৩. সফরের ছালাত (الصلاة في السفر)

সফর অথবা ভীতির সময়ে ছালাতে ‘ক্বছর’ করার অনুমতি রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন-

وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوْا مِنَ الصَّلاَةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَّفْتِنَكُمُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا إِنَّ الْكَافِرِيْنَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوًّا مُبِِيْنًا- (النساء 101)-

অর্থ : ‘যখন তোমরা সফর কর, তখন তোমাদের ছালাতে ‘ক্বছর’ করায় কোন দোষ নেই। যদি তোমরা আশংকা কর যে, কাফেররা তোমাদেরকে উত্যক্ত করবে। নিশ্চয়ই কাফেররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (নিসা ৪/১০১)

‘ক্বছর’ অর্থ কমানো। পারিভাষিক অর্থে : চার রাক‘আত বিশিষ্ট ছালাত দু’রাক‘আত করে পড়াকে ‘ক্বছর’ বলে। মক্কা বিজয়ের সফরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ক্বছরের সাথে ছালাত আদায় করেন।[1] শান্তিপূর্ণ সফরে ক্বছর করতে হবে কি-না এ সম্পর্কে ওমর ফারূক (রাঃ)-এর এক প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, صَدَقَةٌ تَصَدَّقَ اللهُ بِهَا عَلَيْكُمْ فَاقْبَلُوْا صَدَقَتَهُ-‘আল্লাহ এটিকে তোমাদের জন্য ছাদাক্বা (উপঢৌকন) হিসাবে প্রদান করেছেন। অতএব তোমরা তা গ্রহণ কর’।[2] সফর অবশ্যই আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্যের সফর হ’তে হবে, গোনাহের সফর নয়’। [3]

সফরের দূরত্ব (مسافة السفر) :

সফরের দূরত্বের ব্যাপারে বিদ্বানগণের মধ্যে এক মাইল হ’তে ৪৮ মাইলের বিশ প্রকার বক্তব্য রয়েছে।[4] পবিত্র কুরআনে দূরত্বের কোন ব্যাখ্যা নেই। কেবল সফরের কথা আছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকেও এর কোন সীমা নির্দেশ করা হয়নি। [5] অতএব সফর হিসাবে গণ্য করা যায়, এরূপ সফরে বের হ’লে নিজ বাসস্থান থেকে বেরিয়ে কিছুদূর গেলেই ‘ক্বছর’ করা যায়। কোন কোন বিদ্বানের নিকটে সফরের নিয়ত করলে ঘর থেকেই ‘ক্বছর’ শুরু করা যায়। তবে ইবনুল মুনযির বলেন যে, সফরের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনা শহর ছেড়ে বের হয়ে যাওয়ার পূর্বে ‘ক্বছর’ করেছেন বলে আমি জানতে পারিনি’। তিনি বলেন, বিদ্বানগণ একমত হয়েছেন যে, সফরের নিয়তে বের হয়ে নিজ গ্রাম (বা মহল্লার) বাড়ীসমূহ অতিক্রম করলেই তিনি ক্বছর করতে পারেন।[6]

আমরা মনে করি যে, মতভেদ এড়ানোর জন্য ঘর থেকেই দু’ওয়াক্তের ফরয ছালাত ক্বছর ও সুন্নাত ছাড়াই পৃথক দুই এক্বামতের মাধ্যমে জমা করে সফরে বের হওয়া ভাল। তাবূকের অভিযানে রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবীগণ এটা করেছিলেন।[7]

আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ১৯ দিন (মক্কা বিজয় অথবা তাবূক অভিযানে) অবস্থানকালে ‘ক্বছর’ করেছেন। আমরাও তাই করি। তার বেশী হ’লে পুরা করি।[8] যদি কারু সফরের মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকে, তথাপি তিনি ‘ক্বছর’ করবেন, যতক্ষণ না তিনি সেখানে স্থায়ী বসবাসের সংকল্প করেন।[9] সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় ১৯ দিনের বেশী হ’লেও ‘ক্বছর’ করা যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাবূক অভিযানের সময় সেখানে ২০ দিন যাবৎ ‘ক্বছর’ করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) আযারবাইজান সফরে গেলে পুরা বরফের মৌসুমে সেখানে আটকে যান ও ছ’মাস যাবৎ ক্বছরের সাথে ছালাত আদায় করেন। অনুরূপভাবে হযরত আনাস (রাঃ) শাম বা সিরিয়া সফরে এসে দু’বছর সেখানে থাকেন ও ক্বছর করেন। [10]

অতএব স্থায়ী মুসাফির যেমন জাহায, বিমান, ট্রেন, বাস ইত্যাদির চালক ও কর্মচারীগণ সফর অবস্থায় সর্বদা ছালাতে ক্বছর করতে পারেন এবং তারা দু’ওয়াক্তের ছালাত জমা ও ক্বছর করতে পারেন।

মোটকথা ভীতি ও সফর অবস্থায় ‘ক্বছর’ করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সফরে সর্বদা ক্বছর করতেন। হযরত ওমর, আলী, ইবনু মাসঊদ, ইবনু আববাস (রাঃ) প্রমুখ সফরে ক্বছর করাকেই অগ্রাধিকার দিতেন।[11] হযরত ওছমান ও হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রথম দিকে ক্বছর করতেন ও পরে পুরা পড়তেন। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) জামা‘আতে পুরা পড়তেন ও একাকী ক্বছর করতেন।[12] কেননা আল্লাহ বলেন, ‘সফর অবস্থায় ছালাতে ‘ক্বছর’ করলে তোমাদের জন্য কোন গোনাহ নেই’ (নিসা ৪/ ১০১)

