প্রবন্ধ


ইসলামে পোশাক-পরিচ্ছদ : গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মুহাম্মাদ আবু তাহের
পরিচালক, কিউসেট ইনস্টিটিউট, সিলেট।

  (২য় কিস্তি)

পোশাক পরিধান সম্পর্কে কতিপয় আদব :

ইসলামে পোশাক পরিধানের কিছু আদব রয়েছে। প্রত্যেক মুমিনকে তা মেনে চলা উচিত। এতে একদিকে যেমন সুন্নাত পালন হবে, অপরদিকে পোশাক পরিধানের জন্য ছওয়াবের অধিকারী হবে। এসব আদবের কতিপয় এখানে উল্লেখ করা হ’ল।-

১. ডান দিকে থেকে পরিধান করা ও বাম দিক থেকে খোলা :

সকল ভাল ও কল্যাণময় কাজের মত পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রেও ডান দিক থেকে শুরু করা ইসলামী আদব বা শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন হাদীছের আলোকে আমরা জানতে পারি যে, পোশাক-পরিচ্ছদ ডান দিক থেকে পরিধান করা এবং বাম দিক থেকে খোলা উত্তম। হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم يُعْجِبُهُ التَّيَمُّنُ فِى تَنَعُّلِهِ وَتَرَجُّلِهِ وَطُهُوْرِهِ وَفِى شَأْنِهِ كُلِّهِ.

আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘নবী করীম (ছাঃ) জুতা ব্যবহার করতে, চুল-দাড়ি আঁচড়াতে, পবিত্রতা অর্জনে ও তাঁর সকল বিষয়ে ডান দিক থেকে শুরু করা পসন্দ করতেন’।[1] অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا لَبِسَ قَمِيْصًا بَدَأَ بِمَيَامِنِهِ.

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন জামা পরিধান করতেন, তখন ডান দিক থেকে শুরু করতেন’।[2] অপর একটি হাদীছে এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ উল্লিখিত হয়েছে যেমন-

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا لَبِسْتُمْ وَإِذَا تَوَضَّأْتُمْ فَابْدَءُوْا بِأَيَامِنِكُمْ.

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা যখন পোশাক পরিধান করবে এবং যখন ওযূ করবে তখন ডান দিক থেকে শুরু করবে’।[3] জুতা পরিধানের ক্ষেত্রেও ডান দিক থেকে শুরু করার ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ এসেছে।

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضى الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِذَا انْتَعَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَبْدَأْ بِالْيَمِينِ وَإِذَا نَزَعَ فَلْيَبْدَأْ بِالشِّمَالِ، لِتَكُنِ الْيُمْنَى أَوَّلَهُمَا تُنْعَلُ وَآخِرَهُمَا تُنْزَعُ.

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা যখন জুতা পরিধান করবে তখন ডান দিক থেকে শুরু করবে এবং যখন খুলবে তখন বাম দিক থেকে শুরু করবে। যাতে ডান পা প্রথমে আবৃত ও শেষে অনাবৃত হয়’।[4]

২. পোশাক পরিধানের দো‘আ :

ইসলামী জীবন-পদ্ধতির অন্যতম দিক সকল কর্মে হৃদয়কে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত রাখা ও তাঁর কাছে কল্যাণ, দয়া ও সাহায্য প্রার্থনা করা। পোশাক পরিধানের সময়েও প্রার্থনা করতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।

عَنْ أَبِى سَعِيدٍ الْخُدْرِىِّ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا اسْتَجَدَّ ثَوْبًا سَمَّاهُ بِاسْمِهِ إِمَّا قَمِيصًا أَوْ عِمَامَةً ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ كَسَوْتَنِيهِ أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهِ وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهُ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ.

আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নতুন পোশাক পরিধান করলে তার নাম উল্লেখ করতেন, জামা বা পাগড়ি যাই হোক। অতঃপর বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আপনারই সকল প্রশংসা, আপনিই আমাকে এই পোশাকটি পরিধান করিয়েছেন। আমি আপনার কাছে এর কল্যাণ ও মঙ্গল প্রর্থনা করছি এরং এর উদপাদনের মধ্যে যত কল্যাণ ও মঙ্গল রয়েছে তা প্রার্থনা করছি। আর আমি আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি এর অকল্যাণ থেকে এবং এর উৎপাদনের মধ্যে যা কিছু অকল্যাণলকর রয়েছে তা থেকে’।[5] পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দো‘আও বর্ণিত হয়েছে,الْحَمْد لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي هَذَا وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْر حَوْل مِنِّي وَلَا قُوَّة،  ‘সেই আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যিনি আমাকে বিনা শ্রমে ও শক্তি প্রয়োগ ব্যতীত এই পোশাক পরিধান করিয়েছেন এবং রূযী দান করেছেন’।[6]

কাউকে নতুন পোশাক পরিহিত দেখলে দো‘আ করা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবীগণের রীতি বা সুন্নাত।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم رَأَى عَلَى عُمَرَ قَمِيْصًا أَبْيَضَ فَقَالَ ثَوْبُكَ هَذَا غَسِيْلٌ أَمْ جَدِيْدٌ. قَالَ لاَ بَلْ غَسِيْلٌ. قَالَ الْبَسْ جَدِيْدًا وَعِشْ حَمِيْدًا وَمُتْ شَهِيْدًا.

আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ওমর (রাঃ)-কে একটি সাদা জামা (বড় পিরহান) পরিহিত অবস্থায় দেখলে তিনি প্রশ্ন করেন, তোমার কাপড়টি কি ধোয়া না নতুন? তিনি উত্তরে বললেন, নতুন নয়; বরং ধোয়া কাপড়। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘নতুন পোশাক পর, প্রশংসিতভাবে জীবন যাপন কর, শহীদ হয়ে মৃত্যুবরণ কর এবং আল্লাহ তোমাকে পৃথিবীতে এবং আখিরাতে পরিপূর্ণ শান্তি ও আনন্দ প্রদান করুন’।[7]

قَالَ أَبُو نَضْرَةَ فَكَانَ أَصْحَابُ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم إِذَا لَبِسَ أَحَدُهُمْ ثَوْبًا جَدِيدًا قِيلَ لَهُ تُبْلِى وَيُخْلِفُ اللهُ تَعَالَى.

আবূ নাযরাহ মুনযির ইবনু মালিক নামক তাবিঈ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণের মধ্যে রীতি ছিল যে, তাঁদের মধ্যে থেকে কেউ নতুন পোশাক পরিধান করলে (তার শুভকামনা করে) বলা হ’ত, এই পোশাক তোমার দেহেই পুরাতন ও জীর্ণ হয়ে যাক এবং মহান আল্লাহ এর পরিবর্তে অন্য পোশাক তোমাকে দান করুন।[8] অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘ জীবন দান করুন, যে জীবনে এই পোশাক ও অনুরূপ আরো অনেক পোশাক জীর্ণ করার সুযোগ তুমি পাও।

عَنْ أُمِّ خَالِدٍ بِنْتِ خَالِدٍ قالت : أُتِيَ النَّبِيُّ بِثِيَابٍ فِيهَا خَمِيصَةٌ سَوْدَاءُ صَغِيرَةٌ، فَقَالَ : مَنْ تَرَوْنَ أَنْ نَكْسُوَ هَذِهِ؟ فَسَكَتَ الْقَوْمُ، قَالَ : ائْتُونِي بِأُمِّ خَالِدٍ فَأُتِيَ بِهَا تُحْمَلُ، فَأَخَذَ الْخَمِيصَةَ بِيَدِهِ فَأَلْبَسَهَا، وَقَالَ أَبْلِي وَأَخْلِقِي، البخاري-

উম্মু খালিদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, একবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট কিছু কাপড় নিয়ে আসা হয়। তার মধ্যে কিছু কালো নকশীদার ছোট চাদর ছিল। তিনি বললেন, আমরা এগুলো পরব, তোমাদের মত কী? উপস্থিত সকলে চুপ থাকল। তারপর তিনি বললেন, উম্মু খালিদকে আমার কাছে নিয়ে এসো। তাকে বহন করে আনা হ’ল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজের হাতে একটি চাদর নিলেন এবং তাকে পরিয়ে দিলেন। এরপর বললেন, তুমি পুরাতন কর ও ছিঁড়ে ফেল (অর্থাৎ তুমি বহুদিন বাঁচ)। ঐ চাদরে সবুজ অথবা হলুদ রঙের নকশী ছিল। তিনি বললেন, হে খালিদের মা! وهٰذَا سَنَاهْ অর্থাৎ এটি কত সুন্দর! হাবশী ভাষায় সানাহ অর্থ সুন্দর।[9]

দো‘আ মুমিন জীবনের অন্যতম সম্পদ। দো‘আ ইবাদত। মহান আল্লাহর দরবারে দো‘আ করলে তিনি খুশি হন। মুমিনের উচিত জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রেও মাসনূন দো‘আগুলি পাঠ করা। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দার করুন।

৩. পুরুষদের কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান না করা :

