প্রবন্ধ


জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপনের আবশ্যকতা

মূল : ড. হাফেয বিন মুহাম্মাদ আল-হাকামী
অধ্যাপক, হাদীছ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
অনুবাদ : অনুবাদ : আব্দুর রহীম
গবেষণা সহকারী, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

(৩য় কিস্তি)

জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার প্রতি উৎসাহিত করে বর্ণিত হাদীছ সমূহের ফিক্বহী পর্যালোচনা :

হাদীছে নববীতে বর্ণিত জামা‘আতের অর্থ : জামা‘আতের শাব্দিক উৎস সম্পর্কে শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেছেন, الْجَمَاعَةُ هِيَ الِاجْتِمَاعُ وَضِدُّهَا الْفُرْقَةُ؛ وَإِنْ كَانَ لَفْظُ الْجَمَاعَةِ قَدْ صَارَ اسْمًا لِنَفْسِ الْقَوْمِ الْمُجْتَمِعِينَ- ‘জামা‘আত হ’ল সমাজবদ্ধতা। এর বিপরীত হ’ল বিচ্ছিন্নতা। যদিও জামা‘আত শব্দটি স্বয়ং ঐক্যবদ্ধ জাতির নামে পরিণত হয়েছে’।[1] পক্ষান্তরে হাদীছে নববীতে উল্লিখিত ‘জামা‘আত’ শব্দের অর্থের ব্যাপারে মনীষীগণের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। আমরা নিম্নে পর্যালোচনাসহ তাদের উক্তিগুলো এবং সেগুলির মধ্যে গ্রহণযোগ্য মতটি উপস্থাপন করছি।

ইমাম ইবনু জারীর ত্বাবারী (রহঃ) বলেন, ‘এ বিষয়ে অর্থাৎ জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার নির্দেশের ব্যাপারে এবং জামা‘আতের ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। একদল বলেছেন, জামা‘আতকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশটি ওয়াজিব বা আবশ্যক। আর জামা‘আত হ’ল বড় দল’। অতঃপর তিনি (ত্বাবারী) মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন সূত্রে আবু মাসঊদ আল-আনছারী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, ওছমান (রাঃ) নিহত হ’লে আবু মাসঊদ নছীহত প্রত্যাশীকে বলেছিলেন,عَلَيْكَ بِالْجَمَاعَةِ، فَإِنَّ اللهَ لَمْ يَكُنْ لِيَجْمَعَ أُمَّةَ مُحَمَّدٍ عَلَى ضَلَالَةٍ- ‘তুমি জামা‘আতবদ্ধভাবে জীবন-যাপন করবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ করবেন না’।[2]

অন্য একদল বলেছেন, জামা‘আত দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল ছাহাবীগণ। তাদের পরবর্তীরা নয়। কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল আহলুল ইলম (আলেমগণ)। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সৃষ্টি জগতের উপরে দলীল হিসাবে নির্ধারণ করেছেন এবং মানুষেরা দ্বীনের ব্যাপারে তাদের অনুসারী।

অতঃপর ঐ উক্তিগুলো বর্ণনা করার পর ইমাম ত্বাবারী (রহঃ) বলেছেন,وَالصَّوَابُ أَنَّ الْمُرَادَ مِنَ الْخَبَرِ لُزُومُ الْجَمَاعَةِ الَّذِينَ فِي طَاعَةِ مَنِ اجْتَمَعُوا عَلَى تَأْمِيرِهِ فَمَنْ نَكَثَ بَيْعَتَهُ خَرَجَ عَنِ الْجَمَاعَةِ ‘সঠিক হচ্ছে হাদীছ দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল ঐ জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা, যারা তাদের সর্বসম্মত আমীরের আনুগত্যে রয়েছে। যে তার বায়‘আত ভঙ্গ করল, সে জামা‘আত থেকে বের হয়ে গেল’।[3]

জামা‘আত শব্দ এসেছে এমন কয়েকটি হাদীছ উল্লেখ করার পর ইমাম শাত্বেবী (রহঃ) বলেছেন, এই হাদীছসমূহে বর্ণিত জামা‘আত শব্দের উদ্দিষ্ট অর্থের ব্যাপারে মানুষেরা পাঁচটি মতে বিভক্ত হয়েছেন।

