২. তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ ( صلاة الليل)

রাত্রির বিশেষ নফল ছালাত তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ নামে পরিচিত। রামাযানে এশার পর প্রথম রাতে পড়লে তাকে ‘তারাবীহ’ এবং রামাযান ও অন্যান্য সময়ে শেষরাতে পড়লে তাকে ‘তাহাজ্জুদ’ বলা হয়।

তারাবীহ : মূল ধাতু رَاحَةٌ (রা-হাতুন) অর্থ : প্রশান্তি। অন্যতম ধাতু رَوْحٌ (রাওহুন) অর্থ : সন্ধ্যারাতে কোন কাজ করা। সেখান থেকে ترويحة (তারবীহাতুন) অর্থ : সন্ধ্যারাতের প্রশান্তি বা প্রশান্তির বৈঠক; যা রামাযান মাসে তারাবীহর ছালাতে প্রতি চার রাক‘আত শেষে করা হয়ে থাকে। বহুবচনে (التراويح) ‘তারা-বীহ’ অর্থ : প্রশান্তির বৈঠকসমূহ (আল-মুনজিদ)

তাহাজ্জুদ : মূল ধাতু هُجُوْدٌ (হুজূদুন) অর্থ : রাতে ঘুমানো বা ঘুম থেকে উঠা। সেখান থেকে تَهَجُّدٌ (তাহাজ্জুদুন) পারিভাষিক অর্থে রাত্রিতে ঘুম থেকে জেগে ওঠা বা রাত্রি জেগে ছালাত আদায় করা (আল-মুনজিদ)।

উল্লেখ্য যে, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ, ক্বিয়ামে রামাযান, ক্বিয়ামুল লায়েল সবকিছুকে এক কথায় ‘ছালাতুল লায়েল’ বা ‘রাত্রির নফল ছালাত’ বলা হয়। রামাযানে রাতের প্রথমাংশে যখন জামা‘আত সহ এই নফল ছালাতের প্রচলন হয়, তখন প্রতি চার রাক‘আত অন্তর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হ’ত। সেখান থেকে ‘তারাবীহ’ নামকরণ হয় (ফাৎহুল বারী, আল-ক্বামূসুল মুহীত্ব)। এই নামকরণের মধ্যেই তাৎপর্য নিহিত রয়েছে যে, তারাবীহ প্রথম রাতে একাকী অথবা জামা‘আত সহ এবং তাহাজ্জুদ শেষরাতে একাকী পড়তে হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযানের রাতে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ দু’টিই পড়েছেন মর্মে ছহীহ বা যঈফ সনদে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না’। [1]

রাত্রির ছালাতের ফযীলত : রাত্রির ছালাত বা ‘ছালাতুল লায়েল’ নফল হ’লেও তা খুবই ফযীলতপূর্ণ। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

أَفْضَلُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلاَةُ اللَّيْلِ، رَوَاهُ مُسْلِمٌ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ-

‘ফরয ছালাতের পরে সর্বোত্তম ছালাত হ’ল রাত্রির (নফল) ছালাত’।[2] তিনি আরও বলেন,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْآخِرُ فَيَقُوْلُ مَن يَّدْعُوْنِي فَأَسْتَجِيْبَ لَهُ، مَنْ يَّسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَن يَّسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ، مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ- وَفِىْ رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ عَنْهُ: فَلاَ يَزَالُ كَذَالِكَ حَتَّى يُضِيْئَ الْفَجْرُ-

‘আমাদের পালনকর্তা মহান আল্লাহ প্রতি রাতের তৃতীয় প্রহরে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কে আছ আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছ আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? এভাবে তিনি ফজর স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত আহবান করেন’। [3]

