বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে সমানুপাতিক হারে বেড়েছে নগরবাসীর ব্যস্ততা। শৈশবে মাদ্রাসা-স্কুলের পড়াশোনা, এরপর মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক পেরিয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর এবং সবশেষে কর্মজীবনের ব্যস্ততা। মৃত্যুর আগে যেন কারো থামাথামি নেই। ঠিক তেমনি নাজীবের জীবনেও ‘ফুরছত’ শব্দটি যেন কেবলই অভিধানসর্বস্ব। পূর্বের শারীরিক দুর্বলতা ও অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার সুযোগে হঠাৎ এক অসুখ সর্বশক্তি দিয়ে নাজীবকে আক্রমণ করে বসল। টানা দুইদিনের জ্বর ও ক্লান্তির একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই তাকে হাসপাতালে ভর্তি হ’তে হ’ল।

স্ট্রেচারের ধাক্কায় নাজীবের ঘুম ভাঙল। গায়ে প্রচন্ড জ্বর। ব্যথার কারণে হাত-পা নাড়ানো যেন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। স্যালাইনের পাশাপাশি স্টেরয়েড ইনজেকশন নিতে হচ্ছে। হাসপাতালে আজ তার দ্বিতীয় দিন। সর্বক্ষণের সাথী হিসাবে আছে তার বড় ভাই আদীব। সময়ের পরিক্রমায় আদীব পুরোদস্ত্তর সাহিত্যিক ও গভীর চিন্তাবোধের অধিকারী হয়ে উঠলেও নাজীবের আগ্রহের সবটুকু বিজ্ঞানে। তবে আদীবের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ আর জীবনমুখী উপলব্ধির দারুণ সব গল্প নাজীব মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে। মনে হয় যেন অন্যরকম এক পৃথিবীতে সে বাস করছে! হাসপাতালেও তার ব্যতিক্রম হ’ল না।

‘এখন তোর কেমন লাগছে’? ঘুম ভাঙতে দেখে এগিয়ে এসে আদীব জিজ্ঞেস করল। ‘ভাল লাগছে না, খুব কষ্ট হচ্ছে’ হতাশ কণ্ঠে জওয়াব দিল নাজীব। আদীব বলল, ভাল লাগার কথাও নয়। এমনিতে তুই অসুস্থ, তার উপরে চারদিকে তাকিয়ে দেখ, কেমন যেন মৃত্যুর গন্ধ। যেদিকেই তাকাই, মনে হচ্ছে মৃত্যুর উপকরণ থরে থরে সাজানো আছে। এই যে খসখসে সাদা বিছানার চাদর, যার উপরে তুই ছটফট করছিস, এর সাথে কাফনের শুভ্রতার কতই না মিল! মাত্রই যদি তোর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, তবে ঠিক এমন তিন খন্ড সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে তোকে কবরে রেখে আসতে হবে! লাশের সাথে তোর পার্থক্য হ’ল, তুই জ্যান্ত আছিস, আর লাশ প্রাণহীন হয়ে মাটির তলে পড়ে থাকে।

আমরা তো প্রায়ই আববার কবর যিয়ারত করে আসি। কবরস্থানের নিয়মটা একবার ভেবে দেখ। যিয়ারতকারীদের জন্য মাঝখানে ছোট্ট একটি পথ রেখে দু’ধারে সারি সারি কবর থাকে। ঠিক তেমনি এই ওয়ার্ডটাকেও আমার কাছে কবরস্থান মনে হচ্ছে। ডানে-বামে, উত্তরে-দক্ষিণে চেয়ে দেখ, সারি সারি শুভ্র চাদর বিছানো, মাঝখানে চলাচলের পথ; প্রতিটি বিছানাই যেন এক-একটি কবর। বাস্তবেও কিন্তু তা-ই। এখানে কত মুমূর্ষু রোগী, কত আর্তচিৎকার, কত যন্ত্রণা! এদের মধ্য থেকে কতজন নিজ বাড়ির বিছানায় শোয়ার ভাগ্য না পেয়ে সরাসরি কবরস্থানে চলে যাবে, ভাবতে পারিস? ঐ যে ১৭ নম্বর বিছানার রোগী, কাল সন্ধ্যায়ও বেঁচে ছিল, কিন্তু মধ্যরাতেই ওপারের ডাক পড়ে গেল! তোরও কিন্তু যেকোন সময় ডাক পড়ে যেতে পারে!

