প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা

হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/১) : মৌসুমে ইট আগাম কিনে রেখে অন্য সময়ে তা বেশী দামে বিক্রয় করা এবং খাদ্যদ্রব্য যেমন ধান-চাল, আলু- পিঁয়াজ ইত্যাদি স্টক রেখে পরে তা বিক্রয় করা যাবে কি? এছাড়া মাছ চাষের সময় টাকা বিনিয়োগ করে পরে মাছ বিক্রয়ের সময় মনপ্রতি কিছু টাকা লাভ নেওয়া জায়েয হবে কি?

-মুহসিন আলী

দৌলতপুর, কুষ্টিয়া।

উত্তর : ইট খাদ্যদ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং এতে ইহতিকার হয় না। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অধিক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করাই হ’ল ‘ইহতেকার’, যা হারাম। মা‘মার (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি বেশী দামের আশায় সম্পদ জমা রাখে সে গুনাহগার (মুসলিম হা/১৬০৫, আবুদাঊদ হা/৩৪৪৭)। তবে সাধারণভাবে উৎপাদনের মৌসুমে হরাসপ্রাপ্ত মূল্যে খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে অন্য মৌসুমে প্রচলিত বাজার মূল্যে বিক্রয় করায় কোন দোষ নেই। কেননা খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হ’লে তা জায়েয (আউনুল মা‘বূদ ৫/২২৬-২২৮ পৃ, ‘ইহতেকার নিষিদ্ধ’ অনুচ্ছেদ; নায়ল, ৫/২২২ পৃঃ, ‘ইহতেকার’ অনুচ্ছেদ)

আর মাছ চাষের ক্ষেত্রে যদি ‘মুযারাবা’ পদ্ধতিতে একজনের অর্থে অপরজন ব্যবসা করে এবং লভ্যাংশ চুক্তি অনুপাতে উভয়ের মধ্যে বণ্টিত হয়, তবে তা জায়েয (আবুদাঊদ হা/৪৮৩৬; সনদ ছহীহ, নায়ল হা/২৩৩৪-৩৫)

প্রশ্ন (২/২) : মাযার কেন্দ্রিক মসজিদে ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-হাফেয আনীসুর রহমান, হারাগাছ, রংপুর।

উত্তর : মাযার কেন্দ্রিক মসজিদে ছালাত আদায় করা যাবে না। কারণ এর উদ্দেশ্যই হ’ল শিরকের প্রতি মুছল্লীদের প্রলুব্ধ করা ও তাদেরকে মাযারমুখী করা। জানা-অজানা কবর ও ভুয়া কবর নিয়েই বহু স্থানে মাযার নাম দিয়ে নযর-নেয়ায ও ওরসের জমজমাট ব্যবসা চলছে। আর এইসব স্থানে দ্বীনদার মানুষকে আকর্ষণ করার জন্য বানানো হয় মসজিদ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগে কুফরীর উদ্দেশ্যে মুনাফিকরা ক্বোবায় একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল, যা ‘মসজিদে যেরার’ নামে খ্যাত (তওবা ৯/১০৭)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশে সেই মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ যুগের এইসব মসজিদ শিরকের উদ্দেশ্যে নির্মিত। অতএব এখানে ছালাত জায়েয হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কবরের দিকে ফিরে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন (মুসলিম হা/৯৭২)

প্রশ্ন (৩/৩) : আমাদের সমাজে কিছু মানুষ ফিৎরার খাতসমূহে বণ্টন শেষে ১টি অংশ নিজ আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বণ্টন করে। এটা জায়েয হবে কি?

-সিরাজুল ইসলাম

সারদা, রাজশাহী।

উত্তর : খাতসমূহের মধ্যে হকদার গরীব আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও বণ্টন করবে। এতে কোন দোষ নেই। এছাড়া সেখান থেকে সারা বছরের জন্য স্থানীয় বায়তুল মাল ফান্ডে যেটা রাখা হবে, তা থেকেও প্রয়োজনে অন্যান্য হকদারগণের ন্যায় তারাও পাবেন। উল্লেখ্য যে, আত্মীয়-স্বজন হকদার না হ’লে তাদের মাঝে ফিৎরা বণ্টন করা যাবে না (আবুদাঊদ হা/১৬০৯)

প্রশ্ন (৪/৪) : একজন শরী‘আত সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি কোন বিষয়ে দু’জন আলেমের নিকটে দু’রকম মাসআলা পেলে তার জন্য করণীয় কি হবে?

-নাছির রায়হান

হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

উত্তর : ফৎওয়া গ্রহণের ক্ষেত্রে সকল স্তরের মানুষের জন্য যরূরী হ’ল, দলীল জেনে নেওয়া। ছাহাবীগণ একটি বিষয়ে একাধিক ছাহাবীর কাছে জানতেন (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১১৫) এবং পরস্পরের নিকট দলীলও চাইতেন (তিরমিযী, মিশকাত হা/৩৫৫৪)। তবে দলীল বুঝার ক্ষমতা না থাকলে যিনি যিদ ও হঠকারিতা থেকে মুক্ত এবং যিনি পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী ফৎওয়া দেন, সেইরূপ যোগ্য ও আল্লাহভীরু আলেমের নিকট থেকে ফৎওয়া গ্রহণ করতে হবে। এরপরেও এরূপ আলেম যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দলীলবিহীন ফৎওয়া দেন, তাহ’লে তার পাপ তার উপরেই বর্তাবে (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/২৪২)

উল্লেখ্য যে, প্রত্যেক আলেমের কর্তব্য হ’ল জেনে-শুনে যাচাই-বাছাই করে ছহীহ দলীলভিত্তিক ফৎওয়া দেওয়া। আর জানা না থাকলে ‘আল্লাহ ভালো জানেন’ বলা (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৭২)। ইমাম মালেক (রহঃ) দুই-তৃতীয়াংশ ফৎওয়ার ক্ষেত্রে না জানার ওযর পেশ করেছেন। তিনি বলতেন, ‘আলেমের রক্ষাকবচ হ’ল ‘আমি জানি না বলা’। যদি সে এ রক্ষাকবচ ব্যবহারে গাফেল হয়, তাহ’লে সে ধ্বংসে নিক্ষিপ্ত হবে’ (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৭/১৬৭)

প্রশ্ন (৫/৫) : জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাসে ব্যাঙ কেটে পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু শুনেছি এ প্রাণীকে এভাবে হত্যা করা গোনাহের কাজ। এক্ষণে করণীয় কি?

