প্রবন্ধ

খেয়াল-খুশির অনুসরণ

মূল : শায়খ মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ
অনুবাদ : মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

ভূমিকা :

সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহ তা‘আলার জন্য, আর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ), তাঁর বংশধর ও তাঁর ছাহাবীদের সকলের উপর। অতঃপর খেয়াল-খুশির অনুসরণ ভাল কাজ থেকে বাধা প্রদানকারী এবং বুদ্ধি-বিবেক নাশকারী। কেননা খেয়াল-খুশির অনুসরণ অসৎ চরিত্রের জন্ম দেয় এবং নানারকম মন্দ ও গর্হিত কাজ প্রকাশ করে। মানবতার পর্দা তাতে ছিদ্র হয়ে যায় এবং অসৎ কাজ ও পাপাচারের রাস্তা খুলে যায়।

এই খেয়াল-খুশি ফিৎনা-ফাসাদের বাহন। আর দুনিয়া হ’ল পরীক্ষা গৃহ। সুতরাং হে পাঠক! আপনি খেয়াল-খুশির পথ ছেড়ে দিন, শান্তিতে থাকবেন। দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ-ভালবাসা বাদ দিন, সাফল্য লাভ করবেন। দুনিয়া তার সৌন্দর্য ও মনোমুগ্ধকর জিনিসপত্র দ্বারা যেন আপনাকে কখনোই ফিৎনায় ফেলতে না পারে এবং খেল-তামাশা ও নিরর্থক কাজ-কর্মের প্রতি আসক্তি তৈরী করে আপনার প্রবৃত্তি যেন আপনাকে প্রতারিত করতে না পারে। খেল-তামাশার এই সময় তো এক সময় শেষ হয়ে যাবে; যুগের পরিক্রমায় আমরা যা কিছু উপভোগ করেছি মরণের ফলে একদিন তার সবই ফিরিয়ে দিতে হবে। কেবল খেয়াল-খুশির বশবর্তী হয়ে আপনি যে সব হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছেন এবং যে গোনাহ সঞ্চয় করেছেন তাই আপনার জন্য থেকে যাবে।

খেয়াল-খুশি মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই যে কোন শত্রুর তুলনায় খেয়াল-খুশির বিরুদ্ধে কঠিনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া প্রতিটি মানুষের উপর ফরয। আবু  হাযেম (রহঃ) বলেছেন, قَاتِلْ هَوَاكَ أَشَدَّ مِمَّا تُقَاتِلُ عَدُوَّكَ ‘তোমার শত্রুর বিরুদ্ধে তুমি যতটা না লড়াই কর, তার থেকেও ঢের বেশী লড়াই তুমি তোমার প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কর’।[1]

এই খেয়াল-খুশিই সকল ফিৎনা-ফাসাদের মূল এবং সকল বিপদ-আপদের কারণ। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেছেন,

يَا نَفْسُ تُوْبِىْ فَإِنَّ الْمَوْتَ قَدْ حَانَا * وَاعْصِ الْهَوَى فَالْهَوَى مَا زَالَ فَتَّانَا

‘হে মন! তুমি তওবা করো, কেননা মরণ তো অতি নিকটে। আর খেয়াল-খুশির বাধ্য হবে না, কেননা খেয়াল-খুশি তো সব সময় ফিৎনা সৃষ্টিকারী’।

খেয়াল-খুশির অবস্থা যখন এই, তখন তার সম্পর্কে আলোচনা করা আবশ্যক, যাতে আমরা এই ভয়াবহ রোগ থেকে দূরে থাকতে পারি এবং তার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা করতে পারি।

আলোচ্য গ্রন্থে আমরা খেয়াল-খুশির সংজ্ঞা, ক্ষতি, তার বিরোধিতার উপকারিতা, তার অনুসরণের কারণ বা উপকরণ, চিকিৎসা পদ্ধতি (প্রতিকারের উপায়) এবং প্রশংসনীয় প্রবৃত্তি ও নিন্দনীয় প্রবৃত্তির পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করব।

এ গ্রন্থ রচনায় ও কাঙ্ক্ষিত আকারে তা প্রকাশে যে যে ক্ষেত্রে যারা যারা অংশ নিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। পরিশেষে আল্লাহর রহমত ও শান্তি কামনা করছি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ), তাঁর পরিবার-পরিজন ও ছাহাবীদের সকলের উপর।

খেয়াল-খুশির সংজ্ঞা :

