হক-এর পথে যত বাধা

(৭) অবশেষে হক-এর সন্ধান পেলাম

আমি কামাল আহমাদ। পিতার নাম মুহাম্মাদ নূরু মিয়া। আমার বাড়ী কুমিল্লা যেলার লাকসাম থানার অন্তর্গত ইরুয়াইন গ্রামে। ১৯৯১ সালে যখন ৪র্থ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হই, তখনই বাবার মনে ইচ্ছা জাগল তার দুই ছেলের মধ্যে একজনকে যুক্তিবাদী বা বড় মাওলানা বানাবেন। তখন আমি যুক্তিবাদী শব্দটি বুঝতাম না। কুরআন ও ছহীহ হাদীছের কাছে যুক্তি যে মূল্যহীন তা আমার জানা ছিল না। মাদ্রাসায় নতুন করে পড়া একটু কঠিন। তাই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণী পাশ করে পুনরায় মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হই। কিছুদিন পর বাবা হাতে মাইক্রোফোন দিয়ে আমাকে বড় মাওলানার মত সাজিয়ে ছবি তুললেন। ঘরে সে ছবি টাঙ্গিয়েও রাখলেন। তার বড় আশা তার ছেলে একদিন বিরাট মাওলানা হবে। তখন আমি জানতাম না ঘরে ছবি ঝুলালে কি হয়? বাবা আমাকে ‘বিশ্ব নবী (ছাঃ), ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ)-এর জীবনী এনে দিয়ে বলেন, বিকাল বেলায় বিভিন্ন ছেলেদের নিয়ে যেন ওয়ায করার চর্চা করি। সব সময় পাঞ্জাবী-লুঙ্গি পরি বলে লোকে আমাকে ‘হুযূর’ সম্বোধন করতে লাগল। মাদ্রাসায় ৫ম শ্রেণী থেকেই কুরআনের আমপারার অনুবাদ পড়া শুরু করি। ১৯৯৮ সালে কুরআনের সূরা বাক্বারার অনুবাদ, বাংলা মিশকাত, কুদূরী ফিক্বাহ পড়া শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে ১ম বিভাগে দাখিল পাশ করে মাদ্রাসা পরিবর্তন করলাম। ভর্তি হ’লাম লাকসাম গাজীমুড়া কামিল মাদ্রাসায়। ছোট থেকেই খেলাধূলায় অভ্যস্ত ছিলাম না। নিয়মিত ছালাতে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু প্রচলিত মাযহাব আমাকে চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। তাই কুরআন-হাদীছ সম্পর্কে হুযূরদের বলা কথাগুলো সত্য কি মিথ্যা তা যাচাই করার মত কোন চেতনা তৈরী হয়নি। দেশ ও সমাজ যে শিরকী ও বিদ‘আতী আবর্জনায় এভাবে ডুবে আছে তা কোন হুযূরের মুখে শুনিনি। বিদ‘আত কি তখন আমি বুঝতাম না। পাড়া গাঁয়ের স্বল্প শিক্ষিত হুযূর যা বলে তাই ঠিক মনে করতাম। আমিও তাদের সাথে মিশে গিয়েছিলাম। মাযহাব কি জিনিস তখনও বুঝিনি। ধর্মের নামে প্রচলিত বিদ‘আতী আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি অন্ধভক্তি আমাকে যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

