সালাফদের জীবন থেকে

১. একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত তাবেঈ বিদ্বানের ঈমানী জাযবা :

আবু হাইয়ান তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রবী‘ ইবনে খুছাইম (১০-৬৫হি.) পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু প্রতি ওয়াক্তে তাঁকে ধরে ধরে জামা‘আতে নিয়ে যাওয়া হ’ত। লোকেরা তাঁকে বলত, ‘হে আবু ইয়াযীদ! আপনি তো অসুস্থ, জামা‘আতে ছালাত আদায়ে মসজিদে যাওয়ার ক্ষেত্রে তো আপনার ছাড় আছে। তাহ’লে এতো কষ্ট করছেন কেন? জবাবে তিনি বলতেন, আমি যখন ‘হাইয়া ‘আলাছ ছালাহ, হাইয়া ‘আলালা ফালাহ’ (ছালাতে দিকে এসো, সফলতার দিকে এসো) ডাক শুনতে পাই; তখন আর কিভাবে বসে থাকতে পারি! সুতরাং তোমরা যদি পার, এমনকি হামাগুড়ি দিয়ে হ’লেও জামা‘আতে চলে এসো’।[1]

২. ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর আমানতদারিতা :

ইমাম আবু হানীফা (৮০-১৫০ হি.) কেবল একজন যুগশ্রেষ্ঠ ফক্বীহ ছিলেন না, তিনি একজন সফল ও সৎ ব্যবসায়ীও ছিলেন। তাঁর তাক্বওয়া ও আমানতদারিতা ছিল প্রবাদতুল্য। আবূ হানীফা (রহঃ)-এর একজন ব্যবসায়ী অংশীদার ছিলেন, যার নাম হাফছ ইবনু আব্দির রহমান। তিনি তাকে ব্যবসার পণ্য সরবরাহ করতেন। একবার তিনি একটি রেশমী কাপড়ের চালানের সাথে একটি ত্রুটিযুক্ত কাপড় পাঠান এবং তাকে ত্রুটি সম্পর্কে জানিয়ে দেন। তিনি বলে দেন, ‘যখন এটি বিক্রি করবে, তখন এই ত্রুটিটা বর্ণনা করে দেবে’। হাফছ সমস্ত পণ্য বিক্রি করে ফেলেন, কিন্তু সেই ত্রুটিযুক্ত কাপড়ের কথা বলতে ভুলে যান। কার কাছে বিক্রি করেছেন তাও তার মনে ছিল না। যখন আবূ হানীফা (রহঃ) বিষয়টি জানতে পারলেন, তিনি সেই চালানের সমস্ত পণ্যের বিক্রয়লব্ধ অর্থ ছাদাক্বা করে দেন।[2]

৩. যে আয়াতে কেঁপে উঠেছিল দস্যুর হৃদয় :

ফুযাইল ইবনু ইয়ায (১০৭-১৮৭হি.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের একজন বিখ্যাত তাবে-তাবেঈ, প্রখ্যাত বিদ্বান এবং দুনিয়াবিমুখ আবেদ। যিনি ‘আবিদুল হারামাইন’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি জীবনের প্রথম দিকে একজন দস্যু হিসাবে পরিচিত থাকলেও, কুরআনের একটি আয়াত শুনে তাঁর জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে এবং তিনি তওবা করে আল্লাহভীরু বান্দায় পরিণত হন। পরবর্তীতে ইমাম হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

আবূ আম্মার হুসাইন ইবনে হুরাইছ, ফযল ইবনু মূসা থেকে বর্ণনা করেন, ফুযাইল ইবনে ইয়ায একজন দস্যু ছিলেন। তিনি আবীওয়ার্দ ও সারাখসের মধ্যবর্তী রাস্তায় ডাকাতি- রাহযানি করতেন। তিনি জনৈকা নারীর ভালোবাসায় আসক্ত ছিলেন। একদিন রাতে তিনি সেই তরুণীর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য প্রাচীর টপকাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি একজন তেলাওয়াতকারীকে এই আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলেন, أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ ‘মুমিনদের কি সে সময় আসেনি যে, তাদের হৃদয়সমূহ বিগলিত হবে আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে, তার কারণে?’ (হাদীদ ৫৭/১৬)

আয়াতটি শুনে তিনি থমকে গেলেন এবং সাথে সাথে বললেন, بَلىَ يَا رَبِّ، قَدْ آنَ، ‘হ্যাঁ, হে আমার রব! সেই সময় এসে গেছে’। অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন এবং রাত কাটানোর জন্য একটি পরিত্যাক্ত ধ্বংসস্তূপে আশ্রয় নিলেন। সেখানে একদল মুসাফির ছিল। তাদের কেউ বলল, ‘চলো, আমরা রওনা হই’। আবার কেউ বলল, ‘সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি। কারণ রাস্তায় ফুযাইল আছে। সে আমাদের পথ রোধ করে ডাকাতি করবে’। ফুযাইল (রহঃ) বলেন, আমি তখন চিন্তা করলাম এবং নিজেকে বললাম, ‘আমি রাতে পাপ কাজে লিপ্ত থাকি, আর এখানে একদল মুসলিম আমাকে ভয় পাচ্ছে! আমি বুঝতে পারলাম, আল্লাহ আমাকে তাদের কাছে কেবল এ কারণেই নিয়ে এসেছেন, যাতে আমি (পাপ থেকে) বিরত হই’। এরপর তিনি স্বীয় জন্মভূমি সামারকন্দ থেকে মক্কায় হিজরত করে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং জীবনের বাকী সময়টুকু এখানেই কাটিয়ে দেন’।[3]


[1]. ইবনে সা‘দ, আত-তাবাক্বাতুল কুবরা (কায়রো : মাকতাবাতুল খানজী, ১ম মুদ্রণ, ১৪২১হি./২০০১খৃ.), ৮/৩০৯।

[2]. খত্বীব বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ, মুহাক্কিক্ব : মুছতাফা আব্দুল কাদের আত্বা, (বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ, ২য় মুদ্রণ, ২০০৪খৃ.) ১৩/৩৫৬।

[3]. হাফেয জামালুদ্দীন মিযযী, তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল (বৈরূত : মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪১৩হি./১৯৯২খৃ.) ২৩/২৮৬।






বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও
আরও
.