সম্পাদকীয় 

নৃশংসতার প্রাদুর্ভাব : কারণ ও প্রতিকার

(১) গত ২রা আগস্ট’১৫ শেরপুরে প্রথম শ্রেণীর ছাত্র ৮ বছরের শিশু রাহাত-কে তার আপন খালু অপহরণ করে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। অতঃপর তাকে হত্যা করে কুকুর দিয়ে খাইয়ে দেয়। ৮ই আগস্ট দুপুরে নালিতাবাড়ী উপযেলার মধুটিলা ইকোপার্কের কাছে একটি পাহাড় থেকে তার কংকাল উদ্ধার করা হয় (ইনকিলাব ১৪.৮.১৫, ৫/৫ কলাম)। (২) ৮ই জুলাই সিলেটে সবজি বিক্রেতা ১৩ বছরের কিশোর সামিউল আলম ওরফে রাজন-কে চুরির অপবাদ দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে দেড় ঘণ্টা যাবৎ নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। উল্লাসের সাথে পিটানোর ভিডিওচিত্র ধারণ করে নির্যাতনকারীরাই তা ছড়িয়ে দেয়। (৩) ৩রা আগস্ট খুলনায় নির্যাতনের শিকার হওয়া সাতক্ষীরার রসূলপুর গ্রামের ১২ বছরের রাকিব গ্যারেজ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এ কারণে আগের গ্যারেজ মালিক ও তার সহযোগীরা তাকে ধরে মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেওয়ার কমপ্রেসর মেশিনের নল মলদ্বারে ঢুকিয়ে দিয়ে পেটে বাতাস ভরে শিশুটির পেট ফুলে নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে যায় ও ফুসফুস ফেটে মারা যায়। বয়স্ক নির্যাতনকারীদের অন্তর একটুও কাঁপেনি। (৪) ৩রা আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে সুটকেসের ভিতরে থাকা ৯ বছরের একটি ছেলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বুকে ও কপালে ইস্ত্রীর ছ্যাঁকার দাগ এবং পিঠে ছিল পাঁচ ইঞ্চির মতো গভীর ক্ষত। সম্ভবতঃ সে কোন গৃহকর্মী। (৫) ২৩শে জুলাই মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় গর্ভবতী মা ও তাঁর পেটের ৮ মাসের শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। শিশুটির পিঠ ফুঁড়ে বুক দিয়ে বুলেট বেরিয়ে গেছে। এরপরেও মা ও বাচ্চাটি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে। শিশুটি এখন ‘বেবী অফ নাজমা’ বা বাংলাদেশের একমাত্র ‘বুলেট কন্যা’ নামে খ্যাতি পেয়েছে। (৬) ৩রা আগস্ট গভীর রাতে বরগুনায় রবিউল আউয়াল নামে ১০ বছরের এক মাদরাসা ছাত্রকে মাছ চুরির কথিত অপরাধে চোখ উপড়িয়ে শাবল দিয়ে বীভৎস কায়দায় পিটিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয় এক ব্যক্তি। আহ্ কি নৃশংস, কি জঘন্য, কি মর্মান্তিক এসব ঘটনা! এরা পশুরও অধম।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে বিগত সাড়ে তিন বছরে দেশে ৯৬৮টি শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ২৬৭টি সংগঠনের মোর্চা শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১২ সালে ২০৯, ২০১৩ সালে ২১৮, ২০১৪ সালে ৩৫০ জন শিশুকে হত্যা করা হয়। চলতি বছরের সাত মাসেই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ১৯১ জনে। বর্তমানে শিশুহত্যার প্রক্রিয়া বীভৎস থেকে বীভৎসতর হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক। নির্যাতনকারীরা হচ্ছে প্রভাবশালী। ঘটনা ঘটছে, মামলা হচ্ছে। কিন্তু বিচার যে শেষ হচ্ছে, তার কোনো নযীর নেই। ঘটনা ঘটার পর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেখছি বা তদন্তাধীন আছে। জানতে চাইলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বাইরে হয়তো আরও অনেক ঘটনা ঘটছে, যেগুলো জানা যাচ্ছে না। তিনি সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে এদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের ওপর গুরুত্ব দেন।