নাজীব মাথা ঘুরিয়ে ১৭ নম্বর বেডের দিকে তাকাল। সত্যিই তো! বিছানাটা এখন খালি পড়ে আছে। হাসপাতালের উঁচু রংচটা ছাদটাকে তার আকাশ মনে হ’তে লাগল, আর বিছানাটা যেন কবর। বয়স কেবল একটা সংখ্যা মাত্র। নিতান্ত তরুণ হ’লেও মৃত্যুর ভাবনা নাজীবকে ঘিরে ধরল। আনমনে সে প্রভুর সাথে লেনাদেনার একটা হিসাব কষার চেষ্টা শুরু করল। আমাদের সংক্ষিপ্ত জীবনে কত উত্থান-পতন, কত শত পরিকল্পনা! অথচ আমাদের সকল পরিকল্পনার ঊর্ধ্বে কেবল আল্লাহ তা‘আলার পরিকল্পনাই চূড়ান্ত, যার বাস্তব পরিণতিতে তাকে আজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে হচ্ছে।

নাজীবের বিছানা জানালা বরাবর। পুরনো মরিচাপড়া জানালা দিয়ে তিনতলা থেকে হাসপাতালের মর্গ দেখা যাচ্ছে। জীবনের সমস্ত ব্যাকরণ যেখানে দুর্বোধ্য, সকল হিসাবের খাতা যেখানে নিঃশব্দে বন্ধ! সেই হিমঘরের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে আদীব। একের পর এক স্ট্রেচার বের হচ্ছে সেখান থেকে। মৃতদেহ শেষবারের মতো হাসপাতালের দুয়ার দিয়ে বের হ’তে দেখে আদীবের চোখের কোণ হঠাৎ ভিজে ওঠে। আদীবের মৌনতা ভেঙে নাজীব শুধায়, ‘মানুষ তো মৃত্যুর জন্যই এসেছে ভাইয়া! হঠাৎ এমন আনমনা হয়ে কী ভাবছ’?

কপোল গড়িয়ে আসা অশ্রুটুকু হাতের উল্টোপিঠে মুছে নিয়ে আদীব উত্তর দেয়, ‘মানুষের দুনিয়াবী মৃত্যুতেও কত ফারাক রে! আজ যারা এই মর্গ থেকে বের হচ্ছে, তারা হয়তো যন্ত্রণায় মারা গেছে, তবে গাযাবাসীর চেয়ে কম যত্ন এদের হয়নি! এরা নিজেদের অক্ষত শরীরসহ একটুকরো জানাযা পাবে, স্বজনরা পরম মমতায় নিরাপদ স্থানে দাফন করবে। কিন্তু পুরো মুসলিম বিশ্বের অবহেলায় গাযায় যে মৃত্যু নেমে আসে, তা তোকে কে বোঝাবে! বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন শরীর, বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া মাথা নিয়ে তারা রাস্তায় অহরহ পড়ে থাকে। কেউ কাফন পরায় না, ধ্বংসস্তূপের নিচেই পড়ে থাকে তাদের শেষ শাহাদাতের বাণী।

