ভ্রমণ স্মৃতি


মসজিদুল হারামে ওমরাহ ও ই‘তিকাফ

আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
এম.ফিল গবেষক, আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

হজ্জ-ওমরাহ পালনের সুপ্ত বাসনা নেই এরূপ মুসলমান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যথারীতি সেই আকাংখা সুপ্ত ছিল আমার মধ্যেও। তবে এই নবীন বয়সেই সেটা পূরণ হয়ে যাবে এমনটা কখনো ভাবতে পারিনি। ২০০০ সালে আমার আববু (প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব) শেষবারের মত হজ্জব্রত পালন করেছিলেন সঊদী রাজকীয় মেহমান হিসাবে। এরপর থেকে বিগত ১৪ বছর তিনি বিদেশ সফর করেননি। ২০১৩ সালের ২৩শে নভেম্বর সকল মিথ্যা মামলা থেকে বেকসুর খালাস পাওয়ার পর মাঝে-মধ্যেই সপরিবারে হজ্জ বা ওমরায় যাওয়ার আকাংখা প্রকাশ করতেন। কিন্তু তাঁর পাসপোর্টটি অজ্ঞাত কারণে প্রশাসনের হাতে দীর্ঘদিন আটকে থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। অবশেষে গত ১৫ এপ্রিল’১৪ মঙ্গলবার পাসপোর্ট হাতে আসল। আববুর ইচ্ছা রামাযানের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করবেন। কিন্তু এবারের রামাযানে ওমরাহর জন্য খুবই সীমিত ভিসা ইস্যু হওয়ায় শেষ দশকের জন্য ভিসা পাওয়া যাবে না বলে জানানো হ’ল। ফলে আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। হঠাৎ ১৫ই রামাযান সোমবার ইফতারের পূর্বে ঢাকা থেকে ফোন আসলো। আববুকে জানানো হ’ল, সঊদী এ্যাম্বাসীর বিশেষ ব্যবস্থায় আমাদের ভিসা ওকে হয়েছে এবং ১৭ই রামাযান বুধবার বিকেল ৫-টায় সাঊদিয়া এয়ারলাইন্সে যাত্রা করতে হবে। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এত অল্প সময়ে হাতে থাকা সমস্ত কাজ গুছিয়ে নেয়া কি সম্ভব!! যাহোক ঝড়ের বেগে কাজ শুরু হ’ল। সবকিছু গুছিয়ে ১৭ই রামাযান ভোর ৫-টার কোচে আববুর সাথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’লাম। গাড়ীতে সামান্য ঘুমের পর শুরু হ’ল সবাইকে জানানো। নেতা-কর্মী, আত্মীয়-স্বজন সকলেই বিস্মিত হ’লেন। বেলা সোয়া ১০-টায় ঢাকায় পৌঁছে লালমাটিয়া কলেজের শিক্ষক জনাব আশরাফ ভাইয়ের বাসায় সামান্য বিশ্রাম নিয়ে যোহর ও আছরের ছালাত জমা করে চললাম বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে। মাসিক আত-তাহরীক সম্পাদক ড. সাখাওয়াত হোসাইন ও ঢাকা যেলা ‘আন্দোলন’-এর দায়িত্বশীলগণ আগে থেকেই এয়ারপোর্টে ছিলেন। তাঁদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে বেলা সাড়ে ৩-টায় এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে ঢুকলাম। অতঃপর সেখানে কর্মরত পূর্ব পরিচিত আবুবকর, রওশন হাবীব ও হামীদুর রহমান ভাইদের সহযোগিতায় অল্প সময়েই ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করে যথাসময়ে বিমানে চড়ে বসলাম। সাঊদিয়া এয়ারলাইন্সের ঢাউস সাইজের বিমানে চড়া, দেশের বাইরে প্রথম যাওয়া, সব মিলিয়ে আমার কৌতূহলটা ছিল একটু বেশীই। সাড়ে ৫-টায় বিমান চলতে শুরু করল। উপরে উঠতে শুরু করার পর চিরচেনা কংক্রিটে মোড়া  ইট-পাথরের  ঢাকা  শহর  সম্পূর্ণ নতুনরূপে আবির্ভূত হ’ল। তারপর চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। দেখতে দেখতে বিমানটি ৩৩ হাযার ফুট উচ্চতায় উঠে থিতু হ’ল। পশ্চিম মুখে ধাবমান বিমানটির গতি ছিল ঘণ্টায় গড়ে ৯৫০ কি.মি.। বাংলাদেশের হিসাবে মাগরিবের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাইরে সূর্য তখনও স্পষ্ট দীপ্তিমান। অনেক অপেক্ষার পর সূর্য অস্ত গেল রাত্রি ৯-টার পরে। ফলে এদিন আমাদের ছিয়াম দু’ঘণ্টা বেশী দীর্ঘ হয়ে গেল। ইফতারের পর বাংলাদেশ সময় রাত ১০-টায় বিমানটি সঊদী আরবের দাম্মাম বিমানবন্দরে অবতরণ করল। এখানে ১ ঘণ্টা বিরতিকালে আমরা বিমানের মধ্যেই ছালাত আদায়ের স্থানে ওমরাহর জন্য ইহরামের কাপড় পরলাম ও দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করলাম। আমাদের মত আরও অনেকে সেখানে ইহরামের কাপড় পরলেন। অতঃপর বিমান আবার উড়ল জেদ্দার উদ্দেশ্যে। উড্ডয়নের আধা ঘণ্টা পর এবং ইয়ালামলাম মীক্বাত থেকে আধা ঘণ্টার দূরত্বে থাকা অবস্থায় মাইকে ওমরাহ যাত্রীদের ইহরাম বাঁধার প্রস্ত্ততি নেওয়ার ঘোষণা আসল। তারপর সঊদী সময় রাত ৯.৪০ মিনিটে বিমান জেদ্দা বিমানবন্দরে ল্যান্ড করল। সাজানো-গোছানো হলুদ বাতিতে গোটা শহর যেন জ্বলছে। উপর থেকে বিমানবন্দরের বিশালতাও ভালোই টের পাওয়া গেল। এক জায়গায় একত্রে পার্কিং-য়ে থাকা এতগুলো বিমান দেখে আমার চক্ষু তো ছানাবড়া। জেদ্দায় মোট ৪টি বিমানবন্দর রয়েছে। শুনলাম সমন্বিতভাবে যার আয়তন আড়াই’শ বর্গকিলোমিটার। বিমান থেকে নেমে বাসযোগে হজ্জ টার্মিনালে পৌঁছলাম। শুরু হ’ল অপেক্ষার পালা। আমাদের পরে টার্মিনালে আসা শত শত ভিনদেশী যাত্রীর কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশীদের দিকে কেউ তাকায় না। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বাংলাদেশীদের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শুরু হ’ল। ধাপে ধাপে এগিয়ে রাত প্রায় আড়াইটার সময় আমরা ইমিগ্রেশন পার হ’লাম। বিমানবন্দরের বাইরে এসে মোবাইল সিম কিনে যখন আমাদের জন্য রাত ১০-টা থেকে অপেক্ষমান শহীদুল ইসলাম চাচার কাছে ফোন দিলাম, তখন তিনি আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত করে আল-হামদুলিল্লাহ পড়লেন। মোবাইলে যোগাযোগে ব্যর্থ হওয়ায় সবার মধ্যে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছিল। বের হবার পর তিনি সবাইকে জানিয়ে দিলেন আমাদের পৌঁছনোর সংবাদ। সে রাতে সাহারী খেলাম জেদ্দার জনৈক বাংলাদেশী টিপু সুলতান ভাইয়ের বাসায়।