তারাবীহর জামা‘আত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযান মাসের ২৩, ২৫ ও ২৭ তিন রাত্রি মসজিদে জামা‘আতের সাথে তারাবীহর ছালাত আদায় করেছেন। প্রথম দিন রাত্রির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত, দ্বিতীয় দিন অর্ধ রাত্রি পর্যন্ত এবং তৃতীয় দিন নিজের স্ত্রী-পরিবার ও মুছল্লীদের নিয়ে সাহারীর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ছালাত আদায় করেন। [4] পরের রাতে মুছল্লীগণ তাঁর কক্ষের কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি যে, এটি তোমাদের উপর ফরয হয়ে যায় কি-না (خَشِيْتُ أَنْ يُّكْتَبَ عَلَيْكُمْ)। আর যদি ফরয হয়ে যায়, তাহ’লে তোমরা তা আদায় করতে পারবে না’...। [5]

তারাবীহর ফযীলত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‘যে ব্যক্তি রামাযানের রাত্রিতে ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রাত্রির ছালাত আদায় করে, তার বিগত সকল গোনাহ মাফ করা হয়’।[6]

তারাবীহর জামা‘আত ঈদের জামা‘আতের ন্যায় :

ইমাম শাফেঈ, আবু হানীফা, আহমাদ ও কিছু মালেকী বিদ্বান এবং অন্যান্য বিদ্বানগণ বলেন, তারাবীহর ছালাত জামা‘আতে পড়া উত্তম, যা ওমর (রাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরাম চালু করে গেছেন এবং এর উপরেই মুসলমানদের আমল জারি আছে। কেননা এটি ইসলামের প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহের (لأنه من الشعائر الظاهرة) অন্তর্ভুক্ত। যা ঈদায়নের ছালাতের সাথে সামঞ্জস্যশীল’।[7]

রাক‘আত সংখ্যা : রামাযান বা রামাযানের বাইরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে রাত্রির এই বিশেষ নফল ছালাত তিন রাক‘আত বিতরসহ ১১ রাক‘আত ছহীহ সূত্র সমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। যেমন আয়েশা (রাঃ) বলেন,

مَا كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزِيْدُ فِيْ رَمَضَانَ وَلاَ فِيْ غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُصَلِّيْ أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّيْ أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّيْ ثَلاَثًا، متفق عليه-

অর্থ : রামাযান বা রামাযানের বাইরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির ছালাত এগার রাক‘আতের বেশী আদায় করেননি। তিনি প্রথমে (২+২) [8] চার রাক‘আত পড়েন। তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি (২+২) চার রাক‘আত পড়েন। তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিন রাক‘আত পড়েন।[9]

বন্ধ হওয়ার পরে পুনরায় জামা‘আত চালু : সম্ভবত: নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী খেলাফতের উপরে আপতিত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে ১ম খলীফা হযরত আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর সংক্ষিপ্ত খেলাফতকালে (১১-১৩ হিঃ) তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করা সম্ভবপর হয়নি। ২য় খলীফা হযরত ওমর ফারূক (রাঃ) স্বীয় যুগে (১৩-২৩ হিঃ) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে এবং বহু সংখ্যক মুছল্লীকে মসজিদে বিক্ষিপ্তভাবে উক্ত ছালাত আদায় করতে দেখে রাসূল (ছাঃ)-এর রেখে যাওয়া সুন্নাত অনুসরণ করে তাঁর খেলাফতের ২য় বর্ষে ১৪ হিজরী সনে মসজিদে নববীতে ১১ রাক‘আতে তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করেন।[10] যেমন সায়েব বিন ইয়াযীদ (রাঃ) বলেন,

أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيْمًا الدَّارِيَّ أَنْ يَّقُوْمَا لِلنَّاسِ فِىْ رَمَضَانَ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً.... رواه في المؤطأ بإسناد صحيح-

‘খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হযরত উবাই ইবনু কা‘ব ও তামীম দারী (রাঃ)-কে রামাযানের রাত্রিতে ১১ রাক‘আত ছালাত জামা‘আত সহকারে আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেন। এই ছালাত(إلي فُرُوْعِ الْفَجْرِ) ফজরের প্রাক্কাল (সাহারীর পূর্ব) পর্যন্ত দীর্ঘ হ’ত’।[11]