-নুছরাত সাকী ইউহা

সাতকানিয়া সরকারী কলেজ, চট্টগ্রাম।

উত্তর : জীববিজ্ঞানের পড়াশুনার জন্য ব্যাঙ কেটে পরীক্ষা করা জায়েয নয়। কারণ রাসূল (ছাঃ) ব্যাঙ মারতে নিষেধ করেছেন এমনকি ঔষধের প্রয়োজনেও তিনি তা নিষেধ করেছেন। আব্দুর রহমান বিন ওছমান (রাঃ) বলেন, একদা জনৈক ডাক্তার ঔষধ হিসাবে ব্যাঙের ব্যবহার সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে ব্যাঙ মারতে নিষেধ করেন (আবুদাউদ, মিশকাত হা/৪৫৪৫)। প্রয়োজনে একই জাতীয় অন্য প্রাণীর সাহায্য নিবে।

প্রশ্ন (৬/৬) : আমি একজন মুওয়াযযিন। আমার দুই স্ত্রী এবং ৫ ছেলে ও ২ মেয়ে আছে। সম্পদের ৪ ভাগের ৩ ভাগ আমি ছেলেমেয়েদের মাঝে হেবা বিল এওয়ায মোতাবেক বণ্টন করেছি। কিন্তু ইমাম ছাহেব বলছেন, মালিক জীবিত অবস্থায় বণ্টন করা জায়েয নয়। তাই তা ফেরত না নিলে চাকুরী করা যাবে না। এক্ষণে আমার করণীয় কি?

-আব্দুল জাববার

আত্রাই, নওগাঁ।

উত্তর : উত্তরাধিকার সম্পদ মৃত্যুর পরে বণ্টন হওয়াই শরী‘আত নির্দেশিত বিধান, যা সকলের জন্য কল্যাণকর। তবে মৃত্যুর পূর্বে পিতা সন্তানদের মাঝে কিছু বণ্টন করতে পারেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে সকলকে সমানভাবে প্রদান করতে হবে। একদা নু‘মান বিন বাশীর (রাঃ) তার এক ছেলেকে একটি গোলাম দান করার ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ)-কে জানালে তিনি তাকে তার অন্য ছেলেদের একই সমান প্রদানের নির্দেশ দেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩০১৯)। অতএব জীবিত অবস্থায় শরী‘আত মোতাবেক হকদারকে কিছু সম্পদ প্রদান করা জায়েয। এজন্য মুওয়াযযিনকে চাকুরী থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কোন কারণ নেই।

প্রশ্ন (৭/৭) : ফেরেশতাগণকে জিবরীল, আযরাঈল, মিকাঈল ইত্যাদি নামে নামকরণ করার বিষয়টি কি কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত? যেমন মালাকুল মাউতকে আযরাঈল বলা ইত্যাদি।

-আশরাফ হাসাইন, দোগাছী, পাবনা।

উত্তর : ফেরেশতাগণের নামগুলি কুরআন এবং ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। জিবরীল এবং মীকাঈলের নাম কুরআনে বর্ণিত হয়েছে (বাক্বারাহ ৯৮)। কুরআনে মীকাল আসলেও হাদীছে মীকাঈল শব্দে এসেছে (বুখারী হা/৩২৩৬)। এছাড়া ইসরাফীলের নাম হাদীছে পাওয়া যায় (মুসলিম হা/৭৭০, মিশকাত হা/১২১২)।  আর যে ফেরেশতা জান কবয করেন তার নাম মালাকুল মাঊত (সাজদাহ ১১)। ক্বিয়ামতের প্রাক্কালে যিনি সিংগায় ফুঁক দিবেন তার নাম ইসরাফীল (ইবনু কাছীর, সূরা বাক্বারাহ ৯৮ আয়াতের ব্যাখ্যা)। যারা কবরে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তাদের নাম মুনকার এবং নাকীর (তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩০)। আব্দুর রহমান বিন সাবাত্ব বলেন, দুনিয়াবী কর্মসমূহ পরিচালনা করেন চার জন ফেরেশতা। জিব্রীল, মীকাঈল, মালাকুল মাঊত যার নাম আযরাঈল এবং ইস্রাফীল (কুরতুবী, তাফসীর সূরা নাযে‘আত ৭৯/৫)। তিনি বলেন, মালাকুল মউতের নাম হ’ল আযরাঈল। যার অর্থ আব্দুল্লাহ (কুরতুবী, শাওকানী, আয়সারুত তাফাসীর, তাফসীর সূরা সাজদাহ ৩২/১১)। তবে আলবানী (রহঃ) বলেন, ‘মালাকুল মাঊত’ কুরআনে বর্ণিত নাম। কিন্তু মানুষের মাঝে প্রচলিত তার ‘আযরাঈল’ নামকরণের কোন শারঈ ভিত্তি নেই। এটা ইসরাঈলী বর্ণনা মাত্র (আলবানী, তা‘লীক্ব ‘আলাত তাহাবী পৃঃ ৭২)

প্রশ্ন (৮/৮) : দাঁত পড়ে যাওয়া পশু কুরবানী করা যাবে কি?

-আব্দুল আহাদ

তানোর, রাজশাহী।

উত্তর: রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মোট চার ধরণের পশু কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন। যথা  স্পষ্ট খোঁড়া, স্পষ্ট কানা, স্পষ্ট রোগী ও জীর্ণ-শীর্ণ (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৪৬৫)। হাতমা (الْهَتْمَاءُ) অর্থাৎ কিছু দাঁত পড়ে যাওয়া পশু এর অন্তর্ভুক্ত নয়। অতএব এরূপ পশু কুরাবানী করায় কোন বাধা নেই। তবে নিখুঁত ও সুন্দর পশু ক্রয় করাই উত্তম (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনু তায়মিয়াহ ২৬/৩০৮; উছায়মীন, শারহুল মুমতে‘ ৭/৪৩২)

প্রশ্ন (৯/৯) : টয়লেট সহ বাথরুমে ওযু করার পর ওযুর দো‘আ পাঠ করা যাবে কি? না বাইরে এসে দো‘আ পড়তে হবে?

-মা‘ছূম

জঙ্গীপুর, মুর্শিদাবাদ, ভারত।

উত্তর : টয়লেটের ভিতরে উক্ত দো‘আ পাঠে বাধা নেই। কেবল পেশাব-পায়খানারত অবস্থায় দো‘আ সহ সকল প্রকার যিকির থেকে বিরত থাকবে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৩৫)। সাধারণভাবে বাথরুমে দো‘আ পড়া যাবে। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকর করতেন’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৫৬)

প্রশ্ন (১০/১০) : মোবাইলে বা কম্পিউটারে দেখে কুরআন পাঠ করা যাবে কি? করা গেলেও পূর্ণ নেকী লাভ করা যাবে কি?

-রবীউল ইসলাম তাজ, সিলেট।

উত্তর : যাবে। এতে পূর্ণ নেকীও অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব হ’তে একটি হরফ পাঠ করবে তার জন্য দশটি নেকী রয়েছে (তিরমিযী হা/২৯১০; মিশকাত হা/২১৩৭)। অতএব মুখস্ত হৌক, মুছহাফ দেখে হৌক আর কম্পিউটারে দেখে হৌক, সবক্ষেত্রেই সমান নেকী অর্জিত হবে। আর মুছহাফ দেখে কুরআন পাঠের বিশেষ ফযীলত মর্মে বর্ণিত হাদীছগুলি যঈফ ও জাল (সিলসিলা যঈফাহ হা/৩৫৬, ১৫৮৬; যঈফুল জামে‘ হা/২৮৫৫)

প্রশ্ন (১১/১১) : মোযা টাখনুর উপর পর্যন্ত পরা থাকলে প্যান্ট টাখনুর নীচে পরা যাবে কি?

