প্রবন্ধ


আল্লাহর প্রতি ঈমানের স্বরূপ

মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব
প্রধান দা‘ঈ, বাংলা বিভাগ
আল-ফুরক্বান সেন্টার, হূরা, বাহরাইন।

 (পঞ্চম কিস্তি)

আল্লাহর নাম সমূহ ও গুণাবলী প্রসঙ্গে শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ)-এর অভিমত : তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর কিতাবে নিজেকে যে সকল গুণে গুণান্বিত করেছেন এবং তাঁর প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ) যে সকল গুণে গুণান্বিত করেছেন তা কোন পরিবর্তন, প্রত্যাখ্যান, সাদৃশ্য বর্ণনা ও দৃষ্টান্ত স্থাপন ব্যতিরেকে বিশ্বাস করা। তারা (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত) বিশ্বাস করে  যে, তাঁর সাদৃশ্য কিছুই নেই এবং তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। তারা প্রত্যাখ্যান করে না ঐ সমস্ত গুণাবলীকে যেসব গুণে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন। তারা আল্লাহর কালামকে স্বীয় স্থানচ্যুত করেন না এবং পরিবর্তন ও পরিবর্ধনও করেন না। তারা আল্লাহর নাম সমূহ ও গুণাবলীকে অস্বীকার ও অপব্যাখ্যা করেন না। তারা সৃষ্টির গুণাবলীর সাথে স্রষ্টার গুণাবলীকে সাদৃশ্য দান করেন না এবং স্বরূপও বর্ণনা করেন না। কেননা তিনি মহান ও পবিত্র। তাঁর কোন সমকক্ষ ও শরীক নেই। আর তাই আল্লাহর সাথে তাঁর সৃষ্টজীবের কোন প্রকার তুলনা করা চলে না। তিনি তাঁর নিজের ও অপরের সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত আছেন। তিনি সত্যবাদী ও সর্বাপেক্ষা সঠিক কথা বলেন।[1]

ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিইয়াহ (রহঃ) বলেন, ‘ছাহাবায়ে কেরাম আহকাম সম্বলিত মাসআলা সমূহের অনেক ক্ষেত্রে মতবিরোধ করেছেন। অথচ তাঁরা হ’লেন মুমিনদের মাঝে নেতৃস্থানীয় এবং উম্মতের মাঝে পরিপূর্ণ ঈমানদার। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ তাঁরা আল্লাহর নাম, গুণাবলী ও কর্ম সংক্রান্ত মাসআলা সমূহের একটি মাসআলাতেও মতবিরোধ করেননি। বরং তাঁদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলেই কুরআন ও সুন্নায় এ বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে তা এক বাক্যে সাব্যস্ত করেছেন। তাঁরা তাতে কোন প্রকার ভিন্ন ব্যাখ্যা করেননি, প্রত্যাখ্যান ও পরিবর্তন করেননি এবং কোন প্রকার উদাহরণ পেশ করেননি। তাঁদের মধ্যে কেউ কখনো বলেননি যে, এসব ছিফাতের আসল অর্থ না করে রূপক অর্থে ব্যবহার করতে হবে। বরং সেটা যেরূপে বর্ণিত হয়েছে হুবহু সেরূপেই গ্রহণ করেছেন ও মেনে নিয়েছেন।[2]

এ সম্পর্কে বিভ্রান্ত ফিরক্বা সমূহ

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘বনী ইসরাঈলরা বিভক্ত হয়েছিল ৭২ ফিরক্বায়; আর আমার উম্মত বিভক্ত হবে ৭৩ ফিরক্বায়।[3] এই ফিরক্বাবন্দীর মূল উৎস হ’ল আক্বীদাহ। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্বীদাগত ফিরক্বাবন্দীর মূল কারণ হ’ল তাওহীদে আসমা ওয়াছ ছিফাত সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভ্রষ্ট ধারণা। আর একে কেন্দ্র করেই মুসলমানরা  দু’টি বিভ্রান্ত ফিরক্বায় বিভক্ত হয়েছে। (১) মু‘আত্তিলাহ- যারা আল্লাহর নিরেট একত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে আল্লাহর ছিফাত বা গুণাবলীকে অস্বীকার করে বাতিল পথ অনুসরণ করেছে। (২) মুশাবিবহা বা মুজাসসিমা- যারা আল্লাহর ছিফাত সাব্যস্ত করতে গিয়ে তাঁর ছিফাতকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করে পথভ্রষ্ট হয়েছে। প্রথম দল, যারা আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকার করে তারা আবার তিনটি দলে বিভক্ত। যেমন-