বিশ রাক‘আত তারাবীহ : প্রকাশ থাকে যে, উক্ত রেওয়ায়াতের পরে ইয়াযীদ বিন রূমান থেকে ‘ওমরের যামানায় ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়া হ’ত’ বলে যে বর্ণনা এসেছে, তা ‘যঈফ’ এবং ২০ রাক‘আত সম্পর্কে ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে ‘মরফূ’ সূত্রে যে বর্ণনা এসেছে, তা ‘মওযূ’ বা জাল।[12] এতদ্ব্যতীত ২০ রাক‘আত তারাবীহ সম্পর্কে কয়েকটি ‘আছার’ এসেছে, যার সবগুলিই ‘যঈফ’।[13] ২০ রাক‘আত তারাবীহর উপরে ওমরের যামানায় ছাহাবীগণের মধ্যে ‘ইজমা’ বা ঐক্যমত হয়েছে বলে যে দাবী করা হয়, তা একেবারেই ভিত্তিহীন ও বাতিল কথা (بَاطِلَةٌ جِدًّا) মাত্র। [14] তিরমিযীর ভাষ্যকার খ্যাতনামা ভারতীয় হানাফী মনীষী দারুল উলূম দেউবন্দ-এর তৎকালীন সময়ের মুহতামিম (অধ্যক্ষ) আনোয়ার শাহ কাষ্মীরী (১২৯২-১৩৫২/১৮৭৫-১৯৩৩ খৃঃ) বলেন, একথা না মেনে উপায় নেই যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর তারাবীহ ৮ রাক‘আত ছিল। [15]

এটা স্পষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীন থেকে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর অন্য কোন স্ত্রী ও ছাহাবী থেকে ১১ বা ১৩ রাক‘আতের ঊর্ধ্বে তারাবীহ বা তাহাজ্জুদের কোন বিশুদ্ধ প্রমাণ নেই।[16] বর্ধিত রাক‘আত সমূহ পরবর্তীকালে সৃষ্ট। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির ছালাত ১১ বা ১৩ রাক‘আত আদায় করতেন। পরবর্তীকালে মদীনার লোকেরা দীর্ঘ ক্বিয়ামে দুর্বলতা বোধ করে। ফলে তারা রাক‘আত সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে, যা ৩৯ রাক‘আত পর্যন্ত পৌঁছে যায়’।[17] অথচ বাস্তব কথা এই যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) যেমন দীর্ঘ ক্বিয়াম ও ক্বিরাআতের মাধ্যমে তিন রাত জামা‘আতের সাথে তারাবীহর ছালাত আদায় করেছেন, তেমনি সংক্ষিপ্ত ক্বিয়ামেও তাহাজ্জুদের ছালাত আদায় করেছেন। যা সময় বিশেষে ৯, ৭ ও ৫ রাক‘আত হ’ত। কিন্তু তা কখনো ১১ বা ১৩ -এর ঊর্ধ্বে প্রমাণিত হয়নি।[18] তিনি ছিলেন ‘সৃষ্টিজগতের প্রতি রহমত স্বরূপ’ (আম্বিয়া ২১/১০৭) এবং বেশী না পড়াটা ছিল উম্মতের প্রতি তাঁর অন্যতম রহমত।

শৈথিল্যবাদ : অনেক বিদ্বান উদারতার নামে ‘বিষয়টি প্রশস্ত’ (الأمر واسع) বলে শৈথিল্য প্রদর্শন করেন এবং ২৩ রাক‘আত পড়েন ও বলেন শত রাক‘আতের বেশীও পড়া যাবে, যদি কেউ ইচ্ছা করে। দলীল হিসাবে ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীছটি পেশ করেন যে, ‘রাত্রির ছালাত দুই দুই (مَثْنَى مَثْنَى) করে। অতঃপর ফজর হয়ে যাবার আশংকা হ’লে এক রাক‘আত পড়। তাতে পিছনের সব ছালাত বিতরে (বেজোড়ে) পরিণত হবে’।[19] অত্র হাদীছে যেহেতু রাক‘আতের কোন সংখ্যাসীমা নেই এবং রাসূল (ছাঃ)-এর কথা তাঁর কাজের উপর অগ্রাধিকারযোগ্য, অতএব যত রাক‘আত খুশী পড়া যাবে। তবে তারা সবাই একথা বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ১১ রাক‘আত পড়েছেন এবং সেটা পড়াই উত্তম। অথচ উক্ত হাদীছের অর্থ হ’ল, রাত্রির নফল ছালাত (দিনের ন্যায়) চার-চার নয়, বরং দুই-দুই রাক‘আত করে। [20] তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা ছালাত