তুই যদি এখানকার রোগীদের দিকে লক্ষ্য করিস, ঐ যে কমবয়সী এক বাবা। বিছানায় রোগে কাতর, তবুও তার সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এখানকার প্রতিটি শিশু অন্তত হাফ ডজন লোকের সেবা-শুশ্রূষা পাচ্ছে। কিন্তু গাযায়? বোমা-বারুদে ক্ষতবিক্ষত, ছেঁড়া কাপড় পরা যে বালিকা ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে কাঁদে, তার অধিকার আর বিশ্বের অন্য বাচ্চাদের অধিকার কি সমান নয়? আমরা তো সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখি, তবে গাযার শিশুরা কি ভবিষ্যৎ নিয়ে জন্মায়নি? চিকিৎসা ও খাদ্যহীন মৃত্যুর ভয়ংকর রূপ অবলোকন করে আদীবের সাথে ফিলিস্তীনের হাল ভেবে নাজীবের চোখেও অশ্রু এসে গেল। দুর্বল কণ্ঠে সে উত্তর দেয়, ‘তারা শহীদ, তারা মৃত নয়’! একসাথে দু’জনের কম্পিত ঠোঁট উচ্চারণ করে ‘রাবিবনছুর মুসলিমী গাযাহ’ (হে রব! গাযার মুসলিমদের সাহায্য করুন)। অস্ফুট কণ্ঠের এই কান্নাভেজা উচ্চারণ যেন পুরো পৃথিবীর দো‘আয় শামিল হ’ল।

বাইরের রোদের তাপ কেবিনের ভেতর থেকেই আঁচ করা যাচ্ছে। জানালা দিয়ে যথেষ্ট বাতাস প্রবেশ করলেও তাতে যেন আগুনের হলকা। সময়টা তখন যোহর। মেডিকেলে ক্ষীণ স্বরে আযান শোনা গেল। ১৩ নম্বর বেডের ফুসফুস আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীটি যেন মৃত্যুর কাছাকাছি উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণকারী হয়েছেন। ছালাতের প্রতি তাঁর অদ্ভূত নিষ্ঠা, প্রভুর প্রতি তাঁর আনুগত্য সত্যিই অতুলনীয়। সার্বক্ষণিক স্যালাইন ও অক্সিজেন চললেও যোহরের আযান শোনা মাত্রই তাঁর উদ্যম বেড়ে গেল। প্রাণান্তকর সংগ্রামে তাঁকে উঠিয়ে বসানো হ’ল। তায়াম্মুম করলেন। ঝাপসা হয়ে আসা অক্সিজেন মাস্কের ভেতরও তাঁর মুখে প্রশান্তির ছায়া স্পষ্ট, এক স্নিগ্ধ হাসি দেখা যাচ্ছে। স্যালাইনের স্ট্যান্ডটা বেশ উঁচু। ক্লান্ত হাত তুলে তিনি ছালাত আদায় করছেন, যেন বলছেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার মৃত্যু পথযাত্রী’। রোগাটে মুখাবয়ব ও রক্তশূন্যতার ফ্যাকাসে রং ছাপিয়ে তাঁর মুখমন্ডলে ঈমানী দীপ্তির আভা ছড়িয়ে পড়ল।

নাজীব ও আদীব মন্ত্রমুগ্ধের মতো দৃশ্যটি দেখল। আদীবের কণ্ঠে বিস্ময়, ‘এমন দৃশ্য আমি আমার সমগ্র জীবনে দেখিনি! মানুষ সুস্থ থেকেও আড্ডায় বা কর্মব্যস্ততায় আযানের জবাবটুকু দেওয়ার ফুরছত পায় না। সামান্য গরম বাতাসের হলকায় অতিষ্ঠ হয়ে সবাই জানালা বন্ধ করে দিচ্ছে, অথচ দম ফুরোলেই যে আগুনে তাদের ঝলসানো হবে, সেই উপলব্ধি ক’জনের আছে? এই বয়স্ক মুছল্লীর ঈমানী দৃঢ়তার কাছে আমাদের যুবকদের আমলের পরিমাপ করতে গেলেই শরীর ঘাম দিয়ে ওঠে’! নীচু করলে উল্টো রক্ত যেন বেরিয়ে না যায়, সেজন্য তিনি হাতটা উঁচু করে ধরে রাখলেন। যেন বলছেন, ‘ইয়া রাবব! রোগ-শোক-দুর্বলতা তোমার বান্দাকে কাবু করতে পারেনি, তোমার পদতলে সিজদাহ দিতে এই বান্দা কার্পণ্য করেনি। আমাকে জান্নাতে ঠাঁই দিও প্রভু’!