১. সেটি হ’ল মুসলমানদের বড় দল। একথার ভিত্তিতে উম্মতের মুজতাহিদগণ, ওলামায়ে কেরাম, শরী‘আত বিষয়ে পারদর্শী এবং তদনুযায়ী আমলকারীগণ জামা‘আতের মধ্যে শামিল হবেন। তাদের পরবর্তীরাও তাদের মধ্যে শামিল হবেন। কারণ তারা তাদের অনুসরণ-অনুকরণকারী।

২. এটি হল মুজতাহিদ ইমামগণের দল। এ কথার ভিত্তিতে যারা মুজতাহিদ আলেম নন তারা এ জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত নন। কেননা তারা তাক্বলীদপন্থীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি তাদের (মুজতাহিদ ইমামদের) বিপরীত আমল করবে, সে জাহেলিয়াতের উপরে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে শামিল হবে। আর বিদ‘আতীদের কেউই (জামা‘আতের মধ্যে) শামিল হবে না।

৩. জামা‘আত হ’ল বিশেষত ছাহাবায়ে কেরাম। একথার ভিত্তিতে জামা‘আত শব্দটি অন্য একটি বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যশীল। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِى ‘জামা‘আত হ’ল আমি এবং আমার ছাহাবীগণ যার উপরে রয়েছি’।[4]

৪. জামা‘আত হ’ল মুসলমানদের দল, যখন তারা কোন ইমারতের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হবে। এমতাবস্থায় মিল্লাতের অন্যান্যদের উপর তাদের অনুসরণ করা আবশ্যক হবে। এ মতটি উল্লেখ করার পর ইমাম শাত্বেবী (রহঃ) বলেন, এ মতটি দ্বিতীয় মতের দিকে ধাবিত হয়। আর সেটি যা দাবী করে এটিও তাই দাবী করে। অথবা এটি প্রথম মতটির দিকে ধাবিত হয়। আর এটিই সুস্পষ্ট। এর মধ্যে এমন অর্থ নিহিত আছে, যা প্রথমটির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ মুজতাহিদগণ অবশ্যই জামা‘আতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া মূলতঃ বিদ‘আত হবে না। কারণ তখন তারাই মুক্তিপ্রাপ্ত দল (ফিরক্বায়ে নাজিয়াহ)।

৫. ইমাম ত্বাবারীর পসন্দনীয় মতামত হ’ল, জামা‘আত বলতে মুসলমানদের জামা‘আতকে বোঝায় যখন তারা কোন একজন আমীরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হবে। রাসূল (ছাঃ) এ আমীরকে অাঁকড়ে ধরতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং জনগণ তাদের উপর প্রাধান্য দিয়ে যার ইমারতের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, সে বিষয়ে উম্মাহ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে নিষেধ করেছেন।

ইমাম শাত্বেবী (রহঃ) বলেছেন,وَحَاصِلُهُ: أَنَّ الْجَمَاعَةَ رَاجِعَةٌ إِلَى الِاجْتِمَاعِ عَلَى الْإِمَامِ الْمُوَافِقِ لِلْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَذَلِكَ ظَاهِرٌ فِي أَنَّ الِاجْتِمَاعَ عَلَى غَيْرِ سُنَّةٍ خَارِجٌ عَنْ مَعْنَى الْجَمَاعَةِ الْمَذْكُورِ فِي الْأَحَادِيثِ الْمَذْكُورَةِ، كَالْخَوَارِجِ وَمَنْ جَرَى مَجْرَاهُمْ- ‘সারকথা হ’ল জামা‘আত বলতে বোঝায় কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালনাকারী ইমামের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আর এটা স্পষ্ট যে, সুন্নাহ ব্যতীত কোন বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উপরোক্ত হাদীছ সমূহে উল্লেখিত জামা‘আতের আওতাভুক্ত নয়। যেমন খারেজী এবং তাদের পথে পরিচালিত ভ্রান্ত দলসমূহ’।