(১) الجهمية (জাহমিয়্যাহ) : এরা জাহম বিন ছাফওয়ান সামারকান্দী (মৃত ১২৮ হিঃ)-এর অনুসারী। হিজরতের দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে বানী উমাইয়া যুগের শেষের দিকে এবং তাবেঈনদের শেষ যামানায় পারস্যের খোরাসান প্রদেশ থেকে এই জাহমিয়া সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ‘সর্বেশ্বরবাদ’ (وحدة الوجود) তথা ‘সৃষ্টি ও স্রষ্টা অভিন্ন’ মতবাদের প্রবর্তক হ’ল জা‘দ বিন দিরহাম (মৃত ১১৮ হিঃ)। সে আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকার করতঃ তাঁকে নির্গুণ বলে দাবী করত। তদানীন্তনকালের বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম তাকে হত্যার নির্দেশ দেয় এবং তাকে হত্যা করা হয়। তারই ছাত্র জাহম বিন ছাফওয়ান সামারকান্দী (মৃত ১২৮ হিঃ) তার ভ্রান্ত মতবাদগুলো জোরালোভাবে প্রচার করতে থাকে।[4]

ইবনুল মুবারাক, আহমাদ বিন হাম্বল, ইসহাক্ব এবং ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, জাহমিয়াদের সকল দলই আল্লাহর ছিফাতকে অস্বীকার করে।[5]

শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, সালাফে ছালেহীনের নিকট আল্লাহর ছিফাতকে অস্বীকারকারীরা হ’ল জাহমিয়্যাহ।[6]

মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ) বলেন, জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় আল্লাহর সকল গুণাবলীকে অস্বীকার করে। এমনকি এ সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ আল্লাহর নাম সমূহকেও অস্বীকার করে। এরা বলে যে, আল্লাহর নাম সমূহ ও গুণাবলী কোনটাই সাব্যস্ত করা জায়েয নয়। এ মর্মে তাদের যুক্তি হ’ল যদি আপনি আল্লাহর নাম সাব্যস্ত করেন তাহ’লে তাঁকে সৃষ্টিজীবের নামের সাথে সাদৃশ্য সাব্যস্ত করলেন। আর যদি তাঁর গুণাবলী সাব্যস্ত করেন তাহ’লে সৃষ্টিজীবের গুণাবলীর সাথে তাঁর সাদৃশ্য সাব্যস্ত করলেন। তাই আমরা আল্লাহর নাম ও গুণাবলী কোনটাই সাব্যস্ত করি না। তারা আরো বলে যে, কুরআন মাজীদে আল্লাহর নাম ও গুণাবলী নিয়ে যা বর্ণিত হয়েছে তা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হবে। এদের এই ভ্রান্ত যুক্তি ও চিন্তার পর থেকেই আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর একত্ব নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয়ের সৃষ্টি হ’তে থাকে, যা ইতিপূর্বে কখনোই ছিল না।[7]

