আমাদের এই সম্পাদকীয় কলামের মূল সূর থাকে আত্মশুদ্ধিতা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার প্রতি জাতিকে সজাগ করা। আমরা আকাশের পাখি নই বা জঙ্গলের বাঘ নই কিংবা নদীর মাছ বা কুমির নই। আমরা সমাজে বসবাসকারী মানুষ। তাই সমাজকে নিয়েই আমাদের যত ভাবনা। একাত্তরের যুদ্ধ দেখেছি। বাহাত্তর থেকে গত ৫৫ বছরের রাজনীতি দেখেছি। এখনও দেখছি। প্রায় সব নেতাই কমবেশী দেশের কল্যাণে কাজ করেছেন। পৃথিবীর সর্বাধিক ভোট পাওয়া নেতা হলেন ৩জন। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেণ্ট সুকর্ণ, ইরাকের প্রেসিডেণ্ট সাদ্দাম হোসেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিব মাত্র ১০০ জন ফ্রেশ লোক চেয়েছিলেন, যাদের নিয়ে তিনি দেশ চালাবেন। কিন্তু পাননি। অবশেষে ক্ষুব্ধ হয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘লোকেরা পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি’। ১২ই ফেব্রুয়ারী নির্বাচনের পর গণতন্ত্রে উত্তরণের গত ৬৪ দিনের ফলাফল পত্রিকার শিরোনাম অনুযায়ী ‘আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি: মনিটরিং নেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-আইজিপির’: চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, ধর্ষণ, নির্যাতন, খুন, অপহরণ, রাহাজানি ও কিশোর গ্যাং কালচারে জনজীবন দুর্বিষহ’। পুলিশের তথ্যমতে তালিকাভুক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই কোন না কোনভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তি’। কিছুই বলার নেই। পরবর্তী চাওয়া কি? উত্তর নেই।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধ্বংসকারী দুই নেতা হলেন আমেরিকার প্রেসিডেণ্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইস্রাঈলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামীন নেতানিয়াহু। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে চলছে হাযার হাযার মানুষের বিক্ষোভ মিছিল। খোদ আমেরিকায় একদিনে ৮০ লাখ মানুষ মিছিল করেছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধেও তার দেশে সমানে মিছিল হচ্ছে। বহু লোক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছে। তাতেও নেতারা বোমা বর্ষণ ও নিরীহ মানুষ হত্যা বন্ধ করেননি। কেননা তারা গণতন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত। মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েই যাবেন। আর তাই আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসো-র প্রেসিডেণ্ট ইব্রাহীম ত্রাওয়ে বলেছেন, গণতন্ত্র কোন সমাধান নয়। এটি একটি ‘মিথ্যা’ ব্যবস্থা মাত্র। গণতন্ত্র মানুষ হত্যা করে ও ধ্বংস ডেকে আনে। পশ্চিমা দেশগুলো যেখানেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে সেখানেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। তিনি মুয়াম্মার গাদ্দাফির পরবর্তী লিবিয়ার অস্থিতিশীলতাকে গণতন্ত্রের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন এবং বলেন, আফ্রিকার মানুষ এ ব্যবস্থা চায় না’। যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের উদ্যোগে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির সময়সীমা ও শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। যদিও হামলাকারী আমেরিকা এখন বিশ্বব্যাপী কোনঠাসা।
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে অ্যামনেস্টি তাদের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেণ্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেণ্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইস্রাঈলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামীন নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, তাঁদের কর্মকান্ডের ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়েছে’। অথচ আমেরিকা ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম ভেটো ক্ষমতাধারী স্থায়ী সদস্য। ফলে তাদের হাতেই বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা যিম্মী হয়ে আছে। দায়িত্বশীলতার যে গুণ তাদের মধ্যে থাকা অপরিহার্য ছিল, সেটি পরিদৃষ্ট হয়না।
সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার ও সুশাসন চায়। সেটা কেবল তখনই সম্ভব, যখন নেতা-কর্মী সবাই প্রতি মুহূর্তে আল্লাহকে ভয় করবে। মৃত্যু পরবর্তীকালে আল্লাহর নিকট জওয়াবদিহিতাকে ভয় পাবে। সর্বদা নিজের হাত-পা ও ত্বক-এর মত অবিচ্ছেদ্য স্বাক্ষীকে ভয় পাবে। কারণ ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, ‘আজ আমরা তাদের মুখে মোহর মেরে দেব। আর আমাদের সাথে কথা বলবে তাদের হাত ও সাক্ষ্য দিবে তাদের পা, তাদের কৃতকর্ম বিষয়ে’ (ইয়াসীন ৩৬/৬৫)। যখন যালেম ভাববে যে, পরকালে আমাকে শাস্তি পেতেই হবে, কেবল তখনই সে যুলুম থেকে হাত গুটিয়ে নিবে। আর এটিই হ’ল কুরআনের মহা সংবাদ (নাবা ৭৮/১-২)।
নেতৃত্ব ও আনুগত্য ছাড়া সমাজ চলে না। এটা আল্লাহর ব্যবস্থাপনা। নেতাদের অবস্থান গাড়ির চালকের মতো। তাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন আমানত ধ্বংস হবে এবং অযোগ্য ব্যক্তির হাতে নেতৃত্ব সমর্পণ করা হবে, তখন তুমি ক্বিয়ামতের অপেক্ষা কর’ (বুখারী হা/৫৯; মিশকাত হা/৫৪৩৯)। তিনি সাবধান করে বলেন, ‘তোমাদের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশী ভয় পাই পথভ্রষ্ট নেতাদের’ (আবুদাঊদ হা/৪২৫২)। অতঃপর নেতা-কর্মী উভয়কে সাবধান করে তিনি বলেন, তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’ (বুঃ মুঃ মিশকাত হা/৩৬৮৫)। তিনি বলেন, মানুষকে ধ্বংস করে তিনটি বস্ত্ত। প্রবৃত্তিপূজা, লোভের দাসত্ব এবং আত্মম্ভরিতা। আর এটিই হ’ল সবচেয়ে মারাত্মক (বায়হাক্বী, মিশকাত হা/৫১২২; ছহীহাহ হা/১৮০২)। তিনি বলেন, যাকে আল্লাহ নেতৃত্ব দান করেছেন, অথচ সে তার অধিনস্তদের প্রতি খেয়ানতকারী হিসাবে মৃত্যুবরণ করেছে, আল্লাহ তার উপরে জান্নাতকে হারাম করে দেন’ (বুঃ মুঃ মিশকাত হা/৩৬৮৬)। তিনি বলেন, ‘দু’টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগপালের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া অত বেশী ধ্বংসকর নয়, যত না বেশী ধ্বংসকর মাল ও মর্যাদার লোভ মানুষের দ্বীনের জন্য’ (তিরমিযী, দারেমী, মিশকাত হা/৫১৮১)।
পরিশেষে বলা যায়, যিনি যতটুকু দায়িত্বশীল, তাকে সেই আমানতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সচেতন ও আদর্শ রূপকার হ’তে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপে মহান আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার ভয়ই পারে একজন মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে। বর্তমান অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপটে তাই রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে নির্লোভ, সৎ, আমানতদার ও আল্লাহভীরু নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। এই আদর্শ গুণাবলীসম্পন্ন নেতাকর্মীদের সংখ্যা যত বাড়বে, সমাজ ও রাষ্ট্র ততই ন্যায়বিচারপূর্ণ ও শান্তিময় হয়ে উঠবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন।- আমীন! (স.স.)।