সাহারীর পর বেরিয়ে পড়লাম জেদ্দা থেকে ৮৫ কি.মি. দূরে মক্কার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে জেদ্দার ক্বিছাছ মসজিদে ফজরের ছালাত আদায় করলাম। আযান দেওয়ার বড় মাইকে পুরো ছালাত আদায় করানো হয়, যাতে আশপাশের মানুষ ছালাত চলার বিষয়টি জানতে পারে। সঊদী আরবের অধিকাংশ মসজিদ খুবই জাঁকজমকপূর্ণ। ঢুকলে আর বের হ’তে মন চায় না। ক্বিছাছ মসজিদের সামনেই শারঈ আদালতের হুকুম মোতাবেক শিরশ্ছেদসহ বিভিন্ন শাস্তি বাস্তবায়ন করা হয়। শহীদুল চাচা সে স্থানটি দেখালেন। সাধারণত শুক্রবারে এখানে আদালতের রায় অনুযায়ী হুদূদ (দন্ড) বাস্তবায়ন করা হয় এবং এর জন্য পৃথকভাবে জনগণের মধ্যে ঘোষণা দেওয়া হয়।

সেখান থেকে বের হয়ে আমরা মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’লাম এবং সকাল ৬-টায় মক্কা মুকাররামায় পৌঁছলাম। শহীদুল চাচা আমাদেরকে সবকিছু চিনিয়ে দিয়ে আমাদের ব্যাগ-পত্র নিয়ে হোটেলে চলে গেলেন। এখন শুধু আমি আর আববু। বিপুল আগ্রহে এগিয়ে চললাম হারামের দিকে। সবকিছু ছবির মত মনে হচ্ছে। ছবিতে দেখা, ভিডিওতে দেখা মাসজিদুল হারাম আজ বাস্তবে ধরা দিয়েছে চোখের সামনে। অপরূপ নির্মাণশৈলী, সুউচ্চ মিনার, লাখো মানুষে ভরা হারামের বিশাল চত্বর। একপার্শ্বে দাঁড়িয়ে আছে ১৯৭২ ফুট উচ্চতার বিশালকায় যমযম ঘড়ি টাওয়ার, অপরপার্শ্বে হারামের নির্মীয়মাণ বিশালায়তন বর্ধিতাংশ। চোখের পলক যেন পড়তে চায় না। কিং ফাহদ গেট দিয়ে প্রবেশ করে এগিয়ে যেতে যেতে একসময় দৃষ্টিসীমায় এসে গেল কোটি মুসলিমের কাংখিত সেই পবিত্র গৃহ ‘কা‘বা’। সত্যিই এক অপার্থিব অনুভূতি। বারবার যেন মনে হচ্ছিল ‘এটা কি ছবি, না বাস্তব’! হাঁটতে হাঁটতে সকাল সাড়ে ৬-টায় তবাওয়াফের স্থানে পৌঁছে গেলাম। শুরু হ’ল ত্বাওয়াফ। নারী-পুরুষ সবাই একত্রে ঘূর্ণায়মান। কিন্তু কারোর প্রতি কারু কোন মন্দ খেয়াল নেই। কা‘বা গৃহের অপার্থিব আবেদন সবাইকে নিবিষ্ট করে রেখেছে কেবল দো‘আ ও তাসবীহ-তাহলীলে। সাত ত্বাওয়াফ শেষে ছাফা-মারওয়া সাঈ শুরু করলাম। তিনতলা বিশিষ্ট শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সাঈস্থলটির উভয়পার্শ্বে ছাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের সামান্য অংশই বর্তমানে দেখা যায়।

সাঈ শেষে চুল ছাটার পর সকাল সাড়ে ৯-টায় হারাম থেকে বের হয়ে হোটেলে ফিরে গেলাম। অতঃপর গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। বাদ আছর ছোটখাটো কেনাকাটা সেরে আমরা হারামের দিকে রওয়ানা হ’লাম। হারাম শরীফের আন্ডারগ্রাউন্ডস্থ বেজমেন্টটি মূলতঃ ই‘তিকাফকারীরাই ব্যবহার করেন। সেখানে পুরু গালিচা বিছানো রয়েছে। এর উপরে মুছাল্লা বা কোন কাপড় বিছিয়ে সবাই অবস্থান করে। ভিতরে প্রবেশ করে দেখি প্রচুর ভিড়। মনে হচ্ছে কোন জায়গা আর খালি নেই। অবশেষে সাথীদের প্রচেষ্টায় একটি জায়গা পেলাম এবং একদিন আগেই সেখানে আমাদের অবস্থান শুরু হ’ল। বিশাল বেজমেন্টে হাযার হাযার মানুষ একত্রে অবস্থান করছে। অধিকাংশ কুরআন পড়ছে, কেউ ছালাত আদায় করছে, আবার কেউ প্রয়োজনীয় কথা বলছে বা দো‘আ-দরূদ পড়ছে। এখানে কেউ কেউ পুরো রামাযান মাসই অবস্থান করছেন। বিভিন্ন দেশের মানুষ হওয়ায় কারো চেহারার সাথে কারো মিল নেই। তবুও ই‘তিকাফকারী হিসাবে সবার মধ্যে রয়েছে সুন্দর মিল।