(২) المعةزلة (মু‘তাযিলা) : এরা ওয়াছেল বিন আত্বা গায্যাল (৮০-১৩১ হিজরী)-এর অনুসারী। সে হাসান বছরী (রহঃ)-এর ছাত্র ছিল। একদা হাসান বছরী (রহঃ) দারস দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁর নিকট প্রবেশ করে প্রশ্ন করলেন যে, বর্তমানে একটি দল বের হয়েছে (খারেজী) যারা কাবীরা গুনাহগারকে কাফের সাব্যস্ত করে এবং তাদেরকে ইসলাম থেকে খারিজ বলে গণ্য করে। অপরদিকে অন্য আরেকটি দল বের হয়েছে (মুরজিয়া) যারা কাবীরা গুনাহগারকে পূর্ণ মুমিন মনে করে। তাদের নিকটে আমল ঈমানের কোন অংশ নয়। উল্লিখিত দু’টি দল খারেজী ও মুরজিয়া সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? তখন হাসান বছরী (রহঃ)-এর উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর ছাত্র ওয়াছেল বিন আত্বা দাঁড়িয়ে বলল যে, কাবীরা গুনাহগার মুমিনও নয় আবার কাফেরও নয়। বরং তারা ঈমান ও কুফরের মাঝখানে। অর্থাৎ সে সম্পূর্ণরূপে ঈমানের গন্ডি থেকে খারিজ (মুমিন নয়) এবং সম্পূর্ণরূপে কুফরী থেকে মুক্ত (কাফির নয়)। অথচ আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে মুমিন ও কাফির এ দু’টি ভাগে ভাগ করেছেন। এতদ্ভিন্ন মধ্যবর্তী কোন অবস্থার কথা বলেননি। বরং আল্লাহ বলেছেন,هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ فَمِنْكُمْ كَافِرٌ وَمِنْكُمْ مُؤْمِنٌ- ‘তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ হয় কাফির এবং কেউ মুমিন’ (তাগাবুন ৬৪/২)। ওয়াছেল বিন আত্বা কুরআন ও হাদীছ প্রত্যাখ্যান করে নতুন এক মতের জন্ম দেয় এবং একে কেন্দ্র করেই সে হাসান বছরী (রহঃ)-এর দরস থেকে বের হয়ে গিয়ে মসজিদের এক কোণে বসে পড়ে। তখন আরো কিছু ছাত্র তার মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে তার সাথে যোগ দেয়। তখন হাসান বছরী (রহঃ) বললেন, اعتزل عنا واصل ‘ওয়াছেল আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল’। হাসান বছরী (রহঃ)-এর এ কথা থেকেই পরবর্তীতে المعةزلة ‘মু‘তাযিলা’ নামে এ সম্প্রদায়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।[8]

উল্লেখ্য যে, এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদাহ হ’ল তারা কবীরা গুনাহগারকে ঈমানের গন্ডী থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেয় না এবং তাকে হত্যাযোগ্য কাফির সাব্যস্ত করে না। তাই তারা মানুষ হত্যার পথ পরিত্যাগ করে সঠিক দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষকে পূর্ণ ঈমানদার বানানোর চেষ্টা করে।[9]

মু‘তাযিলা সম্প্রদায় আল্লাহর সবগুলি ছিফাতকে অস্বীকার করে। তাদের যুক্তি হ’ল যেহেতু তাওহীদ অর্থ আল্লাহ একক ও তাঁর কোন শরীক নেই। সেহেতু আল্লাহর যাবতীয় ছিফাতকে অস্বীকার করা ব্যতীত তাঁর সাথে শরীক স্থাপন থেকে বিরত থাকা সম্ভব নয়। কেননা আল্লাহর ছিফাত বা গুণাবলীকে সাব্যস্ত করলে তা সৃষ্টিজীবের গুণাবলীর সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়। অথচ আল্লাহ বলেছেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْبَصِيرُ ‘কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ (শূরা ৪২/১১)। তাই তারা আল্লাহর নাম সমূহকে সাব্যস্ত করে। কিন্তু এ নামের সাথে স্বভাবতই যে আল্লাহর গুণাবলীও রয়েছে তা অস্বীকার করে (নাঊযুবিল্লাহ)। পক্ষান্তরে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে আল্লাহর যে সমস্ত ছিফাত বা গুণাবলীর বর্ণনা এসেছে সেগুলোকে তারা রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করে থাকে। অর্থাৎ আল্লাহর হাত অর্থ তাঁর কুদরত বা ক্ষমতা, তাঁর আরশের উপর সমুন্নীত হওয়া অর্থ তাঁর কর্তৃত্ব বা মালিকানা ইত্যাদি। তারা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধিকে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপর প্রাধান্য দেয়। তারা কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে নিজেদের যুক্তির মানদন্ডে বুঝতে চায়। নিজের বিবেক যদি ভাল মনে করে তাহ’লে তা গ্রহণ করে; অন্যথা প্রত্যাখ্যান করে এবং বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে অপব্যাখ্যা করে থাকে। আর এমন অপব্যাখ্যারই ফসল হ’ল, আল্লাহর ছিফাত সমূহকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করা। [10]

