৬. জানাযার ছালাত (صلاة الجنازة)

হুকুম : প্রত্যেক মুসলিম আহলে ক্বিবলার উপর জানাযার ছালাত ‘ফরযে কেফায়াহ’।[1] অর্থাৎ মুসলমানদের কেউ জানাযা পড়লে উক্ত ফরয আদায় হয়ে যাবে। না পড়লে সবাই দায়ী হবে। ছালাত হিসাবে অন্যান্য ছালাতের ন্যায় ওযূ, ক্বিবলা, সতর ঢাকা ইত্যাদি ছালাতে জানাযার শর্তাবলীর অন্তর্ভুক্ত। তবে পার্থক্য এই যে, জানাযার ছালাতে কোন রুকূ-সিজদা বা বৈঠক নেই এবং এ ছালাতের জন্য নির্দিষ্ট কোন ওয়াক্ত নেই। বরং দিনে-রাতে সকল সময় এমনকি নিষিদ্ধ তিন সময়েও পড়া যায়।[2]

ওয়াজিব সমূহ : ছয়টি : (১) দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করা (২) চার তাকবীর দেওয়া (৩) সূরায়ে ফাতিহা পাঠ করা (৪) দরূদ পাঠ করা (৫) মাইয়েতের জন্য খালেছ অন্তরে দো‘আ করা (৬) সালাম ফিরানো।

সুন্নাত সমূহ : পাঁচটি : (১) জামা‘আত সহকারে ছালাত আদায় করা (২) কমপক্ষে তিনটি কাতার হওয়া (৩) ইমাম বা একাকী মুছল্লীর জন্য পুরুষের মাথা ও মেয়েদের কোমর বরাবর দাঁড়ানো (৪) ফাতিহা ব্যতীত অন্য একটি সূরা এবং হাদীছে বর্ণিত দো‘আ সমূহ পাঠ করা (৫) ছালাত শেষে জানাযা উঠানো পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা। [3] বাকী সবই ‘মুস্তাহাব’। যদি ভুলক্রমে তিন তাকবীর হয়ে যায়, তবে পুনরায় ইমাম চতুর্থ তাকবীর দিবেন। যদি মুক্তাদীর কোন তাকবীর ছুটে যায়, তবে শেষে তাকবীর দিয়ে সালাম ফিরাবে। আর যদি না দেয় তাতেও দোষ নেই।[4]

ফযীলত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় কোন জানাযায় শরীক হ’ল এবং দাফন শেষে ফিরে এলো, সে ব্যক্তি দুই ‘ক্বীরাত’ সমপরিমাণ নেকী পেল। প্রতি ‘ক্বীরাত’ ওহোদ পাহাড়ের সমতুল্য। আর যে ব্যক্তি কেবলমাত্র জানাযা পড়ে ফিরে এলো, সে এক ‘ক্বীরাত’ পরিমাণ নেকী পেল’। [5]

কাতার দাঁড়ানো : ইমামের পিছনে কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পা মিলিয়ে কাতার দিবে।[6] এ সময় জামার হাতাগুলো খুলে দিবে ও টাখনুর উপরে কাপড় রাখবে।[7] জুতা-স্যান্ডেল খোলার প্রয়োজন নেই। যদি তাতে নাপাকী থাকে, তবে তা মাটিতে ঘষে নিলেই যথেষ্ট হবে। [8] এ সময় জুতা-স্যান্ডেল থেকে পা বের করে তার উপরে দাঁড়ানো স্রেফ বোকামি। মাইয়েতকে উত্তর মাথা করে ক্বিবলার দিকে সামনে রাখবে।[9] যদি মাইয়েত পুরুষ হন, তবে ইমাম মাইয়েতের মাথা বরাবর দাঁড়াবেন। আর যদি মহিলা হন, তবে মাইয়েতের কোমর বরাবর দাঁড়াবেন।[10] মাইয়েত একত্রে একাধিক হ’লে এবং পুরুষ ও নারী হ’লে পুরুষের লাশ ইমামের কাছাকাছি সম্মুখে রাখবে। অতঃপর মহিলার লাশ থাকবে। যদি শিশু ও মহিলা হয়, তাহ’লে শিশুর লাশ প্রথমে ও মহিলার লাশ পরে থাকবে।