আদায় কর, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ’।[21] এ কথার মধ্যে তাঁর ছালাতের ধরন ও রাক‘আত সংখ্যা সবই গণ্য। তাঁর উপরোক্ত কথার ব্যাখ্যা হ’ল তাঁর কর্ম, অর্থাৎ ১১ রাক‘আত ছালাত। অতএব ইবাদত বিষয়ে তাঁর কথা ও কর্মে বৈপরীত্য ছিল, এরূপ ধারণা নিতান্তই অবাস্তব।

এক্ষণে যখন সকল বিদ্বান এ বিষয়ে একমত যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ১১ রাক‘আত পড়তেন এবং কখনো এর ঊর্ধ্বে পড়েননি এবং এটা পড়াই উত্তম, তখন তারা কেন ১১ রাক‘আতের উপর আমলের ব্যাপারে একমত হ’তে পারেন না? কেন তারা শতাধিক রাক‘আত পড়ার ব্যাপারে উদারতা দেখিয়ে ফের ২৩ রাক‘আতে সীমাবদ্ধ থাকেন? এটা উম্মতকে ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত রাখার নামান্তর বৈ-কি!

এক্ষণে যদি কেউ রাতে অধিক ইবাদত করতে চান এবং কুরআন অধিক মুখস্থ না থাকে, তাহ’লে দীর্ঘ রুকূ ও সুজূদ সহ ১১ রাক‘আত তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ শেষ করে দীর্ঘক্ষণ ধরে তাসবীহ ও কুরআন তিলাওয়াতে রত থাকতে পারেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও অধিক ছওয়াবের কাজ। এছাড়াও রয়েছে যেকোন সাধারণ নফল ছালাত আদায়ের সুযোগ। যেমন ছালাতুল হাজত, ছালাতুত তাওবাহ, তাহিইয়াতুল ওযূ, তাহিইয়াতুল মাসজিদ ইত্যাদি।

অতএব রাতের নফল ছালাত ১১ বা ১৩ রাক‘আতই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও সর্বোত্তম। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রতি দু’রাক‘আত অন্তর সালাম ফিরিয়ে আট রাক‘আত তারাবীহ শেষে কখনও এক, কখনও তিন, কখনও পাঁচ রাক‘আত বিতর এক সালামে পড়তেন। [22] জেনে রাখা ভাল যে, রাক‘আত গণনার চেয়ে ছালাতের খুশূ-খুযূ ও দীর্ঘ সময় ক্বিয়াম, কু‘ঊদ, রুকূ, সুজূদ অধিক যরূরী। যা আজকের মুসলিম সমাজে প্রায় লোপ পেতে বসেছে। ফলে রাত্রির নিভৃত ছালাতের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

জামা‘আতে তারাবীহ কি বিদ‘আত?

রামাযানের প্রতি রাতে নিয়মিত জামা‘আতে তারাবীহ পড়াকে অনেকে বিদ‘আত মনে করেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাত্র তিনদিন জামা‘আতে তারাবীহ পড়েছিলেন [23] এবং ওমর ফারূক (রাঃ) নিয়মিত জামা‘আতে তারাবীহ চালু করার পরে একে ‘সুন্দর বিদ‘আত’(نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هٰذِهِ) বলেছিলেন।[24] এর জবাব এই যে, ওমর ফারূক (রাঃ) এটিকে আভিধানিক অর্থে বিদ‘আত বলেছিলেন, শারঈ অর্থে নয়। কেননা শারঈ বিদ‘আত সর্বতোভাবেই ভ্রষ্টতা। যার পরিণাম জাহান্নাম। তিনি এজন্য বিদ‘আত বলেন যে, এটিকে রাসূল (ছাঃ) কায়েম করার পরে ফরয হওয়ার আশংকায় পরিত্যাগ করেন।[25] আবুবকর (রাঃ) পুনরায় চালু করেননি। অতঃপর দীর্ঘ বিরতির পরে চালু হওয়ায় বাহ্যিক কারণে তিনি এটাকে ‘কতই না সুন্দর বিদ‘আত’ অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর পরে পুনঃপ্রচলন বলে প্রশংসা করেন।[26]

