বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস প্রসঙ্গে বলতে গেলে কিছু অপ্রিয় ঐতিহাসিক সত্য সামনে আসে। সেদিনকার বাস্তবতা কী ছিল? আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানেনা যে, সেদিন পাকিস্তান বাহিনী কার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল? মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী কি সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন? কেন ছিলেন না? কেন সেদিন সে অনুষ্ঠানে যোগদানের উদ্দেশ্যে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ফ্লাই করার পর মধ্য আকাশে ভারতীয় বিমান এসে হামলা করে তাকে ও তার সাথী মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল। কিভাবে তারা সেদিন জ্বলন্ত হেলিকপ্টার থেকে সিলেটের মাটিতে পড়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, তার সঠিক উত্তর আজও কেউ দিতে পারেনি। বাস্তবে সেদিন আত্মসমর্পণ হয়েছিল ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজীর। ভারতের তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতারা তাদের ১৬ই ডিসেম্বরের ভাষণে সর্বদা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কৃতিত্বের কথাই তুলে ধরেন। সেখানে আমাদের অগণিত মুক্তিযোদ্ধার বিরল আত্মত্যাগের কোন উল্লেখ নেই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি বুঝতে গেলে ১৯৪৭ সালের ভারতবিভাগের দর্শনে ফিরে যেতে হবে। আর সেটি ছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের দর্শন। ইসলামের জন্যই সেদিন এ স্বাধীন ভূখন্ডের জন্ম হয়েছিল। একই গুজরাটী বংশোদ্ভূত দুই নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বলেছিলেন, উই আর ফার্স্ট ইন্ডিয়ান, দেন হিন্দু অর মুসলিম’ (আমরা প্রথমে ভারতীয়, পরে হিন্দু বা মুসলিম)। কিন্তু এর জওয়াবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘উই আর ফার্স্ট মুসলিম, দেন ইন্ডিয়ান’ (আমরা প্রথমে মুসলমান, পরে ভারতীয়)। আকাশ-পাতাল ব্যবধান এই আদর্শিক পার্থক্যের কারণেই মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। তাই দু’হাযার মাইল দূরত্বের পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান মিলে একটি ঐক্যবদ্ধ ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু অদূরদর্শী ও হঠকারী শাসকের যুলুমের কারণে পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রোহ শুরু হয়। যাকে দমন করার জন্য তারা পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করে। ফলে বহু নিরপরাধ মানুষ হতাহত হয়। প্রাণে বাঁচার জন্য অসংখ্য মানুষ সেদিন প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নেয়। তখন তারা এই সুযোগটি গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষদিকে এসে ৩রা ডিসেম্বর তারা সরাসরি তাদের সেনাবাহিনী নামিয়ে দেয়। অতঃপর ১৬ই ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের পতন হয়। মেহেরপুর বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে ১৭ই এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়, সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে। যা ছিল এদেশের মানুষের চেতনার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আজ সেই ইতিহাসকে মুছে ফেলে সেখানে কেবল পূজা হচ্ছে। পূজা চলছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যান্টনমেন্ট ও কথিত শহীদ মিনারগুলিতে। যা ইসলামী চেতনা ও মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিরোধী। অথচ এই চেতনা হারিয়ে গেলে এপার বাংলা-ওপার বাংলার মধ্যে নৈতিক কোন পার্থক্য আর থাকবে না। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব একদিন ভারতের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর ’৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময় চাপিয়ে দেওয়া হয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ। আজও বাংলাদেশে ভারতের চাপিয়ে দেওয়া সেই চার মূলনীতিরই চর্চা হচ্ছে। যা আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনার পরিপন্থী। যদিও জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ সংযোজন করে সেই ইসলামী চেতনা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছেন।
আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহকে মুছে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়। অথচ ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানকে দিতে হবে। নাহ’লে এই ভূখন্ডের মানুষ না খেয়ে মরবে। কেননা চট্টগ্রাম হ’ল বাণিজ্যিক বন্দর এবং পাহাড়গুলির নিচে রয়েছে বিভিন্ন খনিজ সম্পদের অমূল্য ভান্ডার। অবশেষে নেহেরুকে পূর্ব পাঞ্জাব দিয়ে দেয়ার বিনিময়ে তিনি সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করেন। জিন্নাহর সেই আত্মত্যাগ ও দূরদর্শিতার কারণেই আজ আমরা স্বাধীনভাবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যবহার করতে পারছি। তবুও বাদ পড়ে গিয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং সিলেটের করিমগঞ্জ যেলা। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে পাহাড়ী যেলাগুলিতে ১৫ বিঘা করে জমি দিয়ে সেখানে মুসলমানদের বসতি স্থাপন করেন। যারা এখন বাঙ্গালী ও পাহাড়ী সংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে এদেশের মানচিত্রকে অটুট রেখেছে।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, বিজয়ের এই মাসে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর শরীফ ওছমান বিন হাদীকে প্রাণ হারাতে হ’ল। দিনে-দুপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক সপ্তাহ পর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ই ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত পৌঁনে ১০টায় তার মৃত্যু হয়। মাত্র ৩২ বছর বয়সে থেমে গেল তার প্রতিরোধ সংগ্রাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ধারণ করতে চেয়েছিলেন বলেই এই তরতাজা নওজোয়ানের মৃত্যুতে দল-মত নির্বিশেষে শোকে মুহ্যমান সারা বাংলাদেশ। তার জানাযায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়াঁ এভিনিউ কানায় কানায় মুছল্লীতে ভরে যায়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাযার পর এতবড় জানাযা এযাবৎ এখানে হয়নি। সেখানে লাখো কণ্ঠে উচ্চারিত মুহুর্মুহু ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ এক নতুন ইসলামী বাংলাদেশের জন্য কতটা উন্মুখ। কিন্তু কাদের হাতে এই বিপ্লবী তরুণকে জীবন দিতে হ’ল? ভারতীয় আধিপত্যবাদ নাকি আভ্যন্তরীণ কায়েমী স্বার্থবাদ? আগামীর ইতিহাসই তা বলে দেবে। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ‘বল বীর- বল উন্নত মম শির!’ ছিল তার বিপ্লবী কণ্ঠের নিত্য উচ্চারণ। তাই প্রিয় কবির কবরের পাশেই তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ রাববুল আলামীন তার গোনাহ-খাতা মাফ করুন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নছীব করুন। আমীন!
সুতরাং নতুন বাংলাদেশ গঠনে দেশের সকল মহলের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহবান, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা ইসলামকে ধারণ করুন। তবেই আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেতে পারে এবং একদিন এদেশ প্রকৃত শান্তি ও সমৃদ্ধি, ন্যায় ও ইনছাফের পথে পরিচালিত হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন।- আমীন! (স.স.)।