ইমামের পিছনে তিনটি কাতার দেওয়া মুস্তাহাব।[11] ১ম কাতারে ইমামের কাছাকাছি মাইয়েতের উত্তরাধিকারীগণ ও দ্বীনদার গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ দাঁড়াবেন। চারজন হ’লে ইমামের পিছনে দু’জন দু’জন করে দাঁড়াবেন।[12] ইমাম ব্যতীত একজন পুরুষ ও একজন মহিলা মুক্তাদী হ’লে ইমামের পিছনে পুরুষ ও তার পিছনে মহিলা দাঁড়াবেন। মুক্তাদী একজন হ’লে তিনি ইমামের পিছনে দাঁড়াবেন। কোন লোক না পেলে একাকী জানাযা পড়বেন।[13] তবে শিরক ও বিদ‘আতী আক্বীদা ও আমল মুক্ত দ্বীনদার মুছল্লীর সংখ্যা জানাযায় যত বেশী হবে, মাইয়েতের জন্য তা তত বেশী উপকারী হবে এবং তাদের দো‘আ কবুল করা হবে’।[14]

ইমামত : মাইয়েত কোন ন্যায়নিষ্ঠ ও পরহেযগার ব্যক্তিকে অছিয়ত করে গেলে তিনিই জানাযা পড়াবেন। নইলে ‘আমীর’ বা তাঁর প্রতিনিধি অথবা মাইয়েতের কোন যোগ্য নিকটাত্মীয়, নতুবা স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা অন্য কোন মুত্তাক্বী আলেম জানাযায় ইমামতি করবেন। মৃত ব্যক্তি দু’জন ব্যক্তির নামেও অছিয়ত করে যেতে পারেন। [15]

জানাযার ছালাতের বিবরণ (صفة صلاة الجنازة) :

জানাযার ছালাতে চার তাকবীর দিবে। পাঁচ থেকে নয় তাকবীর পর্যন্ত প্রমাণিত আছে। তবে চার তাকবীরের হাদীছ সমূহ অধিকতর ছহীহ ও সংখ্যায় অধিক। মুক্তাদী ইমামের পিছে পিছে তাকবীর বলবে।[16] প্রথমে মনে মনে জানাযার নিয়ত করে সরবে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে দু’হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে বাম হাতের উপর ডান হাত বুকে বাঁধবে। এ সময় ‘ছানা’ পড়বে না।[17] নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীছ সর্বসম্মতভাবে ‘যঈফ’।[18] আনাস, ইবনে ওমর, ইবনে আববাস (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীগণ সকল তাকবীরেই হাত উঠাতেন।[19] অতঃপর আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ সূরায়ে ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়বে। [20] তারপর ২য় তাকবীর দিবে ও দরূদে ইবরাহীমী পাঠ করবে, যা আত্তাহিইয়াতু-র পরে পড়া হয়। তারপর ৩য় তাকবীর দিবে ও নিম্নোক্ত দো‘আ সমূহ পড়বে। দো‘আ পাঠ শেষে ৪র্থ তাকবীর দিয়ে প্রথমে ডাইনে ও পরে বামে সালাম ফিরাবে। ডাইনে একবার মাত্র সালাম ফিরানোও জায়েয আছে। [21]

জানাযার ছালাত সরবে ও নীরবে পড়া যায়।[22] ইমাম সরবে পড়লে মুক্তাদীগণ আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ কেবল সূরায়ে ফাতিহা চুপে চুপে পড়বে এবং পরে দরূদ ও অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে। তবে ইমাম নীরবে পড়লে মুক্তাদীগণ সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা এবং অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে।

জানাযার পূর্বে করণীয় : জানাযার পূর্বে মৃতের জন্য প্রথম করণীয় হ’ল তার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা। এজন্য তার সকল সম্পদ বিক্রি করে হ’লেও তা করতে হবে। যদি তার কিছুই না থাকে, তাহ’লে তার নিকটাত্মীয়, সমাজ, সংগঠন বা সরকার সে দায়িত্ব বহন করবে’।[23]