নাজীবের জ্বরটা বাড়ছে। একটা বেজে পঁচিশ মিনিট, আদীব নাজীবকে ওষুধ খাইয়ে দ্রুতপদে জামা‘আত ধরতে ছুটে গেল। বিশাল নোংরা ছাদটা ছোট হয়ে আসছে যেন। শরীরের জড়তা ছাপিয়ে নাজীবের কানে কেউ একজন যেন বলেই চলছে, ‘সামান্য রোদপোড়া বাতাসের হলকা সহ্য করতে না পারা বনু আদমের মাথার একহাত উপরে যখন প্রচন্ড সূর্যটাই ঝুলে থাকবে, তখন তারা কীরূপ হা-হুতাশ করবে’!

নাজীবের অসুস্থতার খবর রটে যেতে বেশী দেরি হ’ল না। আজ হিশামসহ তার বন্ধু-বান্ধব সবাই এসেছে। ঝিম মেরে থাকা নাজীবের মনটা একটু ভাল করতে হিশাম সহাস্যে বলে উঠল, ‘অসুস্থ হয়ে মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার জন্য তোকে ধন্যবাদ। আজ তোর অসুখ না হ’লে কি আমরা রোগী দেখার এই বিপুল ছওয়াব পেতাম’? বিষণন নাজীবের মুখেও হাসি ফুটে উঠল। আদীব বলল, ‘ডাক্তার বেশ কিছু টেস্ট দিয়েছেন, তোমরা সাথে থাকলে ভালোই হবে’। নাজীবের অবস্থা এতটাই জটিল যে তাকে কোলে তুলে হুইলচেয়ারে বসাতে হ’ল। তারপরেও বেডের সাথে ধাক্কা খেয়ে প্রচন্ড ব্যথা পেল সে।

লিফট বা ট্রলির সামনে রোগীদের জটলা। কারো দু’হাত নেই, কারো পা নেই, কেউ ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটছে। আগুনে পোড়া মানুষেরও কমতি নেই। আদীব অভ্যাসমতো স্মরণ করিয়ে দিল, ‘চেয়ে দেখ, আমরা কতটা ভাল আছি, আলহামদুলিল্লাহ’। নাজীব হাঁটতে পারছে না বলে পায়ের অভাব আজ আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। অথচ যাদের পা-ই নেই, তাদের জীবনটা কতটা সংগ্রামের! শরীর সুস্থ থাকতে আমরা ক’জন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি? অথচ অসুস্থ হ’লেই কেবল সুস্থতা চাই।

আল্লাহ চাইলে তো কোন অঙ্গহীন করেও আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠাতে পারতেন। স্বার্থের দ্বন্দ্বই আমাদেরকে পিছিয়ে দেয়, সুস্থ থাকতে সুস্থতার দাম আমরা দেই না। কর্তব্যরত চিকিৎসকের রূঢ় আচরণ নাজীবের মনে ভীষণ দাগ কাটল। তার কেবলই মনে হ’তে লাগল, সক্ষম হ’লে পৃথিবীর সবাইকে সে একবার হ’লেও বলত, ‘সুস্বাস্থ্য বড় নে‘মত, হাসপাতালের গন্ডি দর্শনের পূর্বেই এর যত্ন করো এবং প্রভুর শুকরিয়া আদায় করো’।

হাসপাতালে নাজীবের টানা তিনরাত ঘুম নেই। রোগীদের চিৎকার, নানামুখী হাহাকার আর মাথার ওপর জ্বলতে থাকা বারোশো ওয়াটের বাতির আলোয় ঘুমানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদীব ওষুধ খাইয়ে দিতে দিতে বলল, ‘এই আলো আর চিৎকার-চেঁচামেচিতে তোর ঘুম হচ্ছে না, তাই না? আল্লাহ কত মহান তা তুই এখন বেশী ভালো করে বুঝতে পারবি। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী এবং রাত্রিকে করেছি আবরণস্বরূপ’ (নাবা ৭৮/৯-১০)

