধান রচনা করা হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে এবং এতে যুক্ত করা হয়েছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও জাতীয়তাবাদ চারটি মূলনীতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে তারা ইসলামকে ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’র তকমা দিয়ে প্রতিপক্ষ বানিয়েছে। অথচ এদেশের সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করেছিল যুলুম ও শোষণমুক্তির জন্য, ধর্মহীন হওয়ার জন্য নয়। ইসলামের নিদর্শনগুলিকে তাচ্ছিল্য করা এবং স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাসকে অপব্যাখ্যা করাই হ’ল এসব বর্ণচোরাদের সাংস্কৃতিক ফ্যাসিজমের অংশ।

২৪-এর জুলাই বিপ্লব আবার নতুন করে এমন প্রপঞ্চের সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে আমরা ইতিহাসের আয়নায় নিজেদেরকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এখন সময় এসেছে আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে নতুনভাবে গড়ার। আমাদের চেতনাকে নতুনভাবে শানিত করার। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ‘গেরুয়া বিপ্লব’ আমাদের পুনরায় সেই ৪৭-এর বাস্তবতাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। অতএব আমাদের নতুন প্রজন্মকে বুঝতে হবে, আদর্শহীন বাঙালী কিংবা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ কোনটাই আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না, যতক্ষণ না আমরা ইসলামকে মূল চেতনা হিসাবে গ্রহণ করব। আগামী প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তারা বাংলাদেশের সঠিক জন্ম-ইতিহাস ও ইসলাম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রাপ্ত হয়। সমকালীন বিশ্বে সাংস্কৃতিক প্রভাব কেবল বিনোদন বা ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষা, মিডিয়া, ইতিহাসচর্চা এবং মূল্যবোধ নির্মাণের মাধ্যমে হৃদয়ের গভীরে প্রভাব বিস্তার করছে। তাই এই আধিপত্যবাদকে মোকাবিলার জন্য আমাদের তরুণদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে তৈরী হ’তে হবে।

সাংস্কৃতিক যবরদস্তির শৃংখল ভেঙে আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানা এবং সেই পথ ধরে ইসলামের কালজয়ী আদর্শের পথে ফেরাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় জিহাদ। পার্শ্ববর্তী দেশের আধিপত্যবাদী মানসিকতা এবং তাদের দেশীয় চরদের মিথ্যা বকওয়াস রুখে দিয়ে একটি নির্ভেজাল তাওহীদী চেতনাসম্পন্ন জাতি গঠন করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ও নেতৃত্বে আনতে হবে আমূল সংস্কার। সর্বত্র আনতে হবে নৈতিকতা ও ইসলামী মূল্যোবোধের নবজাগরণ। মিডিয়া ও সাহিত্যের মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের মহান আদর্শ। রুখে দিতে হবে উদারতাবাদ ও আধুনিকতাবাদের নামে চলমান কালচারাল ফ্যাসিবাদের মিথ্যাচার। এ বিষয়ে আমাদের ইসলামী দলগুলো এবং জাতীয় নেতৃবৃন্দ যত দ্রুত সচেতন হবেন, ততই বিশ্বমঞ্চে একটি শক্তিশালী ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে আমাদের উচ্চ অবস্থান তৈরী হবে। আমরা মুক্তি পাব আত্মপরিচয়হীনতা থেকে। জাতি খুঁজে পাবে তাদের প্রকৃত লক্ষ্য। এ পথেই একটি গৌরবোজ্জ্বল ও বিশুদ্ধ ইসলামের দেশ হয়ে গড়ে উঠবে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন। আমীন! (স.স.)






করোনা ভাইরাস - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষা - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
কারা সংস্কারে আমাদের প্রস্তাব সমূহ - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
লক্ষ্যহীন গতানুগতিক নির্বাচন - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
বিশ্বকাপ না বিশ্বনাশ? - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
ভারত ভাগ হয়ে যাচ্ছে - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আমরা শোকাহত, স্তম্ভিত, শংকিত - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
খোশ আমদেদ মাহে রামাযান - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
মানবতা ভাসছে নাফ নদীতে! - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আমরাও আল্লাহকে বলে দেব - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
সংবিধান প্রণয়ন প্রসঙ্গে - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
তালেবানদের পুনরুত্থান ও আমাদের প্রত্যাশা - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আরও
আরও
.