জানাযা বিষয়ে সতর্কতা :

মহাপাপী কোন মুসলিম যেমন কোন ব্যভিচারী, মদ্যপায়ী, চোর-দস্যু-সন্ত্রাসী, আত্মঘাতি, জারজ সন্তান, কবর ও মূর্তি পূজারী, মুশরিক ও বিদ‘আতী যতক্ষণ না সে প্রকাশ্যে কুফরী ঘোষণা করে, আমানতের খেয়ানতকারী প্রভৃতি লোকদের জানাযা কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও পরহেযগার আলেমগণ পড়বেন না। তবে সাধারণ লোকেরা পড়বেন। [24]

ঋণগ্রস্ত, আত্মহত্যাকারী ও বায়তুল মাল বা অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারীর জানাযা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে পড়েননি, বরং অন্যকে পড়তে বলেন।[25] ‘এটি ছিল তাঁর পক্ষ থেকে অন্যকে আদব শিখানোর জন্য’। [26]

(১) খায়বার কিংবা হোনায়েন-এর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জনৈক সাথী বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে। লোকেরা তার উচ্চ প্রশংসা করলে রাসূল (ছাঃ) বললেন, ঐ ব্যক্তি জাহান্নামের অধিবাসী। তখন একজন গোপনে তার পিছু নিল। দেখা গেল যে, ঐ ব্যক্তি যুদ্ধের এক পর্যায়ে আহত হ’ল। অতঃপর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিজের অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করল। তখন লোকটি ছুটে এসে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সবাইকে ডেকে বললেন, সত্যিকারের মুমিন ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মনে রেখ অনেক লোক জান্নাতী আমল করে। কিন্তু মৃত্যুকালে জাহান্নামী হয়ে যায়। আবার অনেকে জাহান্নামের আমল করে, কিন্তু মৃত্যুকালে জান্নাতী হয়ে যায়। অতঃপর তিনি বলেন إِنَّ اللهَ يُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এই দ্বীনকে সাহায্য করেন অনেক পাপী লোকের মাধ্যমে’।[27]

আল্লাহ বলেন,وَلاَ تَقْتُلُوْا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيْمًا ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতিশয় দয়াবান’ (নিসা ৪/২৯)

(২) খায়বার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথীদের মধ্যে একজন নিহত হ’লে তিনি বলেন, صَلُّوْا عَلَى صَاحِبِكُمْ ‘তোমরা তোমাদের সাথীর জানাযা পড়’। এতে তাদের মন খারাপ হলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের বললেন, إِنَّ صَاحِبَكُمْ غَلَّ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ ‘তোমাদের সাথীটি আল্লাহর রাস্তায় খেয়ানত করেছে’। পরে অনুসন্ধানে তার থলিতে ইহুদীদের কণ্ঠহারের একটি ছিদ্রযুক্ত ছোট পাথরের লকেট (خَرَزٌ) পাওয়া গেল (যা গণীমতের মাল ছিল)। যার মূল্য দুই দিরহামেরও কম। [28]

(৩) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে হাদিয়া হিসাবে পাঠানো গোলাম মিদ‘আম (مِدْعَم) খায়বার যুদ্ধে নিহত হ’লে লোকেরা তার জান্নাতের সুসংবাদ বলতে থাকলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাগতঃস্বরে বলেন, কখনোই না। আল্লাহর কসম! গণীমতের মাল থেকে যে চাদরটি সে চুরি করেছে, তা তাকে আগুনে পোড়াবে’। [29]

(৪) অন্য হাদীছে এসেছে, ‘মুমিনের নফ্স তার ঋণের সাথে লটকানো থাকে এবং সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তার ঋণ পারিশোধ করা হয়’। [30]

