প্রবন্ধ

আল-কুরআনের আলোকে জাহান্নামের বিবরণ

-বযলুর রহমান,
কেন্দ্রীয় সহ-পরিচালক, সোনামণি।

(শেষ কিস্তি)

জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের উপায় :

জাহান্নামের আযাবের ভয়াবহতা, লেলিহান আগুনের তীব্রতা ও প্রখরতা অত্যন্ত কঠিন। এজন্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা একটি খেজুর দান করে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ। যদি তাও না থাকে, তাহ’লে ভাল কথার মাধ্যমে হলেও (জাহান্নাম থেকে বাঁচ)।[1] সুতরাং জাহান্নাম থেকে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে এবং আমাদের নিকটাত্মীয়দের বাঁচানোর জন্যও চেষ্টা করতে হবে। জাহানণাম থেকে বাঁচার পথ ও পদ্ধতি নিম্নে আলোচনা করা হ’ল :

মূলতঃ জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের উপায় দু’টি। যেমন-(১) ঈমান আনা ও সৎকর্ম সম্পাদন করা (২) জাহান্নাম হ’তে আল্লাহর কাছে সর্বদা আশ্রয় প্রার্থনা করা।

(১) ঈমান আনা ও সৎকর্ম সম্পাদন করা :

জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হওয়ার মূল কারণ হ’ল কুফুরী। সুতরাং তা থেকে বেঁচে থাকাই জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রধান উপায়। সেক্ষেত্রে ঈমানের ছয়টি রুকনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা অত্যাবশ্যক। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলার বাণী, اَلَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ‘যারা বলে, হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আমরা ঈমান আনলাম। অতএব আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন’ (আলে-ইমরান ২/১৬)। অন্যত্র তিনি আরো বলেছেন,

رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ- رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ- رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ- رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدْتَنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلاَ تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لاَ تُخْلِفُ الْمِيعَادَ.

‘হে আমাদের রব! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র। সুতরাং তুমি আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা কর। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই তুমি যাকে আগুনে প্রবেশ করাবে, অবশ্যই তুমি তাকে লাঞ্ছিত করবে। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আমরা একজন আহবানকারীকে ঈমানের দিকে আহবান করতে শুনেছি যে, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আন’। তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব! আমাদের গুনাহ সমূহ ক্ষমা কর, বিদূরিত কর আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং আমাদেরকে মৃত্যু দাও নেককারদের সাথে। হে আমাদের রব! আর তুমি আমাদেরকে তাই প্রদান কর যার ওয়াদা তুমি আমাদেরকে দিয়েছ তোমার রাসূলগণের মাধ্যমে। আর ক্বিয়ামতের দিনে তুমি আমাদেরকে লাঞ্ছিত করবে না। নিশ্চয়ই তুমি অঙ্গীকার ভঙ্গ কর না’ (আলে ইমরান ২/১৯১-১৯৪)। এছাড়া অসংখ্য সৎকর্ম রয়েছে। যা সঠিক  ও বিশুদ্ধভাবে সম্পাদনের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ লাভ করা যায়। যেমন-

(ক) বিশুদ্ধ আক্বীদা পোষণ :

ঈমানে মুফাছ্ছাল ও ঈমানে মুজমাল সহ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত সকল বিষয়ের উপর দৃঢ় ঈমান ও বিশুদ্ধ আক্বীদা পোষণ করতে হবে। যা জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার অন্যতম উপায়।

(খ) পরিশুদ্ধ নিয়ত :

নিয়ত পরিশুদ্ধ না হ’লে জীবনের উপার্জিত সকল আমল বা ইবাদতই বরবাদ হয়ে যাবে। আর এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, বিশ্ব মানবতার প্রত্যেক কাজ তার অন্তরে পরিকল্পিত চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তাই মানুষের সকল কাজ তার নিয়তের উপর নির্ভরশীল।[2] সুতরাং একনিষ্ঠচিত্তে ও নিবিষ্ট মনে কেবলমাত্র মহান আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অনুসরণই হবে বিশুদ্ধ নিয়তের মৌলিক দাবী।

(গ) শিরক না করা :

শিরক একটি জঘন্য অপরাধ। যা খালেছ তওবা ব্যতীত আল্লাহ ক্ষমা করেন না। এর মাধ্যমে জান্নাত হারাম হয়ে যায় এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুনে দগ্ধীভূত হ’তে হয়। সুতরাং শিরক থেকে বেঁচে থাকতে হবে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ ‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করবে তার উপর জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম হবে তার চূড়ান্ত ঠিকানা। আর সেদিন যালেমদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না’ (মায়েদা ৫/৭২)