ই‘তিকাফ চলা সত্ত্বেও আববুর সাথে দেখা করার জন্য প্রতিদিনই নতুন ও পুরাতন প্রবাসী ভাইয়েরা এসে সাক্ষাৎ করতেন। ১৮ই জুলাই শুক্রবার বাদ আছর জেদ্দা শাখা ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি সাঈদুল ইসলাম (বি-বাড়িয়া), সহ-সভাপতি ইসহাক (সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ), সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসাইন (কুমিল্লা) এবং আবু তাহের ভাই (সোনারগাঁ) সহ বেশ কয়েকজন আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। মাগরিব পর রিয়াদ থেকে এসে সাক্ষাৎ করেন সঊদী আরব ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি শায়খ মুশফিকুর রহমান (রাজশাহী) ও সদস্য শামসুর রহমান (টিকাপাড়া, রাজশাহী),  ‘আন্দোলন’-এর মক্কা শাখা সভাপতি হাসানুল ইসলাম (মাগুরা, সিনিয়র সুপারভাইজর, মক্কা হিলটন হোটেল), মক্কার ভাই আব্দুর রাযযাক (বরিশাল সদর), জসীমুদ্দীন (চাটখিল, নোয়াখালী), সাইফুল ইসলাম (ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর), মোহাম্মাদ সেলীম (রায়পুর, লক্ষ্মীপুর), আব্দুর রহমান (পাঁচবিবি, জয়পুরহাট), মাহফূযুর রহমান (খালিশপুর, খুলনা), আবদুল হালীম (কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা), ইয়াসীন (বরুড়া, কুমিল্লা) প্রমুখ। এদিন রাতে হাসানুল ইসলাম ভাই মাছের বিরানী খাওয়ালেন সবাইকে। সঊদী স্টাইলে প্লেট বিহীন একই দস্তরখানের উপর পুরো খাবার রেখে দিয়ে সবাই একসাথে গোল হয়ে বসে খাওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতাটা ভালই ছিল।

হাসান ভাইয়ের জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে আমাদের ব্যবস্থাপক শহীদুল ইসলাম চাচাকে সন্ধ্যা রাতের খাবার না দেওয়ার অনুরোধ জানালাম। হাসান ভাই প্রতিদিন বাদ মাগরিব প্রবেশদ্বারের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন। তার নিয়ে আসা প্রতিদিনের খাবারের মধ্যে বিশেষতঃ মুরগীর স্যুপ মিশ্রিত জাউ ভাতের স্বাদ এখনও জিহবায় লেগে আছে। ই‘তিকাফে তাঁর আন্তরিক খেদমতের কথা ভোলার মত নয়।  

ভোর রাতে সাহারী নিয়ে আসতেন শহীদুল চাচা ও তাঁর সাথীবৃন্দ। আববুর পসন্দমত করলা ভাজি, সবজি এবং গোশত প্রতিদিনই তিনি নিজ হাতে রান্না করে আনতেন। এছাড়া দেশী মাছের ঝোল, বড় বড় সামুদ্রিক ভাজা মাছ সহ আরো অনেক কিছুই খুব যত্নের সাথে ই‘তিকাফের দিনগুলিতে তিনি আমাদেরকে খাইয়েছেন। নিরহংকার সাধাসিধে এই মানুষটির স্বহস্তে রান্না করা খাবারের অসাধারণ স্বাদ, সুরসিক ব্যবহার, সর্বোপরি আমাদের প্রতি তাঁর সুতীক্ষ্ণ দায়িত্ববোধ প্রতিনিয়তই আমাদেরকে মুগ্ধ করত।

১৯শে জুলাই শনিবার বিকালে ইফতারীর কিছু আগে শহীদুল চাচা আমাদের ডাকতে আসলেন। আববুকে বললেন, ডা. যাকির ভাই আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং মাত্বাফে আপনার সাথে একত্রে ইফতার করতে আসছেন। আগে থেকেই শুনেছিলাম তিনি যমযম টাওয়ারের ২১তম তলায় সপরিবারে অবস্থান করছেন। ই‘তিকাফ শেষে তাঁর সাথে আববুর সাক্ষাতের কথা ছিল। যাইহোক মাত্বাফে এসে দু’এক মিনিট অপেক্ষা করতেই ডা. যাকির নায়েক তাঁর ছেলে ফারিক নায়েককে নিয়ে উপস্থিত হ’লেন। সোজা এসে আববুর সাথে কোলাকুলি করে দীর্ঘ কুশল বিনিময় করলেন। আমার সাথেও কোলাকুলি হ’ল। তাঁর ছেলে ফারিকের সাথেও পরিচয় ও অল্প কথাবার্তা হ’ল। ইফতারের সময় সমাগত। সবাই একত্রে বসে পড়লাম। আযান হ’লে ইফতার শুরু করলাম। কা‘বাগৃহের সামনে বসে ইফতারীতে যেন একটা ভিন্ন আমেজ সৃষ্টি হ’ল। পরে ছালাত আদায়ের সময়ও কেমন যেন একটা অপরিচিত স্বাদ অনুভব করছিলাম। অথচ ছালাতের ক্ষেত্রে কা‘বাগৃহ কেবলমাত্র ক্বিবলা ছাড়া কিছুই নয়। দাসত্ব পাওয়ার হকদার কেবল আল্লাহ। মূর্তি সামনে রেখে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার ক্ষেত্রেও মনে হয় একই অনুভূতি হয়। সেখানে শয়তান ধোঁকা সৃষ্টি করে এবং মূর্তিকে আল্লাহ প্রাপ্তির অসীলা মনে করে। যেটা স্পষ্ট শিরক। অন্যান্য বিষয় ছাড়াও যখন ডা. যাকির নায়েক এবং আববুকে পাশাপাশি পায়ে পা মিলিয়ে, সুন্দরভাবে বুকে হাত বেঁধে ও রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে পূর্ণ মনোযোগের সাথে ছালাত আদায় করতে দেখলাম, তখন মনটা খুশীতে ভরে গেল। ছালাত শেষে তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে কথা হ’ল। ডা. যাকির নায়েক কথার ফাঁকে ‘পীস টিভি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে’ বলতেই আববু বললেন, ‘আমি তো ভাই টিভির লোক নই’। আববুর কথা শুনে তিনি হেসে ফেললেন। আববু এ বছর পীস টিভিতে দেওবন্দী ও ব্রেলভী বক্তাদের সুযোগ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, তাদের সাথে আমাদের একটা সেতুবন্ধন তৈরী করার জন্যই এটা করা হয়েছে। তবে তাদের কোন বাতিল বা ছহীহ হাদীছ বিরোধী বক্তব্য রাখা হচ্ছে না, কেটে ফেলা হয়েছে। তিনি বিদায় নেয়ার সময় সিদ্ধান্ত হ’ল যে, পরের দিনগুলিতে এই স্থানেই আমরা একত্রে ইফতার করব। সে মোতাবেক পরের দুই দিনও তিনি আসলেন এবং আমরা একত্রে ইফতার করলাম। কিন্তু তারপর থেকে আববুর হাঁটুর ব্যথা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমরা আর মাত্বাফে যেতে পারিনি।