ইমাম শাত্বেবী কর্তৃক উল্লেখিত মতামত সমূহ চতুর্থ মতামতটি ব্যতীত ইমাম ত্বাবারী থেকে পূর্বে উল্লেখিত মতামতের মতোই। ইমাম শাত্বেবী পরক্ষণেই উল্লেখ করেছেন যে, সেটি প্রথম অথবা দ্বিতীয় মতামত থেকে আলাদা নয়। অতঃপর প্রথম তিনটি মতামত একটি অর্থের দিকেই প্রত্যাবর্তনশীল। আর তা হ’ল জামা‘আত দ্বারা উদ্দেশ্য কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ। অতএব যারা বলেছেন তাঁরা হলেন ছাহাবায়ে কেরাম, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হ’ল- ছাহাবায়ে কেরাম হলেন মানুষের মাঝে জামা‘আতের অধিক উপযুক্ত। আর যারা বলেছেন তারা হ’লেন ‘আহলুল ইলম’ (আলেম) ও মুজতাহিদগণ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হ’ল, ছাহাবীগণের পরে তারাই মানুষের মাঝে জামা‘আতের অধিক উপযুক্ত। আর যারা বলেছেন তারা মুসলমানদের বড় দল, তাদের উদ্দেশ্য হ’ল ছাহাবায়ে কেরাম ও বড় বড় তাবেঈগণের যুগ। কেননা ইমাম ত্বাবারী (রহঃ) আবু মাসউদ আনছারী (রাঃ)-এর উপদেশের উপর একথার ভিত্তি নির্মাণ করেছেন, যখন তাকে ওছমান (রাঃ)-এর শাহাদাত বরণের সময়কার ফিতনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে সে সময়কার বড় দল তারাই যারা কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী। পরবর্তী যুগের লোকেরা তার বিপরীত।

এ অর্থকে কেন্দ্র করেই ওলামায়ে কেরামের মতামত সমূহ আবর্তিত হয়, যারা হাদীছ সমূহে বর্ণিত জামা‘আতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেছেন, وَتَفْسِيرُ الْجَمَاعَةِ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ هُمْ أَهْلُ الْفِقْهِ وَالْعِلْمِ وَالْحَدِيثِ- ‘বিদ্বানগণের নিকটে জামা‘আতের ব্যাখ্যা হ’ল তারা হ’লেন আহলুল ফিক্হ, আহলুল ইলম ও আহলুল হাদীছ। তিনি বলেন, আমি জারূদ ইবনু মু‘আযকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি আলী ইবনুল হাসান (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারককে জামা‘আত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি উত্তরে বললেন, (জামা‘আত হ’ল) আবুবকর ও ওমর (রাঃ)। বলা হ’ল, আবুবকর ও ওমর (রাঃ) তো মারা গেছেন। তিনি বললেন, অমুক ও অমুক। তাকে বলা হ’ল, তারাও তো মারা গেছেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বললেন, আবু হামযাহ সুক্কারী হ’লেন জামা‘আত। আবু ঈসা তিরমিযী (রহঃ) বলেন, এই আবু হামযা হ’লেন মুহাম্মাদ ইবনু মায়মূন। তিনি ছিলেন একজন সৎ শায়খ। তিনি (ইবনুল মুবারক) আমাদের মাঝে বেঁচে থাকা অবস্থায় একথা বলেছিলেন।[5]

ইবনু আবিল ইয হানাফী (রহঃ) বলেন,وَالْجَمَاعَةُ: جَمَاعَةُ الْمُسْلِمِينَ، وَهُمُ الصَّحَابَةُ وَالتَّابِعُونَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّينِ. ‘জামা‘আত হ’ল মুসলমানদের জামা‘আত। আর তাঁরা হলেন ছাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারীগণ’।[6]