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে আইন কমিশনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী নারী ও শিশু-সংক্রান্ত মামলাসহ প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ সংখ্যাটি প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। এ বিষয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, বিচার-প্রক্রিয়ার শ্লথ গতিতে অপরাধীরা অপরাধ করা থেকে নিরুৎসাহিত তো হয়ই না, বরং উৎসাহিত হয়। অপরাধীরা ভেবেই নিচ্ছে যে, অন্যায় করলে বিচার আর কী? ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর সমন্বিত সেবাকেন্দ্র) সমন্বয়কারী বিলকীস বেগম বলেন, এক বছর বয়সী শিশুকে পর্যন্ত ধর্ষণ করা হয়। আমাদের কাছে যখন ওই শিশুকে আনা হয় তখন তার যৌনাঙ্গ একেবারে ছিঁড়ে গেছে। এক বা দুই বছর বয়সী কম থাকলেও তিন, চার বা পাঁচ বছর বয়সী শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রতিনিয়ত শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সামাজিক ন্যায়বিচারহীনতা এবং ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শক্তি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দুর্বৃত্তপরায়ণ ও পশু প্রবৃত্তির লোকদের প্রাধান্য থাকায় এ ধরনের অমানবিক ঘটনাগুলো ঘটছে (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো, ৭.৮.১৫ইং)

সেই সাথে ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে নারী নির্যাতন। ধর্ষণ ও গণধর্ষণ। গত ৬ মাসে সারাদেশে ১০ হাযার মামলা হয়েছে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের (ইনকিলাব ৬.৮.১৫ইং)। সবশেষে গত ১৩ই আগস্ট মাদারীপুরের অষ্টম শ্রেণীর দুই স্কুল ছাত্রীকে ১৮/২০ বছর বয়সের চারজন যুবক ধর্ষণের পর হত্যা করে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে লাশ ফেলে রেখে গেছে (প্রথম আলো ১৪.৮.১৫ইং)। ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো অমানবিক, অনৈতিক, বর্বর এ ধরনের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে সামাজিকভাবে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। ভিকটিম ও তার পরিবার লোকলজ্জা, সামাজিক ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। কেউ কেউ অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। বর্ণিত রিপোর্টগুলিতে কি প্রমাণ হয় যে, আমরা মানুষের সমাজে বাস করছি?

কারণ : উপরের আলোচনায় সূধীদের বক্তব্যে নৃশংসতার কারণ ও প্রতিকার কিছুটা বর্ণিত হয়েছে। সেই সাথে আমাদের পরামর্শ হ’ল সেটাই যা মন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি বলতে আড়ষ্টবোধ করেছেন। আর তা হ’ল, এসবের মৌলিক কারণ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, আল্লাহহীন শিক্ষা ও শাসন ব্যবস্থা এবং নিজেদের মনগড়া বিচার ব্যবস্থা।  

প্রতিকার : (১) ধর্মীয় অনুশাসন এবং পারিবারিক ও সামাজিক শাসন যোরদার করা। (২) আল্লাহমুখী শিক্ষা, শাসন ও বিচার ব্যবস্থা কায়েম করা। (৩) বড়-ছোট নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমভাবে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী দাঁতের বদলে দাঁত ও চোখের বদলে চোখ নীতি অবলম্বন করা (মায়েদাহ ৪৫)। (৪) যেসব অভিযোগের সত্যতা হাতে-নাতে পাওয়া যায়, সেগুলির শাস্তি আদালতের মাধ্যমে সাথে সাথে বাস্তবায়ন করা এবং যাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাকে সেভাবেই হত্যা করা। এ ধরনের দু’চারটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে দেশ দ্রুত শান্ত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন -আমীন! (স.স.)

বর্ষশেষের নিবেদন :

১৮তম বর্ষ শেষে ১৯তম বর্ষের প্রাক্কালে এবং আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে আমাদের সকল পাঠক-পাঠিকা, লেখক-লেখিকা, এজেন্ট ও গ্রাহক এবং দেশী ও প্রবাসী সকল শুভানুধ্যায়ীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সাথে আত-তাহরীকের অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে, যিলহজ্জের এ পবিত্র মাসে আল্লাহর নিকটে আকুলভাবে আমরা সেই প্রার্থনা জানাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের খুলূছিয়াতকে কবুল করুন এবং দ্বীনদার ভাই-বোনদের হৃদয় সমূহকে আমাদের প্রতি রুজূ করে দিন- আমীন! [সম্পাদক]

HTML Comment Box is loading comments...