ইসবাল অর্থ ঝুলিয়ে দেওয়া, ঢেলে দেওয়া। শারঈ পরিভাষায় গোড়ালীর নিচে কাপড় ঝুলে পড়াকে ইসবাল বলে। এর বিধান দু’টি। (ক) অহংকার বশতঃ কেউ যদি এই কাজ করে তাহ’লে সকল আলেমদের অভিমত হ’ল সে জাহান্নামে যাবে। (খ) অসতর্কতা বশতঃ যদি ঝুলে যায় তাহ’লে গুনাহ হবে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَسْبَلَ إِزَارَهُ فِى صَلاَتِهِ خُيَلاَءَ فَلَيْسَ مِنَ اللهِ فِى حِلٍّ وَلاَ حَرَامٍ  ‘যে ব্যক্তি ছালাতের মধ্যে অহমিকার সাথে তার ইযার ঝুলিয়ে পরিধান করবে, আল্লাহর সাথে হালাল বা হারাম কোন প্রকারের সম্পর্ক তার থাকবে না’।[10]

বিভিন্ন হাদীছ থেকে জানা যায় যে, লুঙ্গি, পাজামা, জামা ইত্যাদি পায়ের পাতা পর্যন্ত বা মাটি পর্যন্ত ঝুলিয়ে পরা তৎকালীন সমাজের একটি অতি প্রচলিত রীতি ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই রীতি পরিহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে একটি হাদীছে এসেছে, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, الإِزَارُ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ فَلَمَّا رَأَى شِدَّةَ ذَلِكَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ قَالَ إِلَى الْكَعْبَيْنِ لاَ خَيْرَ فِيمَا أَسْفَلَ مِنْ ذَلِكَ. ‘ইযার (লুঙ্গি) পায়ের নালার মাঝামাঝি (অর্ধ সাক) পর্যন্ত পরতে হবে। মুসলমানদের জন্য বিষয়টি খুব কঠিন হয়ে পড়ল। তিনি যখন দেখলেন যে, মুসলমানদের জন্য বিষয়টি খুবই কষ্টকর তখন বললেন, পায়ের গিরা পর্যন্ত। এর নিচে কল্যাণ নেই’।[11] অপর একটি হাদীছে এসেছে,

عَنْ سَالِمِ بْنِ عَبْدِ اللهِ عَنْ أَبِيهِ رضى الله عنه عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلاَءَ لَمْ يَنْظُرِ اللهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. قَالَ أَبُو بَكْرٍ يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّ أَحَدَ شِقَّىْ إِزَارِى يَسْتَرْخِى، إِلاَّ أَنْ أَتَعَاهَدَ ذَلِكَ مِنْهُ. فَقَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم لَسْتَ مِمَّنْ يَصْنَعُهُ خُيَلاَءَ.

সালিম বিন আব্দুল্লাহ তার পিতা হ’তে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহংকার বশতঃ নিজের পোশাক ঝুলিয়ে পরবে, আল্লাহ তার প্রতি ক্বিয়ামতের দিন (দয়ার) দৃষ্টি দিবেন না। তখন আবু বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমার লুঙ্গির এক পাশ ঝুলে থাকে, আমি তাতে গিরা না দিলে। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, যারা অহংকার বশতঃ এমন করে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও’।[12] অন্যত্র এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضى الله عنه عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَا أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ مِنَ الإِزَارِ فَفِى النَّارِ.

আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ইযারের বা পরিধেয় বস্ত্রের যে অংশ পায়ের গোড়ালির নীচে থাকবে, সে অংশ জাহান্নামে যাবে’।[13]

[চলবে]

[1]. বুখারী হা/১৬৮;  

[2]. তিরমিযী হা/১৭৬৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৭৭৯; মিশকাত হা/৪৩৩০, সনদ ছহীহ

[3]. আবু দাউদ হা/৪১৪১; মিশকাত হা/৪০১, সনদ ছহীহ।

[4]. বুখারী হা/৫৮৫৫; তিরমিযী হা/১৭৭৯; মিশকাত হা/৪৪১০।

[5]. আবু দাউদ হা/৪০২০; তিরমিযী হা/১৭৬৭; মিশকাত হা/৪৩৪২, সনদ ছহীহ।

[6]. আবু দাঊদ হা/৪০২৩; মিশকাত হা/৪১৪৯।

[7]. ইবনু মাজাহ হা/৩৫৫৮; ছহীহাহ হা/৩৫২।

[8]. আবু দাউদ হা/৪০২০।

[9]. বুখারী হা/৫৮২৩।

[10]. আবু দাউদ হা/৬৩৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৬০১২, সনদ ছহীহ।

[11]. আহমাদ হা/১৩৬৩০; ছহীহাহ হা/১৭৬৫।

[12]. আহমাদ হা/৬২০৩; বুখারী হা/৫৭৮৪।

[13]. বুখারী হা/৫৭৮৭; নাসাঈ হা/৫৩৩০; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৫৯৫।

HTML Comment Box is loading comments...