২০০১ সালে আলিম পরীক্ষায় দুর্ঘটনাবশত ফেল করায় লেখাপড়ার প্রতি গভীর মনোযোগ দেই। ২০০২ সালে আলিম পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ফাযিল ক্লাস শুরু করি। এরই মধ্যে বড় ভাই ক্যাসেটের দোকান দেন। আমার মনটাকে শয়তান যেন ঘিরে ফেলল। দ্বীনের পথ থেকে দূরে সরে পড়ে আমি আমার স্বপ্নগুলো যেন সব হারিয়ে ফেললাম। যাহোক প্রায় বছরখানেক এভাবে যাওয়ার পর ভাইয়া একদিন জানালো, আমার সাইপ্রাসে যাওয়ার ভিসা হয়েছে। আমাকে সাইপ্রাস যেতে হবে। ২০০৩ সালের ১০ মার্চ ইউরোপের দেশ সাইপ্রাস চলে যাই। সাইপ্রাসে সারা দেশ জুড়ে মাত্র তিনটি মসজিদ। পশ্চিমা কালচারের দেশে চোখকে কুদৃষ্টি থেকে ফিরিয়ে রাখা খুবই দুঃসাধ্য। তাদের কালচারের অবস্থা বর্ণনা করতেও মনে বাধা আসে। তাই বেশীরভাগ সময়ই ছালাত বাসায় পড়তাম। ২০০৪ সালের শেষের দিকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারে ‘লিমাছল’ এলাকার একটি মসজিদে মাগরিবের ছালাত পড়ব ভেবে ছালাতের বেশ কিছু পূর্বেই মসজিদে চলে যাই। মসজিদে গিয়ে দেখি কিছু বাঙ্গালী গোল হয়ে বসে রাহবার, ইস্তেগফার, আমীর, বক্তা ইত্যাদি নিযুক্ত করছে। ঐদিন তারা আমাকে হঠাৎ করে তাদের আলোচনায় বক্তা নিযুক্ত করে। অর্থাৎ আমাকে মাগরিবের পর বক্তব্য রাখতে হবে। জীবনের প্রথম আলোচনা রাখার অভিজ্ঞতা আমার সাইপ্রাসের এই লিমাছল মসজিদেই হ’ল। আমি কুরআনের সূরা আন‘আমের প্রথম ৫টি আয়াত তেলাওয়াত করি এবং শাব্দিক অর্থ করে প্রায় ৩০-৪০ জন লোকের সামনে এক ঘণ্টা আলোচনা করি। যেহেতু মাদরাসার ছাত্র ছিলাম তাই খুব অসুবিধা হয়নি। তখন লোকজন মুগ্ধ হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগল, আমার বাড়ী কোথায়, আমি কোন সংগঠন করি কি-না ইত্যাদি। তাবলীগ জামাআতের এ প্রোগ্রাম গোপনে ছাত্রশিবিরের কর্মীরাই পরিচালনা করত। তারা আমাকে নিয়মিত আসার জন্য অনুরোধ করল। কিন্তু আমি পূর্ণভাবে সায় দিলাম না। তবে নিয়মিত মসজিদে আসা-যাওয়া করতাম। লিমাছল মসজিদের ইমাম ছিলেন একজন সিরিয়ান। মসজিদে গিয়ে দেখতাম, সিরিয়ার আরবরা অধিকাংশই ছালাতের সময় রাফউল ইয়াদাইন করে। বুকের উপর হাত বাঁধে। তারা শবেমেরাজ ও শবেবরাতে কোন বিশেষ ছালাত বা আনন্দ উৎসব করে না। রামাযানে দেখলাম, তারা আট রাক‘আত তারাবীহ পড়ে এবং বিতরের ৩য় রাক‘আতে হাত তুলে দীর্ঘক্ষণ মুনাজাত করে। ঈদের ছালাতে আমি নিয়ত করেছিলাম ছয় তাকবীরের। কিন্তু ইমাম ছাহেব যখন ১২ তারবীরে ছালাত শেষ করলেন তখন খুব চিন্তিত হ’লাম। বছরে একবার আসে ঈদের ছালাত, এখন কি হবে? আমার ছালাত কি হয়েছে? মাথার মধ্যে প্রতিনিয়ত কাজ করছে, আল্লাহ তা‘আলা এক, মুহাম্মাদ (ছাঃ) হ’লেন সর্বশেষ নবী। একই কুরআন, একই হাদীছ, তাহ’লে ইবাদত কেন এত রকম? আরবরা এভাবে পড়ে কেন? তাদের নেকীর প্রয়োজন হ’লে, আমাদেরও তো নেকীর প্রয়োজন। তাহ’লে এত পার্থক্য কেন? এ চিন্তা আমার মাথায় সর্বক্ষণ ঘুরপাক খেতে লাগল। দেশে থাকতে জানতাম আমরা হানাফী মাযহাবের অনুসারী। আর মাদরাসায় নবম, দশম ও আলেম শ্রেণীর কুদূরী, শরহে বেক্বায়া, উছূলুশ শাশী, নূরুল আনোয়ার এগুলো হানাফী মাযহাবেরই কিতাব। মাঝে মাঝে নিজেকে ভাবতাম আমরা হানাফী আর আরবরা অন্য মাযহাবী, তাই তারা এভাবে ছালাত