খেয়াল-খুশির আভিধানিক অর্থ : আরবী هَوٰى শব্দটি هَوِىَ ক্রিয়ার ধাতু। আভিধানিক অর্থ হ’ল, কোন কিছুকে ভালবাসা, কাম্য বস্ত্ত পাওয়ার প্রবল বাসনা।[2]

[বাংলা অভিধানে هَوٰى (হাওয়া)-এর প্রতিশব্দ খেয়ালখুশি, নিয়ম ছাড়া ব্যাপার, স্বেচ্ছাচারিতা, খামখেয়ালি, অযৌক্তিক ইচ্ছা, কামনা, বাসনা, প্রবৃত্তি, কুপ্রবৃত্তি, ভোগের পথ ইত্যাদি।[3] এই পুস্তকে هَوٰى শব্দের প্রতিশব্দ অধিকাংশ ক্ষেত্রে খেয়ালখুশি এবং ক্ষেত্রবিশেষে কামনা-বাসনা ও প্রবৃত্তি গ্রহণ করা হয়েছে।-অনুবাদক]

পরিভাষায় هَوى বা খেয়ালখুশি : উপভোগ্য জিনিসের প্রতি শরী‘আতের কোন অনুমোদন ছাড়াই মনের যে ঝোঁক তৈরী হয় তাকে هَوى বা খেয়ালখুশি বলে।[4] ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, কাঙ্ক্ষিত জিনিসের প্রতি মনের ঝোঁককে هوى বা খেয়ালখুশি বলে। এই ঝোঁক মানুষের মাঝে তার অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই সৃষ্ট হয়েছে। কেননা তার যদি খাদ্য, পানীয় ও বিবাহ-শাদীর প্রতি ঝোঁক ও আকর্ষণ না থাকত, তাহ’লে সে খানা-পিনা, বিয়ে-শাদী কোনটাই করত না। সুতরাং প্রবৃত্তি মনের চাহিদার প্রতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। যেমন করে ক্রোধ অপ্রীতিকর জিনিষ থেকে তাকে বিরত রাখে।[5]

খেয়াল-খুশির অনুসরণে নিষেধাজ্ঞা :

শরী‘আতের প্রমাণাদি দ্বিধাহীনভাবে খেয়াল-খুশির অনুসরণ করতে নিষেধ করে। কুরআন-হাদীছে এসব প্রমাণ নানাভাবে নানা আঙ্গিকে বিধৃত হয়েছে। যেমন-

১. কখনো খেয়াল-খুশির অনুসরণ নিঃশর্তভাবে নিষেধ করা হয়েছে :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَلاَ تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُواْ ‘ন্যায়বিচার করতে তোমরা খেয়ালখুশির অনুসরণ করো না’ (নিসা ৪/১৩৫)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا دَاوُوْدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيْفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ  ‘হে দাঊদ! আমি তোমাকে এই যমীনে আমার খলীফা (শাসক) বানালাম। অতএব তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার করো এবং কখনো খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না, তেমন করলে তা তোমাকে আল্লাহর রাস্তা থেকে দূরে সরিয়ে দেবে’ (ছোয়াদ ৩৮/২৬)।

২. কখনো কাফির ও পথভ্রষ্টদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلاَ تَتَّبِعْ أَهْوَاء الَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِآيَاتِنَا وَالَّذِيْنَ لاَ يُؤْمِنُوْنَ بِالآخِرَةِ وَهُمْ بِرَبِّهِمْ يَعْدِلُوْنَ ‘হে রাসূল! তুমি ঐ সকল লোকের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবে না যারা আমার আয়াত সমূহকে অস্বীকার করে, যারা পরকালে অবিশ্বাস করে এবং তারা অন্য কিছুকে তাদের মালিকের সমকক্ষ মনে করে’ (আন‘আম ৬/১৫০)।

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে কাফিরদের বলতে বলেছেন, قُل لاَّ أَتَّبِعُ أَهْوَاءَكُمْ قَدْ ضَلَلْتُ إِذاً وَمَا أَنَاْ مِنَ الْمُهْتَدِيْنَ ‘হে রাসূল! তুমি বল, আমি তো তোমাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করি না। যদি আমি তা করি তাহ’লে আমি তখন অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাব এবং সত্যানুসারী দলের মাঝে থাকব না’ (আন‘আম ৬/৫৬)।

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, وَلاَ تَتَّبِعُواْ أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّواْ مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّواْ كَثِيْراً وَضَلُّواْ عَن سَوَاء السَّبِيْلِ ‘তোমরা সেসব জাতির খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না, যারা আগেভাগেই পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে এবং তারা অনেক লোককে পথহারা করে দিয়েছে আর তারা নিজেরাও সোজা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে’ (মায়েদাহ ৫/৭৭)।