(ঘ) বিদ‘আত পরিহার করা :

বিদ‘আত আমল বিধ্বংসী এমন একটি অস্ত্র যার মাধ্যমে জাহান্নামের পথ সুগম হয়। মানুষ দ্রুত জান্নাতের রাস্তা থেকে দূরে সরে যায়। ক্বিয়ামতের কঠিন ময়দানে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর শাফা‘আত থেকে বঞ্চিত হয়। সুতরাং বিদ‘আত পরিহার করতে হবে এবং সুন্নাতের সনিষ্ঠ অনুসারী হ’তে হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ وَكُلَّ ضَلاَلَةٍ فِى النَّارِ ‘অতঃপর সকল নতুন আবিষ্কৃত বস্ত্তই নিকৃষ্ট এবং প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা। আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতাই জাহান্নামী’।[3] এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَطِيْعُوْا اللهَ وَأَطِيعُوْا الرَّسُوْلَ وَلاَ تُبْطِلُوْا أَعْمَالَكُمْ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, অতঃপর (তাদের আনুগত্য না করে) তোমাদের আমলসমূহকে বিনষ্ট কর না’ (মুহাম্মাদ ৪৭/৩৩)। সুতরাং কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী আমল করতে হবে। আর বিদ‘আতকে সর্বদা পরিহার করতে হবে।

(ঙ) ফরয ইবাদতগুলি যথাযথভাবে আদায় করা :

মহান আল্লাহ কর্তৃক বান্দার উপর যে সমস্ত ইবাদত ফরয করা হয়েছে সেগুলি যথাযথভাবে আদায় করা জাহান্নাম থেকে মুক্তির অন্যতম উপায়। ছালাত, ছিয়াম, যাকাত ও হজ্জ প্রভৃতি। যেমন- ছালাত আদায় করা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ، الَّذِيْنَ هُمْ فِيْ صَلاَتِهِمْ خَاشِعُوْنَ ‘অবশ্যই মুমিনগণ সফলকাম হয়েছে। যারা তাদের ছালাত বিনয়-নম্রতা সহকারে আদায় করে’ (মু’মিনূন ২৩/১-২)। অন্যত্র তিনি আরো বলেছেন, وَالَّذِيْنَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُوْنَ ‘(তারাও সফলকাম) যারা তাদের ছালাতসমূহের হেফাযত করে’ (মুমিনূন ২৩/৯)। ছিয়াম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, اَلصَّوْمُ جُنَّةٌ مِنْ عَذَابِ اللهِ كَجُنَّةِ أَحَدِكُمْ مِنَ الْقِتَالِ. ‘ছিয়াম আল্লাহর আযাব হ’তে পরিত্রাণের ঢালস্বরূপ, তোমাদের কারো যুদ্ধে ব্যবহৃত ঢালের ন্যায়’।[4]

ইবাদত হবে সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ ‘তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবে যেন (মনে করবে) তুমি তাকে দেখছ। আর যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও, তাহ’লে (অন্তত এতটুকু বিশ্বাস রাখবে যে) নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে দেখছেন’।[5]

(চ) অধিক পরিমাণ নফল ইবাদত করা :

আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের জন্য ফরয ইবাদত সমূহ প্রতিপালন করা আবশ্যক। পাশাপাশি সুন্নাত ও নফল ইবাদত সমূহ ও একজন মুসলিমকে আল্লাহর অধিক নৈকট্যশীল বান্দায় পরিণত করে। তাছাড়া ক্বিয়ামতের দিন যখন আমলনামা হালকা হবে তখন নফল ইবাদত দিয়ে তা পূর্ণ করা হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

وَمَا تَقَرَّبَ إِلَىَّ عَبْدِى بِشَىْءٍ أَحَبَّ إِلَىَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ وَمَا يَزَالُ عَبْدِى يَتَقَرَّبُ إِلَىَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِى يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِى يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِى يَبْطِشُ بِهَا وَرِجْلَهُ الَّتِى يَمْشِى بِهَا وَإِنْ سَأَلَنِى لأُعْطِيَنَّهُ وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِى لأُعِيذَنَّهُ وَمَا تَرَدَّدْتُ عَنْ شَىْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِى عَنْ نَفْسِ الْمُؤْمِنِ يَكْرَهُ الْمَوْتَ وَأَنَا أَكْرَهُ مَسَاءَتَهُ.