(৫) যারা শরীক ফাঁকি দেয় কিংবা শক্তির জোরে বা ছল-চাতুরী করে অন্যের জমি ও সম্পদ আত্মসাৎ করে, তাদের জানাযা কোন পরহেযগার আলেমের পড়া উচিৎ নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ ظُلْمًا فَإِنَّهُ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرْضِيْنَ ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারু জমি দখল করে, ক্বিয়ামতের দিন সাত তবক যমীন তার গলায় বেড়ীরূপে পরিয়ে দেওয়া হবে’।[31] অন্য বর্ণনায় এসেছে, مَنْ أَخَذَ أَرْضًا بِغَيْرِ حَقِّهَا كُلِّفَ أَنْ يَّحْمِلَ تُرَابَهَا الْمَحْشَرَ ‘...তাকে ক্বিয়ামতের দিন ঐ মাটির বোঝা মাথায় বহন করে চলতে বাধ্য করা হবে’।[32]

উপরোক্ত ব্যক্তিগণ কবীরা গোনাহগার। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ছালাত তরককারী ব্যক্তিকে হাদীছে ‘কাফির’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। [33] তাহ’লে কিভাবে তার জানাযা পড়া যেতে পারে? আল্লাহ আমাদের হেদায়াত করুন- আমীন!

জানাযার দো‘আ (دعاء الجنازة) :

অনেকগুলি দো‘আর মধ্যে নিম্নের দো‘আটি সুপরিচিত।-

1- اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اَللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيْمَانِ، اَللَّهُمَّ لاَ تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ وَلاَ تَفْتِنَّا بَعْدَهُ-

(১) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগ্ফির লিহাইয়েনা ওয়া মাইয়েতেনা ওয়া শা-হেদেনা ওয়া গা-য়েবেনা ওয়া ছাগীরেনা ওয়া কাবীরেনা ওয়া যাকারেনা ওয়া উন্ছা-না, আল্লা-হুম্মা মান আই্য়াইতাহূ মিন্না ফাআহ্য়িহী ‘আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফ্ফায়তাহূ মিন্না ফাতাওফ্ফাহূ ‘আলাল ঈমান। আল্লা-হুম্মা লা তাহরিমনা আজরাহূ ওয়া লা তাফ্তিন্না বা‘দাহূ।

অনূবাদ : ‘হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত এবং (এই জানাযায়) উপস্থিত-অনুপস্থিত আমাদের ছোট ও বড়, পুরুষ ও নারী সকলকে আপনি ক্ষমা করুন। যাকে আপনি বাঁচিয়ে রাখবেন, তাকে ইসলামের উপরে বাঁচিয়ে রাখুন এবং যাকে মারতে চান, তাকে ঈমানের হালতে মৃত্যু দান করুন। হে আল্লাহ! এই মাইয়েতের (জন্য দো‘আ করার) উত্তম প্রতিদান হ’তে আপনি আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না এবং তার পরে আমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলবেন না’।[34]

(২) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দো‘আ যা প্রথমটির সাথে যোগ করে পড়া যায় বিশেষভাবে মাইয়েতের উদ্দেশ্যে। যেমন-

2- اَللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ وَوَسِّعْ مَدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّيْ الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِّنْ دَارِهِ وَأَهْلاً خَيْرًا مِّنْ أَهْلِهِ وَزَوْجًا خَيْرًا مِّنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَ مِنْ عَذَابِ النَّارِ-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগ্ফির লা-হূ ওয়ারহামহু ওয়া ‘আ-ফিহি ওয়া‘ফু ‘আনহু ওয়া আকরিম নুযুলাহূ ওয়া ওয়াস্সি‘ মাদ্খালাহূ; ওয়াগ্সিলহু বিলমা-এ ওয়াছ্ছালজে ওয়াল বারাদে; ওয়া নাক্বক্বিহি মিনাল খাত্বা-য়া কামা ইউনাক্বক্বাছ্ ছাওবুল আবইয়াযু মিনাদ্ দানাসি; ওয়া আবদিলহু দা-রান খায়রান মিন দা-রিহী ওয়া আহলান খায়রাম মিন আহলিহী ওয়া যাওজান খায়রাম মিন যাওজিহী; ওয়া আদখিল্হুল জান্নাতা ওয়া আ‘ইয্হু মিন ‘আযা-বিল ক্বাবরে ওয়া মিন ‘আযা-বিন না-রে