আবু শামাহ (রহঃ) বলেন,وَحَيْثُ جَاءَ الْأَمرُ بِلُزُوم الْجَمَاعَة فَالْمُرَادُ بِهِ لُزُوْمُ الْحَقِّ وَاَتْبَاعِهِ وَاِنْ كَانَ الْمُتَمَسِّكُ بِالْحَقِّ قَلِيلاً وَالْمُخَالِفُ لَهُ كَثِيْرًا، لِأَنَّ الْحقَّ  هُوَ الَّذِيْ كَانَتْ عَلَيْهِ الْجَمَاعَةُ الأُوْلَى مِنَ النَّبِيِّ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَأَصْحَابِهِ رضى الله عَنْهُم وَلَا نَظْرَ اِلَى كَثْرَةِ أَهْلِ الْبَاطِل بَعْدَهُمْ- ‘যেখানে জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার কথা এসেছে সেখানে জামা‘আত দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল- হক ও তার অনুসারীদেরকে অাঁকড়ে ধরা। যদিও হককে অাঁকড়ে ধারণকারীর সংখ্যা অল্প হয় এবং এর বিরোধীদের সংখ্যা বেশী হয়। কারণ হকতো তাই, যার উপর রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের প্রথম জামা‘আত প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাদের পরে বাতিলপন্থীদের আধিক্যের কোন গুরুত্ব নেই’।[7]

এ অর্থটা ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর বাণী থেকেও এসেছে। লালকাঈ তার সনদে আমর ইবনু মায়মূন থেকে বর্ণনা করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) তাকে বলেন,يَا عَمْروَ بْنَ مَيْمُونٍ إِنَّ جُمْهُورَ الْجَمَاعَةِ هِيَ الَّتِي تُفَارِقُ  الْحَقَّ، إِنَّمَا الْجَمَاعَةُ مَا وَافَقَ طَاعَةَ اللهِ وَإِنْ كُنْتَ وَحْدَكَ- ‘হে আমর ইবনু মায়মূন! জনসাধারণের জামা‘আত হ’ল সেটি যা সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রকৃত জামা‘আত হ’ল সেটি যা আল্লাহর আনুগত্যের অনুকূলে। যদিও তুমি একাকী হও’।[8]

জামা‘আত শব্দের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্বে বর্ণিত ইবনু জারীর ত্বাবারী ও শাত্বেবী (রহঃ)-এর মতামতগুলোর মধ্যে একটি অবশিষ্ট থাকল। আর সেটি ইবনু জারীরের বক্তব্য, এমন জামা‘আত যার একজন আমীর আছেন এবং লোকেরা তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। শাত্বেবী মনে করেন, এ মতটি কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের শর্ত আরোপের ক্ষেত্রে পূর্বে উল্লেখিত মতামতগুলোর বিপরীত নয়। ইবনু জারীর তাবারীর মন্তব্য উল্লেখ করার পর শাত্বেবী বলেন, জামা‘আত বলতে বোঝায় কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালনাকারী ইমামের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আর এটা স্পষ্ট যে, সুন্নাহ ব্যতীত কোন বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উপরোক্ত হাদীছ সমূহে উল্লেখিত জামা‘আতের আওতাভুক্ত নয়। যেমন খারেজী এবং তাদের পথে পরিচালিত ভ্রান্ত দলসমূহ’। এর উপর ভিত্তি করে আল্লামা শাত্বেবী মনে করেন, তার বর্ণিত ঐ পাঁচটি মতামত যার মধ্যে ইবনু জারীর ত্বাবারীর উক্তিও রয়েছে, এগুলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত ও আহলুল ইত্তেবার (কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণকারীগণ) উপর আবর্তনশীল। আর জামা‘আত সম্পর্কিত হাদীছ দ্বারা তারাই উদ্দেশ্য। তবে ইবনু জারীরের উক্তি অন্যান্য উক্তিগুলো থেকে ভিন্নতার ফায়েদা দেয়। ঐ মতামতগুলো উল্লেখ করার পর তিনি বলেন, وَالصَّوَابُ أَنَّ الْمُرَادَ مِنَ الْخَبَرِ لُزُومُ الْجَمَاعَةِ الَّذِينَ فِي طَاعَةِ مَنِ اجْتَمَعُوا عَلَى تَأْمِيرِهِ  ‘সঠিক হচ্ছে হাদীছ দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল ঐ জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা, যারা তাদের সর্বসম্মত আমীরের আনুগত্যে রয়েছে’। তাঁর ‘আছ-ছাওয়াব’ (সঠিক হ’ল) কথাটি ফায়েদা দেয় যে, অন্যান্য মতামতগুলো তার মতের বিপরীত। তবে বাস্তবতা হ’ল, জামা‘আতের আক্বীদাহ ও কর্মপদ্ধতির দিক থেকে ঐ মতামতগুলোর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এই অর্থটিকেই আল্লামা শাত্বেবী উদ্দেশ্য নিয়েছেন। মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির ব্যাপারে মু‘আবিয়া (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে আগত জামা‘আত শব্দের ব্যাখ্যা সম্পর্কে তার আলোচনা ছিল। সেখানে এসেছে,سَتَفْتَرِقُ أُمَّتِى عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً- يَعْنِي اَهْلَ الاَهْوَاءِ-كُلُّهاَ فِى النَّارِ اِلاَّ وَاحِدَةً وَهِىَ الْجَمَاعَةُ-  ‘আমার উম্মত তিহাত্তরটি দলে বিভক্ত হবে (অর্থাৎ প্রবৃত্তির পূজারীরা)। একটি দল ব্যতীত সবগুলো জাহান্নামে যাবে। আর সেটি হ’ল জামা‘আত’।

