কুরআন সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের সংশয় ও তার জবাব

ইসলামের চিরন্তন সংবিধান আল-কুরআন শুধু মুসলমানদের জীবনব্যবস্থাই নয়; বরং তা একটি পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং জ্ঞানগত দিকনির্দেশনা প্রদানকারী জীবনবিধান। যুগে যুগে মুসলিম ও অমুসলিম সকল চিন্তাবিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে আল-কুরআন। অমুসলিমদের মধ্যে একদল কুরআনের গভীরতা অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন, অপর একদল পন্ডিত যারা প্রাচ্যবিদ হিসাবে পরিচিত, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কুরআনের বিরুদ্ধে সংশয় ও বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। এই প্রবন্ধে আমরা প্রাচ্যবিদদের সেসব সংশয়ের জবাব সংক্ষেপে এবং যথাযথভাবে প্রদানের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

প্রাচ্যবিদ্যা ও প্রাচ্যবিদ :

প্রাচ্যবিদ্যা (Orientalism) পশ্চিমা বিশ্বের প্রাচ্যের সংস্কৃতি, ধর্ম ও ইতিহাস নিয়ে গবেষণার একটি শাখা। এই গবেষণার উদ্দেশ্য যত না একাডেমিক, তার চেয়ে অনেক বেশী রাজনৈতিক। এজন্য আমরা দেখি যে, প্রাচ্যবিদদের একটি বড় অংশ গবেষণার নামে ইসলাম বিরোধী প্রচার-প্রচারণায় লিপ্ত হয়েছেন। আর তারই অংশ হিসাবে তারা হাদীছকে তো বটেই, স্বয়ং কুরআনকে পর্যন্ত আল্লাহর বিধান নয়, বরং মানবরচিত সংকলন হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন এবং এর মাধ্যমে ইসলামের প্রতি তাদের বিদ্বেষমূলক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। তারা কুরআনের সমালোচনা করতে গিয়ে এর ঐতিহাসিক সত্যতা, উৎস, ভাষাগত সমালোচনা ও সামাজিক বিধি-বিধানের সমালোচনার মাধ্যমে আল্লাহ অহি হিসাবে কুরআনের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।

উল্লেখ্য যে, প্রাচ্যবিদ বলতে বোঝায় ঐসব পশ্চিমা চিন্তাবিদদের, যারা প্রাচ্যের ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করেন। এই গবেষণাগুলো প্রায়শই নিরপেক্ষ না হয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্ট হয়। এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Orientalism-এ দেখিয়েছেন কিভাবে পশ্চিমারা প্রাচ্যের সমাজ ও সভ্যতার বিরুদ্ধে বিশেষ করে ইসলামের বিরুদ্ধে আধিপত্যবাদী মানসিকতা নিয়ে গবেষণা চালায়। তার মতে, প্রাচ্যবাদী পান্ডিত্য মূলত পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে।[1]

প্রাচ্যবিদদের অবস্থান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্বিমুখী। তাদের কর্মকান্ডে পশ্চিমা কেন্দ্রিকতা (Eurocentrism) ও ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্টতা লক্ষণীয়। যদিও তাদের ইসলাম সংক্রান্ত গবেষণার কিছু ইতিবাচক দিকও ছিল।[2] তবে তাদের হিংসাত্মক এবং অসৎউদ্দেশ্য প্রণোদিত দিকটি খুব কদর্যপূর্ণ। জ্ঞানচর্চার পোষাকে একাডেমিক গবেষণার চেয়ে তাঁরা ঘৃণ্য রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থকেই প্রাধান্য দেন। মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপর তাদের যে জ্ঞানমূলক আধিপত্যবাদী যুদ্ধের সূচনা হয়, তা الغزو الفكري বা বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ[3] হিসাবে পরিচিত। সেজন্য তাদের গবেষণায় সত্য উদঘাটনের চেয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, পূর্বনির্ধারিত পক্ষপাতিত্ব ও সংশয়বাদ স্পষ্টভাবেই পরিলক্ষিত হয়।[4]

নিম্নে প্রাচ্যবিদদের কুরআন বিষয়ক মৌলিক কিছু সংশয়ের জবাব প্রদান করা হ’ল।

প্রাচ্যবিদদের মৌলিক সংশয়সমূহ ও তার জবাব :

১. কুরআনের উৎস নিয়ে সংশয় :