অনুবাদ : হে আল্লাহ! আপনি এই মাইয়েতকে ক্ষমা করুন। তাকে অনুগ্রহ করুন। তাকে নিরাপদে রাখুন এবং তার গোনাহ মাফ করুন। আপনি তাকে সম্মানজনক আতিথেয়তা প্রদান করুন। তার বাসস্থান প্রশস্ত করুন। আপনি তাকে পানি দ্বারা, বরফ দ্বারা ও শিশির দ্বারা ধৌত করুন এবং তাকে পাপ হ’তে এমনভাবে মুক্ত করুন, যেমনভাবে সাদা কাপড় ময়লা হ’তে ছাফ করা হয়। আপনি তাকে দুনিয়ার গৃহের বদলে উত্তম গৃহ দান করুন। তার দুনিয়ার পরিবারের চাইতে উত্তম পরিবার এবং দুনিয়ার জোড়ার চাইতে উত্তম জোড়া দান করুন। তাকে আপনি জান্নাতে দাখিল করুন এবং তাকে কবরের আযাব হ’তে ও জাহান্নামের আযাব হ’তে রক্ষা করুন’।[35]

3- اَللَّهُمَّ إِنَّ فُلاَنَ بْنَ فُلاَنٍ فِيْ ذِمَّتِكَ وَحَبْلِ جِوَارِكَ، فَقِهِ مِنْ فِتْنَةِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ النَّارِ، وَأَنْتَ أَهْلُ الْوَفَاءِ وَالْحَقِّ، اَللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُ وَارْحَمْهُ، إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُوْرالرَّحِيْمُ-

(৩) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ইন্না ফুলা-নাবনা ফুলা-নিন ফী যিম্মাতিকা ওয়া হাবলি জিওয়া-রিকা; ফাক্বিহী মিন ফিৎনাতিল ক্বাবরি ওয়া ‘আযা-বিন্না-রি; ওয়া আন্তা আহলুল ওয়াফা-ই ওয়াল হাক্বক্বি। আল্লা-হুম্মাগফিরলাহূ ওয়ারহামহু, ইন্নাকা আন্তাল গাফূরুর রহীম

অনুবাদ : হে আল্লাহ! অমুকের পুত্র অমুক আপনার যিম্মায় ও আপনার তত্ত্বাবধানে আবদ্ধ। অতএব আপনি তাকে কবরের পরীক্ষা ও জাহান্নামের আযাব হ’তে রক্ষা করুন। আপনি ওয়াদা ও সত্যের মালিক। হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন ও তাকে অনুগ্রহ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান।[36]

4- اَللَّهُمَّ عَبْدُكَ وَابْنُ أَمَتِكَ احْتَاجَ إِلَى رَحْمَتِكَ، وَأَنْتَ غَنِيٌّ عَنْ عَذَابِهِ، إِنْ كَانَ مُحْسِنًا فَزِدْ فِي حَسَنَاتِهِ، وَإِنْ كَانَ مُسِيْئًا فَتَجَاوَزْ عَنْهُ-

(৪) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ‘আব্দুকা ওয়া ইবনু আমাতিকা, ইহতা-জা ইলা রহমাতিকা ওয়া আনতা গানিইয়ুন ‘আন ‘আযা-বিহী। ইন কা-না মুহসিনান ফাযিদ ফী হাসানা-তিহী; ওয়া ইন কা-না মুসীআন, ফাতাজা-ওয়ায ‘আনহু।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! মাইয়েত আপনার বান্দা এবং সে আপনার এক বান্দীর সন্তান। সে আপনার রহমতের ভিখারী। আপনি তাকে শাস্তি দিতে বাধ্য নন। অতএব যদি সে সৎকর্মশীল হয়, তাহ’লে তার নেকী বাড়িয়ে দিন। আর যদি অন্যায়কারী হয়, তাহ’লে তাকে আপনি ক্ষমা করে দিন’।[37]

(৫) মাইয়েত শিশু হ’লে সূরা ফাতিহা, দরূদ ও জানাযার ১ম দো‘আটি পাঠের পর নিম্নোক্ত দো‘আ পড়বে-

5- اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا سَلَفًا وَّ فَرَطًا وَّ ذُخْرًا وَّ أَجْرًا ، رواه البخاريُّ تعليقًا-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাজ‘আলহু লানা সালাফাওঁ ওয়া ফারাত্বাওঁ ওয়া যুখ্রাওঁ ওয়া আজরান’। ‘লানা’-এর সাথে ‘ওয়া লে আবাওয়াইহে’ (এবং তার পিতা-মাতার জন্য) যোগ করে বলা যেতে পারে।[38]

অনুবাদ : ‘হে আল্লাহ! আপনি এই শিশুকে আমাদের জন্য (এবং তার পিতা-মাতার জন্য) পূর্বগামী, অগ্রগামী এবং আখেরাতের পুঁজি ও পুরস্কার হিসাবে গণ্য করুন’! [39]

জানাযার দো‘আর আদব (آداب دعاء الجنازة) :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, إِذَا صَلَّيْتُمْ عَلَى الْمَيِّتِ فَأَخْلِصُوْا لَهُ الدُّعَاءَ- ‘যখন তোমরা জানাযার ছালাত আদায় করবে, তখন মাইয়তের জন্য খালেছ অন্তরে দো‘আ করবে’।[40] অতএব মাইয়েত ভাল-মন্দ যাই-ই হৌক না কেন, তার জন্য খোলা মনে দো‘আ করতে হবে। কবুল করা বা না করার মালিক আল্লাহ। ছাহেবে ‘আওন বলেন, অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মৃতের জন্য নির্দিষ্ট কোন দো‘আ নেই। বরং যেকোন প্রার্থনা করা যেতে পারে। শাওকানীও সেকথা বলেন। তবে তিনি বলেন যে, হাদীছে বর্ণিত দো‘আ সমূহ পাঠ করাই উত্তম। এই সময় সর্বনাম সমূহ পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। কেননা ‘মাইয়েত’ এখানে উদ্দেশ্য। ‘মাইয়েত’ (مَيِّتٌ) আরবী শব্দ, যা স্ত্রী ও পুরুষ উভয় লিঙ্গে ব্যবহৃত হয়।[41]

মৃত্যুকালীন সময়ে করণীয় (الأعمال عند من حضره الموت)

(ক) তালক্বীন করানো : ‘তালক্বীন’ (التلقين) অর্থ: কথা বুঝানো বা দ্রুত মুখস্থ করে নেওয়া। মৃত্যুর আলামত দেখা গেলে রোগীর শিয়রে বসে তাকে কালেমায়ে ত্বাইয়িবা ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ পড়ানো উচিত।[42] যাতে সে দ্রুত মুখস্থ বা স্মরণ করে নেয়। তাওহীদের স্বীকৃতিবাচক এই কালেমাই তাকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা্ঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তির সর্বশেষ বাক্য হবে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ (অর্থ : নেই কোন উপাস্য আল্লাহ ব্যতীত), সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[43] জমহূর বিদ্বানগণ কেবল লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ পড়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। কেননা হাদীছে কেবল এতটুকুই এসেছে।[44]

তালক্বীনের অর্থ মৃত্যুমুখী ব্যক্তিকে কেবল কালেমা শুনানো নয়। বরং তাকে কালেমা পড়ানোর চেষ্টা করা। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক আনছার রোগীকে দেখতে গেলেন ও বললেন, হে মামু! আপনি পড়ুন লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ। তিনি বললেন যে, আমাকে এখতিয়ার দিন, আমি নিজেই পড়ি...। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হ্যাঁ’।[45] কিন্তু কালেমা পড়ানোর জন্য চাপাচাপি করা উচিত নয়। তাতে মুখ দিয়ে বেফাস কথা বের হয়ে যেতে পারে। একবার বলানোর পরে দ্বিতীয়বার চেষ্টা না করা উচিত। যাতে এই কালেমাই তার শেষ বাক্য হয়। এই সময় তাকে ক্বিবলামুখী করার জন্য উত্তর দিকে মাথা করে বিছানা ঠিক করে দেওয়া সম্পর্কে কোন ছহীহ হাদীছ নেই। খ্যাতনামা তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবকে ক্বিবলামুখী করে বিছানা ঘুরিয়ে দিলে হুঁশ ফেরার পর তিনি পুনরায় পূর্বের ন্যায় শয়ন করেন ও বলেন, মাইয়েত কি মুসলমান নয়? [46] এই সময় মাইয়েতের শিয়রে বসে সূরা ইয়াসীন পাঠ করার হাদীছ ‘যঈফ’।[47]