মু‘তাযিলাদের এই ভ্রান্ত মতবাদ খলীফা আল-মামূন, মু‘তাছিম এবং ওয়াছিকদের যুগে তাদের দ্বারা শক্তিশালী হয়েছিল ও প্রসার লাভ করেছিল।[11]

(৩) الأشعرية (আশ‘আরিয়্যাহ) : এরা আবুল হাসান আলী বিন ইসমাঈল আশ‘আরী (২৬০-৩৩৪ হিঃ)-এর অনুসারী। তিনি প্রথম যামানায় মু‘তাযিলী ছিলেন। লেখা-পড়া করেছেন মু‘তাযিলী মাদরাসায়। এরপর মু‘তাযিলা ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মধ্যবর্তী একটি মতবাদের উদ্ভব ঘটান। যা আশ‘আরী মতবাদ নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে তিনি সেই ভ্রান্ত আক্বীদা পরিহার করে ৩০০ হিজরী সনে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা গ্রহণ করেন। যা তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘আল-ইবানাহ আল উছূলিদ দিয়ানাহ’-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হ’ল আজ পর্যন্ত তাঁর অনেক অনুসারী তাঁর প্রথম মতবাদ তথা আশ‘আরী মতবাদের উপরেই অটল রয়েছে। আশ‘আরীরা আল্লাহর নাম সমূহ স্বীকার করে এবং তাঁর গুণাবলীর মধ্যে শুধুমাত্র সাতটি গুণকে স্বীকার করে। আর বাকী গুণাবলীকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করে। তারা যে সাতটি গুণকে বিশ্বাস করে তা হ’ল-

(১) حي (হাই) তথা চিরঞ্জীব, জীবন নামক গুণসহ।

(২) عليم (আলীম) তথা মহাজ্ঞানী, জ্ঞান নামক গুণসহ।

(৩) قدير (ক্বাদীর) তথা মহা শক্তিশালী, শক্তি নামক গুণসহ।

(৪) سميع (সামী‘) তথা সর্বশ্রোতা, শ্রবণ নামক গুণসহ।

(৫) بصير (বাছীর) তথা সর্বদ্রষ্টা, দর্শন নামক গুণসহ।

(৬) متكلم (মুতাকাল্লিম) তথা কথক, কথা নামক গুণসহ।

(৭) مريد (মুরীদ) তথা ইচ্ছা পোষণকারী, ইচ্ছা নামক গুণসহ।

আশ‘আরীরা উল্লিখিত সাতটি ছিফাত বিশ্বাস করে। এতদ্ভিন্ন সকল ছিফাতকে অস্বীকার করে এবং রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করে।[12]

দ্বিতীয় প্রকার : মুশাবিবহা বা মুজাসসিমা : এরা হ’ল হিশামিয়্যাহ, যাওয়ারিবিয়্যাহ এবং কারামিয়্যাহ সম্প্রদায়। যারা আল্লাহর নাম সমূহ ও গুণাবলীকে স্বীকার করে বটে কিন্তু তা সৃষ্টির সাথে তুলনা করতঃ বলে যে, আল্লাহর গুণাবলী মানুষের গুণাবলীর মতই। যেমন তারা বলে, আল্লাহর হাত আমাদের হাতের মত, তাঁর কান আমাদের কানের মত ইত্যাদি (নাঊযুবিল্লাহ)।