ব্যস্ত নগরীর সারাদিনের কোলাহল শেষে রাতের আঁধারেই শরীর প্রশান্তি পায়। কিন্তু বর্তমান যুবসমাজের দিকে তাকালে দেখি, তারা আল্লাহর এই চমৎকার নে‘মতের চরম অবহেলা করছে। গভীর রাত পর্যন্ত স্মার্টফোনে বা আড্ডাবাজিতে মেতে থাকছে, আর কাকডাকা ভোরে ঘুমিয়ে যোহরের আযানের আগে উঠছে। এভাবেই তারা কার্যত নিজের শরীরের আরাম একেবারে নষ্ট করে ফেলছে। নাজীব ধীর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করল। চোখে ঘুম নামাতে এর চেয়ে জাদুকরী কোন পন্থা আপাতত তার জানা নেই।

ভোরের প্রশান্তিময় সময়টায় নাজীব খানিকটা নিশ্চিন্তে ঘুমায়। সকালের স্যালাইন শেষ হ’তে গিয়ে ক্যানলার ব্যথায় তার ঘুম ভাঙল। আজ পবিত্র জুম‘আ বার। আশেপাশে আদীবকে দেখা যাচ্ছে না, নিশ্চয়ই সে ফজরের ছালাতে মসজিদে গেছে। অথচ নিয়তির কারণে নাজীব আজ রোগাক্রান্ত হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী। ও মনে মনে ভাবতে লাগল, আজ সে মেডিকেলে, কিন্তু কত অযুত কোটি সুস্থ মুসলিম নির্বিঘ্নে ঘুমে ডুবে আছে! দুনিয়ার চাকরির সামান্য বেতনের জন্য তারা ঠিকই ভোরে ওঠে, অথচ ছালাতের মতো হৃদয়স্পর্শী ইবাদত তাদের কাছে নিছক প্রথাগত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

কিছুক্ষণ পর আদীব দ্রুত হেঁটে ফিরে এলো। নাজীবকে তায়াম্মুম করিয়ে বিছানায় শুয়েই ছালাত আদায় করালো। কারণ এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। শেষে আদীবের ‘কেমন আছিস’? প্রশ্নের জবাবে নাজীব বলল, ‘যেসব সুস্থ মানুষ আজ ফজরে জাগতে পারেনি, তাদের আত্মার ব্যাধি তাদেরকে জাগতে দেয়নি, তারা দুনিয়া ও আখিরাত দুই-ই খুইয়েছে। আমি আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছি। কারণ আমার এই দৈহিক রোগ পরকালীন কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না’।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। স্যালাইন চলার ফাঁকে নাজীব খেয়াল করল, আদীব মৃদু স্বরে সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করছে। সূরা কাহাফের সাপ্তাহিক তিলাওয়াত অন্তরকে পরবর্তী জুম‘আ পর্যন্ত আলোকিত রাখে। নাজীব চোখ বুঁজে সেই তিলাওয়াত শুনে যাচ্ছে। সুস্থ থাকলে সে নিজেই তিলাওয়াত করত, কিন্তু আজ অন্তত সে শুনে রাখতে পারছে। এরপর দুই ভাই মিলে দরূদ পাঠ করতে লাগল। মুসলিম জাতির জন্য দরূদের ফযীলত অনেক। গুনাহ মাফ, মর্যাদা বৃদ্ধি আর সুপারিশ লাভের অন্যতম মাধ্যম এটি।