২০শে জুলাই রবিবার দুপুরে মক্কা প্রবাসী আব্দুল হালীম (কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা) ও বারাকাত ভাই (মানিকগঞ্জ) এসে সাক্ষাৎ করলেন। কথার ফাঁকে আববু ‘হাজারে আসওয়াদ’ চুমু খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে আব্দুল হালীম ভাই বললেন, আমি তো রাতে এবং ভোরে ‘হাত্বীম’-এর ভিতরেই দায়িত্ব পালন করি। হাত্বীম পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে বাকি দায়িত্ব আমার। শুনে খুব আনন্দিত হ’লাম। মাগরিবের পর খাওয়া-দাওয়া সেরে সাড়ে ৮-টায় যথাস্থানে পৌঁছে গেলাম। ততক্ষণে হাত্বীমের চারপাশ ঘিরে এশার ছালাতের কাতার দাঁড়ানো শুরু হয়ে গেছে। ছালাতের জন্য পুলিশ ‘হাজারে আসওয়াদ’ চুমু দেওয়ার সুযোগও বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদেরকে দেখে আব্দুল হালীম ভাই এগিয়ে আসলেন এবং চুমু দেওয়ার জন্য সাথে করে নিয়ে গেলেন। হাজারে আসওয়াদের পাশে কেবল আমি, আববু এবং আব্দুল হালীম ভাই। কেমন যেন বিস্ময়কর ঠেকছিল। কারণ প্রথমদিন এসে আববুকে বলছিলাম, এই ভিড়ের মধ্যে পাথরে চুমু দেওয়ার স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। যাইহোক প্রথমে আববু তারপর আমি চুমু খেলাম। হাত বুলিয়ে পরখ করে দেখলাম জান্নাতী এই পাথরটি। কষ্টসাধ্য একটি বিষয় এত সহজে সম্পন্ন হয়ে যাওয়ায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।

২১শে জুলাই সোমবার মাগরিবের পূর্বে মাত্বাফে যাওয়ার পথে নরসিংদীর মাধবদী বাজারের ব্যবসায়ী মুছাদ্দিক ছাহেবের সাথে আমাদের সাক্ষাত হয়। তিনিও ই‘তিকাফে এসেছেন। ২২শে জুলাই আমাদের ঢাকা অফিসের বাড়ীওয়ালা হাসান ভাই (অর্থ সম্পাদক, ঢাকা যেলা ‘যুবসংঘ’) এসে আমাদের সাথে ইফতার করলেন। তিনি তাঁর মাকে নিয়ে রামাযানের শুরু থেকেই মক্কায় অবস্থান করছিলেন। সেদিন আরো দুই ভাই বারাকাত (মানিকগঞ্জ) ও রাসেল (রায়পুরা, নরসিংদী) দেখা করতে আসলেন। তারা মক্কায় ও হারামের অনেক অজানা তথ্য আমাদের জানালেন। ২৪ তারিখ বৃহস্পতিবার বাদ যোহর মক্কা থেকে ১৭০০ কি.মি. দূরে জর্ডান সীমান্তবর্তী ‘ক্বারিয়াত’ (القريات) দাওয়াহ সেন্টারের দাঈ জনাব আব্দুর রাযযাক (খয়েরসূতি, পাবনা) আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলেন। তিনি সপরিবারে ওমরাহ করতে এসেছেন। ২০০০ সালে মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায় তিনি আববুকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করতে দেখেছিলেন। তারপর এই প্রথম দেখা। তাঁর সেন্টারে ১৫ কপি ‘আত-তাহরীক’ নিয়মিত যায় বলে তিনি জানালেন।

এর মধ্যে একদিন শায়খ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদের বাঙ্গালী ড্রাইভার বেলাল ভাই শায়খের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওমরাহ করতে এসে আমাদের সাথে মিলিত হ’লেন। এদিন তার কাছে শায়খের কার্যক্রম সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। তিনি শায়খের বড় ছেলের হত্যাকান্ড এবং এ ব্যাপারে সঊদী কোর্টের বিচার সম্পর্কে চমৎকার তথ্য দিলেন। ঘটনা ছিল যে, শায়খের ছেলের সাথে তার বন্ধুর কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে একপর্যায়ে ঐ বন্ধুটি তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। পরে পুলিশ ঘাতক বন্ধুকে গ্রেফতার করে কোর্টে হাযির করে। বেলাল ভাই তার শায়খ ও তাঁর অপর দুই ছেলেকে নিয়ে কোর্টে উপস্থিত হ’লেন। উকিল বিহীন আদালতে শায়খ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তাঁর ছেলের হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিলেন। ইসলামী আইন মোতাবেক বাদী ক্বিছাছের পরিবর্তে বিবাদীকে ক্ষমা করে দেওয়ার অধিকার রাখে। সুতরাং বিচারকের কিছুই করার ছিল না। কিন্তু বিচারক আসামীর সংশোধনের জন্য এক বিস্ময়কর শাস্তি দিলেন। তাকে কারাগারে কুরআন হেফয করতে হবে এবং যেদিন হেফয শেষ হবে সেদিন সে মুক্তি পাবে। সব মিলিয়ে ৪০ মিনিটে সেদেশের একজন বিখ্যাত ব্যক্তির সন্তানের হত্যা মামলার সমাপ্তি ঘটলো। অথচ আজ এই সুন্দর বিচারব্যবস্থাকেই বলা হচ্ছে সেকেলে (?)। আমাদের দেশে হয়ত এরূপ একটি মামলা একদিকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, জজকোর্ট, হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্ট, আপিলবিভাগ সবমিলিয়ে ন্যূনতম ১০-১৫ বছর দীর্ঘায়িত হ’ত। অপরদিকে বাদী-বিবাদীর পকেট ছাফ হয়ে তাদের পথে বসতে হ’ত। অথবা বাদী-বিবাদী মারা যেত, মামলা শেষ হ’ত না। যেমন আমার আববুর বিরুদ্ধে বিগত সরকারের দেওয়া মিথ্যা মামলা শেষ হ’তে ৮ বছর ৮ মাস ২৮ দিন লাগল। তিনি বিনা বিচারে অন্যায়ভাবে ৩ বছর ৬ মাস ৬দিন কারা যন্ত্রণা ভোগ করলেন। কিন্তু মিথ্যা মামলা দায়েরকারী তৎকালীন সরকারের কোন শাস্তি হ’ল না। এটা কি ন্যায়বিচার? এভাবেই আমরা বিগত বৃটিশদের রেখে যাওয়া আইন সগর্বে লালন করছি। কিন্তু ইসলামের আইন আমাদের কাছে অপসন্দনীয়। কতই না নির্বোধ আমরা!