-মুনীর খান

পীরগঞ্জ, রংপুর।

উত্তর : যাবে না। কারণ উভয়ের বিধান পৃথক। শরী‘আতে মোযা পরিধান সিদ্ধ (তিরমিযী হা/২৮২০; মিশকাত হা/৪৪১৮)। কিন্তু টাখনুর নীচে কাপড় পরা হারাম। টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরলে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না, তার সাথে কথা বলবেন না এবং তাকে (গোনাহ থেকে) পবিত্রও করবেন না (মুসলিম, মিশকাত হা/২৭৯৫, ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন টাখনুর নীচে কাপড় যতটুকু যাবে, ততটুকু জাহান্নামে পুড়বে’ (বুখারী, মিশকাত হা/৪৩১৪)। অতএব সর্বাবস্থায় এ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

প্রশ্ন (১২/১২) : আমি একটি মসজিদের বেতনভুক মুওয়াযযিন। কিন্ত কর্মব্যস্ততার কারণে যোহর ও আছরের ছালাতে আযান দিতে পারি না। এজন্য আমি দায়ী হব কি?

-রফীকুল ইসলাম

বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই ক্বিয়ামতের দিন স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৮৫, ‘নেতৃত্ব ও পদ মর্যাদা’ অধ্যায়)। সুতরাং কৌশলে বা অবাধ্য হয়ে এরূপ করলে অবশ্যই গুনাহগার হ’তে হবে। আর যদি বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে হয়ে থাকে তবে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন (১৩/১৩) : ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদি শস্য চাষের জমিতে আগে ওশর দিতাম। বর্তমানে পুকুর কেটে মাছ এবং কলার চাষ করছি। এক্ষণে এই ফসলের ওশর বা যাকাত আদায় করব কিভাবে?

-যাকির হোসাইন, গুরুদাসপুর, নাটোর।

উত্তর : মাছ বা কলার শরী‘আত নির্ধারিত কোন যাকাত নেই। তবে উভয়টিই যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে করা হয় তবে বছর শেষে মূলধন ও লভ্যাংশ হিসাব করে নিছাব পরিমাণ হলে তা থেকে শতকরা আড়াই টাকা হারে যাকাত আদায় করতে হবে।

প্রশ্ন (১৪/১৪) : সূরা ফজর ২ আয়াতের ব্যাখ্যা জানতে চাই।

-ফাহীমা, কেঁড়াগাছি, সাতক্ষীরা।

উত্তর : আয়াতটির অর্থ হ’ল- আর ‘শপথ দশ রাত্রির’। ইবনু আববাস, ইবনু যুবায়ের, মুজাহিদ, সুদ্দী, কালবী প্রমুখ বিগত ও পরবর্তী যুগের অধিকাংশ বিদ্বান এর দ্বারা যুলহিজ্জাহর প্রথম দশদিন অর্থ নিয়েছেন। তবে কেউ কেউ রামাযানের শেষ দশকের কথাও বলেছেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘এই দশদিনের (অর্থাৎ যুলহিজ্জাহর প্রথম দশদিনের) আমলের চাইতে প্রিয়তর কোন আমল আল্লাহর কাছে নেই। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি নয়’? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে ঐ ব্যক্তি, যে স্বীয় জান ও মাল নিয়ে জিহাদে বেরিয়েছে। কিন্তু কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি’। অর্থাৎ শহীদ হয়ে গেছে (বুখারী হা/৯৬৯; তিরমিযী হা/৭৫৭; ইবনু মাজাহ হা/১৭২৭; মিশকাত হা/১৪৬০; দ্রঃ তাফসীরুল কুরআন ৩০তম পারা ২৭১ পৃঃ)

প্রশ্ন (১৫/১৫) : তাল গাছের রস বা লালি খাওয়া যাবে কি?

-আবুল কাসেম

বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : মাদকতা না আসা পর্যন্ত তাল গাছের রস পানে বাধা নেই। যা মাদকতা সৃষ্টি করে কেবল সেটি হারাম (মুসলিম হা/২০২০৩; মিশকাত হা/৩৬৩৮; ছহীহাহ হা/২০৩৯)। সাধারণতঃ তাযা রসে মাদকতা থাকেনা। কিন্তু তা রোদ্রের তাপ পেলে তাতে মাদকতা আসতে পারে। যখন মাদকতা আসবে তখন হারাম। তবে তালের লালি খাওয়াতে কোন বাধা নেই। কারণ তাতে কোন মাদকতা সৃষ্টি করে না।

প্রশ্ন (১৬/১৬) : দুধ বা কোন খাবারে বিড়াল মুখ দিলে উক্ত খাবার খাওয়া যাবে কি?

-তাওহীদ, নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তর : উক্ত খাবার খাওয়া যাবে। তবে রুচি না হলে খাবে না। তাবেঈ বিদ্বান দাঊদ ইবনু ছালেহ তাঁর মাতা হতে বর্ণনা করেন যে, তাঁর মাতার মুক্তিদানকারিণী মনিব একবার তাঁকে  কিছু হারীসা নিয়ে আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট পাঠালে তিনি তাঁকে ছালাতরত অবস্থায় পেলেন। তখন তিনি আমাকে ইশারা করে খাবারটি রেখে যেতে বললেন। এসময় একটি বিড়াল আসল এবং তা হ’তে কিছু খেল। ছালাত শেষে আয়েশা (রাঃ) বিড়ালের খাওয়া স্থান হতেই কিছু খাবার খেলেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, বিড়াল নাপাক নয়। তা তোমাদের পাশে অধিক বিচরণকারী একটি জন্তু। আর আমি রাসূল (ছাঃ)-কে তার উচ্ছিষ্ট পানি দ্বারা ওযূ করতে দেখেছি (আবুদাঊদ হা/৭৬, মিশকাত হা/৪৮৩)

প্রশ্ন (১৭/১৭) : জেহরী ছালাতে মুক্তাদী সূরা ফাতিহা ইমামের সাথে সাথে পাঠ করবে, নাকি এক আয়াত পরে পরে পাঠ করবে?

-এস এ তালুকদার, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।

উত্তর : মুক্তাদী ইমামের পিছে পিছে নীরবে সূরা ফাতিহা পড়বে। জেহরী ছালাতে মুক্তাদী কিভাবে সূরা ফাতিহা পাঠ করবে, এরূপ এক প্রশ্নের জবাবে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ‘তুমি এটা মনে মনে পড়’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৮২৩ ‘ছালাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১২)

প্রশ্ন (১৮/১৮) : ফেরেশতাগণের নামে সন্তানের নাম রাখা যাবে কি?

-মেহেদী হাসান

কানসাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : রাখা যাবে (নববী, মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব ৮/৪৩৬)। ফেরেশতাগণের নামে নাম রাখা যাবে না মর্মে বর্ণিত হাদীছটি খুবই দুর্বল (আলবানী, যঈফুল জামে‘ হা/৩২৮৩)। এছাড়া নবীগণের নামেও নাম রাখায় কোন বাধা নেই। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা আমার নামে নাম রাখ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৭৫০)

প্রশ্ন (১৯/১৯) : হজ্জ পালনকালে মীক্বাতের বাইরে কোন স্থান পরিদর্শনে গিয়ে পুনরায় ফিরে আসলে ওমরাহ করতে হবে কি?