অন্যত্র তিনি বলেন, فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ وَلاَ تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ  ‘সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা যেসব বিধি-বিধান নাযিল করেছেন তুমি তার ভিত্তিতে বিচার-ফায়ছালা কর এবং এ বিচারের সময় তোমার নিকট যে সত্য দ্বীন এসেছে তা থেকে সরে গিয়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবে না’ (মায়েদাহ ৫/৪৮)।

তিনি নবী করীম (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, فَلِذَلِكَ فَادْعُ وَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ  ‘(হে নবী!) তুমি মানুষকে এ দ্বীনের দিকে ডাকতে থাক এবং এর উপরেই অবিচল থাকো, যেভাবে তোমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর ওদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবে না’ (শূরা ৪২/১৫)।

তিনি বলেন, وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطاً ‘তুমি এমন কোন ব্যক্তির আনুগত্য করবে না যার হৃদয়-মনকে আমরা আমাদের স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি, আর সে তার প্রবৃত্তির দাসত্ব করতে শুরু করেছে এবং তার কাজকর্ম সীমালংঘনমূলক’ (কাহফ ১৮/২৮)।

এসব আয়াতে মহান আল্লাহ কাফির-মুশরিকদের সাথে খেয়ালখুশির সম্পর্ক যোগ করেছেন। কেননা তাদের খেয়ালখুশি সত্য হ’তে বিচ্যুত। পক্ষান্তরে মুমিনদের খেয়ালখুশি তেমন নয়। কাফিরদের কামনা-বাসনা পুরোটাই বাতিল তথা অন্যায়ের উপর কেন্দ্রীভূত। অপরদিকে মুমিনদের কামনা-বাসনা উন্নত হ’তে হ’তে এক সময় তা আল্লাহ তা‘আলার হুকুম মাফিক হয়ে যায় এবং নবী করীম (ছাঃ) আনীত দ্বীন বা জীবন বিধানের অনুগামী হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তার মন যখন কোন দিকে ঝোঁকে তখন তা সুন্নাত ও আনুগত্য বলে গণ্য হয়, ন্যূনপক্ষে তা মুবাহ হয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, أَفَمَنْ كَانَ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّهِ كَمَنْ زُيِّنَ لَهُ سُوْءُ عَمَلِهِ وَاتَّبَعُوْا أَهْوَاءَهُمْ ‘যে ব্যক্তি তার মালিকের কাছ থেকে আসা সুস্পষ্ট সমুজ্জ্বল নিদর্শনের উপর রয়েছে তার সাথে এমন লোকদের তুলনা কীভাবে হবে যাদের চোখের সামনে তাদের মন্দ কাজগুলো শোভনীয় করে রাখা হয়েছে এবং তারা নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে’ (মুহাম্মাদ ৪৭/১৪)।

৩. কখনো মন্দের সাথে জড়িত মন বা ব্যক্তিসত্তার দিকে খেয়াল-খুশিকে সম্বন্ধ করে তার নিন্দা করা হয়েছে : আবু ইয়া‘লা শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, اَلْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا ‘অক্ষম-মূর্খ সেই ব্যক্তি যে নিজের মনকে তার প্রবৃত্তি বা খেয়ালখুশির কথামতো চলতে দেয়’।[6]

৪. কখনো অন্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রবৃত্তির নিন্দা জানানো হয়েছে : হুযায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوْبِ كَالْحَصِيْرِ عُوْدًا عُوْدًا فَأَىُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَ فِيْهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ وَأَىُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا نُكِتَ فِيْهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَصِيْرَ عَلَى قَلْبَيْنِ عَلَى أَبْيَضَ مِثْلِ الصَّفَا فَلاَ تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالأَرْضُ وَالآخَرُ أَسْوَدُ مُرْبَادًّا كَالْكُوزِ مُجَخِّيًا لاَ يَعْرِفُ مَعْرُوفًا وَلاَ يُنْكِرُ مُنْكَرًا إِلاَّ مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ ‘মানুষের মনে ফিৎনা বা গোমরাহী এমনভাবে ঢেলে দেওয়া হয় যেমন করে খেজুরের মাদুর বা পাটি বুনতে একটা একটা করে পাতা ব্যবহার করা হয়। যে মনে ঐ ফিৎনা অনুপ্রবেশ করে তাতে একটা কালো দাগ পড়ে যায়। আর যে মন তা প্রত্যাখ্যান করে তাতে একটা সাদা দাগ পড়ে। এভাবে মনগুলো দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক. মসৃণ পাথরের মত সাদা মন, যাতে কোন ফিৎনা বা পাপাচার আসমান-যমীন বিদ্যমান থাকা অবধি কোনই বিরূপ ক্রিয়া করতে পারবে না। দুই. কয়লার ন্যায় কালো মন, যা উপুড় করা পাত্রের মত, না সে কোন ন্যায়কে বোঝে, না অন্যায়কে স্বীকার করে। তার খেয়াল-খুশি বা কামনা-বাসনা তাকে যেভাবে পরিচালনা করে সেইভাবেই কেবল সে পরিচালিত হয়’।[7] এখানে খেয়াল-খুশিকে হৃদয়ের সাথে সম্বন্ধিত করা হয়েছে।