২৫শে জুলাই শুক্রবার আছরের ছালাতের পূর্বে আমরা টয়লেটে গিয়েছি। ফিরে এসে দেখি আমাদের ই‘তিকাফের স্থানে কয়েকজন নতুন ব্যক্তি জামা‘আতে দাঁড়াচ্ছেন। আমি গিয়ে একজনকে সামনের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতেই দেখি পাশে আমাদের মেযবান তাঁদের সাথে। বুঝলাম না ঘটনা কী। তারপর কিছু না বলে আমরা সামনের কাতারে ফাঁকা  জায়গায়  দাঁড়িয়ে  ছালাত  আদায় করলাম। সালাম ফিরানোর পর দেখি আমাদের কাংখিত পাকিস্তানী মেহমান। যার নাম জানতাম। কিন্তু দেখিনি কখনো। সেদিন সকালেই তিনি পাকিস্তান থেকে সপরিবারে  মক্কায়  এসেছেন।  তিনি  হ’লেন  ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’র সাবেক প্রফেসর ও বর্তমানে ‘আল-হুদা ইনটারন্যাশনাল’-এর ডাইরেক্টর ড. ইদরীস যুবায়ের। যাঁর স্ত্রী একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রফেসর ও বর্তমানে একই সেন্টারের মহিলা বিভাগের পরিচালিকা এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের ধর্মীয় আলোচক ড. ফারহাত হাশেমী। ছেলে হিশামসহ তাঁরা ৪ জন আমাদেরকে খুঁজতে খুঁজতে অজান্তেই আমাদের স্থানটি খালি পেয়ে সেখানেই জামা‘আতে দাঁড়িয়ে গেছেন। ব্যাপারটি জেনে আমরা সবাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। একই বিছানায় আমাদের মেযবানসহ তিন মুরববীর তিন ছেলে মোট ছয়জন একত্রে বসলাম। সেসময় পাকিস্তানের ইসলামাবাদে তাঁর সেন্টারেই আমার বড়ভাই আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব ই‘তিকাফরত ছিল। ই‘তিকাফে বসার দু’দিন আগে মটরসাইকেল এ্যাক্সিডেন্টে ভাইয়ার বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুলে ফ্র্যাকচার হয়েছিল। ওমরায় আসার দিন তিনি ঐ প্লাস্টার বাঁধা হাতসহ ভাইয়ার সাথে মোবাইলে একটা ছবি তুলেছিলেন। সেটা তিনি আমাদের দেখালেন। কথার ফাঁকে দুই হারামে অনুষ্ঠিত শেষ দশকের রাতের প্রথমভাগ ও শেষভাগ মিলে মোট ৩৩ রাক‘আত রাত্রির নফল ছালাত নিয়ে কথা উঠলো। তিনি বললেন, ৮ রাক‘আতই যে রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরও আমাদের মেযবান প্রতি রাক‘আতে ১ লক্ষ নেকী হিসাবে ২০ লাখ নেকী থেকে বঞ্চিত হওয়ার বেদনা প্রকাশ করলে আববু বললেন, দেখুন সুন্নাত বহির্ভূত কোন আমলে নেকীর আশা করা ঠিক নয়। বরং সুন্নাতের অনুসরণেই নেকী নিহিত। ড. ইদরীস যুবায়েরের ছেলে হিশাম এটি সবাইকে খুশী রাখার জন্য সঊদী সরকারের একটি রাজনীতি বলে আখ্যায়িত করলেন। আরো বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার পর তাঁরা বিদায় নিলেন।

এছাড়া আমভাবে অনেক প্রবাসী ভাই প্রতিদিন সাক্ষাৎ করতে আসতেন। যাদের অপরিসীম আন্তরিকতা, অকৃত্রিম ভালোবাসা কখনো ভুলবার নয়। অনেকের সাথেই আববুর এই প্রথম সাক্ষাৎ। কিন্তু আক্বীদা ও আমলের ঐক্যের কারণে সবাই যেন দেখামাত্রই আপনজন হয়ে যাচ্ছিলেন। আক্বীদার ঐক্য যে কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসে তা আরেকবার টের পেলাম। আর সবার মধ্যে বিশেষতঃ যারা সঊদী আরবে এসে আহলেহাদীছ হয়েছেন তাদের সকলের একটিই বক্তব্য ‘সঊদী আরবে এসে আমরা আর কি পেয়েছি জানি না, তবে সঠিক পথ খুঁজে পেয়েছি এটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া’।

মক্কা-মদীনা মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রীয় মিলনস্থল। শেষ দশকে পৃথিবীর সকল দেশের মানুষই মনে হয় এখানে জমা হয়। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার এসব অপরিচিত মানুষদের সাথে কথা বলতে আমার ভালো লাগত। যদিও অভ্যাস না থাকায় আরবী-ইংরেজী বলতে বেশ অসুবিধায় পড়তাম। একদিন এক নাইজেরিয়ান সরকারী অফিসারের সাথে আলাপচারিতায় তিনি তাঁর দেশের চরমপন্থী গ্রুপ বোকো হারামের কার্যক্রম নিয়ে খুবই দুঃখ প্রকাশ করলেন। এরা সে দেশে ‘সালাফী’ হিসাবে পরিচিত কি-না জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এদের কোন ধর্ম নেই। এদের ধর্ম একটাই যে, এরা তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যাকে খুশী হত্যা করবে। তিনি বললেন, সেদেশের মুসলমানরা অধিকাংশই বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমল সম্পন্ন। এদের অধিকাংশ মালেকী হ’লেও তাদের সাথে সালাফীদের তেমন কোন পার্থক্য নেই। কারণ তারা মাযহাবপন্থী হ’লেও কোন বিষয়ে ছহীহ হাদীছ পেলে মাযহাবী সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করতে দ্বিধা করে না।