-আখতারুল ইসলাম, রাজশাহী।

উত্তর : হজ্জ করতে গিয়ে মীক্বাতের বাইরে গেলেও ওমরাহ করতে হবে না। কারণ এক সফরে একটি ওমরাহ হয়ে থাকে। আয়েশা (রাঃ) ঋতুবতী হওয়ায় প্রথমে হজ্জে ক্বিরান-এর ওমরাহ করতে না পারায় হজ্জের পরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ওমরার জন্য তাঁর ভাই আব্দুর রহমানকে তার সাথে মীক্বাতের বাইরে তানঈমে পাঠালেন। আয়েশা (রাঃ) সেখানে ইহরাম বেঁধে ওমরাহ করলেন। কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আব্দুর রহমান পুনরায় ওমরাহ করেননি (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৫৫৬, ২৬৬৭)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথী অন্য কোন ছাহাবীও একাধিক ওমরাহ করেননি। অতএব মীক্বাতের বাইরে গিয়ে পরে মক্কায় ফিরে আসলেও ওমরাহ করতে হবে না (ওছায়মীন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২২/৭৮; ঐ, প্রশ্নোত্তর নং-১৫৯৩; আলবানী, ছহীহাহ হা/১৯৮৪-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য, ইবনুল ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ ২/৮৯)

প্রশ্ন (২০/২০) : কাউকে যাকাতের মাল প্রদানের সময় তাকে জানানো যরূরী কি?

-ইলিয়াস সরকার, জামালপুর।

উত্তর : শরী‘আতে যাকাতের মাল হকদারদের মাঝে বণ্টন করার নির্দেশ এসেছে (তওবা ৯/৬০)। এজন্য তাদেরকে জানানোর কোন আবশ্যকতা নেই। কাউকে জানানো হ’লে বরং তাকে ছোট করা হয়, যা খোটা দানের শামিল। আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমরা খোটা দিয়ে তোমাদের ছাদাক্বাগুলিকে বিনষ্ট করো না’ (বাক্বারাহ ২/২৬৪)

প্রশ্ন (২১/২১) : বিশ বছর পূর্বে আমার দাদারা আমাদের মসজিদটি আহমাদিয়া জামা‘আতের নামে লিখে দিয়ে তাদের অন্তর্ভুক্ত হন। বর্তমানে তারা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী আমল করছেন। কিন্তু মসজিদ তাদের নামেই লেখা আছে। এক্ষণে আমাদের করণীয় কি?

-আবু সাঈদ, গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : আদালতে ঘোষণাপত্র দলীল সম্পাদনের মাধ্যমে উক্ত রেজিস্ট্রি পরিবর্তন করে নতুনভাবে রেজিস্ট্রি করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। অন্যথায় সুযোগ সন্ধানীরা পুনরায় মসজিদটি দখলের অপচেষ্টা চালাবে। এখুনি নাম পরিবর্তন করা না গেলেও উক্ত মসজিদে বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমলসম্পন্ন ইমামের পিছনে ছালাত আদায়ে কোন বাধা নেই। মনে রাখতে হবে যে, আহমাদিয়া জামা‘আত শেষনবী হিসাবে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে মানেনা। সেকারণ ওরা মুসলমান নয়। ওদের নবী হ’ল পূর্ব পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর যেলার কাদিয়ান শহরের ভন্ডনবী গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী।

প্রশ্ন (২২/২২) : বর্তমানে বিভিন্ন মসজিদে দেখা যাচ্ছে, বহু অর্থ খরচ করে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সিংহাসন সদৃশ মিম্বার তৈরী করা হচ্ছে। এটা কতটুকু গ্রহণযোগ্য?

-লোকমান আলী

গোমস্তাপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : মসজিদে অধিক সাজ-সজ্জা ও জাঁকজমক করা নিষেধ। মুছল্লীর দৃষ্টি কেড়ে নেয় এরূপ বস্ত্ত সেখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে (বুখারী হা/৫৯৫৯; মিশকাত হা/৭৫৮, ৭৫৭; আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৭১৮-১৯)। সুতরাং মিম্বার এমনভাবে তৈরী করা যাবে না, যা মুছল্লীর দৃষ্টি কেড়ে নেয় এবং অপব্যয়ের শামিল হয়। শরী‘আতে সরলতা পসন্দনীয়। সকল প্রকার বাড়িবাড়ি ও অপব্যয় পরিত্যাজ্য (আ‘রাফ ৩১; ইসরা ২৬-২৭)

প্রশ্ন (২৩/২৩) : হজ্জে গমনকারী পিতা সেখানে কুরবানী দিবেন। এক্ষণে বাড়ীতে অবস্থানকারী পরিবারের জন্য কুরবানী দিতে হবে কি?

-আহসানুল্লাহ, মুজিবনগর, মেহেরপুর।

উত্তর : হজ্জপালনকারীকে হজ্জের ওয়াজিব হিসাবে সেখানে নিজের পক্ষ থেকে কুরবানী করতে হয়। যা অনাদায়ে ফিদইয়া দিতে হয় (বাক্বারাহ ২/১৯৬)। এর সাথে পরিবারের কুরবানীর কোন সম্পর্ক নেই। সেকারণ সামর্থ্য থাকলে বাড়িতে পরিবারের পক্ষ থেকে একটি পশু কুরবানী করবে (ইবনু মাজাহ হা/৩১২৩, সনদ হাসান)

প্রশ্ন (২৪/২৪) : মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় স্ত্রী স্বামীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বলে যে, মোহরানাসহ তোমার যা কিছু আছে সব ফেরত নিয়ে আমাকে তালাক দাও। অন্যথায় এখনই আমি আত্মহত্যা করব বলে সে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়। এমতাবস্থায় স্বামী নিরুপায় হয়ে একত্রে তিন তালাক প্রদান করে। অতঃপর ঘন্টাখানেক পর স্ত্রী স্বাভাবিক হ’লে তারা উভয়ে অনুতপ্ত হয়ে একত্রে বসবাস করতে থাকে। বিভিন্ন সময়ে তিনবার এরূপ ঘটনা ঘটে। এক্ষণে করণীয় কি?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : প্রশ্নে বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী স্ত্রী মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় তার পক্ষ থেকে ‘খোলা’ প্রার্থনা এবং স্বামী কর্তৃক জীবন বাঁচানোর স্বার্থে এভাবে তালাক প্রদান শরী‘আতের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ রাসূল (ছাঃ) বলেন, তিন ব্যক্তির উপর হ’তে শরী‘আতের বিধান উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে একজন হ’ল মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি (তিরমিযী হা/১৪২৩; মিশকাত হা/৩২৮৭)

প্রশ্ন (২৫/২৫) : ইদানিং অনেক লোক হজ্জ করতে গিয়ে ইহরাম বাঁধার পর জেদ্দা বিমান বন্দর থেকে সরাসরি মদীনায় যান এবং মদীনা থেকে ফিরে এসে মক্কায় হজ্জের কাজ সমাধা করেন। এতে হজ্জের কোন ত্রুটি হয় কি?