সম্মানিত পাঠক! আহলুত তা‘তীল বা যারা আল্লাহর নাম সমূহ ও গুণাবলীকে অস্বীকার করে তাদের মধ্যে উপরোক্ত তিনটি ফিরক্বা অন্যতম। যাদের মধ্যে (১) জাহমিয়্যাহ; যারা আল্লাহর নাম সমূহ ও গুণাবলীর সবগুলিকেই অস্বীকার করে। (২) মু‘তাযিলা; যারা আল্লাহর নাম সমূহকে স্বীকার করে। কিন্তু তাঁর ছিফাত বা গুণাবলীর সবগুলিকেই অস্বীকার করে। (৩) আশ‘আরিয়্যাহ; যারা আল্লাহর নাম সমূহ স্বীকার করে কিন্তু গুণাবলীর মধ্যে শুধুমাত্র সাতটি গুণকে স্বীকার করে। আর বাকী গুণাবলী অস্বীকার করে। উপরোক্ত বিভ্রান্ত ফিরক্বা সমূহ কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত আল্লাহর ছিফাত বা গুণাবলীকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করে। যেমন আল্লাহর হাত অর্থ কুদরতী হাত, আল্লাহর চেহারা অর্থ তাঁর অস্তিত্ব; আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্থ তাঁর পুরস্কার, আল্লাহর ক্রোধান্বিত হওয়া অর্থ তাঁর শাস্তি ইত্যাদি। পক্ষান্তরে অপর বিভ্রান্ত ফিরক্বা (মুশাবিবহা বা মুজাসসিমা); যারা আল্লাহর নাম সমূহ ও গুণাবলীর সবগুলিকেই স্বীকার করে, কিন্তু আল্লাহর গুণাবলীকে মানুষের গুণাবলীর সাথে তুলনা করে। ফলে এরা আল্লাহর নাম সমূহ ও গুণাবলীকে স্বীকার করেও পথভ্রষ্ট হয়েছে।

এ বিষয়ে সঠিক আক্বীদা হ’ল এই যে, মহান আল্লাহ অবশ্যই নাম ও গুণযুক্ত সত্তা। তবে তাঁর সত্তা ও গুণাবলী বান্দার সত্তা ও গুণাবলীর সাথে তুলনীয় নয়। বরং কুরআন ও ছহীহ হাদীছে আল্লাহর নাম ও গুণাবলী যেরূপে বর্ণিত হয়েছে সেরূপেই তাঁর প্রতি ঈমান আনতে হবে। এক্ষেত্রে কোনরূপ পরিবর্তন, পরিবর্ধন, অস্বীকার ও দৃষ্টান্ত পেশ করা যাবে না। এই মধ্যবর্তী পথই হ’ল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের পথ ও গৃহীত আক্বীদা। যা ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের গৃহীত আক্বীদার অনুরূপ।