পড়ে। কিন্তু মনের অবস্থার কোন পরিবর্তন হ’ল না। নিয়মিত মসজিদে আসা-যাওয়ার মধ্যে একসময় তাবলীগী ভাইদের সাথে মিশে যাই। লিমাছল থেকে রাজধানী নিকোশিয়ায় পর পর তিনটি চিল্লাও আমি দিয়েছি। মাদরাসা পড়ুয়া বলে তাবলীগী অনুষ্ঠানে প্রায়ই আলোচনা করতাম। একদিন হঠাৎ ছালাতের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থানার এক ভাই সালেকীন শিবির কর্মী হ’লেও বাহ্যিকভাবে তাবলীগের কাজ করতেন। তিনিও আমার সাথে মাঝে মধ্যে আলোচনা করতেন। একদিন তিনি ছালাতের পদ্ধতি আলোচনা করতে গিয়ে বললেন, ‘সিজদায় যাওয়ার আগে হাত দিতে হয়’। তখন আমি এবং উপস্থিত তাবলীগী আমীর শামীম ভাইসহ অনেকেই বললেন, না সিজদায়ে যাওয়ার আগে হাঁটু দিতে হয়। আমরা মাদরাসায় এভাবেই পড়ে এসেছি। সালেকীন ভাই তখন বললেন, ‘কামাল ভাই! আমার কাছে একটা বই আছে, ঐ বইটিতে সিজদায় যাওয়ার সময় আগে হাত দেয়ার কথা আছে। আমি তাকে বললাম, আমাকে বইটি একটু পড়তে দিবেন। একদিন তিনি আমাকে বইটি পড়তে দিলেন। বইটি হচ্ছে শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানীর ‘ছিফাতু ছালাতিন্নবী’ (অনুবাদ: এম এম সিরাজুল ইসলাম)। পরে তার কাছ থেকে আরো কিছু বই যেমন- কাজী ইবরাহীম প্রণীত ‘তাওহীদ জিজ্ঞাসার জবাব’, মাওলানা আব্দুর রহীম প্রণীত ‘সুন্নাত ও বিদ‘আত’ বই নিয়ে অধ্যয়ন করি। এই বইগুলো খুব মনোযোগ সহকারে পড়ে আমি যেন নতুন এক পৃথিবীতে পা রাখলাম। আমার অতীত জীবনের সমস্ত আমল যেন আমি সেই দিনই কবর দিয়েছি। ‘ছিফাতু ছালাতিন্নাবী’ বইটির শেষের দিকে অনুবাদক এম এম সিরাজুল ইসলাম প্রচলিত ছালাতের ৭৬টি ভুল উল্লেখ করেন। আমি যেন হতবাক হয়ে যাই। এতদিন ছালাত পড়েছি, অথচ আমি এ ৭৬টি ভুলের মধ্যে ডুবে ছিলাম। এই বইয়ের সাথে আরবদের ছালাতের হুবহু মিল রয়েছে দেখে আমার মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল। আমি তখন থেকেই আমার পূর্ববতী ছালাতের পদ্ধতি ত্যাগ করে এই বইয়ের হাদীছের রেফারেন্স মোতাবেক ছালাত পড়া শুরু করি এবং ধাপে ধাপে ছালাতের ঐ ৭৬টি ভুলের সংশোধন করি। তখন থেকেই আমার সহকর্মীরা আমার বিরোধিতা শুরু করে। জামায়াতে ইসলামীর এক বয়স্ক কর্মী আমার রুমে থাকতেন। তিনি আমার খুব বিরোধিতা করতে থাকেন। সাইপ্রাসে বাঙালীদের মধ্যে আমি আর কাউকে আমার মত ছালাত পড়তে দেখিনি। কিছুদিন পর আমার দেখাদেখি আমার এক রুমমেট আমার মত ছালাত পড়া শুরু করে, ফালিল্লাহিল হামদ। তখন ঐ বয়স্ক লোকটি তো চূড়ান্ত মাত্রায় ক্ষেপে উঠল। রুমমেটদের অনেকেই বিভিন্ন মন্তব্য শুরু করল। কিন্তু আমি তাদের কথায় কর্ণপাত না করে নিজের সিদ্ধান্তেই স্থির থাকলাম। কিছুদিন পর ২০০৫ সালের জুনে বাংলাদেশ থেকে রাসেল নামে এক ছেলে সাইপ্রাস যায় এবং আমাদের রুমে অবস্থান করে। রাসেল আমার ছালাত পড়া দেখে একদিন আমাকে বলল, ‘কামাল ভাই! আপনি যেভাবে