-মাহমূদুল ইসলাম

রিয়াদ, সঊদী আরব।

উত্তর : ইহরাম বাঁধা হয় হজ্জ ও ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে। এ সময় বলতে হয় ‘লাববাইক ওমরাতান’ অথবা ‘হাজ্জান’ (হে আল্লাহ! আমি ওমরাহ অথবা হজ্জের উদ্দেশ্যে তোমার দরবারে হাযির) (মুসলিম হা/১২৩২)। সেকারণ ইহরাম বেঁধে বায়তুল্লাহ ব্যতীত অন্যত্র যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। রাসূল (ছাঃ) হজ্জ ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্যই মীক্বাত নির্ধারণ করেছেন (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/২৫১৬ ‘হজ্জ’ অধ্যায়)। তবে সফরসূচী যদি জেদ্দা থেকে মদীনা হয়, সেক্ষেত্রে ইহরাম না বেঁধেই মদীনা গমন করবেন। অতঃপর সেখান থেকে আসার পথে যুল-হুলায়ফা মীক্বাত থেকে ইহরাম বেঁধে মক্কায় এসে ওমরাহ ও হজ্জ পালন করবেন।

প্রশ্ন (২৬/২৬) : হোমিও ঔষধ সেবনে শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-নাছিরুদ্দীন, গাযীপুর।

উত্তর : হোমিও ঔষধ সেবনে শরী‘আতে কোন বাধা নেই। কেননা হোমিও সহ বিভিন্ন ঔষধে কেবল সংরক্ষণের জন্য  সামান্য পরিমাণ পরিশোধিত এ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়। যাতে মাদকতা আসে না এবং তা ছালাত ও যিকর হ’তে বিরতও রাখে না (ফাতাওয়া উছায়মীন ১১/২৫৬-২৫৯, ১৭/৩১)

প্রশ্ন (২৭/২৭) : সাত পরিবারের পক্ষ থেকে সাত ভাগে গরু বা উট কুরবানী করা যাবে কি?

-মাহবূব, দৌলতপুর, কুষ্টিয়া।

উত্তর : রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগে সাত পরিবারের পক্ষ থেকে সাত ভাগে কুরবানী করার কোন দলীল পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিদায় হজ্জে আরাফার দিনে সমবেত জনমন্ডলীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হে জনগণ! নিশ্চয়ই প্রতিটি পরিবারের উপরে প্রতি বছর একটি করে কুরবানী’ (আবুদাউদ হা/২৭৮৮; তিরমিযী হা/১৫১৮; মিশকাত হা/১৪৭৮)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় সর্বদা নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বা দু’টি দুম্বা কুরবানী করেছেন’ (বুখারী হা/৫৫৬৪-৬৫; মুসলিম হা/১৯৬৭, মিশকাত হা/১৪৫৩-৫৪)। ছাহাবীগণের মধ্যেও সর্বদা একই প্রচলন ছিল। প্রখ্যাত ছাহাবী আবু আইয়ূব আনছারী (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ)-এর সময়ে লোকেরা নিজের ও নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে একটি করে বকরী কুরবানী দিত (তিরমিযী হা/১৫০৫, সনদ ছহীহ)। ধনাঢ্য ছাহাবী আবু সারীহা (রাঃ) বলেন, সুন্নাত জানার পর লোকেরা পরিবারপিছু একটি বা দু’টি করে বকরী কুরবানী দিত। অথচ এখন প্রতিবেশীরা আমাদের বখীল বলছে’ (ইবনু মাজাহ হা/৩১৪৮, সনদ ছহীহ)। অতএব পরিবারের পক্ষ থেকে একটি পশু কুরবানী করাই সুন্নাত।

উল্লেখ্য যে, সাত পরিবার নয় বরং সাতজন ব্যক্তি মিলে একটি গরু বা উট কুরবানী করার বিধান রয়েছে সফর অবস্থায়। যেমন জাবের (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে হোদায়বিয়া এবং হজ্জের সফরে ছিলাম। তখন তিনি আমাদেরকে একটি উটে ও গরুতে সাতজন করে শরীক হবার নির্দেশ দিলেন (মুসলিম হা/১৩১৮ (৩৫০-৫১)। একই বাক্যে বর্ণিত মুসলিম ও আবুদাঊদের উক্ত হাদীছটি সংক্ষেপে এসেছে মিশকাতে (হা/১৪৫৮)। যেখানে বলা হয়েছে, গরু ও উট সাতজনের পক্ষ হ’তে। এটি সফরের অবস্থায়। যা একই রাবীর অন্য বর্ণনায় এসেছে। যেমন ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে একটি সফরে ছিলাম। এমন সময় ঈদুল আযহা উপস্থিত হয়। তখন আমরা একটি গরুতে সাতজন ও একটি উটে দশজন করে শরীক হই’ (তিরমিযী হা/৯০৯; ইবনু মাজাহ হা/৩১৩১; মিশকাত হা/১৪৬৯)

প্রশ্ন (২৮/২৮) : আমাদের এলাকায় ঈদুল আযহার এক সপ্তাহ পূর্বেই কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রি হয়ে যায়। এটা শরী‘আত সম্মত কি?

-মকবূল, আড়াই হাযার, নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : এরূপ ক্রয়-বিক্রয় দোষণীয় নয়। কারণ অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় জায়েয আছে, যদি সেখানে পরিমাপ, পরিমাণ ও মেয়াদ নির্ধারিত থাকে (বুখারী হা/২২৪০, মুসলিম, মিশকাত হা/২৮৮৩)

প্রশ্ন (২৯/২৯) : পুরুষের ইমামতিতে মহিলা জামা‘আত চলাকালীন অবস্থায় ইমামের ক্বিরাআতে ভুল হ’লে মহিলারা ভুল সংশোধন করে দিতে পারবে কি?

-আব্দুর রহীম, কাসেমপুর, সাতক্ষীরা।

উত্তর : এমতাবস্থায় মহিলাগণ ক্বিরাআতের সংশোধনী দিবেন না। কেননা রাক‘আত বা অনুরূপ কোন বড় ভুলে ‘হাতের উপর হাত’ মারা (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯৮৮) ব্যতীত তাদের জন্য সকণ্ঠে সংশোধনী দেওয়ার কোন বিধান নেই।

প্রশ্ন (৩০/৩০) : কোন কোন ছালাত আদায় না করলে গোনাহ হবে এবং কোন ছালাত আদায় না করলে গোনাহ হবে না। বিস্তারিত জানতে চাই।