‘আমি যেসব বিষয় ফরয করেছি, তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অনুসন্ধানের চাইতে প্রিয়তর আমার নিকটে আর কিছু নেই। বান্দা নফল ইবাদত সমূহের মাধ্যমে সর্বদা আমার নৈকট্য হাছিলের চেষ্টায় থাকে, যতক্ষণ না আমি তাকে ভালবাসি। অতঃপর যখন আমি তাকে ভালবাসি, তখন আমিই তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শ্রবণ করে, চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে, পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। তখন সে যদি আমার কাছে কিছু চায় তখন অবশ্যই আমি তাকে দান করে থাকি। যদি সে আমার নিকট আশ্রয় ভিক্ষা করে, আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দিয়ে থাকি। আমি কোন কাজ করতে চাইলে তা করতে কোন দ্বিধা করি না, যতটা দ্বিধা করি মুমিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপসন্দ করে আর আমি তার বেঁচে থাকাকে অপসন্দ করি’।[6]

বান্দা মৃত্যুকে অপসন্দ করে অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ- ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً- فَادْخُلِي فِي عِبَادِي- وَادْخُلِي جَنَّتِي- ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি চলে এসো তোমার প্রতিপালকের সন্তুষ্টির দিকে সন্তুষ্ট চিত্তে। অতঃপর আমার সৎকর্মশীল বান্দাদের মধ্যে প্রবেশ কর এবং প্রবেশ কর জান্নাতে’ (ফজর ৮৯/২৭-৩০)

(ছ) অধিক পরিমাণ দান করা :

দান ও ছাদাক্বার মাধ্যমে আত্মা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে তার নিকটবর্তী হওয়া যায়। রাসূলুললাহ (ছাঃ)-এর আনুগত্যকারীর অন্তর্ভুক্ত হওয়া যায়। আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা সুদৃঢ় হয় এবং জান্নাতের পথ সুগম হয়। মহান আল্লাহ তা‘আলার বাণী, إِنْ تُبْدُوا الصَّدَقاتِ فَنِعِمَّا هِيَ وَإِنْ تُخْفُوها وَتُؤْتُوهَا الْفُقَراءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَيُكَفِّرُ عَنْكُمْ مِنْ سَيِّئاتِكُمْ وَاللَّهُ بِما تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান কর তবে তা উৎকৃষ্ট এবং যদি গোপনে দান কর এবং দরিদ্রদেরকে প্রদান কর তবে তোমাদের জন্য তা কল্যাণকর। আর এর দ্বারা তিনি তোমাদের পাপ সমূহ মোচন করে দেন। বস্ত্ততঃ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ যথাযথভাবে খবর রাখেন’ (বাক্বারাহ ২/২৭১)। অন্যত্র তিনি বলেন, لا خَيْرَ فِيْ كَثِيْرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوْفٍ أَوْ إِصْلاحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذلِكَ ابْتِغاءَ مَرْضاتِ اللهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيْهِ أَجْراً عَظِيْماً ‘তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোন মঙ্গল নিহিত থাকে না। তবে যে ব্যক্তি ছাদাক্বা করে, সৎকর্ম করে, মানুষের মাঝে পরস্পরে সত্য মীমাংসা করে এবং যে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য এরূপ করে সে ব্যতীত। আমি তাকে এর জন্য মহা পুরস্কারে ভূষিত করব’ (নিসা ৪/১১৪)

দানের গুরুত্ব বর্ণনায় নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ فِى ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ الإِمَامُ الْعَادِلُ وَشَابٌّ نَشَأَ فِى عِبَادَةِ رَبِّهِ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِى الْمَسَاجِدِ وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِى اللهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّى أَخَافُ اللهَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ أَخْفَى حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ.