এক নযরে রাতের নফল ছালাতের নিয়ম সমূহ :

(১) ১১ রাক‘আত : দুই দুই করে ৮ রাক‘আত। অতঃপর তিন রাক‘আত পড়ে শেষ বৈঠক করবে।[27] রামাযান ও অন্য সময়ে এটা ছিল রাসূলূল্লাহ (ছাঃ) -এর অধিকাংশ রাতের আমল।

(২) ১১ রাক‘আত : দুই দুই করে মোট ১০ রাক‘আত। অতঃপর এক রাক‘আত বিতর।[28]

(৩) ১৩ রাক‘আত : দুই দুই করে ৮ রাক‘আত। অতঃপর একটানা পাঁচ রাক‘আত বিতর। অথবা দুই দুই করে ১০ রাক‘আত, অতঃপর ৩ রাক‘আত বিতর। অথবা দুই দুই করে ১২ রাক‘আত, অতঃপর ১ রাক‘আত বিতর।[29]

(৪) ৯ রাক‘আত : একটানা ৮ রাক‘আত পড়ে প্রথম বৈঠক ও নবম রাক‘আতে শেষ বৈঠক। অথবা দুই দুই করে ৬ রাক‘আত। অতঃপর তিন রাক‘আত বিতর। অথবা দুই দুই করে ৮ রাক‘আত। অতঃপর ১ রাক‘আত বিতর।[30]

(৫) ৭ রাক‘আত : একটানা ৬ রাক‘আত পড়ে প্রথম বৈঠক ও সপ্তম রাক‘আতে শেষ বৈঠক। অথবা দুই দুই করে ৪ রাক‘আত। অতঃপর ৩ রাক‘আত বিতর। অথবা দুই দুই করে ৬ রাক‘আত। অতঃপর এক রাক‘আত বিতর।[31]

(৬) ৫ রাক‘আত : একটানা ৫ রাক‘আত বিতর অথবা দুই দুই করে ৪ রাক‘আত। অতঃপর এক রাক‘আত বিতর।[32]

ইমাম মুহাম্মাদ বিন নছর আল-মারওয়াযী বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে একটানা একাধিক রাক‘আত বিতর পড়ার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু দুই দুই রাক‘আত পড়ে সালাম ফিরানো ও শেষে এক রাক‘আত-এর মাধ্যমে বিতর করাকেই আমরা উত্তম মনে করি। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক প্রশ্নকারীকে এধরনের জবাবই দিয়েছিলেন যে, ‘রাতের ছালাত দুই দুই। অতঃপর যখন তুমি ফজর হয়ে যাবার আশংকা করবে, তখন এক রাক‘আত পড়ে নাও, যা তোমার পিছনের সব ছালাতকে বিতরে পরিণত করবে’। [33]

উপরের ৬টি নিয়মের মধ্যে প্রথমটি কেবল তিনি তারাবীহ ও তাহাজ্জুদে পড়েছেন। বাকীগুলি বিভিন্ন সময় তাহাজ্জুদে পড়েছেন। বৃদ্ধাবস্থায় কিংবা সময় কম থাকলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনো কখনো কমসংখ্যক রাক‘আতে তাহাজ্জুদ পড়তেন। উম্মতের জন্য এটি বিশেষ অনুগ্রহ বটে। বৃদ্ধকালে ভারী হয়ে যাওয়ায় তিনি অধিকাংশ (রাতের নফল) ছালাত বসে বসে পড়তেন।[34]