আমাদের পাশেই ই‘তিকাফে বসেছিলেন সঊদী আরব প্রবাসী এক মিসরী ভাই মুহাম্মাদ। তিনি ইখওয়ানের দ্বিতীয় স্তরের কর্মী। জেনারেল সিসির সাথে ইখওয়ানের সংঘাতের সময় সঊদী থেকে দেশে ফিরে গিয়ে আনেদালনে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে ৩-৪টি গুলি খেয়েও বেঁচে গিয়ে আবার সঊদীতে ফিরে এসেছেন। দেশের রাজনীতি নিয়ে সবসময় চিন্তাক্লিষ্ট। দলের প্রতি খুবই একনিষ্ঠ। তিনি বললেন, মিসরীদের পড়াশুনা শুরু হয় কুরআন হেফয করার মধ্য দিয়ে। বর্তমান জামে‘ আযহারের অবস্থা নিয়ে অনেক দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, আযহারসহ সারা মিসরে নৈতিক অবক্ষয় বর্তমানে চরমে উঠেছে। অসামাজিক কার্যকলাপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ পাপকে পাপ বলে মনে করছে না। তার একটি কথা আমার সবসময় মনে থাকবে। তা হ’ল, আজকের মিসরের অবস্থা হ’ল, ‘ইলমুন কাছীর ওয়া আমালুন ক্বালীল’ অর্থাৎ ‘জ্ঞান প্রচুর কিন্তু আমল অল্প’। মনে হয় কথাটি কেবল মিসর নয়, সকল দেশের জন্য প্রযোজ্য। তিনি বললেন, নীতিভ্রষ্টতার কারণে আমরা মিসরে ‘হিযবুন নূর’ নামে রাজনীতিতে নতুন যোগদানকারী সালাফী দলটিকে ‘হিযবুয ঝুর’ তথা ‘মিথ্যার দল’ হিসাবে আখ্যায়িত করে থাকি। তিনি গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিরোধিতা করলেও এটা কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম বলে আখ্যায়িত করলেন এবং বললেন, ক্ষমতায় গিয়ে আমাদের দল এ পদ্ধতি বাতিল করে দেবে। উত্তরে আমি বললাম, ‘অবৈধ পথে কোন বৈধ কাজ উদ্ধার হয় কি’? জবাবে তিনি চুপ থাকলেন।

হারাম শরীফে অবস্থানরত মুছল্লীদের দেখে একটা বিশেষ অনুভূতি হ’ল যে, এটা এমন একটা স্থান, যেখানে ধনী-গরীব, দেশী-বিদেশী সবাই সমান হয়ে যায়। সবাই একই পোষাকে ত্বাওয়াফ-সাঈ করে। সবাই একইসাথে বসে ই‘তিকাফরত। সবাই সবার জন্য ত্যাগ স্বীকারে ব্যস্ত। কে কাকে কত সাহায্য করতে পারে, কে কাকে কত খাওয়াতে পারে সেই প্রতিযোগিতা সর্বত্র। কেউ খেজুর দিচ্ছে, কেউ নির্দিষ্ট স্থান থেকে যমযম পানি এনে সকলের মাঝে বিতরণ করছে, কেউবা শরবত বিতরণ করছে। কেউ টিস্যু বক্স নিয়ে এগিয়ে আসছে। আর ইফতার ও সাহারী পরস্পরকে খাওয়ানোর জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা বৈ-কি! সবার মাঝে কেবল নেকী অর্জনের প্রচেষ্টা। প্রচুর ভিড় ঠেকাতে ও শৃংখলা রাখতে পুলিশের বিভিন্ন বাধা-নিষেধ সত্ত্বেও কেউ ক্ষিপ্ত হচ্ছে না। হারামে মাক্কীর পূত-পবিত্রতার প্রভাবে সবার রাগ যেন পানি হয়ে গেছে। ইলেকট্রনিক বিল-বোর্ডে বারবার ভেসে উঠছে রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ لاَ تَغْضَبْ ‘ক্রুদ্ধ হয়ো না’। মুমিনের জন্য এই একটি হাদীছই যথেষ্ট। ভাবছিলাম, এরূপ নেকী অর্জনের প্রতিযোগিতা এবং গোনাহ থেকে বাঁচার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা যদি আমরা সর্বদা ধরে রাখতে পারতাম!

হারামে সবচেয়ে বেশী ভীড় হয় রামাযানের ২৭ ও ২৯-এর রাত্রে। আর শেষ দশকের জুম‘আর ছালাতগুলিতে। এই দুই ক্বদরের রাত্রিতে পুরো হারাম এলাকা সহ আশপাশে সব জায়গা ভর্তি হয়ে যায়। লাখো মানুষের জামা‘আতবদ্ধ ইবাদত। সাথে শায়খ সুদাইসীর শ্রুতিমধুর হৃদয়গ্রাহী তেলাওয়াত। সব মিলিয়ে এক ভিন্ন আবহ সৃষ্টি হয়।

মক্কায় প্রথম দিন এসেই বুঝতে পেরেছিলাম যে এখানকার বাতাসে জলীয় বাষ্প কম থাকায় প্রচন্ড গরমেও ঘাম হয় না। এছাড়া প্রতিদিন গোসল সেরে কাপড় শুকানোও ছিল খুবই সহজ। কোথায় ১০ মিনিট কাপড় মেলে রাখলেই মোটামুটি শুকিয়ে যেত। আকাশে মেঘের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে ২৮ রামাযান বিকালে দেখি কিছু মেঘ এসে ডাকাডাকি শুরু করেছে। তারপর ইফতারের ৫ মিনিট পূর্ব থেকে মাগরিবের ছালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত বৃষ্টি হ’ল। মাগরিবের পর বাইরে গিয়ে দেখি মানুষের পায়ের ময়লায় কাদা কাদা ভাব হয়ে যাওয়া চত্বর পরিষ্কার করার জন্য হাযারো পরিচ্ছন্নতাকর্মীতে ভরে গেছে হারাম এলাকা। ৫-১০ মিনিটের মধ্যে পুরো এলাকা আবার ঝকঝকে হয়ে গেল।

হারামের নীচে এই বেজমেন্টে গত তিন বছর যাবৎ ই‘তিকাফকারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র সর্বদা চালু থাকায় ঠান্ডার আধিক্য আমাদের জন্য কিছুটা কষ্টকর মনে হচ্ছিল। প্রথম দিকে কিছুটা অসুস্থই হয়ে পড়েছিলাম। আববুর পায়ের ব্যথা বৃদ্ধি পেয়েছিল। বেজমেন্টে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। এটা ভাল দিক। তাতে নিরিবিলি ইবাদতে সুবিধা হয়। যদিও দেশ-বিদেশের যোগাযোগকারীরা বিব্রত হন।

হারাম কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা সত্যিই প্রশংসনীয়। পুরো হারামে শত শত স্থানে শীতল যমযম পানি খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ভাবতাম হায়! যে পানি দেশে এক ঢোক খাওয়ার জন্য বিশেষ প্রত্যাশী থাকতাম। আজ এত সহজে তা হাতের নাগালে পেয়ে যাচ্ছি!