প্রাচ্যবিদদের একটি প্রধান বক্তব্য হ’ল, কুরআন মূলত আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব নয়। বরং মুহাম্মাদ (ছা.)-এর নিজস্ব রচনা। তিনি কুরআনের তথ্যসমূহ মূলতঃ বাইবেল, তাওরাত, ইহুদী-খ্রিষ্টান সাহিত্য এবং অন্যান্য ধর্ম (যেমন জরাথুস্ট্রবাদ, ছাবেই ধর্ম) থেকে ধার করে লিপিবদ্ধ করেছেন। তারা কুরআনে বর্ণিত সৃষ্টি, আদম, জান্নাত, জাহান্নাম এবং নবীদের গল্পের সাথে অন্যান্য ঐশী গ্রন্থের সাদৃশ্য দেখে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) অন্যান্য ধর্ম থেকে সবকিছু গ্রহণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ইবনে ওয়াররাক (Ibn Warraq) অভিযোগ করেন যে, ছালাতের শর্তাবলী ইহূদী লেখা থেকে এবং পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ছাবেইদের থেকে নেওয়া হয়েছে। তিনি জিন সম্পর্কিত ধারণা পারসিক ধর্ম থেকে গ্রহণের দাবী করেন এবং মেরি (ঈসা (আঃ)-এর মা) ও মিরিয়ামের (হারুন (আঃ)-এর বোন) মধ্যে বিভ্রান্তির অভিযোগ করেন।[5] প্রাচ্যবিদরা আরও দাবী করেন যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) ইহূদী ও খ্রিষ্টানদের সংস্পর্শে এসে এই জ্ঞান অর্জন করেছেন, যদিও তারা স্বীকার করেন যে, সেই সময়ে এই বইগুলো আরবীতে অনূদিত ছিল না বা নবীর কাছে সহজলভ্য ছিল না।[6]

উইলিয়াম মুইর (William Muir) তার The Life of Mahomet (১৮৫৮) গ্রন্থে কুরআনকে মুহাম্মদ (ছাঃ)-এর ‘ব্যক্তিগত রচনা’ বলে অভিহিত করেন। তিনি তাঁকে প্রভাব ও ক্ষমতার আকাঙ্খী, একজন ভাবকবি ও ভুতাহত বলেও চিহ্নিত করেছেন।[7] জন ওয়ানসব্রো (John Wansbrough) তার Quranic Studies (১৯৭৭) গ্রন্থে দাবী করেন যে, কুরআন পরবর্তীকালে সংকলিত হয়েছে। তাদের মতে, কুরআন মুহাম্মদ (ছাঃ)-এর নিজস্ব চিন্তা, বা তা খ্রিষ্টীয় ও ইহূদী ধর্মগ্রন্থ থেকে অনুপ্রাণিত।[8]

জবাব :

প্রথমতঃ কুরআন নিজেই এই অপবাদ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُبِينٌ ‘আর আমরা তো জানি যে, তারা বলে, তাকে শিক্ষা দেয় জনৈক ব্যক্তি। অথচ যার দিকে তারা ইঙ্গিত করে, সে তো একজন অনারব। অথচ এই কুরআন হ’ল পরিষ্কার আরবী ভাষায় (নাহল ১৬/১০৩)। অর্থাৎ মক্কার কিছু ইহূদী, খৃষ্টান দাস ছিল, যাদের প্রতি ইঙ্গিত করে মক্কার কাফেররা বলত যে, অমুক দাস মুহাম্মাদকে কুরআন শিক্ষা দেয়। ফলে আল্লাহ তাদের উত্তরে বললেন, যাদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়, তারা তো শুদ্ধ আরবীই জানে না। অতএব এই দাবী নিতান্তই অবান্তর।[9]

আল-কুরআন যদি তাদের ধারণামত এমন বিভিন্ন ভিনদেশী উৎস থেকে গৃহীত হত, তবে তাতে বহু বিভ্রান্তি ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যেত। এজন্য আল্লাহ নিজেই চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا ‘তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? যদি এটা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হ’ত, তবে তারা এতে অনেক ধরনের বৈপরীত্য খুঁজে পেত’ (নিসা ৪/৮২)