খেয়াল-খুশির অনুসরণ হেতু একজন মানুষ কখন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য :

খেয়াল-খুশি ও লোভ-লালসা মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত একটি বিষয়। না সে তার থেকে আলাদা হ’তে পারে, না তাকে পরিত্যাগ করতে পারে। মহান আল্লাহ মানুষকে প্রবৃত্তি ও লালসার তাড়না দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। তবে কি খেয়াল-খুশি ও লালসার উদ্রেক যখনই হবে তখনই সেজন্য মানুষকে শাস্তি পোহাতে হবে? মানুষ কি তার হৃদয়-মন থেকে খেয়াল-খুশি বের করে দিতে শরী‘আতের দাবী অনুযায়ী বাধ্য? নাকি তার কিছু নিয়মনীতি ও সীমানা রয়েছে?

ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন, ‘খোদ প্রবৃত্তি ও লালসার জন্য কোন শাস্তি পোহাতে হবে না। বরং তার অনুসরণ ও তার কথামত কাজ করার দরুণ শাস্তি পোহাতে হবে। সুতরাং মন খেয়াল-খুশির পেছনে চলতে চাইবে আর ব্যক্তি মনকে তার থেকে বিরত রাখলে তখন তার এ বিরত রাখাই আল্লাহর ইবাদত ও নেক কাজ বলে গণ্য হবে’।[8]

একজন সত্যবাদী মুসলিমের অবস্থাতো এটাই। তার মন সর্বদা তাকে এটা ওটা করতে হুকুম করবে আর সে বরাবর তা করতে অস্বীকার করবে এবং তার লালসার অপকারিতার শিকার হওয়া থেকে তাকে বিরত রাখবে। মন তাকে খেয়াল-খুশির যেসব বিষয় লাভে উদ্বুদ্ধ করবে সেসব ক্ষেত্রে সে তার প্রতিপালকের মুখোমুখি দাঁড়ানোকে ভয় করবে। এমন মানুষ অবশ্যই ভাল প্রতিফল পাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى- ‘আর যে ব্যক্তি তার মালিকের সামনে (হাশরের ময়দানে) দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং (সেই ভয়ে নিজের) মনকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখে, অবশ্যই জান্নাত হবে তার ঠিকানা’ (নাযি‘আত ৮০/৪০-৪১)।

সুতরাং খেয়াল-খুশি মনে উদয় হ’লেই সেজন্য শাস্তি দেওয়া হবে না; সেটা কাজে পরিণত করা ব্যতীত। মানুষ যখন কোন পাপ কাজের বাসনা করবে এবং মনে মনে তা কামনা করবে, তারপর বাস্তবে তা রূপায়িত করবে তখন তার খেয়াল-খুশি ও কাজের উপর হিসাব গ্রহণ করা হবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيْبُهُ مِنَ الزِّنَى مُدْرِكٌ ذَلِكَ لاَ مَحَالَةَ فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ وَالأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الاِسْتِمَاعُ وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلاَمُ وَالْيَدُ زِنَاهَا الْبَطْشُ وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ ‘আদম সন্তানের জন্য ব্যভিচারের একাংশ নির্ধারিত আছে; যা সে অবশ্যই পাবে। চক্ষুদ্বয়ের  যেনা হ’ল দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। কর্ণদ্বয়ের যেনা হ’ল শ্রবণ করা, জিহবার যেনা হ’ল আলোচনা করা, হাতের যেনা হ’ল স্পর্শ করা এবং পায়ের যেনা হল এ কাজে পা চালানো, মন (যেনা করতে) গভীরভাবে কামনা করবে, তারপর যৌনাঙ্গ তা সম্পন্ন করার মাধ্যমে হয় তা সত্য প্রমাণ করবে, নয় তা প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে মনের কামনাকে মিথ্যা প্রমাণ করবে’।[9]

