রাসূলের আতিথেয়তা ও মেহমানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন

রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরাম অধিকাংশ সময় ক্ষুধার্থ থাকতেন। ক্ষুধার যন্ত্রণা অসহনীয় হ’লে তারা তা অন্যের কাছে প্রকাশ করতেন। আবার নিজের ঘরে যা কিছু থাকতো তা দিয়ে অতিথির আপ্যায়ন ও সমাদর করার চেষ্টা করতেন। অতিথিকে কখনও তারা অসম্মান করতেন না। নিম্নের হাদীছে রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক অতিথি আপ্যায়নের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।

মিক্বদাদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, খাবারের অভাবে আমার ও আমার দু’সাথীর দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি কমে যায়। অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীদের নিকটে নিজেদের উত্থাপন করতে লাগলাম। কিন্তু তাদের কেউ আমাদের কথা শুনলেন না। অবশেষে আমরা নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট গমন করলে তিনি আমাদের সাথে নিয়ে তাঁর পরিবারের নিকটে গেলেন। সেখানে তিনটি বকরী ছিল। তিনি বললেন, তোমরা দুধ দোহন করবে। এ দুধ আমরা বণ্টন করে পান করবো। তিনি বলেন, এরপর থেকে আমরা দুধ দোহন করতাম। আমাদের সবাই যার যার অংশ পান করতো। আর আমরা নবী করীম (ছাঃ)-এর জন্য তাঁর অংশ উঠিয়ে রাখতাম। তিনি রাত্রে এসে এমনভাবে সালাম দিতেন যাতে নিদ্রারত লোক উঠে না যায় এবং জাগ্রত লোক শুনতে পায়।

বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি মসজিদে এসে ছালাত আদায় করতেন। প্রত্যাবর্তন করে দুধ পান করতেন। একদিন রাতে আমার নিকটে শয়তান আগমন করলো। আমি তো আমার অংশ পান করে ফেলেছিলাম। সে বলল, মুহাম্মাদ (ছাঃ) আনছারদের নিকটে গেলে তারা তাঁকে উপঢৌকন দিবে এবং তাদের নিকটে তাঁর এ অল্প দুধের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যাবে। অতঃপর আমি এসে সেটুকুও পান করে ফেললাম। দুধ পুরোটা পান করার পর আমি বুঝতে পারলাম যে, এ দুধ বের করার আর কোন উপায় নেই। তখন শয়তান আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল, তোমার ধ্বংস হোক, তুমি একি করলে! তুমি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দুধ পান করে ফেললে? তিনি জাগ্রত হয়ে যখন তা পাবেন না, তখন তোমার উপর বদদো‘আ করবেন। এতে তোমার সর্বনাশ হয়ে যাবে এবং তোমার ইহকাল ও পরকাল সব নিঃশেষ হয়ে যাবে।

সে সময় আমার শরীরে একটা চাদর ছিল। আমি যদি তা আমার দু’পায়ের উপর রাখি তাহ’লে আমার মাথা বের হয়ে পড়ে, আর যদি তা আমার মাথার উপর রাখি তাহ’লে আমার দু’পা বেরিয়ে পড়ে। কিছুতেই আমার ঘুম আসছিল না। আমার সাথীদ্বয় তো নিদ্রাচ্ছন্ন ছিল। তারা তো আমার মতো কাজ করেনি। তিনি বলেন, অতঃপর নবী করীম (ছাঃ) আগমন করে যেভাবে সালাম করতেন সেভাবেই সালাম করলেন। এরপর মসজিদে ঢুকে ছালাত আদায় করলেন। অতঃপর দুধের নিকটে এসে ঢাকনা খুলে সেখানে কিছুই পেলেন না। এরপর তিনি নিজ মাথা আকাশের দিকে তুললেন। আমি তখন (মনে মনে) বললাম, এখনই হয়তো আমার উপর তিনি বদদো‘আ করবেন, আর আমি নিঃশেষ হয়ে যাবো। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! যে লোক আমার খাবারের ব্যবস্থা করে তুমি তার খাদ্যের ব্যবস্থা কর। আর যে আমাকে পান করায় তাকে তুমি পান করাও।