ছালাত পড়েন বাংলাদেশে ‘আহলেহাদীছ’ নামে একটি সংগঠন আছে যারা হুবহু আপনার মত ছালাত আদায় করে। বাংলাদেশে গেলে তাদের বক্তব্য শুনে দেখবেন তারা দলীল ছাড়া কোন কথা বলে না। ২০০৬ সালে ৩০ এপ্রিল দেশে আসার সময় ‘ছিফাতু ছালাতিন্নাবী ও আব্দুর রহীম প্রণীত ‘সুন্নাত ও বিদ‘আত’ বই দু’টির নাম লিখে নিয়ে আসলাম। বাড়ীতে ফিরেই আমি গ্রামের মসজিদে গিয়ে সফরে কাযা হওয়া ছালাতগুলো আদায় করছিলাম। তখন মসজিদে উপস্থিত ছিল আমাদের এলাকার তাবলীগ জামাআতের এক মুরববী। তিনি আমার ছালাত পড়ার পদ্ধতি দেখে পুরা এলাকায় তা প্রকাশ করে দিল। ফলে লোকজন আমাকে নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শুরু করল। মসজিদের ইমাম ছাহেব আমাকে একদিন জুম‘আর সময় ৫ মিনিট আলোচনার সুযোগ দিলেন। আমি রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি সত্যিকারের ভালবাসা সংক্রান্ত কিছু কথা বললাম এবং ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (ছাঃ) বলে আঙ্গুলে চুমু খেয়ে চোখে লাগানোর বিরোধিতা করলাম। রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ পড়তে হবে এ পর্যন্তই সঠিক। বাড়তি আর কিছু করা উচিত নয়। আমার এ কথা শুনে ঐদিন মসজিদ কমিটি ও মুছল্লীরা খুব ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। আমার আববা মসজিদ কমিটির একজন সদস্য হওয়ায় মসজিদ কমিটির লোকজন আববার কাছে বিচার দিল। আববা আমাকে সেদিন সরাসরি কিছু না বলে আমাকে পরীক্ষা করার জন্য লাকসাম পৌর শহরে প্রায় সকল মসজিদে ছালাত পড়লেন। তিনি অনেক যাচাই-বাছাই করার পর একদিন আমাকে বললেন, ‘বাবারে, সবাই নামায পড়ে এক রকম, তুই পড়স আরেক রকম, এত বড় বড় হুযূররা কি বুঝে না? বায়তুল মোকাররাম মসজিদের হুযূর কি ভুল করে? মাওলানা সাঈদী কি ভুল বলে? তোর মত আমি আর কাউকে ছালাত পড়তে দেহি নাই’।

আমি আববার কথাগুলো শুনলাম কিন্তু কোন উত্তর দিলাম না। কেবল কিতাব সংগ্রহের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়লাম। লাকসামের লাইব্রেরী ও কুমিল্লা শহরের লাইব্রেরীগুলোতে খুব খোঁজাখুঁজি করি। কিন্তু কোথাও পাচ্ছিলাম না। এরই মধ্যে লাকসাম শহরে এক মসজিদে আমাকে ছালাতরত অবস্থায় এক মুছল্লী বুকের উপর থেকে হাত টেনে নিচে নামানোর চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে লোকজন ঘিরে ফেলতো। আল্লাহর সাহায্যে উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে তাদের কথার জওয়াব দিতাম। অনেক দিন অপেক্ষার পর লাকসাম শহরের এক লাইব্রেরীতে ‘সুন্নাত ও বিদ‘আত’ এবং ‘ছিফাতু ছালাতিন্নাবী’ পেলাম। এভাবে কিতাবের সন্ধানে আমার এক-দেড় বছর কেটে যায়।