আজকের জুম‘আ নিয়ে নাজীবের অনেক পরিকল্পনা ছিল। জুম‘আর পর কবরস্থানে গিয়ে জীবনের শেষ শয্যার কথা ভাববে, আর বিকেলে লাইব্রেরি থেকে বই কিনবে। অথচ আল্লাহর পরিকল্পনার কাছে মানুষের শত পরিকল্পনা কতই না তুচ্ছ! কিন্তু এই পরিকল্পনা ভেঙে যাওয়ার মাঝেও নাজীব এক অদ্ভূত আনন্দ খুঁজে পেল। জুম‘আর জামা‘আতে সে শরীক হ’তে পারছে না ঠিকই, কিন্তু হাসপাতালের মর্গের ধারে শুয়ে মৃত্যু ও জীবনের নানাবিধ চিন্তায় এই সপ্তাহজুড়ে সে যে আত্মিক উন্নতি সাধন করেছে, তা নিছক বইয়ের পাতা উল্টে কিংবা দুনিয়াবী কোন মোটিভেশনাল স্পিচ শুনে অর্জন করতে পারত না।

টানা এক সপ্তাহের জ্বর, ইনজেকশন আর ডজনখানেক ওষুধের পর অবশেষে সুস্থতার স্বাদ নিয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দে নাজীব যেন নবজাতক শিশুর মত দুনিয়ার আলো গায়ে মাখতে লাগল। তার মনে পড়ে গেল, মুমিনরা জান্নাতে প্রবেশ করলে যে যাতনাহীন অনন্ত প্রশান্তি পাবে তার কথা। সে কেবলমাত্র দুনিয়াটা দেখার জন্য মাত্র এক সপ্তাহে এত কষ্ট পেল, অথচ কল্পনাতীত সুখের জান্নাতে প্রবেশ করলে কেমন অনুভূতি হবে! রিকশায় বসে নাজীব আনমনা হয়ে গেল।

আদীব ইতিপূর্বে যতবারই নিজের অন্তরের সাথে কথা বলতে চেয়েছে, মৃত্যুর নির্মমতার কথা সে ভয়ে বেশী ভাবতে পারেনি। কিন্তু নাজীবকে নিয়ে কাটানো এই সপ্তাহে দু’জনের আলোচনায় সেই ভয় কেটেছে। জীবনের প্রতিক্ষণে পরম করুণাময় আল্লাহর কুদরতের দর্শন অব্যাহত রাখার জন্য তারা পাঠচক্রের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক বৃদ্ধের ঈমানদীপ্ত ছালাত নাজীবকে আমলের কবুলিয়াত নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে। সে ইদানীং ভাবে, ‘আমরা যেমন দায়সারা ইবাদত করি, তা কি আল্লাহ কবুল করবেন? আমি আমার রব হ’লে কি নিজের আমলগুলো কবুল করতাম’? আসলেই একজন বান্দা তার নিজের পাপ ও ত্রুটি সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানে। সুতরাং পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে সে যদি নিজের আমলের হিসাব কষে, তবে আত্মার উন্নয়ন কতই না সহজ!

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে বাড়ির সামনে রিকশা থামল। হাসপাতালের যে দিনগুলো নাজীব শুয়ে-বসে কাটিয়েছে, তাতে সে জীবনের যত পাঠ আর আত্মার পরিশুদ্ধিতা অর্জন করেছে, তা সুস্থতার ব্যস্ততার মাঝে হয়তো সম্ভব হ’ত না। মূলত আমাদের কর্তব্য হ’ল জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আখিরাতের অপরিহার্য নিদর্শনাবলী খুঁজে ফেরা। সমাজ, দেশ এবং নিজের পরিবার থেকে শুরু করে সবকিছু সংশোধনের জন্য খুব বেশী কিছুর দরকার নেই। শুধু সুন্দর মন, ছহীহ আক্বীদা এবং জীবনের প্রতিটি ধাপে চিন্তাশীল পদক্ষেপই আমাদেরকে পৌঁছে দেবে কাঙ্ক্ষিত সফলতার সর্বোচ্চ চূড়ায়! আল্লাহ আমাদের কবুল করুন- আমীন!

মুহাম্মাদ মুবাশ্শিরুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।






বিষয়সমূহ: বিধি-বিধান
আরও
আরও
.