দ্বিতীয়তঃ মুহাম্মাদ (ছাঃ) ছিলেন উম্মী তথা নিরক্ষর। তিনি অন্য কোন গ্রন্থ পাঠ করবেন, পর্যালোচনা করবেন, তারপর নিজেই এমন এক অপূর্ব সাহিত্য, বিশুদ্ধ ইতিহাস ও বিজ্ঞানসম্মত কিতাব রচনা করবেন- এটা মোটেই স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।[10]

তৃতীয়তঃ তৎকালে বাইবেল ও তাওরাতের কোন আরবী অনুবাদ ছিল না। ফলে রাসূল (ছাঃ) অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হ’লেও সেখান থেকে কিছু ‘ধার’ করার সুযোগ ছিল না।[11]

চতুর্থতঃ পবিত্র কুরআনের সাথে বাইবেল ও তাওরাতের কিছু বিষয় যদি সাদৃশ্যপূর্ণ হয়, তবে সেটা অস্বাভাবিক নয়। কেননা আল্লাহ সকল নবীর কাছে যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তার মৌলিক বক্তব্য একই ছিল। সেসব গ্রন্থে যে সকল কাহিনী ছিল, তা কুরআনেও কিছু কিছু এসেছে। সবই যেহেতু একই মূল উৎস থেকে নাযিল হয়েছে, তাই তাতে সাদৃশ্য থাকা স্বাভাবিক। এতে মোটেও ‘ধার’ করা সাব্যস্ত হয় না, বরং কুরআনের এলাহী সত্যতাই প্রমাণ করে।[12]

পঞ্চমতঃ পবিত্র কুরআনে সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয় যেমন আছে, তেমনি এমন বহু বিষয় রয়েছে, যার কোন ইঙ্গিত বা অস্তিত্বই বাইবেলে নেই। যেমন বিগ ব্যাং তত্ত্ব (আম্বিয়া ২১/৩১)[13] অন্যদিকে কুরআনে এমন অনেক বিষয় আছে যা বাইবেলের ভুল সংশোধনও করে। যেমন বাইবেল ও কুরআন উভয়ই মহাবিশ্ব ও মানব জাতি সৃষ্টির বর্ণনা দেয়, তবে উপস্থাপনায় পার্থক্য রয়েছে। বাইবেল ৬ দিনে সৃষ্টির বর্ণনা দিয়েছে এবং ৭ম দিনে বিশ্রামের কথা বলেছে (আদিপুস্তক ২/১-২)। অপরদিকে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তবে কোন বিশ্রামের কথা উল্লেখ করেনি, কারণ আল্লাহ কখনোই ক্লান্ত হন না। আল্লাহ বলেন, وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبٍ ‘ আর নিশ্চয়ই আমরা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এ দু’য়ের মধ্যেকার সবকিছুকে সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে। অথচ এতে আমাদের কোনরূপ ক্লান্তি স্পর্শ করেনি’ (ক্বাফ ৫০/৩৮)। এই আয়াত বাইবেলের ঐ বর্ণনাকে সংশোধন করেছে, যেখানে বলা হয়েছে সৃষ্টিকর্তা বিশ্রাম নেন। এতে স্পষ্টতই বোঝা যায়, কুরআন পূর্ববর্তী কোন কিতাবের অনুকরণ নয়, বরং আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত স্বতন্ত্র কিতাব।

২. কুরআনের সংকলন প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয়

প্রাচ্যবিদদের অভিযোগ, কুরআন বহু বছর পর সংকলিত হয়, অনেক আয়াত হারিয়ে যায়। অতঃপর ছাহাবীগণ নিজের মত করে তা রচনা ও সজ্জায়ন করেন। তাদের দলীল হ’ল খলীফা ওছমান (রাঃ) কর্তৃক কুরআনের সংকলন এবং অন্যান্য সংস্করণ ধ্বংসের নির্দেশ, যা তাদের মতে, কুরআন বিকৃতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এমনকি এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইসলাম এবং এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ব্রিটেনিকাতে পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়েছে যে, কুরআনের অনেক অংশ হারিয়ে গেছে।[14]

তারা কুরআনের বিভিন্ন ক্বিরাআত (পঠন পদ্ধতি)-এর অস্তিত্বকে বাইবেলের বিভিন্ন সংস্করণের মতো কুরআনেরও ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ হিসাবে উপস্থাপন করেন।[15]

