وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ-
‘তোমরা যুদ্ধ কর আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে, যারা যুদ্ধ করে তোমাদের বিরুদ্ধে। তবে এতে সীমালংঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের ভালবাসেন না’ (বাক্বারাহ ২/১৯০)।
পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, রক্তপাত আর আর্তনাদ। বিজয়ী শক্তির দাম্ভিকতায় যুগে যুগে পদদলিত হয়েছে মানবতা, লুণ্ঠিত হয়েছে সম্মান। কিন্তু আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে, আইয়ামে জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে ইসলাম এক অভূতপূর্ব ও মানবিক যুদ্ধের নীতিমালা বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ বিধান নাযিল করেছেন, যা যুদ্ধক্ষেত্রেও মানবাধিকারের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা স্থাপন করেছে।
আয়াতের শানে নুযূল ও প্রেক্ষাপট :
মক্কায় সুদীর্ঘ ১৩ বছর মুসলিমরা অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেছেন, কিন্তু তাদের তরবারি উত্তোলনের অনুমতি ছিল না। মদীনায় হিজরতের পর যখন মক্কার কাফেররা সেখানেও মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হ’ল এবং বদর প্রান্তরে সশস্ত্র যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হ’ল, তখন আত্মরক্ষা ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত নাযিল করেন। বিখ্যাত ছাহাবী ইবনু আববাস (রাঃ) ও প্রখ্যাত তাবেঈ রবী‘ ইবনে আনাস (রহঃ) -এর মতে, শত্রুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের অনুমতি দিয়ে অবতীর্ণ এটিই পবিত্র কুরআনের প্রথম আয়াত (নাসাঈ হা/৩০৮৫)।
হুদায়বিয়া সন্ধির পরের বছর ৭ম হিজরীতে গত বছরের চুক্তি অনুযায়ী ওমরাহ পালনের জন্য যখন মুসলমানগণ প্রস্ত্ততি গ্রহণ করেন, তখন অনেকে আশংকা প্রকাশ করেন যে, কাফেররা চুক্তি ভঙ্গ করে হামলা করতে পারে। তখন অত্র আয়াত নাযিল হয় (কুরতুবী)।
ব্যাখ্যা :
আয়াতটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী অংশ হ’ল যুদ্ধের আদেশ দেয়ার পর বলা হয়েছে, ‘তবে (যুদ্ধের ক্ষেত্রে) সীমালংঘন করো না’। যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় পক্ষের রক্ত গরম থাকাই স্বাভাবিক। প্রতিশোধের আগুনে অন্ধ হয়ে যাওয়াটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু এখানেই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আল্লাহ মুমিনদেরকে যুদ্ধের ময়দানেও চরম সংযম ও নৈতিকতার পাঠ দিয়েছেন। প্রখ্যাত মুফাসসির ইবনু কাছীর (রহঃ) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করো, তবে তাতে সীমালঙ্ঘন করো না। হাসান বাছরী (রহঃ)-এর মতে, এর মধ্যে যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ অন্তর্ভুক্ত। যেমন- মৃতদেহ বিকৃত করা, গনীমতের সম্পদ আত্মসাৎ করা, নারী, শিশু, বৃদ্ধ (যাদের যুদ্ধে কোন অংশগ্রহণ নেই), সাধক ও উপাসনালয়ের অধিবাসীদের হত্যা করা এবং কোন কারণ ছাড়াই গাছপালা জ্বালিয়ে দেওয়া ও প্রাণী হত্যা করা (ইবনু কাছীর ঐ আয়াতের ব্যাখ্যা)।
নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতিটি যুদ্ধে উক্ত পদক্ষেপ প্রতিফলিত হয়েছে। হাদীছের এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন কোন সেনাদল প্রেরণ করতেন, তখন কঠোরভাবে নির্দেশনা দিতেন, বলতেন,اُخْرُجُوا بِسْمِ اللهِ تُقَاتِلُوْنَ فِى سَبِيْلِ اللهِ مَنْ كَفَرَ بِاللهِ لاَ تَغْدِرُوْا وَلاَ تَغُلُّوا وَلاَ تُمَثِّلُوا وَلاَ تَقْتُلُوا الوِلْدَانَ وَلاَ أَصْحَابَ الصَّوَامِعِ- ‘তোমরা আল্লাহর নামে বের হও! তোমরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ কর তাদের সাথে যারা আল্লাহর সাথে কুফরী করে। তোমরা বিশ্বাস ভঙ্গ করো না, খেয়ানত করো না, নিহত ব্যক্তির অঙ্গ ছেদন করো না, শিশুদের ও গীর্জার পূজারীদের হত্যা করো না’ (আহমাদ হা/২৭২৮, সনদ হাসান-আরনাঊত্ব; বায়হাক্বী হা/১৮৬১৮)।
ইসলামের প্রথম খলীফা আবূবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ) সিরিয়ায় সেনাদল পাঠানোর সময় যে ঐতিহাসিক দশটি অমূল্য উপদেশ দিয়েছিলেন, তা এই আয়াতেরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা উপাসনালয়ে এমন কিছু মানুষকে পাবে, যারা দুনিয়া ত্যাগ করে ইবাদতে মগ্ন আছে, তাদের নিজ অবস্থায় ছেড়ে দেবে। কোন ফলবান বৃক্ষ কাটবে না, জনপদ বিরান করবে না এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করবে না...’। আধুনিক বিশ্বের তথাকথিত মানবাধিকার সনদ খ্যাত জেনেভা কনভেনশনও ইসলামের এই মহানুভবতার শিক্ষার ধারে-কাছেও নেই।
শিক্ষণীয় দিকসমূহ :
১. লড়াই হবে কেবল সত্যের পথে : আয়াতে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ (আল্লাহর পথে) কথাটি যুক্ত করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মুসলিমদের যুদ্ধ কোন রাজ্য বিস্তার, সম্পদ লুণ্ঠন বা দাম্ভিকতা প্রকাশের জন্য নয়। এই লড়াই স্রেফ আল্লাহর উদ্দেশ্যে, দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে নয়। এ লড়াই কেবল যুলুমের অবসান এবং আল্লাহর যমীনে তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য।
২. নিরপরাধের সুরক্ষা : যে ব্যক্তি অস্ত্র ধারণ করেনি, যুদ্ধক্ষেত্রে তার গায়ে একটি আঁচড় পড়াও ইসলাম সমর্থন করে না। এটি ইনছাফ ও মানবাধিকারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
৩. আল্লাহর ভালোবাসা লাভ : মুমিন কখনো প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে অন্ধ হয় না। সে সর্বদা আল্লাহর ভালোবাসার কাঙাল। তাই সে জানে, সীমালংঘন করলে সে আল্লাহর দয়া ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে।
৪. যুদ্ধ হবে যাদের সাথে : অত্র আয়াতে আরেকটি মৌলিক নীতি বলে দেওয়া হয়েছে যে, যুদ্ধ কেবল তাদের সাথে হবে, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করে।
উপসংহার :
সূরা বাক্বারাহ-এর এই আয়াতটি কেবল একটি আইনী নির্দেশিকা নয়; বরং এটি হ’ল মানবাধিকারের এক অমর ঘোষণাপত্র। আজ বিশ্বজুড়ে যখন যুদ্ধের নামে নারী, শিশু ও নিরপরাধ মানুষের রক্তে হোলি খেলা হচ্ছে, তখন ১৪০০ বছর পূর্বে অবতীর্ণ এই আয়াতটি বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের শান্তি ও ইনছাফ কেবল ইসলামই দিতে পারে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের ভালোবাসেন না। আল্লাহ আমাদেরকে উক্ত আয়াতের সঠিক তাৎপর্য অনুধাবন করা এবং আল্লাহ প্রেরিত নূর তথা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জীবন গঠনের তাওফীক দান করুন-আমীন!