-মুনীর, উল্ল­াপাড়া, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : কালেমা পাঠকারী প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞান থাকা পর্যন্ত প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করা ফরয। এছাড়া বাকি সকল ছালাতই নফল (বুখারী হা/২৬৭৮; মুসলিম হা/১১; মিশকাত হা/১৬৯)। যেকোন ফরয ছালাত পরিত্যাগকারী ব্যক্তি গোনাহগার হবে। কেননা অবহেলাবশতঃ ফরয ছালাত পরিত্যাগ করা ‘কুফরী’ পর্যায়ভুক্ত মহাপাপ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৯, ৫৭৪, ৫৮০)। এছাড়া নফল ছালাত পরিত্যাগকারী ব্যক্তি গোনাহগার হবে না। তবে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালবাসা ও নৈকট্য লাভ করে (বুখারী হা/৬৫০২)। বান্দার ফরয ইবাদতের ঘাটতিসমূহ এর দ্বারা পূরণ হয় (আবুদাঊদ হা/৮৬৪, মিশকাত হা/১৩৩০)। তবে কিছু নফল ছালাত রয়েছে, যা রাসূল (ছাঃ) কখনোই ছাড়তেন না। যেমন ফজরের সুন্নাত ও বিতর ছালাত (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১১৬৩, ১২৬২)। এতদ্ব্যতীত যোহরের আগে-পরের ৬ বা ৪, মাগরিবের পরে ২ ও এশার পরের ২ রাক‘আত ছালাত তিনি পারতপক্ষে ছাড়তেন না (তিরমিযী হা/৪১৫; ঐ, মিশকাত হা/ ১১৫৯)

তাছাড়া ইদায়নের ছালাত সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ, যা সবাইকে আদায় করা আবশ্যক। এটি ইসলামের নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আর জানাযার ছালাত ফরযে কিফায়া, যা মহল্লার কেউ আদায় না করলে সকলেই গুনাহগার হয় এবং কিছু লোক আদায় করলে সকলের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায় (ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) পৃ. ২১৩)

প্রশ্ন (৩১/৩১) : গামছা বা অনুরূপ পাতলা কিছু গায়ে দিয়ে ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-বুলবুল, কাঠালপাড়া, নবাবগঞ্জ।

উত্তর: উভয় কাঁধ পূর্ণরূপে ঢেকে থাকলে এরূপ কাপড় গায়ে দিয়ে ছালাত আদায় করা যাবে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৭৫৪)। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও তাক্বওয়াপূর্ণ সুন্দর পোষাক পরে আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান হওয়া যরূরী। আল্লাহ বলেন, তোমরা ছালাতের সময় সুন্দর পোষাক পরিধান কর’ (আ‘রাফ ৭/৩১)

প্রশ্ন (৩২/৩২) : জনৈক আলেম বলেন, ২৫ উক্বিয়া বা ২০০ দিরহাম যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৮ হাযার টাকা, একবছর থাকলে যাকাত দিতে হবে। এর সত্যতা আছে কি?

-আব্দুল্লাহ

সরিষাবাড়ী, জামালপুর।

উত্তর : একথা ভিত্তিহীন। উক্ত আলেম হাদীছে বর্ণিত দিরহাম ও দীনারের মান বুঝতে ভুল করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘বিশ দীনারের কম স্বর্ণে যাকাত ফরয নয়’ (আবূদাউদ হা/১৫৭৩) এবং ‘পাঁচ উক্বিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যে যাকাত নেই’ (বুখারী হা/১৪৮৪)। হাদীছে বর্ণিত ২০ দীনার সমান ৮৫ গ্রাম তথা ৭ ভরি ৫ আনা ৫ রতি স্বর্ণ। আর ১ উক্বিয়া সমান ৪০ দিরহাম হিসাবে ৫ উক্বিয়া সমান ২০০ দিরহাম তথা ৫৯৫ গ্রাম সমান ৫১.০২ ভরি রৌপ্য (উছায়মীন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৮/১৩৮)। অতএব ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ বা ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্যের মধ্যে যেটির মূল্যমান অপেক্ষাকৃত কম থাকবে সেটি অনুযায়ী নিছাব পরিমাণ হলে যাকাত আদায় করতে হবে (ফাতাওয়া হাইআতু কিবারিল ওলামা ১/৩৭৩, ৩৮৮, ৪১১ পৃঃ, ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ৯/২৫৭)

তবে স্বর্ণের মূল্যমান রৌপ্য অপেক্ষা স্থিতিশীল এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য বিধায় অধিকাংশ বিদ্বান স্বর্ণের হিসাব অনুযায়ী যাকাত দেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেন।

প্রশ্ন (৩৩/৩৩) : কোন হিন্দু মেয়েকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে বিবাহ করা যাবে কি?

-আবুল কালাম

আলীপুর, সাতক্ষীরা।

উত্তর : যাবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মুশরিক নারীদেরকে বিবাহ করো না যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে’ (বাক্বারাহ ২২১)। তবে তার অভিভাবক অমুসলিম হওয়ার কারণে যেহেতু অলী হ’তে পারবে না, তাই সরকারের মুসলিম প্রতিনিধি বা সমাজ নেতা উক্ত মেয়ের অলীর দায়িত্ব পালন করবেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যার অলী নেই তার অলী হবে দেশের শাসক’ (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩১৩১ ‘বিবাহের অভিভাবক’ অনুচ্ছেদ)। আবু সুফিয়ান অমুসলিম থাকাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে তার কন্যা উম্মে হাবীবার বিয়েতে বাদশাহ নাজাশী অলীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন (ইরওয়াউল গালীল ৬/৩৫৩, হা/১৮৫০ ‘অলী’ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (৩৪/৩৪) : শিরক সম্পর্কে না জানার কারণে মাযার ও শহীদ মিনারের সামনে মাথা নত করে শিরক করেছি। এক্ষণে পূর্বে কৃত এসব পাপ থেকে মুক্তির উপায় কি?

-ওমর ফারূক

বিরল, দিনাজপুর।

উত্তর : এসব গোনাহ হ’তে মুক্তি লাভের আশায় অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে ক্ষমা পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ (তাহরীম ৬৬/৮)। তওবা কবুলের জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে- (১) একমাত্র আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই তওবা করতে হবে। (২) কৃত গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হ’তে হবে। (৩) পুনরায় সে গোনাহে জড়িত না হওয়ার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। তওবার জন্য বেশী বেশী পাঠ করতে হবে ‘আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ুম ওয়া আতূবু ইলাইহে’ (তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/২৩৫৩; ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ২৯৪ পৃঃ)

প্রশ্ন (৩৫/৩৫) : একসাথে দুই স্ত্রীর ভরণ-পোষণের ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিবাহ করা শরী‘আত সম্মত হবে কি?

- আব্দুল্লাহ, কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মোহর ও ভরণ-পোষণের সামর্থ্য থাকার শর্তে বিবাহের নির্দেশ দিয়েছেন। আর সামর্থ্য না থাকলে ছিয়াম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮০, মিরক্বাত ৬/১৮৬)। যেখানে প্রথম বিবাহের জন্যই সামর্থ্যের শর্তারোপ করা হয়েছে, সেখানে সামর্থ্যহীন অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ জায়েয হয় কিভাবে? উল্লেখ্য যে, রাসূল (ছাঃ) জনৈক ব্যক্তিকে অভাবমুক্ত হওয়ার জন্য একাধিক বিবাহ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (সিলসিলা যঈফাহ হা/৩৪০০ আলোচনা দ্রঃ)

প্রশ্ন (৩৬/৩৬) : অহি লেখকগণ কে কে ছিলেন?