খেয়াল-খুশির অনুসরণের কারণ সমূহ :

খেয়াল-খুশির অনুসরণের পিছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। এসব কারণেই মানুষ খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে। প্রশ্ন জাগে, মানুষ কেন তাদের খেয়াল-খুশির পিছনে চলে? কেনই বা তারা সত্য ও সরল পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? এর পিছনে আসলে অনেক কারণ রয়েছে। যথা-

১. শৈশবকালে খেয়াল-খুশি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত না হওয়া :

কখনো কখনো শিশু শৈশবে তার মাতা-পিতার কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত ভালবাসা ও আদর পেয়ে থাকে। তারা তার সকল প্রকার আগ্রহে সাড়া দিয়ে থাকে। সে যা চায় তারা তার নিকট তা হাযির করে। এক্ষেত্রে তারা হালাল-হারাম, বৈধ ও নিষিদ্ধের কোন বাছবিচার করে না। শিশু যদি ফজর ছালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে তাহ’লে তারা বলে, ‘এখনো বোধবুদ্ধি হাল্কা আর ঘুমকাতুরে, ঠিক আছে ঘুমাক’। ছেলেটা যখন কোন খেলনার বায়না ধরে অমনি তারা তার ব্যবস্থা করে দেয়। তাতে কোন গান-বাজনা আছে কি-না কিংবা কোন নির্লজ্জ দৃশ্য আছে কি-না সেদিকে মোটেও ভ্রূক্ষেপ করে না। হয়তো দেখা যাচ্ছে কিশোর ছেলের জন্য রয়েছে একজন স্পেশাল ড্রাইভার, আবার কিশোরী মেয়ের জন্য রয়েছে অভ্যর্থনা কক্ষসহ খাছ কামরা। এভাবে একজন শিশু তার খেয়াল-খুশি বা মর্যিমাফিক চলাফেরার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। সে যখন যা ইচ্ছা করে তাই পায় এবং করতে পারে। তাকে কোন বাধাদানকারী বাধা দেয় না। আবার কোন নিষেধকারী প্রশাসনও নিষেধ করে না। এভাবে বল্গাহীন অবস্থায় চলতে চলতে যখন সে বয়ঃপ্রাপ্তির পর্যায়ে উপনীত হয় তখন তার লাগামহীন কামনা-বাসনা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। ঐ সকল মনোবাসনা ও কল্পনা বাস্তবায়নে তার প্রবৃত্তির পিছনে তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যেন লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটতে থাকে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের সময়গুলোতে এমনটা খুব ঘটে। ফলে এ ধরনের ছেলে-মেয়েরা বড় বড় অপরাধ এবং মারাত্মক জঘন্য কাজ করে বসে, অথচ তা থেকে তাদের দূরে রাখার ও প্রতিহত করার কোন উপায় থাকে না।

অথচ ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে সেই ছেলেবেলা থেকেই প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত হ’তে প্রশিক্ষণ দিতেন। তাঁদের ছোটরা বড়দের সঙ্গে ছিয়াম, ছালাত, হজ্জ ইত্যাদি শারঈ ইবাদত-বন্দেগী পালনে চেষ্টা করতেন।

রুবাই বিনতে মু‘আওবিয (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) আশুরার দিন ভোরে আনছারদের বসতিতে লোক পাঠিয়ে ঘোষণা দেওয়ান যে, مَنْ أَصْبَحَ مُفْطِرًا فَلْيُتِمَّ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ، وَمَنْ أَصْبَحَ صَائِمًا فَلْيَصُمْ ‘সকালে যে খেয়ে নিয়েছে সে যেন বাকি দিন না খেয়ে কাটায়, আর যে ছিয়াম পালনের অবস্থায় সকাল করেছে সে যেন ছিয়াম সম্পন্ন করে’। বর্ণনাকারিণী বলেন,فَكُنَّا نَصُومُهُ بَعْدُ، وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا، وَنَجْعَلُ لَهُمُ اللُّعْبَةَ مِنَ الْعِهْنِ، فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ، حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الإِفْطَارِ ‘এই ঘোষণা শুনে আমরা পরবর্তী সময়টুকু ছিয়ামে কাটালাম এবং আমাদের বাচ্চাদেরও ছিয়াম রাখালাম। তাদের জন্য আমরা এক প্রকার পশমী খেলনা যোগাড় করে রাখলাম। যখন তাদের কেউ খাবারের জন্য কেঁদে উঠছিল তখনই আমরা তাদের সামনে ঐ খেলনা এগিয়ে দিচ্ছিলাম। ইফতার পর্যন্ত তারা এভাবেই পার করছিল’।[10]