অতঃপর শাত্বেবী সকল হাদীছে বর্ণিত জামা‘আত শব্দটিকে এ অর্থের উপর আরোপ করেছেন। যার মধ্যে হুযায়ফা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছও রয়েছে। এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ইবনু জারীর (রহঃ) শুধু হুযায়ফা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে আগত জামা‘আত শব্দের ব্যাখ্যা করার ইচ্ছা করেছেন। তিনি সকল হাদীছে বর্ণিত জামা‘আত শব্দের ব্যাখ্যা করার ইচ্ছা করেননি। পূর্বে বর্ণিত তার মতামত ‘হাদীছ দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল’  (المراد من الخبر)কথাটি এই বক্তব্যকে সমর্থন করে। হাফেয ইবনু হাজার (রহঃ) হুযায়ফা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনু জারীর (রহঃ)-এর মতামতগুলো উল্লেখ করেছেন। হুযায়ফা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের শব্দ ইবনু জারীর (রহঃ)-এর মতামতের অনুকূলে। সেখানে এসেছে, تَلْزَمُ جَمَاعَةَ الْمُسْلِمِينَ وَإِمَامَهُمْ ‘তুমি মুসলমানদের জামা‘আত এবং তাদের ইমামকে অাঁকড়ে ধরবে’।[9]

এই অর্থে ‘আল-মুফহাম’ (المفهم) গ্রন্থ প্রণেতা আল্লামা কুরতুবী ইবনু জাবীরের সাথে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। যেখানে তিনিتَلْزَمُ جَمَاعَةَ الْمُسْلِمِينَ  ‘তুমি মুসলমানদের জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরবে’ এর অর্থে বলেন, অর্থাৎ মুসলমানগণ কোন নেতার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হলে তার আনুগত্য থেকে বের হওয়া যাবে না। যদিও তিনি যুলুম করেন’।[10]

এই অর্থে আরো অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে ছহীহ মুসলিমে ইবনু আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীছে এসেছে,مَنْ رَاىَ مِنْ أَمِيْرِهِ شَيْئًا يَكْرَهُهُ فَلْيَصْبِرْ فَإِنَّهُ مَنْ فَارَقَ الجَماَعَةَ... রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে তার আমীরের মধ্যে অপসন্দনীয় কোন কিছু দেখবে, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে। কেননা যে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গেল.. (এবং এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হ’ল, সে জাহেলিয়াতের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল)।[11] আর হুযায়ফা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ হ’ল-مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ وَاسْتَذَلَّ الْإِمَارَةَ রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল এবং ইমারতকে লাঞ্ছিত করল... (সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, তার পক্ষে কোন দলীল-প্রমাণ থাকবে না)’।[12]