এক্ষণে ২৩, ২৫ ও ২৭শে রামাযানের যে বেজোড় তিন রাত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জামা‘আত সহ তারাবীহ পড়েছিলেন, সে তিন রাত কত রাক‘আত পড়েছিলেন? জবাব এই যে, সেটা ছিল আট রাক‘আত তারাবীহ ও বাকীটা বিতর। যেমন হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে-

صَلَّى بِنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْ شَهْرِ رَمَضَانَ ثَمَانَ رَكْعَاتٍ وَالْوِتْرَ-

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের নিয়ে রামাযানে ছালাত আদায় করলেন আট রাক‘আত এবং বিতর পড়লেন।[35]

জাবের (রাঃ) বর্ণিত উক্ত হাদীছে বিতরের রাক‘আত সংখ্যা বলা হয়নি। কিন্তু আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের শেষে স্পষ্টভাবে তিন রাক‘আত বিতরের কথা এসেছে, যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।[36] অতএব ৮+৩=১১ রাক‘আত তারাবীহ জামা‘আত সহকারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাত হিসাবে সাব্যস্ত হয়। হযরত ওমর (রাঃ) সেটাই পুনরায় চালু করেছিলেন। তিনি মোর্দা সুন্নাত যেন্দা করেছিলেন। তিনি ‘সুন্নাতে হাসানাহ’ করেছিলেন, ‘বিদ‘আতে হাসানাহ’ করেননি। কেননা শারঈ বিদ‘আত সবটুকু ভ্রষ্টতা। সেখানে ভাল-মন্দ ভাগ নেই। বরং শারঈ বিদ‘আতকে ‘হাসানাহ’ ও ‘সাইয়েআহ’ দু’ভাগে ভাগ করাটাই আরেকটি বিদ‘আত। আল্লাহ আমাদেরকে বিদ‘আত হ’তে রক্ষা করুন!

উল্লেখ্য যে, হাদীছে বিতর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ‘যখন তুমি ফজর হয়ে যাবার আশংকা করবে, তখন এক রাক‘আত পড়ে নাও। তাহ’লে পিছনের ছালাত গুলি বিতরে পরিণত হবে’।[37] এতে বুঝা যায় যে, একটানা বা দুই দুই করে পড়লেও সেটা শেষের এক রাক‘আতের মাধ্যমে বিতরে পরিণত হবে। [38] আর একারণেই ইমাম হাকেম (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে ১৩, ১১, ৯, ৭, ৫, ৩, ও ১ রাক‘আত বিতর প্রমাণিত আছে। তবে সবচেয়ে বিশুদ্ধতর হ’ল এক রাক‘আত।[39] অর্থাৎ তারাবীহ ও বিতর পৃথক নয়। বরং শেষে এক রাক‘আত যোগ করলে সবটাকেই ‘বিতর’ বলা যায় ও সবটাকেই ‘ছালাতুল লায়েল’ বা ‘রাতের ছালাত’ বলা যায়।

রাত্রির ছালাত সম্পর্কে জ্ঞাতব্য (معلومات في صلاة الليل) :