ছেলেমেয়েরা যা চায় তাই দিয়ে তাদের প্রতিপালনে শুধুই যে দ্বীন-ধর্মীয় ক্ষতি হয় তাই নয় বরং তা তাদের জন্য জাগতিক ক্ষতিও ডেকে আনে। কখনো কখনো দেখা যায়, একটা পরিবারের উপর বালা-মুছীবত ও দুর্দশা নেমে আসে, যার ফলে তাদের ধন-সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং তাদের জীবন-জীবিকা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। কখনো আবার পরিবারের কর্তা মারা যায় সে সময় এই শিশু কীভাবে তার খাহেশ চরিতার্থ করবে? কোত্থেকে সে তার কামনা-বাসনা পূরণের ব্যবস্থা করবে?

তারপর জীবনের এক পর্যায়ে যখন কিশোর ছেলে জীবনযুদ্ধের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ে এবং তার অনেক প্রয়োজন দেখা দেয় তখন সে হয়তো দেখতে পায়, তার পরিবার তার সকল চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতে পারছে না। বিশেষ করে যখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, বিয়েশাদী করে ঘর-সংসার গড়তে ইচ্ছে করে তখন সে হয়তো একটা নির্দিষ্ট কাজ করতে চায়, কিন্তু তার পক্ষে তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

অনুরূপভাবে যে কিশোরী মেয়ে বিলাসিতা ও আমোদ-প্রমোদের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, হয়ত তার বিয়ে এমন লোকের সাথে হয়েছে অর্থবিত্তে যে তার সমপর্যায়ের নয়। এজন্য সে অসন্তুষ্ট হয় আর রাগে-দুঃখে সবসময় হাহুতাশ করে। এমনও হয় যে, সে তার স্বামীকে ফকীর-মিসকীন বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তার জীবনটা দ্বন্দ্ব-ফাসাদ আর ঝগড়াঝাটিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। যাতে তার আত্মিক সুখ এবং স্বামীর সঙ্গে তার সুখ বিনষ্ট হয়।[11]

২. প্রবৃত্তি পূজারীদের সঙ্গে উঠাবসা ও তাদের সাহচর্য গ্রহণ :

একে অপরের সাথে উঠাবসা করলে এবং দীর্ঘদিন কারো সাহচর্যে থাকলে পারস্পরিক ভালবাসা ও সাহায্য-সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং যে প্রবৃত্তির পূজারীদের সঙ্গে একান্তভাবে উঠাবসা করে এবং তাদের সাহচর্যে থাকে সে তাদের দ্বারা অবশ্যই প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে যদি সে দুর্বল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হয় এবং তার মধ্যে বিচার-বিবেচনা ছাড়াই যে কোন ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা থাকে। এ কারণেই সালাফে ছালেহীন বিদ‘আতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠাবসা করতে নিষেধ করতেন।

আবু কিলাবা (রহঃ) বলেছেন, لا تجالسوا أهل الأهواء ولا تجادلوهم فإني لا آمن أن يغمسوكم في الضلالة أو يلبسوا عليكم في الدين بعض ما لبس عليهم ‘তোমরা খেয়াল-খুশি ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের সঙ্গে উঠাবসা করো না এবং তাদের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ো না। কেননা আমার ভয় হয় যে, তারা তোমাদেরকে গোমরাহীর মধ্যে ডুবিয়ে দিতে পারে অথবা দ্বীনের কোন কোন বিষয়ে তোমাদেরকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দিতে পারে; যেমনটা তারা নিজেরা দ্বিধাদ্বন্দ্বের শিকার।[12]

মুজাহিদ (রহঃ) বলেছেন, তোমরা খেয়াল-খুশির অনুসারীদের সাথে উঠাবসা করো না।[13] কায়স ইবনু ইবরাহীম থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।[14]

৩. আল্লাহ ও পরকাল সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানের অভাব : যে মানুষ তার মালিকের যথাযথ কদর করে না সে তো তাকে ক্রুদ্ধ করা, তাঁর নাফরমানী করা কিংবা তাঁর হুকুমের অন্যথা করার কোনই পরোয়া করবে না। তার অন্তরে তো আল্লাহ তা‘আলার প্রতি সম্মান ও ভক্তি-শ্রদ্ধা বলে কিছুই নেই। এরূপ লোকদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَمَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيْعاً قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّماوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِيْنِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُوْنَ ‘আসলে এই লোকগুলো আল্লাহ তা‘আলার সেভাবে মূল্যায়নই করেনি যেভাবে তাঁর মূল্যায়ন করা উচিত ছিল। কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আসমানগুলো (একে একে) ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে থাকবে। পবিত্র ও মহান তিনি, ওরা তাঁর সাথে যা কিছু শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে’ (যুমার ৩৯/৬৭)।