ছালাত জমা ও ক্বছর করা (الجمع بين الصلاتين والقصر) :

সফরে থাকা অবস্থায় যোহর-আছর (২+২=৪ রাক‘আত) ও মাগরিব-এশা (৩+২=৫ রাক‘আত) পৃথক এক্বামতের মাধ্যমে সুন্নাত ও নফল ছাড়াই জমা ও ক্বছর করে তাক্বদীম ও তাখীর দু’ভাবে পড়ার নিয়ম রয়েছে।[13] অর্থাৎ শেষের ওয়াক্তের ছালাত আগের ওয়াক্তের সাথে ‘তাক্বদীম’ করে অথবা আগের ওয়াক্তের ছালাত শেষের ওয়াক্তের সাথে ‘তাখীর’ করে একত্রে পড়বে।[14]

ভীতি ও ঝড়-বৃষ্টি ছাড়াও অন্য কোন বিশেষ শারঈ ওযর বশতঃ মুক্বীম অবস্থায়ও দু’ওয়াক্তের ছালাত ক্বছর ও সুন্নাত ছাড়াই একত্রে জমা করে পড়া যায়। যেমন যোহর ও আছর পৃথক এক্বামতের মাধ্যমে ৪+৪=৮(ثَمَانِيًا) এবং মাগরিব ও এশা অনুরূপভাবে ৩+৪=৭(سَبْعًا) রাক‘আত। ইবনু আববাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ’ল, এটা কেন? তিনি বললেন, যাতে উম্মতের কষ্ট না হয়’।[15]

ইস্তেহাযা বা প্রদর রোগগ্রস্ত মহিলা ও বহুমূত্রের রোগী বা অন্যান্য কঠিন রোগী, বাবুর্চী এবং কর্মব্যস্ত ভাই-বোনেরা মাঝে-মধ্যে বিশেষ ওযর বশতঃ সাময়িকভাবে এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন।[16]

হজ্জের সফরে আরাফাতের ময়দানে কোনরূপ সুন্নাত-নফল ছাড়াই যোহর ও আছর একত্রে (২+২) যোহরের আউয়াল ওয়াক্তে পৃথক এক্বামতে ‘জমা তাক্বদীম’ করে এবং মুযদালিফায় মাগরিব ও এশা একত্রে (৩+২) এশার সময় পৃথক এক্বামতে ‘জমা তাখীর’ করে জামা‘আতের সাথে অথবা একাকী পড়তে হয়। [17]

সফরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সুন্নাত সমূহ পড়তেন না। [18]

অবশ্য বিতর, তাহাজ্জুদ ও ফজরের দু’রাক‘আত সুন্নাত ছাড়তেন না। [19]

তবে সাধারণ নফল ছালাত যেমন তাহিইয়াতুল ওযূ, তাহিইয়াতুল মাসজিদ ইত্যাদি আদায়ে তিনি কাউকে নিষেধ করতেন না। [20]



[1] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৩৬ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১।

[2] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৩৩৫ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১।

[3] . মির‘আত ৪/৩৮১।

[4] . শাওকানী, নায়লুল আওত্বার ৪/১২২ পৃঃ; আলোচনা দ্রষ্টব্য, সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৬৩।

[5] . ইবনুল ক্বাইয়িম, যা-দুল মা‘আদ (বৈরুত: ১৪১৬/১৯৯৬) ১/৪৬৩ পৃঃ।

[6] . নায়লুল আওত্বার ৪/১২৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৩।

[7] . আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩৪৪ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১।

[8] . বুখারী ১/১৪৭, হা/৪২৯৮; ঐ, মিশকাত হা/১৩৩৭।

[9] . সাইয়িদ সাবিক্ব, ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৩।

[10] . মিরক্বাত ৩/২২১; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৩-১৪।

[11] . ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২৪/৯৮; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১২।

[12] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৪৭-৪৮ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১।

[13] . বুখারী, মিশকাত হা/১৩৩৯; আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩৪৪।

[14] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৫।

[15] .(أَرَادَ أَنْ لاَ يُحْرِجَ أُمَّتَهُ) বুখারী হা/১১৭৪ ‘তাহাজ্জুদ’ অধ্যায়-১৯, অনুচ্ছেদ-৩০; মুসলিম হা/১৬৩৩-৩৪; নায়লুল আওত্বার ৪/১৩৬; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৮।

[16] . নায়লুল আওত্বার ৪/১৩৬-৪০; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৭-১৮।

[17] . বুখারী, মিশকাত হা/২৬১৭, ২৬০৭ ‘হজ্জ’ অধ্যায়, ‘আরাফা ও মুযদালিফা থেকে প্রত্যাবর্তন’ অনুচ্ছেদ-৫; আহমাদ, মুসলিম, নাসাঈ, নায়ল ৪/১৪০।

[18] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৩৮ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৬।

[19] . ইবনুল ক্বাইয়িম, যা-দুল মা‘আদ ৩/৪৫৭ পৃঃ।

[20] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৪০; বুখারী হা/১১৫৯; নায়ল ৪/১৪২; যা-দুল মা‘আদ ১/৪৫৬।