১৯৭২ সালে ইয়ামনের ছান‘আয় আবিষ্কৃত ছান‘আ পান্ডুলিপি (Sana'a Manuscript) প্রাচ্যবিদদের সমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। এই পান্ডুলিপির নিম্ন পাঠে (lower text) ওছমানী পাঠের (upper text) থেকে অনেক ভিন্নতা এবং অধ্যায়ের ভিন্নক্রম পাওয়া যায়।[16] গার্ড আর. পুইন (Gerd R. Puin) এই গবেষণার ভিত্তিতে দাবী করেন যে, কুরআন একটি ‘বিভিন্ন পাঠ্যের মিশ্রণ’ (a kind of cocktail of texts) যা সময়ের সাথে বিকশিত হয়েছে এবং এর কিছু অংশ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পূর্ববর্তী হতে পারে।[17] সাম্প্রতিক কালে আবিষ্কৃত বার্মিংহাম/প্যারিস পান্ডুলিপির কার্বন ডেটিং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সময়ের কাছাকাছি দেখালেও প্রাচ্যবিদরা একে পরবর্তীকালের সংযোজন হিসাবে দেখেন।[18] এছাড়াও প্যাট্রিসিয়া ক্রোন (Patricia Crone) এবং মাইকেল কুক (Michael Cook) দাবী করেন যে, ৭ম শতাব্দীর শেষ দশকের আগে কুরআনের অস্তিত্ব সম্পর্কে কোন ‘নিশ্চিত প্রমাণ’ নেই।[19]

জবাব :

প্রথমতঃ কুরআন নিজেই স্পষ্ট করেছে যে, এটি আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত। যেমন আল্লাহ বলেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ ‘নিশ্চয়ই আমরা এই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরাই তা সংরক্ষণকারী’ (হিজর ১৫/৯)। কুরআনের ভাষ্য মোতাবেক আল্লাহ নিজেই কুরআনকে যেকোন পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজন থেকে রক্ষা করেছেন।

দ্বিতীয়তঃ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জীবদ্দশায় কুরআন মুখস্থকরণ

(হিফয) এবং লিখিত উভয় পদ্ধতিতেই সংরক্ষিত হয়েছিল। প্রতিটি আয়াত নাযিলের পর নবী (ছাঃ) নিজে এবং ছাহাবীগণ তা মুখস্ত করতেন এবং লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতেন। এই উভয়বিধ পদ্ধতি কুরআনের পাঠ্য (Text)-কে শুরু থেকেই সুরক্ষিত করেছিল। কুরআনের সংকলন তিন পর্যায়ে হয়- (১) রাসূল (ছাঃ)-এর জীবদ্দশায় : অহি নাযিল হওয়ার পর ছাহাবীগণ লিখে রাখতেন এবং মুখস্ত করতেন। (২) আবু বকর (রাঃ)-এর সময়কাল : ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক কুরআনের হাফেয ছাহাবীদের মৃত্যু হ’লে কুরআনে হেফাযতের উদ্দেশ্যে একটি পূর্ণ মুছহাফ তৈরি করা হয়। প্রথম খলীফা আবুবকর (রাঃ)-এর নির্দেশে যায়েদ ইবনে ছাবিত (রাঃ) একটি সুক্ষ্ম ও সতর্ক যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কুরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ লিখিত সংকলন প্রস্ত্তত করেন। এই প্রক্রিয়ায় মৌখিক ও লিখিত উভয় প্রমাণ মিলিয়ে দেখা হয় এবং এটা নিশ্চিত করা হয় যে, প্রতিটি আয়াত বহু সূত্র থেকে প্রমাণিত।

(৩) ওছমান (রাঃ)-এর সময়কাল : ইসলাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে অনারবদের সুবিধার্থে হাফছাহ (রাঃ) কর্তৃক সংরক্ষিত কুরআন ছয়টি কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তৃতীয় খলীফা ওছমান (রাঃ)-এর এই সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল মূলত কুরআনের ক্বিরাআতগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান এবং আঞ্চলিক ভিন্নতা দূর করে একটি সার্বজনীন ও প্রমিত পাঠ প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে কুরআনের সংরক্ষণ অধিকতর নিশ্চিত করা হয়েছিল, কোন বিকৃতি সাধন করা হয়নি।[20]