৪. খেয়াল-খুশির অনুসারীদের প্রতি অন্যদের কর্তব্য পালন না করা : লোকেরা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধে ভীষণ উদাসীনতা ও গাফলতি করে। ফলে খেয়াল-খুশির অনুসারীদের খেয়াল-খুশি লাগামছাড়া হয়ে যায়। সে তার খেয়াল-খুশি চরিতার্থ করতে মোটেও পরোয়া করে না। এভাবে খেয়াল-খুশি তার মনের উপর জেঁকে বসে এবং তার আচার-আচরণের উপর কর্তৃত্ব করে। এজন্যই ইসলাম সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের কথা বলেছে- আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلْتَكُنْ مِّنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা (মানুষকে) কল্যাণের দিকে ডাকবে; সত্য ও ন্যায়ের আদেশ দিবে, আর অসত্য ও অন্যায় কাজ থেকে (তাদের) বিরত রাখবে। সত্যিকার অর্থে ওরাই হচ্ছে সফলকাম’ (আলে ইমরান ৩/১০৪)।

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, ادْعُ إِلِى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ  ‘(হে নবী) তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে (মানব জাতিকে) প্রজ্ঞা ও সদুপদেশ দ্বারা আহবান কর এবং এমন এক পদ্ধতিতে তাদের সঙ্গে যুক্তিতর্ক কর, যা সবচাইতে উৎকৃষ্ট’ (নাহল ১৬/১২৫)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلاً بَلِيْغاً ‘আর আপনি তাদেরকে উপদেশ দিন এবং তাদেরকে আপনি মনকাড়া ওজস্বী ভাষায় কথা শুনান’ (নিসা ৪/৬৩)।

যখন বেশির ভাগ লোক অন্যায়-অবৈধ কাজ নিষেধ করতে অভ্যস্ত হবে তখন খেয়াল-খুশির অনুসারীদের বেপরওয়া হওয়ার  পথে তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।

৫. দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা এবং ঝোঁক : যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালবাসে, দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং পরকালের কথা ভুলে যায়, দুনিয়া তার সামনে যত কিছুর স্বপ্ন দেখায় তা সব লাভের জন্য সে তীরবেগে ছুটে যায়। এমনকি তা আল্লাহর বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হ’লেও সে তার পরোয়া করে না। আর এটাই তো সরাসরি খেয়াল-খুশির অনুসরণ। আমাদের মালিক এই কারণের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, إِنَّ الَّذِيْنَ لاَ يَرْجُوْنَ لِقَاءَنَا وَرَضُوْا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّواْ بِهَا وَالَّذِيْنَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُوْنَ، أُوْلَـئِكَ مَأْوَاهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُواْ يَكْسِبُوْنَ- ‘যারা (মৃত্যুর পর) আমার সাথে সাক্ষাতের প্রত্যাশা করে না, যারা এ পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে এবং এখানকার সবকিছু নিয়েই তৃপ্তিবোধ করে, (সর্বোপরি) যারা আমার নিদর্শনাবলী থেকে অমনোযোগী থাকে, তারাই হচ্ছে ঐসব লোক, যাদের নিশ্চিত ঠিকানা হবে জাহান্নামের আগুন; এ হচ্ছে তাদের সেই কর্মফল, যা তারা দুনিয়ার জীবনে অর্জন করেছিল’ (ইউনুস ১০/৭-৮)।

৬. কাঙ্ক্ষিত বৈধ জিনিস লাভে বেশি তৎপরতা দেখানো :

মানুষের মন যখন কোন বৈধ জিনিস কামনা করে তখনই সে তা পেতে অনেক সময় দ্রুত ধাবিত হয়। কিন্তু জ্ঞানী-গুণীরা এরূপ কাঙ্ক্ষিত বৈধ জিনিস থেকেও তাদের শিষ্যদের নিষেধ করতেন।