(১) শেষ রাতে তাহাজ্জুদে উঠে প্রথমে হালকাভাবে দু’রাক‘আত পড়বে। অতঃপর বাকী ছালাত পড়বে।[40] (২) যদি কেউ প্রথম রাতে এশার পরে বিতর পড়ে ঘুমিয়ে যায়, তবে শেষ রাতে উঠে দু’রাক‘আত করে তাহাজ্জুদ পড়বে। শেষে আর বিতর পড়তে হবে না। কেননা এক রাতে দুই বিতর চলে না।[41] (৩) বিতর ক্বাযা হয়ে গেলে সকালে অথবা যখন স্মরণ বা সুযোগ হবে, তখন পড়বে’। [42] এটি ‘মুবাহ’ (ইচ্ছাধীন, বাধ্যতামূলক নয়)।[43] (৪) তাহাজ্জুদ বা বিতর ক্বাযা হয়ে গেলে ‘উবাদাহ বিন ছামিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ, আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস প্রমুখ ছাহাবীগণ ফজর ছালাতের আগে তা আদায় করে নিতেন। [44] (৫) বিতর পড়ে শুয়ে গেলে এবং ঘুম অথবা ব্যথার আধিক্যের কারণে তাহাজ্জুদ পড়তে না পারলে রাসূল (ছাঃ) দিনের বেলায় (সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে) ১২ রাক‘আত পড়েছেন (তন্মধ্যে তাহাজ্জুদের ৮ রাক‘আত ও ছালাতুয যোহা ৪ রাক‘আত)। [45] (৬) যদি কেউ আগ রাতে বিতরের পর দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করে এবং শেষরাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে সক্ষম না হয়, তাহ’লে উক্ত দু’রাক‘আত তার জন্য যথেষ্ট হবে’।[46] (৭) ‘যদি কেউ তাহাজ্জুদের নিয়তে শুয়ে গেলেও উঠতে না পারে, তাহ’লে সে উত্তম নিয়তের কারণে পূর্ণ নেকী পাবে এবং উক্ত ঘুম তার জন্য ছাদাক্বা হবে’।[47] ‘যদি কেউ পীড়িত হয় বা সফরে থাকে, তাহ’লে বাড়ীতে সুস্থ অবস্থায় সে যে নেক আমল করত, সেইরূপ ছওয়াব তার জন্য লেখা হবে’।[48] আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে অব্যাহত পুরস্কার’। [49] (৮) রাতের নফল ছালাত নিয়মিত আদায় করা উচিত। কেননা ‘যেকোন নেক আমল তা যত কমই হৌক, নিয়মিত করাই আল্লাহর নিকট অধিক পসন্দনীয়’।[50] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তুমি ঐ ব্যক্তির মত হয়ো না, যে রাতের নফল ছালাতে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু পরে ছেড়ে দিয়েছে’।[51] তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ ঐ স্বামী-স্ত্রীর উপর রহম করুন, যারা তাহাজ্জুদে ওঠার জন্য পরস্পরের মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়, যদি একজন আপত্তি করে’।[52] (৯) তাহাজ্জুদের ক্বিরাআত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনো সশব্দে কখনো নিঃশব্দে পড়েছেন।[53] তিনি বলেন, সরবে ও নীরবে পাঠকারী প্রকাশ্যে ও গোপনে ছাদাক্বাকারীর ন্যায়।[54] তিনি আবুবকর (রাঃ)-কে কিছুটা জোরে এবং ওমর (রাঃ)-কে কিছুটা আস্তে ক্বিরাআত করার উপদেশ দেন।[55] (১০) তারাবীহর জন্য নির্দিষ্ট কোন দো‘আ নেই। তবে শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলিতে পড়ার জন্য আয়েশা (রাঃ)-কে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বিশেষ একটি দো‘আ শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেটি হ’ল, اَللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْআল্লা-হুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউভুন তোহেববুল ‘আফ্ওয়া ফা‘ফু ‘আন্নী’ (হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল। তুমি ক্ষমা করতে ভালবাস। অতএব আমাকে ক্ষমা কর)। [56] (১১) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা মনের প্রফুল্লতা নিয়ে ছালাত আদায় কর এবং সাধ্যমত নেক আমল কর, বিরক্তি বোধ না করা পর্যন্ত’।[57] (১২) মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি জানিনা যে, আল্লাহর নবী (ছাঃ) কখনো এক রাত্রিতে সমস্ত কুরআন খতম করেছেন কিংবা ফজর অবধি সারা রাত্রি ব্যাপী (নফল) ছালাত আদায় করেছেন।[58]

তাহাজ্জুদে উঠে দো‘আ ( ما يقول إذا قام من الليل) :

(ক) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ রাত্রে জাগ্রত হয় ও নিম্নের দো‘আ পাঠ করে এবং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, তা কবুল করা হয়। আর যদি সে ওযূ করে এবং ছালাত আদায় করে, সেই ছালাত কবুল করা হয়’। দো‘আটি হ’ল :

لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لآ شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ، سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ ِللهِ وَلآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ وَلآ حَوْلَ وَلآ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ-

উচ্চারণ : লা ইলা-হা ইল্ল