মিক্বদাদ (রাঃ) বলেন, তখন আমি চাদরটি গায়ে বাঁধলাম এবং একটি ছুরি নিলাম। এরপর (এ ভেবে) বকরীগুলোর কাছে গেলাম যে, এদের মধ্যে যেটি সবচেয়ে বেশী মোটাতাযা আমি সেটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জন্য যবহ করবো। সেখানে গিয়ে দেখলাম, সেটি দুধে পরিপূর্ণ এবং অন্যান্য সব বকরীও দুধে পূর্ণ। অতঃপর আমি মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পরিবারের একটি বাসন নিয়ে এলাম যার মধ্যে তারা দুধ দোহাতেন না। মিক্বদাদ (রাঃ) বলেন, আমি তার মধ্যেই দুধ দোহন করলাম, এমনকি বাসনের উপরের অংশে ফেনা ভেসে উঠলো। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট আগমন করলাম। তিনি বললেন, তোমরা কি রাত্রের দুধ পান করেছ? আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আপনি পান করুন। তিনি পান করে আমাকে দিলেন।

আমি বললাম, হে রাসূল (ছাঃ)! (আরো) পান করুন। তিনি পান করে আমাকে দিলেন। আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, নবী করীম (ছাঃ) পরিতৃপ্ত হয়ে গেছেন এবং আমি তার নেক দো‘আ পেয়ে গেছি, তখন আমি খুশীতে হাসতে হাসতে মাটিতে নুয়ে পড়লাম। রাসূল (ছাঃ) বললেন, হে মিক্বদাদ! এটা তো তোমার একটা মন্দকাজ! তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! ঘটনা না তো ঘটেই গেছে। তখন নবী (ছাঃ) বললেন, এটা একমাত্র আল্লাহ্র মেহেরবানী! তুমি কেন আমাকে জানালে না? আমরা আমাদের সঙ্গীদ্বয়কে জাগাতাম, তাহ’লে তারাও এর অংশ পেত। আমি বললাম, যে মহান স্রষ্টা আপনাকে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর কসম! আপনি যখন পেয়েছেন এবং আমি যখন আপনার সঙ্গে ভাগ পেয়েছি, তখন আর কারো পাওয়া না পাওয়ার ব্যাপারে আমি পরোয়া করি না’ (মুসলিম হা/২০৫৫; আহমাদ হা/২৩৮৬৩; তিরমিযী হা/২৭১৯)


শিক্ষা :

১. এ হাদীছে মদীনায় হিজরতকারী ছাহাবীদের কঠিন মুহূর্তের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে।

২. রাসূল (ছাঃ) ছিলেন অতিথিপরায়ণ। তিনি মিক্বদাদ ও তার সঙ্গীদ্বয়কে আপ্যায়ন করেন নিজের সামগ্রীর স্বল্পতা ও অধিক মুখাপেক্ষিতা সত্ত্বেও।

৩. এতে রাসূল (ছাঃ)-এর রাত্রে বাড়ীতে প্রবেশের শিষ্টাচার বর্ণিত হয়েছে। তিনি ধীরে শান্তভাবে বাড়ীতে প্রবেশ করতেন, যাতে অধিবাসীরা বিরক্ত না হয়। এমন অনুচ্চ শব্দে সালাম দিতেন যাতে জাগ্রত ব্যক্তি শুনতে পায় এবং ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত না হয়।

৪. সফর থেকে ফিরে তিনি মসজিদে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে বাড়ীতে প্রবেশ করতেন এবং সালাম দিতেন।

৫. এ হাদীছ প্রমাণ করে যে ছাহাবায়ে কেরাম রাসূল (ছাঃ)-এর ক্রোধ ও অসন্তোষের অত্যধিক ভয় করতেন।

৬. রাসূলের দুনিয়াবী কোন হক নষ্ট হ’লে তিনি রাগান্বিত হ’তেন না। কোন প্রতিশোধও নিতেন না।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে উক্ত শিক্ষাসমূহ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা তাওফীক দান করুন-আমীন!






আবু নাজীহ (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণ - মুসাম্মাৎ শারমিন আখতার
হাদীছের গল্প - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
জুম‘আর দিনে দো‘আ কবুলের সময় - মুসাম্মাৎ শারমিন আখতার
মহামারী আক্রান্ত এলাকায় না যাওয়া - মুসাম্মাৎ শারমিন আখতার
হানযালা (রাঃ)-এর আল্লাহভীতি - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ছাহাবায়ে কেরামের জীবন যাত্রার একটি নমুনা - মুসাম্মাৎ শারমিন আখতার
আলী (রাঃ) ও খারেজীদের মধ্যকার ঘটনা - মুসাম্মাৎ শারমিন আখতার
রাসূল (ছাঃ) ও মুজাহিদদের সম্পদে বরকত - মুসাম্মাৎ শারমিন আখতার
উপকারীকে প্রতিদান দেওয়া - মুসাম্মাৎ শারমিন আখতার
ইমামকে সতর্ক করতে মুক্তাদীর করণীয় - .
সৎ লোকের দো‘আ - মুসাম্মাৎ শারমিন আখতার
মুসলমানদের নাহাওয়ান্দ বিজয় - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
আরও
আরও
.