মৃত্যুর পরে দো‘আ সমূহ এবং করণীয় :

(১) মৃত্যু হওয়ার পরে উপস্থিত সকলে এবং যারা শুনবেন তারা প্রত্যেকে إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ‘ইন্না লিল্লা-হে ওয়া ইন্না ইলাইহে রা-জে‘ঊন’ (অর্থ : ‘আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’) পাঠ করবে এবং আল্লাহ-নির্ধারিত তাক্বদীরের উপরে ছবর করবে ও সন্তুষ্ট থাকবে। অতঃপর (২) মৃতের চোখ দু’টি বন্ধ করে দিবে। [48] সারা দেহ ও মুখমন্ডল কাপড় দিয়ে ঢেকে দিবে।[49] তবে (হজ্জ বা ওমরাহ কালে) ‘মুহরিম’ ব্যক্তির মুখ ও মাথা খোলা থাকবে। কেননা তিনি ক্বিয়ামতের দিন ‘তালবিয়া’ পাঠ করতে করতে উঠবেন। [50]

(৩) এই সময় মাইয়েতের নিকটতম ব্যক্তি এই দো‘আ পড়বে : اَللَّهُمَّ أَجِرْنِي فِيْ مُصِيْبَتِيْ وَأَخْلِفْ لِيْ خَيْرًا مِّنْهَا ‘আল্লা-হুম্মা আজিরনী ফী মুছীবাতী ওয়া আখলিফ্লী খায়রাম মিনহা’ (অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে বিপদে ধৈর্য ধারণের পারিতোষিক দান কর এবং আমাকে এর উত্তম প্রতিদান দাও’)।[51] (৪) এসময় মৃতের জন্য নিম্নোক্ত দো‘আটি পড়া যেতে পারে। যা আবু সালামাহ (রাঃ)-এর জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পাঠ করেছিলেন,

اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمَهْدِيِّيْنَ وَاخْلُفْهُ فِيْ عَقِبِهِ فِي الْغَابِرِيْنَ وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ الْعَالَمِيْنَ، وَافْسَحْ لَهُ فِيْ قَبْرِهِ وَنَوِّرْ لَهُ فِيْهِ-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগফির লাহু ওয়ারফা‘ দারাজাতাহু ফিল মাহদিইয়ীনা ওয়াখলুফহু ফী ‘আক্বিবিহী ফিল গা-বিরীনা, ওয়াগফির লানা ওয়ালাহু ইয়া রববাল ‘আ-লামীন; ওয়াফসাহ লাহু ফী ক্বাবরিহী ওয়া নাওভির লাহু ফীহি।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং সুপথপ্রাপ্তদের মধ্যে তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। পিছনে যাদেরকে তিনি ছেড়ে গেলেন, তাদের মধ্যে আপনিই তার প্রতিনিধি হউন। হে বিশ্ব চরাচরের পালনকর্তা! আপনি আমাদেরকে ও তাকে ক্ষমা করুন। আপনি তার জন্য তার কবরকে প্রশস্ত করে দিন এবং সেটিকে তার জন্য আলোকিত করে দিন’। [52]

(৫) এই সময় মৃতের মাগফেরাতের জন্য দো‘আ করা ও তার সদগুণাবলী বর্ণনা করা উচিত। কেননা তাতে ফেরেশতাগণ ‘আমীন’ বলেন ও তার জন্য ওগুলি ওয়াজিব হয়ে যায়’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়’।[53] একটি বর্ণনায় এসেছে যে, ৪, ৩ এমনকি ২ জন নেককার মুমিন ব্যক্তিও যদি মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে উত্তম সাক্ষ্য দেয়, তাতেই তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।[54] অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘কোন মুসলমান মারা গেলে তার নিকটতম প্রতিবেশীদের চারজন যদি তার সম্পর্কে সাক্ষ্য দে