সারাদিন হাযার হাযার পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। ফলে লাখো মানুষের পদচারণাতেও ময়লার কোন চিহু খুঁজে পাওয়া যায় না। মুছল্লীদের জন্য হাযার হাযার টয়লেটের ব্যবস্থা থাকায় প্রাকৃতিক কর্ম সারতে তেমন কোন অসুবিধা হয় না। বিশালায়তন হারামের খোলা চত্বর প্রবল সূর্যতাপেও গরম হয় না। পরে জানলাম এখানে শ্বেত পাথরের দীর্ঘ টাইলসগুলি বিশেষ পদ্ধতিতে নিজস্ব কারখানায় অনেক মোটা করে নির্মিত। ফলে তা সহজে গরম হয় না।

পুরো হারামে হাযার হাযার তরুণ নিরাপত্তাকর্মী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ায় সুন্দর আচরণের মাধ্যমে আইন-শৃংখলা রক্ষায় তাদের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব চোখে পড়ার মত। যদিও ভিড় বেড়ে গেলে তাদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াতো। ২৭শে রামাযান তারাবীহ ছালাতের সময় ভিড় হওয়ায় মাত্বাফে একজন মহিলাকে দেখলাম অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে। সর্বোচ্চ ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই অক্সিজেন ও হুইল চেয়ার সমৃদ্ধ বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা ঝড়ের বেগে ছুটে আসলো এবং তাকে নিয়ে হাসপাতালে চলে গেল।

অস্বস্তিকর লেগেছে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ একই রাতে পড়ানোটা। যা কখনো রাসূল (ছাঃ) পড়েননি। যদিও মুকাবিবরের ঘোষণায় দু’রাতেই ‘ক্বিয়ামুল লাইল’ বলা হয়েছে। তারাবীহ শায়খ আব্দুল্লাহ আওয়াদ আল-জুহানী এবং অন্য একজন ইমাম ১০+১০ করে পড়াতেন। তাহাজ্জুদ প্রথম ৬ রাক‘আত শায়খ সঊদ আশ-শুরাইম এবং শেষ চার ও তিন রাক‘আত বিতর শায়খ আব্দুর রহমান আস-সুদাইস পড়াতেন। তিন রাক‘আত বিতরের দু’রাক‘আতে সালাম ফিরাতেন এবং এক রাক‘আত পৃথকভাবে পড়তেন। এটাও একটা জায়েয পদ্ধতি। যদিও এক সালামে ও এক বৈঠকে তিন রাক‘আত পড়াই উত্তম। বিতরের কুনূত বিশ মিনিট ধরে হ’ত। শেষ দিনে ২৫ মিনিট হ’ল। কান্নার স্বরে শায়খ সুদাইসের কুনূত পড়াটা অপূর্ব। যারা অর্থ বুঝেন তাদের নিকট অনন্য। বিশেষ করে গাযা, সিরিয়া, ইরাক, মিয়ানমার এবং অন্যান্য দেশের নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য আল্লাহর নিকটে তাঁর প্রাণ উজাড় করা কণ্ঠের আকুল প্রার্থনা যে কোন কঠিন হৃদয়ের মানুষের চোখেও অশ্রুর বান ডেকে আনে। আমরা প্রথম দু’রাত তারাবীহর সময় শুয়ে শুয়ে কেবল ক্বিরাআত শুনেছি। পরের অধিকাংশ রাতে তারাবীহর সময় তাওয়াফ করেছি ও তেলাওয়াত শুনেছি। ফলে আমাদের দেখাদেখি অনেকে একই পন্থা অবলম্বন করেন। মদীনার হারামেও একই অবস্থা। অথচ হারামের বাইরে অন্যান্য সকল মসজিদে বিতর সহ ১১ রাক‘আতই তারাবীহ পড়া হয়। এ বিষয়ে এখানকার শায়খদের কাছে প্রশ্ন করলে অনেকেই শৈথিল্য দেখান। এ ব্যাপারে ‘সকলের মনরক্ষা নীতি’ কাজ করছে বলে মনে হ’ল। মজার ব্যাপার হ’ল, ১১ রাক‘আতই যে সর্বোত্তম এ বিষয়ে কোন শায়খেরই দ্বিমত নেই। প্রশ্ন হ’ল, উত্তমটি ছেড়ে তাহ’লে কেন বছরের পর বছর ধরে ‘অনুত্তম’ আমলটি বহাল রাখা হয়েছে? এর ফলে বহু দ্বীনদার মুমিন ধোঁকায় পড়ে যাচ্ছেন এবং ছহীহ-শুদ্ধ আমল থেকে দূরে থাকছেন।

প্রতি ছালাতের শেষে মুকাবিবরের কণ্ঠে ভেসে ওঠে আছছালাতু ‘আলাল আমওয়াত (মৃতদের উপর জানাযার ছালাত)। এতে প্রতি ওয়াক্তেই মুছল্লীদের মধ্যে মৃত্যুর ভয় জাগ্রত হয়। একই নিয়ম পরে দেখলাম মদীনার হারাম সহ বিশেষ বিশেষ মসজিদে।

ইফতারের প্রাক্কালে অনেককে দাঁড়িয়ে বা বসে কা‘বা গৃহের দিকে ফিরে হাত তুলে দো‘আ করতে দেখলাম। অথচ ইফতারের সময় দো‘আ কবুল হয় মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ। বরং ছায়েমের দো‘আ সবসময় কবুল হয় মর্মে বর্ণিত হাদীছটি ছহীহ। এছাড়া দো‘আ হবে কেবল আল্লাহর সমীপে, কা‘বা গৃহকে লক্ষ্য করে নয়। অনেকে বসা অবস্থায় দু’হাত দু’হাঁটুর উপরে ফেলে রেখে দো‘আ করছেন। অথচ একাকী দো‘আ করার পদ্ধতি হ’ল, খোলা দু’হস্ততালু একত্রিত করে চেহারা বরাবর সামনে রেখে দো‘আ করা। দেখলাম কেউ বুকে হাত না বেঁধে হাতের আঙ্গুলের উপর আঙ্গুল রেখে বুকে হাত রেখে ছালাত আদায় করছেন, কেউবা হাত ছেড়ে আদায় করছেন। একজনকে দেখলাম সিজদা দেওয়ার সময় হাতে থাকা মাটির চাকতি মাটিতে রেখে তার উপর সিজদা দিচ্ছেন। শুনলাম এরা শী‘আ। এরা কারবালার মাটিকেই কেবল পবিত্রজ্ঞান করে। সেকারণ যেখানেই ছালাত আদায় করে সেখানেই এই মাটির উপর তারা সিজদা করে। এরূপ বহু রকমের ছালাতের দৃশ্য চোখে পড়লো। আববু বলছিলেন, হারাম শরীফ একটা চিড়িয়াখানার মত। এখানে ৭৩ ফের্কার লোক ছালাত আদায় করে’। সারা বিশ্বের সকল মতের মুসলমানের মিলনস্থল হওয়ায় বিচিত্র সব আমল এখানে দেখা যায়।