-মুছত্বফা কামাল, যশোর।

উত্তর : যায়েদ বিন ছাবিত (রাঃ) ছিলেন অহি লেখকগণের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য। সেকারণ কুরআন জমা করার সময় ওছমান (রাঃ) তাঁকেই এ গুরুদায়িত্ব প্রদান করেন (বুখারী হা/৪৬৭৯, ৪৯৭৯)। তিনি ব্যতীত আরো অনেক ছাহাবী বিভিন্ন সময়ে এ মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। যাদের সংখ্যা ২৬ থেকে ৪২ পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে। ইবনু কাছীর (রহঃ) এক্ষেত্রে ২৫ জন ছাহাবীর নাম উল্লেখ করেছেন। তারা হ’লেন (১) হযরত আবুবকর (২) ওমর (৩) ওছমান (৪) আলী (৫) আবান বিন সাঈদ ইবনুল আছ (৬) উবাই বিন কা‘ব (৭) যায়েদ বিন ছাবেত (৮) খালেদ বিন সাঈদ ইবনুল ‘আছ (৯) মু‘আয বিন জাবাল (১০) আরক্বাম বিন আবুল আরক্বাম (১১) ছাবেত বিন ক্বায়েস বিন শাম্মাস (১২) হানযালা বিন রবী‘ (১৩) ও তার ভাই রাবাহ (১৪) ও চাচা আকছাম বিন ছায়ফী (১৫) খালেদ বিন ওয়ালীদ (১৬) যুবায়ের ইবনুল ‘আওয়াম (১৭) আব্দুল্লাহ বিন সা‘দ বিন আবী সারাহ (১৮) ‘আমের বিন ফুহায়রাহ (১৯) আব্দুল্লাহ বিন আরক্বাম (২০) আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ বিন আব্দে রবিবহি (২১) ‘আলা ইবনুল হাযরামী (২২) ‘আলা বিন উক্ববাহ (২৩) মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ (২৪) মু‘আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (২৫) মুগীরাহ বিন শো‘বা (রাঃ) (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৫/৩৩৯-৩৫৫)

প্রশ্ন (৩৭/৩৭) : হজ্জ করতে গিয়ে সেখান থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে কিছু  আনা যাবে কি?

-আব্দুর রহমান

গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : হজ্জ করতে গিয়ে সেখান থেকে বৈধ পন্থায় ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে মালামাল নিয়ে আসাতে কোন বাধা নেই। কারণ হজ্জ পালনকালেও মালামাল ক্রয়-বিক্রয় বৈধ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের উপর কোন গোনাহ নেই স্বীয় প্রতিপালকের অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে’ (বাক্বারাহ ২/১৯৮)। অনুগ্রহ বলতে এখানে ক্রয়-বিক্রয়কে বুঝানো হয়েছে। তবে হজ্জের সময় ব্যবসা যেন মূল উদ্দেশ্য না হয়। তাতে হজ্জের নেকীতে ঘাটতি হবে।

প্রশ্ন (৩৮/৩৮) : শত্রুর পক্ষ থেকে ক্ষতির আশংকা থাকলে কি কি দো‘আ পাঠ করতে হয়? জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আব্দুল্লাহ আল-মামূন, বাঘা, রাজশাহী।

উত্তর : ঘর হ’তে বের হওয়ার সময় পড়বে ‘বিসমিল্লা-হি তাওয়াক্কালতু ‘আলাল্লা-হি লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লাবিল্লা-হি’। অর্থাৎ ‘আল্লাহর নামে (বের হচ্ছি), তাঁর উপরে ভরসা করছি। নেই কোন ক্ষমতা, নেই কোন শক্তি আল্লাহ ব্যতীত’ (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/২৪৪৩)।

অতঃপর পড়বে ‘আল্লা-হুম্মা ইন্না নাজ‘আলুকা ফী নুহূরিহিম ওয়া নাঊযুবিকা মিন শুরূরিহিম’। অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমরা আপনাকে শত্রুদের মুকাবিলায় পেশ করছি এবং তাদের অনিষ্টসমূহ হ’তে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি’ (আহমাদ, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/২৪৪১, দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়; ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) পৃঃ ২৮৭)। ‘নবী করীম (ছাঃ) যখন কোন গোত্রের ভয় করতেন, তখন উপরোক্ত দো‘আটি পড়তেন।

এছাড়া আরো পড়বে- ‘আ‘ঊযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত তাম্মা-তি মিন শার্রি মা খালাক্ব’  অর্থাৎ আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমা সমূহের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্টকারিতা হ’তে পানাহ চাচ্ছি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘এই দো‘আ পাঠ করলে, ঐ স্থান হ’তে প্রস্থান করা পর্যন্ত তাকে কোন কিছুই ক্ষতি করবে না’।(মুসলিম, মিশকাত হা/২৪২২)

প্রশ্ন (৩৯/৩৯) : হারাম উপার্জন দ্বারা হজ্জ করলে তা কবুল হবে কি?

-মীযানুর রহমান

আল-বুরাইদা, সঊদী আরব।

উত্তর : হারাম পন্থায় উপার্জিত অর্থ দ্বারা হজ্জ করলে তা আল্লাহর নিকট কবুল হবে না (মুসলিম হা/১০১৫, মিশকাত হা/২৭৬০)। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কোন নেকী অর্জিত হবে না। তবে এর দ্বারা হজ্জ-এর ফরযিয়াত আদায় হয়ে যাবে মর্মে জমহূর বিদ্বানগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন (নববী, আল-মাজমূ‘ ৭/৬২; আলবানী, সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, অডিও ক্লিপ নং ২৯; উছায়মীন, লিক্বাউল বাবিল মাফতূহ ৮৮/১৩; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ১১/৪৩)। যেমন ছালাতের মধ্যে ‘রিয়া’ থাকলে ছালাত আদায় হয়ে যায়, কিন্তু তা আল্লাহর নিকটে কবুলযোগ্য হয় না।

প্রশ্ন (৪০/৪০) : ঈদের মাঠে মিম্বার কখন থেকে চালু হয়েছে? জনৈক আলেম কয়েকটি হাদীছ উল্লেখ করে বলেন, রাসূল (ছাঃ) মিম্বারের উপরে দাঁড়িয়ে ঈদের খুৎবা দিতেন। এক্ষণে এ ব্যাপারে সঠিক সমাধান জানতে চাই। 

-মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : রাসূল (ছাঃ) ঈদের খুৎবায় মিম্বার ব্যবহার করতেন না। উমাইয়া খলীফা মারওয়ান বিন হাকাম (৬৪-৬৫ হিঃ) সর্বপ্রথম ঈদগাহে মিম্বার ব্যবহার করেন।