‘যেদিন আল্লাহর বিশেষ ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না সেদিন আল্লাহ তা‘আলা সাত শ্রেণীর ব্যক্তিকে তাঁর ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন। (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক (২) এমন যুবক যে আল্লাহর ইবাদতে জীবন অতিবাহিত করেছে (৩) এমন ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে (৪) এমন দু’জন ব্যক্তি যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালবেসে একত্রিত হয় এবং পৃথক হয় (৫) এমন ব্যক্তি যাকে কোন সুন্দরী ও অভিজাত নারী আহবান করে, তখন সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি (৬) এমন ব্যক্তি যে গোপনে ছাদাক্বা করে কিন্তু তার বাম হাত জানতে পারে না যে তার ডান হাত কি ব্যয় করে (৭) এমন ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রুধারা প্রবাহিত করে।[7] অন্যত্র ছাদাক্বা প্রদানকারীকে জান্নাতের অধিবাসী বলে বর্ণনা করা হয়েছে।[8]

(২) জাহান্নাম হ’তে আল্লাহর কাছে সর্বদা আশ্রয় প্রার্থনা করা :

জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উম্মতকে কতিপয় দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন। যেসব দো‘আ নিয়মিত পাঠের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। দো‘আগুলো হ’ল :

(১) اَللَّهُمَّ أَدْخِلْنِيْ الْجَنَّةَ وَأَجِرْنِيْ مِنَ النَّارِ-

(১) ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাও’।[9] উল্লেখ্য, উক্ত দো‘আ তিনবার পাঠ করার মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করলে জাহান্নাম তার জন্য সেখান থেকে মুক্তির জন্য সুফারিশ করবে।[10]

(২) اَللَّهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِى الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِى الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ-

(২) ‘হে আল্লাহ! হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি আমাদেরকে দুনিয়াতে মঙ্গল দাও ও আখেরাতে মঙ্গল দাও এবং আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও’।

আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সবসময় এই দো‘আ পাঠ করতেন।[11]

(৩) اَللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ-

(৩) ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকটে জাহান্নামের শাস্তি হ’তে, কবরের আযাব হ’তে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা হ’তে এবং দাজ্জালের ফিতনা হ’তে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছালাতের শেষ বৈঠকে তাশাহ্হুদ পাঠের পর এই দো‘আ পাঠ করতেন।[12]

(৪) اللَّهُمَّ أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ وَبِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ لاَ أُحْصِى ثَنَاءً عَلَيْكَ أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ-

(৪) ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার সন্তুষ্টির মাধ্যমে তোমার অসন্তুষ্টি থেকে, তোমার ক্ষমার মাধ্যমে তোমার আযাব বা শাস্তি হ’তে, আমি তোমার মাধ্যমে তোমার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি তোমার প্রশংসা ও গুণগান করার ক্ষমতা রাখি না। সুতরাং তোমার প্রশংসা তেমনই যেমন তুমি তোমার প্রশংসা করেছ’।[13]

(৫) رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا-

(৫) ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি বিদূরিত করুন। মূলতঃ তার শাস্তিতো শুধুমাত্র ধ্বংস’ (ফুরক্বান ২৫/৬৫)

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِى كَفَانِى وَآوَانِى وَأَطْعَمَنِى وَسَقَانِى وَالَّذِى مَنَّ عَلَىَّ فَأَفْضَلَ وَالَّذِى أَعْطَانِى فَأَجْزَلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ اللَّهُمَّ رَبَّ كُلِّ شَىْءٍ وَمَلِيكَهُ وَإِلَهَ كُلِّ شَىْءٍ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ النَّارِ-

(৬) ‘যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যিনি আমাকে সকল বিপদ-মুছীবত থেকে রক্ষা করেছেন, বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, পানাহারের ব্যবস্থা করেছেন। অতঃপর সেই সত্তার প্রশংসা যিনি আমার প্রতি যখন অনুগ্রহ করেছেন, তখন যথেষ্ট পরিমাণে করেছেন। আর যখন আমাকে কোন কিছু দান করেন, তখনও যথেষ্ট পরিমাণে দান করেন। তাই সর্বাবস্থায় সকল প্রশংসা একমাত্র তাঁরই জন্য। হে আল্লাহ! তুমিই সব কিছুর প্রভু, সকল কিছুর রাজত্ব তোমারই এবং তুমিই সবকিছুর ইলাহ। সুতরাং আমি তোমার নিকটে জাহান্নামের শাস্তি হ’তে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’।[14]

উপসংহার :