একবার খালাফ ইবনু খলীফা আহওয়াযের শাসনকর্তা সুলায়মান ইবনু হাবীব ইবনুল মুহাল্লাবের সঙ্গে দেখা করেন। তখন তাঁর নিকট বদর নাম্নী এক দাসী ছিল। সে ছিল অত্যন্ত রূপসী ও গুণবতী। সুলাইমান খালাফকে বললেন, এই দাসীকে তোমার দেখতে কেমন লাগছে? খালাফ বললেন, হে আমীর, আল্লাহ আপনার ভাল করুন, আমার এ দু’চোখ তার চেয়ে সুন্দরী নারী কখনো দেখেনি। তিনি বললেন, তুমি এর হাত ধরে নিয়ে যাও। খালাফ বললেন, আমি যখন আমীরকে তাকে ভালোবাসতে দেখেছি, তখন আমার পক্ষে তাকে নিয়ে যাওয়া শোভনীয় নয়। শাসনকর্তা তখন বললেন, আরে রাখ, আমি তাকে ভালবাসলেও তুমি তাকে নিয়ে যাও। এতে করে আমার প্রবৃত্তি বুঝতে পারবে, আমি তার উপর জয়যুক্ত হ’তে পেরেছি।[15]

এভাবে ধৈর্য-সহিষ্ণুতায় অভ্যস্ত হওয়ার মানসে মনকে কিছু কিছু বৈধ জিনিস থেকে বঞ্চিত করার মাঝেও বিশেষ কল্যাণ রয়েছে। বিশেষ করে মনের ঝোঁক ও প্রবৃত্তি যখন হারামের দিকে ধাবিত হয় তখন তো মুবাহ পরিত্যাগ করাই বাঞ্ছনীয়। এরূপ ক্ষেত্রে মুবাহ বা বৈধ বিষয়ে বরাবর অভ্যস্ত হয়ে উঠলে অনেক সময় ব্যক্তির মন হারামের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে।

৭. খেয়াল-খুশির অনুসরণের পরিণাম সম্পর্কে অজ্ঞতা : কোন কিছুর পরিণতি সম্পর্কে মানুষের জানা না থাকলে তার দ্বারা সেটা বারবার হ’তে পারে। কু-প্রবৃত্তি ও খেয়াল-খুশির অনেক রকম ক্ষতি ও অনিষ্টতা রয়েছে। সেগুলো জানা থাকলে খেয়াল-খুশির অনুসারী লোকটি হতো তা প্রতিহত করতে পারত। আহমাদ ইবনুল কাসেম আত-ত্বাবারাণী কবিতায় বলেছেন,

سَأَحْذَرُ مَا يُخَافُ عَلَيَّ مِنْهُ   + وَأَتْرُكُ مَا هَوَيْتُ لِمَا خَشِيْتُ

‘আমার থেকে যা হওয়ার ভয় হয় আমি তা থেকে অবশ্যই সাবধান থাকব। আর যা আমি ভয় করি তার কারণে আমি আমার কামনা-বাসনার জিনিস বর্জন করি’।[16]

[চলবে]


*কামিল, এম.এ; সহকারী শিক্ষক, হরিণাকুন্ডু সরকারী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঝিনাইদহ।

[1]. আবু নু‘আইম ইস্পাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ৩/২৩১।

[2]. আল-মুগরাব ফী তারতীবিল মু‘রাব ২/৩৯২।

[3]. বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান।

[4]. জুরজানী, আত-তা‘রীফাত, পৃঃ ৩২০।

[5]. রাওযাতুল মুহিববীন, পৃঃ ৪৬৯।

[6]. হাকেম, আহমাদ, ইবনু মাজাহ হা/৪২৬০, সনদ যঈফ।

[7]. মুসলিম হা/১৪৪, মিশকাত হা/৫৩৮০।

[8]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১০/৬৩৫।

[9]. মুসলিম হা/২৬৫৭।

[10]. বুখারী হা/১৯৬০; মুসলিম হা/১১৩৬।

[11]. অথচ ছোটবেলা থেকে দ্বীনী পরিবেশে নিয়ন্ত্রিত কামনার মাঝে বাস করলে ছেলেমেয়ে উভয়েরই পরিণত বয়সে জীবন এত জটিল হয় না। আল্লাহই সবকিছুর মালিক, তিনি যেন সবাইকে সঠিক বুঝ দান করেন।

[12]. দারেমী হা/৩৯১, সনদ ছহীহ; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ, পৃঃ ৯১।

[13]. আল-মালাতী, আত-তানবীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃঃ ৮৬।

[14]. হিলয়াতুল আওলিয়া ৪/২২২।

[15]. যাম্মুল হাওয়া, পৃঃ ২৬।

[16]. ইবনু আসাকির, তারিখু দিমাশ্ক ৭/৩৭২।

 

 

 

 


HTML Comment Box is loading comments...