কাযী আয়ায (রহঃ) এই হাদীছের আলোচনায় বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বাণী مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ ‘যে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল’ এর প্রকাশ্য অর্থ হ’ল- সাধারণ মানুষ এবং ইমারতের ব্যাপারে যার সম্পর্কে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তারা হ’লেন আহলুল ইলম (জ্ঞানীগণ)।[13] একথার মাধ্যমে কাযী আয়ায (রহঃ) জামা‘আত শব্দের ব্যাখ্যায় আল্লামা ত্বাবারীর সাথে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তিনি তার মতের অনুকূল অর্থের ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন এবং অন্য মতটি দুর্বল ছীগায় (قيل) বর্ণনা করার মাধ্যমে তা দুর্বল হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

যদিও এ হাদীছগুলোতে আহলুল ইলম দ্বারা জামা‘আতের ব্যাখ্যা করা জামা‘আতের প্রকাশ্য অর্থ হিসেবে বিবেচিত হয় না, কিন্তু এ আলোচনার প্রথমে উল্লেখিত পূর্বের হাদীছসমূহ জামা‘আতের এ অর্থকে স্পষ্ট করে।

মোদ্দাকথা হ’ল, জামা‘আত শব্দের ব্যাখ্যায় দু’টি অর্থই গ্রহণযোগ্য। আর ইবনুল আরাবী (রহঃ) এটাকেই স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বাণী عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ ‘তোমাদের উপর আবশ্যক হ’ল জামা‘আতবদ্ধভাবে বসবাস করা’ এর অর্থ সম্পর্কে বলেন, এখানে দু’টি অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহ যখন কোন কথার উপরে ঐক্যবদ্ধ হবে, তখন পরবর্তীদের জন্য অন্য আরেকটি মতামত আবিস্কার করা জায়েয হবে না। দ্বিতীয় অর্থ হ’ল- তারা যখন কোন ইমামের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হবে, তখন তার সাথে বিবাদ করা বা তার বিরোধিতা করা বৈধ হবে না।[14] এ কথার স্বীকৃতি আল্লামা শাত্বেবীর কথা থেকেও পাওয়া যায়। জামা‘আত দ্বারা উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বড় দলই ভ্রান্ত ফিরক্বাসমূহের মধ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত। তারা তাদের দ্বীনের বিষয়ে যার উপরে অটল ছিলেন, সেটিই হক্ব। আর যে তাদের বিরোধিতা করবে সে জাহেলিয়াতের উপর মৃত্যুবরণ করবে। তাই তারা শরী‘আতের কোন বিষয়ে তাদের বিরোধিতা করুক অথবা তাদের আমীর ও সুলতানের বিষয়ে বিরোধিতা করুক। সে হকের বিরোধিতাকারী।[15]

[চলবে]

[1]. মাজমূউ ফাতাওয়া ৩/১৫৭

[2]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী ১৩/৩৭

[3].

[4]. তিরমিযী হা/২৬৪১; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৩৪৩; ছহীহাহ হা/২০৪, ১৩৪৮

[5]. তিরমিযী হা/২১৬৭-এর আলোচনা

[6]. শারহুল আকীদাতিত ত্বাহাবিয়া, পৃঃ ৪৩১

[7]. আবু শামাহ, আল-বাইছু আলা ইনকারিল বিদঈ ওয়াল হাওয়াদিছ, পৃঃ ২২

[8]. শারহু উছূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ ১/১০৮

[9]. বুখারী হা/৩৬০৬;১৮৪৭; মিশকাত হা/৫৩৮২

[10]. আল-মুফহাম ৪/৫৭।

[11]. বুখারী হা/৭০৫৩; মুসলিম হা/১৮৪৯; ছহীহুল জামে‘ হা/৬২৪৯; ইরওয়া হা/২৪৫৩; আহমাদ হা/২৮৫৬; মিশকাত হা/৩৬৬৮

[12]. হাকেম হা/৪০৯; আহমাদ হা/২৩৩৩১; মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/৯১২৮, এ হাদীছের সনদ ছহীহ। হাকেম ও আল্লামা যাহাবী বলেন, হাদীছটি ছহীহ। শু‘আইব আরনাউত বলেন, হাসান

[13]. মাশারিকুল আনওয়ার ১/১৫৩-১৫৪

[14]. আরেযাতুল আহওয়াযী ৯/১০।

[15]. আল-ই‘তিছাম ২/২৬০

HTML Comment Box is loading comments...