পরিশেষে বলা যায় যে, মহান আল্লাহ তা‘আলা মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার জন্য। মানুষের উচিত তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে এবং তাঁর নিকটেই মনের আকুলি-বিকুলি প্রকাশ করা। যারা আল্লাহর নিকটে নিজেকে সপে দিয়ে দুনিয়াবী জীবন পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী পরিচালনা করবে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য অনন্য ও চিরন্তন নে‘মত সমৃদ্ধ জান্নাত প্রস্ত্তত করে রেখেছেন। পক্ষান্তরে যারা তাঁর আনুগত্য ও রাসূলের ভালবাসার নামে বিভিন্ন মাযহাব, মতবাদ বা ইযমের অন্ধ অনুসরণ করে থাকে এবং যঈফ ও জাল হাদীছ ভিত্তিক আমল করে তাদের জন্য মহান আল্লাহ জাহান্নামের জ্বলন্ত অগ্নিশিখা তৈরী করে রেখেছেন। হে আল্লাহ! তুমি রহীম ও রহমান, তুমি গফুর ও গাফফার, তুমি ছাড়া ক্ষমা করার আর কেউ নেই। সুতরাং আমাদের পাপরাশিকে ক্ষমা করে দিয়ে আমাদেরকে জান্নাতের অধিবাসী কর- আমীন!!


* ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. ছহীহ বুখারী হা/১৪১৩, হা/১৪১৭; ইবনু হিববান হা/৭৩৭৪।

[2]. ছহীহ বুখারী হা/১, ৬৬৮৯; মুসলিম হা/৫০৩৬।

[3]. নাসাঈ হা/১৫৭৮; ইবনু খুযায়মাহ হা/১৭৮৫; ছহীহুল জামে‘ হা/১৩৫৩।

[4]. ইবনু মাজাহ হা/১৬৩৯; নাসাঈ হা/২২৩০-২২৩১; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৮৭৯।

[5]. বুখারী হা/৫০ ও ৪৭৭৭; মুসলিম হা/১০২, ১০৬ ও ১০৮; আবুদাঊদ হা/৪৬৯৫; ইবনু মাজাহ হা/৬৩-৬৪; তিরমিযী হা/২৬১০; নাসাঈ হা/৪৯৯০-৪৯৯১; মিশকাত হা/২।

[6]. ছহীহ বুখারী হা/৬৫০২, ‘বিনয়ী হওয়া’ অনুচ্ছেদ-৩৮

[7]. ছহীহ বুখারী হা/৬৬০, অনুচ্ছেদ-৩৬, অধ্যায়-১০; ছহীহ মুসলিম হা/২৪২৭; তিরমিযী হা/২৩৯১।

[8]. ছহীহ মুসলিম হা/৭৩৮৬, অধ্যায়-৫৪, অনুচ্ছেদ-১৭; মিশকাত হা/৪৯৬০, ‘সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ’ অধ্যায়-১৫, অনুচ্ছেদ-২।

[9]. তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত হা/২৪৭৮।

[10]. ইবনু মাজাহ হা/৪৩৪০; তিরমিযী হা/২৫৭২; নাসাঈ হা/৫৫২১; মিশকাত হা/২৪৭৮; ছহীহুল জামে‘ হা/৬২৭৫। হাদীছ ছহীহ।

[11]. বুখারী হা/৪৫২২ ও ৬৩৮৯; বাক্বারাহ ২/২০১; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৪৮৭, ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯, ‘সারগর্ভ দো‘আ’ অনুচ্ছেদ-৯।

[12]. ছহীহ মুসলিম হা/১৩৫৪, ‘ছালাতে যা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়’ অনুচ্ছেদ-২৬; আবুদাঊদ হা/৯৮৩; ইবনু মাজাহ হা/৯০৯; মিশকাত হা/৯৪০, ‘তাশাহ্হুদে পঠিতব্য দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১।

[13]. ছহীহ মুসলিম হা/১১১৮, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৫, ‘রুকূ ও সিজদায় যা বলতে হয়’ অনুচ্ছেদ-৪২; আবুদাঊদ হা/১৪২৭; ইবনু মাজাহ হা/৩৮৪১; নাসাঈ হা/১১০০; মিশকাত হা/৮৯৩, ‘ছালাত’ অধ্যায়-১৩, ‘সিজদাহ এবং তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ-১।

[14]. আবুদাঊদ হা/৫০৬০; মিশকাত হা/২৪১০; মুসনাদে আহমাদ হা/৫৯৮৩; ইবনু হিববান হা/৫৫৩৮; মুসনাদে আবী ইয়া‘লা হা/৫৭৫৮। হাদীছ ছহীহ।

 

HTML Comment Box is loading comments...