সম্মানিত পাঠক! ইতিপূর্বে এ বিষয়ে চার ইমামের আক্বীদা আলোচনা করা হয়েছে; যেখানে সরাসরি তাদের উক্তি পেশ করা হয়েছে। যাতে প্রমাণিত হয়েছে যে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদার সাথে ইমাম চতুষ্টয়ের আক্বীদাগত কোন পার্থক্য নেই। কারণ সকল ইমামই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আর আক্বীদাই হ’ল ইসলামের মৌলিক বিষয়। তাই কেউ যদি কোন মাযহাবের অনুসরণ করতে চায়, তাহ’লে তার কর্তব্য হবে সর্বপ্রথম তার অনুসরণীয় মাযহাবের ইমামের আক্বীদা গ্রহণ করা। অর্থাৎ যদি কেউ হানাফী মাযহাবের অনুসরণ করতে চায় তাহ’লে তার কর্তব্য হবে ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) যে আক্বীদাহ পোষণ করেছেন তার অনুসরণ করা। অনুরূপভাবে যদি কেউ শাফেঈ, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের অনুসরণ করতে চায় তাহ’লে তার কর্তব্য হবে তাদের অনুসরণীয় মাযহাবের ইমামদের আক্বীদা গ্রহণ করা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হ’ল ভারত উপমহাদেশের (ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম; যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী বলে দাবী করেন তারা আক্বীদার দিক থেকে আশ‘আরিয়্যাদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়েছে। আশ‘আরিয়্যারা যেমন আল্লাহর ছিফাতকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করেন। তেমনিভাবে ভারত উপমহাদেশের অধিকাংশ হানাফী ওলামায়ে কেরামও আল্লাহর ছিফাতকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করে এবং বলে যে, আল্লাহর হাত অর্থ তাঁর কুদরত, আল্লাহর চেহারা অর্থ তাঁর অস্তিত্ব ইত্যাদি। তাই আমাদের দেশের হানাফী মাযহাবের অনুসারীরা নিজেদেরকে হানাফী মাযহাবের অনুসারী বলে বুলি আওড়িয়ে মুখে ফেনা তুললেও তারা তাদের দাবীতে সত্যবাদী নয়। কারণ তারা ফিক্বহী মাস‘আলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে হানাফী মাযহাবের অনুসরণ করলেও ইমলামের মৌলিক বিষয় আক্বীদাগত দিক থেকে তারা আশ‘আরী, মু‘তাযিলী, জাহমী এবং মাতুরিদিয়্যাদের অনুসারী। প্রকৃত হানাফী সেই ব্যক্তি যার আক্বীদা হবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা। যে ব্যক্তি যাবতীয় যঈফ ও জাল হাদীছ বর্জন করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুসারী হবে। কেননা ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলে গেছেন, إِذَا صَحَّ الْحَدِيْثُ فَهُوَ مَذْهَبِيْ- ‘যখন ছহীহ হাদীছ পাবে, জেনো সেটাই আমার মাযহাব’।[13]

[চলবে]


[1]. ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফতাওয়া ৩/১৩০ পৃঃ; মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছাইমীন, শারহুল আক্বীদাতিল ওয়াসেত্বিয়া, (দারু ইবনিল জাওযী, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪২৭ হিজরী), পৃঃ ৭৪-৮৫ ।

[2]. ইবনুল ক্বাইয়িম, ই‘লামুল মুওয়াক্বি‘ঈন, (দার ইবনুল জাওযী, ৩য় সংস্করণ, ১৪৩৫ হিজরী) ২/৯১ পৃঃ।

[3]. তিরমিযী হা/২৬৪১; মিশকাত হা/১৭১; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৩৪৩; তারাজু‘আতুল আলবানী হা/১১।

[4]. ইমাম বুখারী, খালকু আফ‘আলিল ইবাদ ওয়ার রদ্দ আলাল জাহমিয়্যাহ, (মাকতাবা দারুল হিজায, তৃতীয় সংস্করণ-২০১৪), পৃঃ ১৪৫।

[5]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৮/২২৯ পৃঃ।

[6]. ঐ, ১৪/৩৪৯ পৃঃ ।

[7]. শারহুল আক্বীদাতুল ওয়াসেতিয়্যাহ, ৩৩৭ পৃঃ ।

[8]. ড. মাহমূদ মুহাম্মাদ মাযরূ‘আহ, ফিরাক্ব ইসলামিয়্যাহ, (দারুর রিযা, ২য় সংস্করণ ২০০৩), পৃঃ ১০৭-১০৮; শারহু আক্বীদাহ ওয়াসেত্বিয়্যাহ ৩৪১-৩৪৩ পৃঃ।

[9]. শারহু আক্বীদাহ ওয়াসেত্বিয়্যাহ ৩৪১-৩৪৩ পৃঃ।

[10]. ফিরাক্ব ইসলামিয়্যাহ ১১৩ পৃঃ।

[11]. আল-মিলাল ওয়ান নিহাল ১/৩৮ পৃঃ।

[12]. ফিরাক্ব ইসলামিয়্যাহ, পৃঃ ১৪৭-১৬২।

[13]. হাশিয়াহ ইবনে আবেদীন, ১/৬৩ পৃঃ।

HTML Comment Box is loading comments...