২৭ তারিখ রবিবার। ই‘তিকাফের শেষ দিন। বিদায়ের প্রস্ত্ততি মনে মনে শুরু হয়ে গেছে। আজ সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা গেলে আগামী কাল ঈদ। হারামে ঈদের ছালাত আদায় করব। তাই ভিতরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। যদিও ই‘তিকাফে অবস্থানরত অন্যান্য ভাইদের মাঝে ঈদ নিয়ে কোন বিশেষ আনন্দ বা বিদায়ের প্রস্ত্ততি লক্ষ্য করা গেল না। জানতে পারলাম যে, চাঁদ উঠলো কি-না তা নিয়েও হারামে অবস্থানরত ভাইদের মাঝে কোন আগ্রহ থাকে না। এর কারণ সম্ভবতঃ এখান থেকে কেউ চলে যেতে চায় না। ফলে যেদিন বাদ এশা তারাবীহর ছালাত অনুষ্ঠিত হয় না, সেদিন সকলে বুঝতে পারেন আগামীকাল ঈদ। সারাদিন ২-৩ জন ভাইয়ের গমনাগমনের পর বাদ আছর আমাদের সাথে সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য রিয়াদ থেকে আসলেন ‘আন্দোলন’-এর সঊদী আরব শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বারী (রাজশাহী) এবং রিয়াদের ছানা‘আহ জাদীদাহ-ক শাখার সভাপতি ইমরান হোসায়েন মোল্লা (নবীনগর, বি-বাড়িয়া) ও শাহজাহান (চান্দনাইশ, চট্টগাম) কর্মপরিষদ সদস্য, হারা শাখা। একটু পরে আসলেন জেদ্দা সভাপতি সাঈদুল ইসলাম ভাই। ইফতারের কিছু পূর্বে আসলেন মক্কা থেকে প্রায় ১৬০০ কি.মি. দূরে অবস্থিত ‘আন্দোলন’ আল-খাফজী শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম (শরীয়তপুর), অর্থ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম (বরিশাল) সমাজ কল্যাণ সম্পাদক আল-আমীন (বি-বাড়িয়া), সদস্য হাফেয সায়ফুল্লাহ (ঐ), হাফেয আব্দুছ ছামাদ (ঐ) প্রমুখ। সবাই মিলে একত্রে শেষ ইফতার করলাম। এরপর এশা পর্যন্ত আরও এলেন দাম্মাম থেকে হাবীব (বি-বাড়িয়া), যিনি নওদাপাড়াস্থ কেন্দ্রীয় মারকাযের পাশে জমি কিনেছেন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। এছাড়া এলেন বারাকাত, আব্দুল আযীয (রাজবাড়ী) প্রমুখ ভাইয়েরা। মাগরিবের কিছু পরে মোবাইলে নতুন চন্দ্রোদয়ের সংবাদ জানতে পারলাম। বেশ আনন্দিত হলেও বিদায় সর্বদাই কষ্টদায়ক। এশা পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনার পর বাদ এশা বিদায়ের সময় মনটা যেন কেমন আনচান করছিল। দশদিন এক স্থানে একপরিবারের ন্যায় সবাই একত্রে কাটালে স্বভাবতঃই একটা মায়া পড়ে যায়। আশপাশের মিসরী, পাকিস্তানী, আফগানী, সঊদী সহ বিভিন্ন দেশী ভাইদের সাথে বিদায়ী মোলাকাতকালে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। গত ২০ বছর যাবৎ হারামে ই‘তিকাফকারী লন্ডনপ্রবাসী শামসুদ্দীন আহমাদ (৫০) (জুড়ী, মৌলভীবাজার) এদিন সকালে ‘ছালাতুর রাসূল (ছাঃ)’ বইটি আমাদের কাছ থেকে নিয়েছিলেন। বিদায়ের সময় সেটি নিয়ে যাওয়ার জোর দাবী জানালেন। আববু তাতে স্বহস্তে ‘সৌজন্য কপি’ লিখে স্বাক্ষর করে দিলেন। উনি খুব খুশী হ’লেন।

এদিন বাদ মাগরিব আমাদের জেদ্দায় শায়খ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদের সাথে নির্ধারিত বৈঠক ছিল। কিন্তু হঠাৎ গাড়ী দুর্ঘটনায় তাঁর ভাতিজার মৃত্যু কারণে তিনি ঐদিনই রিয়াদ গমন করায় বৈঠকটি বাতিল হয়ে যায়। উনার ড্রাইভার বেলাল ভাই আমাদেরকে এ দুঃসংবাদটি জানালেন।

এশার পর ই‘তিকাফস্থল ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যেতে লাগল। আমরাও একসময় বিদায়ের পথ ধরলাম। কর্মী ভাইদেরকে নিয়ে রাত সাড়ে ১০-টার দিকে শহীদুল চাচার হোটেলে গিয়ে উঠলাম। তিনি আমাদের দু’জনের জন্য সার্বিক ব্যবস্থা করে রাখলেও সাথে আরো ১১ জন দেখে তাৎক্ষণাৎ রান্না শুরু করলেন। বড় একটি রুমে সবাই একত্রে বসলাম। আববু সবাইকে লক্ষ্য করে দীর্ঘ আলোচনা পেশ করলেন। খাফজীর ভাইদের ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও ত্যাগী মনোভাব আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করল। রাত ১২টার পর শহীদুল চাচা খাবার নিয়ে হাযির হ’লেন। সঊদী আরবে এসে প্রথম আলুভর্তা ও ডাল দিয়ে ভাত খেলাম। প্রবাসী ভাইয়েরাও চমৎকার স্বাদের এই খাবার খেয়ে খুশী হ’লেন। এরপর সবাই নিজ নিজ হোটেলে ফিরে গেলেন। আববু, আমি এবং সাঈদুল ইসলাম ভাই একরুমে শুয়ে পড়লাম। ঘুম যেন আসতেই চায় না। কারণ পরের দিন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ঈদের জামা‘আতে আগামীকাল ঈদের ছালাত আদায় করব। ভিতরে ভিন্ন ধরনের আমেজ কাজ করছিল। ঘণ্টাখানেক এসব চিন্তা-ভাবনা করতে করতে একসময় ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাম।     (ক্রমশঃ)

 

HTML Comment Box is loading comments...