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে ঈদগাহে পৌঁছে প্রথমে ছালাত আদায় করতেন। অতঃপর মুছল্লীদের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন আর তারা তখন স্ব স্ব কাতারে বসা থাকত। ... রাবী বলেন, মানুষ এভাবে আমল করতে থাকে। পরে আমি মারওয়ানের সাথে ঈদুল ফিৎর অথবা ঈদুল আযহায় গেলাম। তখন তিনি মদীনার আমীর। মাঠে এসে দেখি কাছীর ইবনুছ ছালত মাটি ও কাঁচা ইট দ্বারা একটি মিম্বার তৈরী করেছে। মারওয়ান মিম্বরে চড়ে ছালাতের পূর্বে খুৎবা দিতে চাইলে আমি তার কাপড় টেনে ধরলাম। কিন্তু তিনি জোরপূর্বক মিম্বরে উঠে ছালাতের পূর্বে খুৎবা দিলেন। আমি তাকে বললাম, আল্লাহর কসম! তোমরা (রাসূলের সুন্নাত) পরিবর্তন করলে। মারওয়ান বললেন, আবু সাঈদ! তুমি যে নিয়ম জান ঐ নিয়ম এখন চলবে না। আমি বললাম, আমি যে নিয়ম জানি তাতেই কল্যাণ রয়েছে। তখন মারওয়ান বললেন, মানুষ ছালাতের পর আমার খুৎবা শুনার জন্য বসে না। তাই আমি খুৎবাকে ছালাতের পূর্বে করেছি’ (বুখারী হা/৯৫৬; মুসলিম, হা/৮৮৯ ‘ঈদায়েন-এর ছালাত’ অধ্যায়)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘মারওয়ান ঈদের দিন মিম্বার নিয়ে বের হ’লেন এবং ছালাতের পূর্বেই খুৎবা শুরু করলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে মারওয়ান! তুমি সুন্নাতের বিরোধিতা করলে। ঈদের দিন তুমি মিম্বর বের করলে যা কখনো এখানে বের হয়নি! আবার তুমি ছালাতের পূর্বে খুৎবাও শুরু করলে! একথা শুনে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বললেন, ঐ ব্যক্তি কে? তখন উপস্থিত অন্যরা বলল, অমুক। তখন তিনি বললেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে কেউ ‘মুনকার’ কিছু দেখলে তা যেন হাত দিয়ে পরিবর্তন করে। নইলে যবান দিয়ে। নইলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। আর এটা হ’ল দুর্বলতম ঈমান (আবুদাঊদ হা/১১৪০)। এই হাদীছ শুনানোর মাধ্যমে তিনি ঐ ব্যক্তির প্রতিবাদকে সমর্থন করলেন এবং প্রকারান্তরে তিনি ছালাতের পূর্বে খুৎবা ও মিম্বার উভয়েরই প্রতিবাদ করলেন।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, নিঃসন্দেহে মিম্বর মসজিদ হ’তে বের করে মাঠে নিয়ে যাওয়া হ’ত না, সর্বপ্রথম মারওয়ান ইবনুল হাকাম এটি করেছেন’ (যাদুল মাআদ ১/৪৩১ পৃঃ)

উপরোক্ত দলীল সমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, খলীফা মারওয়ানই তার শাসনামলে সর্বপ্রথম ঈদগাহে মিম্বারের প্রচলন ঘটান। আবু সাঈদ (রাঃ) ও অন্যান্যগণ যার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।

এক্ষণে রাসূল (ছাঃ) ঈদের খুৎবা মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে দিয়েছেন মর্মে প্রশ্নকারীর উপস্থাপিত দলীলগুলির বিশ্লেষণ নিম্নরূপ :

(১) জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, ‘আমি কুরবানীর ঈদে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ঈদগাহে উপস্থিত ছিলাম। তিনি যখন খুৎবা শেষ করলেন, তখন মিম্বার থেকে নামলেন’ (আহমাদ হা/১৪৯৩৮, আবুদাঊদ হা/২৮১০; তিরমিযী হা/১৫২১)

শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন, হাদীছটি মুত্ত্বালিব ও জাবের (রাঃ)-এর মাঝে ইনক্বিতা‘ বা সনদে বিচ্ছিন্নতার দোষে দুষ্ট...। রাবী মুত্ত্বালিব একজন মুদাল্লিস রাবী। অতএব এরূপ বর্ণনা দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় না। তাছাড়া অন্য বর্ণনায় এ হাদীছটি বুখারী ও মুসলিমে জাবের থেকে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে মিম্বারের কথা উল্লেখ নেই (সিলসিলা যঈফাহ হা/৯৬৩-এর আলোচনা দ্রঃ)

(২) অন্যত্র জাবের (রাঃ) বলেন, ‘রাসূল (ছাঃ) ঈদের খুৎবা শেষে অবতরণ করে নারীদের কাছে গিয়ে তাদেরকে উপদেশ দিয়েছেন(বুখারী হা/৯৭৮)। এ হাদীছের ব্যাপারে ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ‘ইতিপূর্বে ‘মুছাল্লার দিকে বের হওয়া’ অনুচ্ছেদে পাওয়া গেছে যে, রাসূল (ছাঃ) ঈদের মুছাল্লায় যমীনের উপর দাঁড়িয়ে খুৎবা দিতেন। তাই সম্ভবতঃ রাবী স্থান পরিবর্তনকে অবতরণ করা শব্দে এনেছেন’ (ضَمَّنَ النُّزُولَ مَعْنَى الاِنْتِقَالِ) (ফাৎহুল বারী ঐ হাদীছের ব্যাখ্যা দ্রঃ ২/৪৬৭)

(৩) ইবনু আববাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে, তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে ঈদের মুছাল্লা সম্পর্কে জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ঈদের দিন রাসূল (ছাঃ) (أَتَى الْعَلَمَ الَّذِى عِنْدَ دَارِ كَثِيرِ بْنِ الصَّلْتِ) কাছীর বিন ছালতের বাড়ির সামনে যে  নিশানা ছিল সেখানে আসলেন এবং ছালাত আদায়ের পর খুৎবা দিলেন (বুখারী হা/৯৭৭)

উল্লেখ্য যে, হাদীছে বর্ণিত নিশানা এবং কাছীর ইবনুছ ছালতের বাড়ী কোনটিই রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে ছিল না। বরং তা পরবর্তীতে তৈরীকৃত। কারণ হাদীছে এসেছে রাসূল (ছাঃ)-এর মুছাল্লা ছিল খোলা ময়দান। সেখানে কোন সুৎরা বা নিশানা ছিল না। ফলে তার সামনে একটি বর্শা পুঁতে দেওয়া হ’ত এবং তিনি সেদিকে ফিরে ছালাত আদায় করতেন (ইবনু মাজাহ হা/১৩০৪, ইবনু রজব হাম্বলী, ফৎহুল বারী হা/৯৭৭ এর ব্যাখ্যা দ্রঃ)। অর্থাৎ পরবর্তীতে সেখানে বাড়ি এবং নিশানা নির্মিত হওয়ার পর ইবনু আববাস (রাঃ) ঐ ব্যক্তিকে সেগুলির মাধ্যমে স্থানটি চিনিয়ে দিচ্ছিলেন মাত্র।

(৪) ইবনু আববাস (রাঃ) বর্ণিত আরেকটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (ছাঃ) মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে জুম‘আ, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিৎরের খুৎবা দিতেন’। এ হাদীছটি যঈফ (আলবানী, সিলসিলা যঈফাহ হা/৯৬৩)

সুতরাং সার্বিক পর্যালোচনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ঈদের খুৎবা মিম্বারে দেয়ার প্রমাণে কোন বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য দলীল নেই। সুতরাং মিম্বারহীন খোলা ময়দানে দাঁড়িয়েই খুৎবা দিতে হবে।

HTML Comment Box is loading comments...