তৃতীয়তঃ ছাহাবীগণ কুরআন থেকে আয়াত বাদ দিয়েছেন বা পরিবর্তন করেছেন এমন কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অপবাদ। কুরআন নাযিলের পর থেকেই ছাহাবীগণ কুরআন মুখস্থ করতেন। এককভাবে কোন ছাহাবীর পক্ষে তাতে কিছু বাদ দেয়া বা পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না। কেননা সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রস চেক হয়ে অপরজনের কাছে ধরা পড়ে যেত। তাছাড়া কেবল মুখস্তই নয়, তা হাড়ে বা বিভিন্ন স্থানে লিখিতও ছিল। অতএব কুরআনের কোন অংশ হারিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। স্রেফ ধারণা ছাড়া এর পিছনে কোন ঐতিহাসিক ও দালীলিক প্রমাণ নেই।[21]

চতুর্থতঃ কুরআনের ৭ ক্বিরাআত একটি সুবিদিত বিষয়, যা কেবল শব্দের উচ্চারণভিন্নতা বোঝায়। এতে অর্থের কোন ভিন্নতা হয় না যে একে বিকৃতি হিসাবে গণ্য করা যাবে। ক্বিরাআতগুলো কুরআনের মূল ব্যঞ্জনবর্ণের কাঠামো (الرسم) বজায় রেখে পাঠ করার একটি অনুমোদিত বৈচিত্র, যা মুহাম্মাদ (ছাঃ) নিজেই অনুমোদন করেছিলেন। এগুলি বাইবেলের মতো ভিন্ন সংস্করণ নয়, যাতে সম্পূর্ণ পাঠ ও তথ্যই ভিন্ন; বরং একই পাঠের বিভিন্ন অনুমোদিত উচ্চারণ ও ব্যাকরণগত রূপ।[22] ছান‘আ পান্ডুলিপির নিম্ন পাঠে যে ভিন্নতা দেখা যায় তা মূলত ক্বিরাআতের ভিন্নতা, মূল ওছমানী পাঠ্য (Text)-এর ভিন্নতা নয়। অন্যদিকে প্যারিসে পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রাচীন যে পান্ডুলিপি পাওয়া গেছে, তা বরং কুরআনের সংরক্ষিত হওয়াকেই সুপ্রমাণিত করে। 

পঞ্চমতঃ প্রাচ্যবিদরা অতীতকালীন কোন কিছুর প্রাথমিক প্রমাণ হিসাবে প্রত্নতাত্ত্বিক ও লিখিত প্রমাণকেই কেবল সামনে আনেন। অথচ ইসলামের একটি বিশেষ ঐতিহ্য হ’ল হিফয বা মৌখিক ভাবে পূর্বঐতিহ্য সংরক্ষণ করা, যার কারণে বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে পর্যন্ত এখনও প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ কুরআনের হাফেয তৈরী হচ্ছে। যেহেতু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণই প্রাচ্যবিদদের কাছে কেবল সুনিশ্চিত প্রমাণ, তাই কুরআনের প্রামাণিকতা নিয়ে তারা সংশয় তৈরী করেন। অথচ এর বিপরীতে ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে তাওয়াতুর (ধারাবাহিক বিবরণ) এবং হিফয (মুখস্থকরণ)-এর একটি দৃঢ় ঐতিহ্য রয়েছে, যা প্রত্নতাত্ত্বিক ও লিখিত প্রমাণের চেয়েও ক্ষেত্রবিশেষে অনেক বেশী শক্তিশালী। সুতরাং ‘নিশ্চিত প্রমাণ’ কেবল প্রতণতাত্ত্বিক বা লিখিত নিদর্শনই হতে হবে- প্রাচ্যবিদদের এই নীতি যুক্তি ও বাস্তবতার নিরিখে এবং ইতিহাসের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণই ভিত্তিহীন। এই নীতি জ্ঞানের সংরক্ষণ করে না, বরং জ্ঞানকে ধ্বংসই করে। (ক্রমশঃ)


[1]. Edward W. Said, Orientalism (Newyork : Vintage books, 1979), p.36

[2]. যেমন-হাদীছ ডিকশনারী রচনা, প্রাচীন ইসলামী গ্রন্থাবলীর পাঠোদ্ধার প্রভৃতি (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : ড. মুহাম্মাদ সিবাঈ, আল-ইসতিশরাক্ব ওয়াল মুসতাশরিকুন : মা লাহুম ওয়ামা আলাইহিম (কায়রো : দারুল ওয়ার্রাক্ব, ১ম প্রকাশ : ১৯৬৮ইং, পৃ. ৩১-৩৩।

[3]. বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : ড. আলী জারীশাহ ও মুহাম্মাদ শরীফ আয-যায়বাক্ব, আসালিবুল গুযু আল-ফিকরী

[4]. Adil kadavath, Orientalism: The Western Hierarchy Against Islam, Islam on web, Aug 13, 2024, https://en.islamonweb.net/orientalism

[5]. Ibn-e-Warraq, The Origins of the Koran (New York : Prometheus Books 59 John Glenn Drive, Amherst), p. 592.

