قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ - يَهْدِي بِهِ اللهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ-

‘নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হ’তে এসেছে একটি নূর ও স্পষ্ট বর্ণনাকারী কিতাব। যার মাধ্যমে আল্লাহ ঐসব লোকদের শান্তির পথ সমূহ প্রদর্শন করেন, যারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং তিনি তাদেরকে (কুফরীর) অন্ধকার হ’তে (ঈমানের) আলোর দিকে বের করে আনেন স্বীয় অনুমতিক্রমে। আর তিনি তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন’ (মায়েদাহ ৫/১৫-১৬)।

ব্যাখ্যা :

ক. ‘নূর’ ও ‘স্পষ্ট বর্ণনাকারী কিতাব’-এর তাৎপর্য : হাফেয ইবনু কাছীর (রহ.) তাঁর বিখ্যাত তাফসীরে উল্লেখ করেছেন, আয়াতে ‘নূর’ ও ‘কিতাব’ দ্বারা প্রধানত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এবং এটি যার ওপর নাযিল হয়েছে সেই রাসূল (ছাঃ)-কে বোঝানো হয়েছে (তাফসীর ইবনু কাছীর, ৩/৫৫ পৃ.)।

ইমাম ইবনু জারীর ত্বাবারী ও আল্লামা শাওকানী (রহ.) উল্লেখ করেছেন, আয়াতে ‘নূর’ ও ‘সুস্পষ্ট কিতাব’ দ্বারা মূলতঃ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনকেই বোঝানো হয়েছে। এখানে গুণবাচক অর্থে একটি সত্তাকে দু‘টি অভিধায় (নূর ও কিতাব) ভূষিত করা হয়েছে (عَطْفُ الصِّفَةِ عَلَى الصِّفَةِ)। কারণ কুরআন সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী এবং অন্তরের অন্ধকার দূরকারী নূর (তাফসীর ত্বাবারী, ১০/১৪৪-১৪৫ পৃ.; ফাতহুল ক্বাদীর, ২/৩০ পৃ.)।

খ. অন্ধকার থেকে আলোর দিকে উত্তরণ : ইমাম ইবনু জারীর ত্বাবারী (রহ.) এবং আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেন, আয়াতে বহুবচন ‘যুলুমাত’ (অন্ধকারসমূহ) দ্বারা কুফর, শিরক, বিদ‘আত, নিফাক ও নফসের আনুগত্যের শতধা বিভক্ত পথকে বোঝানো হয়েছে। আর একবচন ‘নূর’ (আলো) দ্বারা তাওহীদ, সুন্নাহ এবং সরল-সঠিক একটিমাত্র পথকে বোঝানো হয়েছে (তাফসীর ত্বাবারী, ১০/১৪৪-১৪৫ পৃ.; মাদারিজুস সালিকীন, ১/৩১২ পৃ.)।

গ. শান্তির পথ (সুবুলুস সালাম) : আল্লামা কুরতুবী (রহ.) বলেন, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী হয়, আল্লাহ তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে সালাম তথা নিরাপত্তার পথ সুগম করে দেন (তাফসীর কুরতুবী, ৬/১১৮-১১৯ পৃ.)।

একটি সংশয় ও তার নিরসন :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কি ‘নূরের’ তৈরী? অনেকে উক্ত আয়াতে বর্ণিত ‘নূর’ শব্দ দিয়ে রাসূল (ছাঃ) শারীরিক বা সৃষ্টিগতভাবে ‘নূরের তৈরী’ বলে প্রমাণ করতে চান, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অহি-ভিত্তিক আক্বীদা পরিপন্থী। এর কারণ হ’ল

প্রথমত : আয়াতে ‘নূর’ শব্দটি মাজাযী (রূপক) বা হেদায়াতের অর্থে ব্যবহার হয়েছে, শারীরিক উপাদান (মাদ্দা) অর্থে নয়। আল-কুরআনে কুরআনকেও ‘নূর’ বলা হয়েছে (আ‘রাফ ৭/১৫৭), তাওরাতকেও ‘নূর’ বলা হয়েছে (মায়েদাহ ৫/৪৪)। সুতরাং ‘নূর’ বললেই বস্ত্তগত আলো বা নূরের সৃষ্টি বোঝায় না।

দ্বিতীয়ত : রাসুল (ছাঃ)-এর মানবীয় সত্তা (বাশারিইয়াত)। কুরআন মাজীদের অগণিত আয়াতে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে যে, রাসূল (ছাঃ) সৃষ্টিগতভাবে একজন মানুষ (বাশার)। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন! আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার প্রতি অহি নাযিল হয়’ (কাহফ ১৮/১১০)। অর্থাৎ তিনি মানুষের মতই জন্মগ্রহণ করেছেন, পিতা-মাতার সন্তান ছিলেন এবং স্বাভাবিক মানুষের মত তাঁরও দৈহিক প্রয়োজন ছিল ও তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।

তৃতীয়ত : রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (আলো) থেকে, জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের শিখা থেকে এবং আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে তা থেকে, যার বিবরণ তোমাদের দেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ মাটি থেকে)’ (মুসলিম হা/২৯৯৬)। আর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যেহেতু আদম (আঃ)-এর বংশধর, তাই তিনি সৃষ্টিগতভাবে মাটির তৈরী মানবসন্তান, ফেরেশতাদের মত নূরের তৈরী নন।

চতুর্থত : রাসূল (ছাঃ) নিশ্চয়ই ‘নূর’ বা আলো, তবে তা হেদায়াত ও নবুঅতের নূর, সৃষ্টিগত উপাদান নয়। তাঁর মাধ্যমে পুরো পৃথিবী জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে হেদায়াতের আলো লাভ করেছে। সুতরাং তাঁকে সত্ত্বাগতভাবে ‘নূর’ বলার কোন দলীল নেই। বরং তিনি আমাদের মতই মানুষ ছিলেন।

শিক্ষা :

১. অহি-র বিধানের প্রয়োজনীয়তা : মানব রচিত কোন চিন্তাধারা বা দর্শন মানুষকে হেদায়াত দিতে পারে না। কেবল অহী ভিত্তিক জ্ঞানই মানুষকে যাবতীয় পথভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত রাখতে পারে।

২. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কামনাই হেদায়াত লাভের শর্ত : অহি-র আলো থেকে উপকৃত হ’তে হ’লে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আন্তরিক ইচ্ছা (إِتِّبَاعُ الرِّضْوَان) থাকা আবশ্যক। নতুবা অহি-র আলো থেকে পূর্ণাঙ্গ ফায়দা লাভ করা সম্ভব নয়।

৩. শিরক ও বিদ‘আত থেকে মুক্ত থাকা : অহি তথা একমাত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুসরণই সমাজকে শিরক, বিদ‘আত ও অন্ধ তাক্বলীদ থেকে বের করে তাওহীদ ও সুন্নাহর আলোকোজ্জ্বল পথে পরিচালিত করতে পারে।

৪. ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা : ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রকৃত শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অহি-র বিধানের অনুসরণ ছাড়া কোন বিকল্প নেই।

৫. সুন্নাহর আনুগত্য : রাসূল (ছাঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসাবে বিশ্বাস করে তাঁর পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের মাধ্যমেই কেবল ‘সুবুলুস সালাম’ বা শান্তির পথের সন্ধান পাওয়া সম্ভব।

আল্লাহ আমাদেরকে উক্ত আয়াতের সঠিক তাৎপর্য অনুধাবন করার এবং আল্লাহ প্রেরিত নূর তথা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জীবন গঠনের তাওফীক দান করুন-আমীন!






আরও
আরও
.