[6]. Nazar Fadli and others, Orientalists and Their Study of the Qur’an, The International Journal of Social Sciences, Aug 13, 2024, https://en.islamonweb.net/orientalism.

[7]. William Muir, The life of Mahomet (London : Smith, Elder and co.), p 35-39.

[8]. John Wansbrough, Quranic Studies (New york : Prometheus Books), 1977.

[9]. Muhammad Mohar Ali, The Qur'an And The Orientalists: An Examination of their Main Theories and Assumptions (London : Jamiyat Ihyaa Minhaj Al-Sunnah), 2004, p 94.

[10]. ড. মুহাম্মাদ খলীফা, আল-ইসতিশরাক ওয়াল কুরআনিল আযীম (কায়রো : দারুল ইতিছাম, ১৯৯৪), পৃ. ৪৩।

[11]. The Qur'an And The Orientalists, p 109.

[12]. ibid, p 217.

[13]. ibid, p 192.

[14]. ড. মুহাম্মাদ আমীন, আল-মুসতাশরিকুন ওয়াল কুরআনিল কারীম (জর্ডান : দারুল আমাল, ২০০৪), পৃ. ২৭১-৭২।

[15]. George sale, The Koran (New York : Fredrick worn & company), 1890, p.49.

[16]. Gerd-R Puin, Observations on Early Qur'an Manuscripts in anʿāʾ (In Stefan Wild (ed.). The Qur'an as Text. Leiden, Netherlands: E. J. Brill, 1996), p. 107–111.

[17]. Patricia Crone , Michael A. Cook, Hagarism: The Making of the Islamic World (London: Cambridge University Press), 1977.

[18]. Keith E. Small, Textual Criticism and Qur'an Manuscripts (Lexington Books), 2011.

[19]. Elisabeth Puin, At a glance: The first two Islamic centuries] (in German) (1st ed.). Berlin: Verlag Hans Schiler. 2008, p. 461.

[20].আল-ইসতিশরাক ওয়াল কুরআনিল আযীম, পৃ. ৯২-৯৭; ড. মুহাম্মাদ আবু লায়লাহ, আল-কুরআনুল কারীম মিনাল মানযূরিল ইসতিশরাকি (কায়রো : দারুন নাশর লিল-জামিআত, ২০০২), পৃ. ১৮৫-৯০

[21]. আল-মুসতাশরিকুন ওয়াল কুরআনিল কারীম, পৃ. ২৭৮-৮৭।

[22]. , পৃ. ৪০২, ৪১৭-২১।






মানবাধিকার ও ইসলাম (১২তম কিস্তি) - শামসুল আলম
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাক্বলীদ - মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী
মৃত ব্যক্তির নিকট কুরআন তেলাওয়াতের বিধান - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
আল্লাহর সতর্কবাণী - রফীক আহমাদ - বিরামপুর, দিনাজপুর
সুন্নাত উপেক্ষার পরিণাম - লিলবর আল-বারাদী - যশপুর, তানোর, রাজশাহী
আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে কতিপয় ভ্রান্ত আক্বীদা (শেষ কিস্তি) - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
আল-কুরআনের আলোকে জাহান্নামের বিবরণ (শেষ কিস্তি) - বযলুর রশীদ
ইসলামে তাক্বলীদের বিধান (৪র্থ কিস্তি) - আহমাদুল্লাহ - সৈয়দপুর, নীলফামারী
কুরআন মাজীদকে আঁকড়ে ধরার স্বরূপ (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - ড. নূরুল ইসলাম
মানব জাতির সাফল্য লাভের উপায় - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
আদর্শ পরিবার গঠনে করণীয় (২য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
তাক্বলীদের বিরুদ্ধে ৮১টি দলীল (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
আরও
আরও
.