২০০৭ সালের শেষের দিকে সরকারীভাবে ভোটার আই.ডি কার্ড করানোর জন্য কেন্দ্র করা হয় লাকসাম শহরে। সেখানে কম্পিউটার অপারেটর হিসাবে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার থানার মফীয নামে এক ব্যক্তি। তিনি একদিন লাকসাম বাইপাস হাউজিং মসজিদে একাকী আছরের ছালাত আদায় করেন। তার অপর পাশে ছিলাম আমি। আমি যখন দেখলাম তিনি ছালাতে বুকের উপর হাত বাঁধেন এবং রুকূর আগে-পরে রাফঊল ইয়াদায়ন করেন, তখন আমার মনে হ’ল যেন আমি ঈদের চাঁদ দেখেছি। আমি বাংলাদেশে সর্বপ্রথম তাকেই দেখি আমার মত ছালাতে বুকের উপর হাত বাঁধতে বা রাফঊল ইয়াদায়ন করতে। আমি ছালাত শেষ করেই বললাম, ‘ভাই! আপনি যে আমার মত ছালাত পড়লেন, আপনি কি আহলেহাদীছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ! আপনি? আমি বললাম, আমি আহলেহাদীছ কি-না বলতে পারবো না। তবে আমি সাইপ্রাসে থাকাকালীন নাছিরুদ্দীন আলবানীর ‘ছিফাতু ছালাতিন্নাবী’ বইটি পড়ে ছালাত পরিবর্তন করি এবং ‘আহলেহাদীছ’ শব্দটি আমি সেখানেই এক যুবকের নিকট শুনেছি। তার সাথে পরিচয় হ’লে তিনি আমাকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেন এবং লাকসাম বাইপাসে আমার ‘মাইওয়ান’ শোরুমে সন্ধ্যায় সাক্ষাৎ করেন। সেদিন মফীয ভাই আমাকে ২০০২ সালের ২ কপি আত-তাহরীক, মুহতারাম ডঃ মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব প্রণীত ‘ছালাতুর রাসূল (ছাঃ)’, আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ প্রণীত ‘কে বড় লাভবান’ বই এবং তাঁর ঢাকার বংশালে প্রদত্ত ‘ছালাত’ বিষয়ক আলোচনা ও মাওলানা তারেক মনোয়ারের ‘সুন্নাত ও বিদ‘আত’ বিষয়ক আলোচনার সিডিগুলো দিয়ে বললেন, আপনার কোন বইয়ের প্রয়োজন হ’লে ঢাকা বংশালে কয়েকটি আহলেহাদীছ লাইব্রেরী আছে, সেখানে যাবেন। সেখানে আপনার প্রয়োজনীয় সব বই পাবেন। (মফীয ভাইকে আল্লাহ হায়াতে তাইয়্যেবা দান করুন)। তিনি যতদিন লাকসামে ছিলেন ততদিন আমাকে আহলেহাদীছ সম্পর্কে বিভিন্ন পরামর্শ দেন, যা আমাকে হক্ব খোঁজার পথ দেখায়। কিছুদিন পরই আমি ঢাকার বংশালে অবস্থিত আহলেহাদীছ লাইব্রেরীগুলোতে গিয়ে বিষয়ভিত্তিক বইগুলো সংগ্রহ করি এবং নিজে নিজে দৃঢ়চিত্ত হই যে, আমার কাছে এখন দলীল আছে। ইনশাআল্লাহ আমার আর কোন সমস্যা হবে না। এর কিছুদিন পর লাকসামে আমি আমার নিজস্ব শোরুমে না বসে আমাদের সিডি-ক্যাসেটের দোকানে বসা শুরু করি এবং প্রতিদিন সকালে আবদুর রাযযাক বিন ইউসুফ-এর ‘ছালাত’ বিষয়ক ক্যাসেটটি বড় সাউন্ডবক্সে বাজাতে আরম্ভ করি। প্রতিদিন বাজানোর কারণে কেউ কেউ বিরক্ত বোধ করত। আবার কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বক্তব্য শুনত। এভাবে প্রতিদিন সকালে ‘ছালাত’ ও ‘সুন্নাত-বিদ‘আত’ ক্যাসেটটি বাজাতে থাকলে কিছু সংখ্যক লোক সিডিগুলো চাওয়া শুরু করল আর আমি কাউকে দশ টাকার বিনিময়ে আবার কাউকে ফ্রি সিডিগুলো দিতে থাকলাম। একসময় ডিশ লাইনে সিডিগুলো চালানোর জন্যও ডিস অপারেটরকে অনুরোধ করি। এভাবে আমি আমার দাওয়াতী মিশন পুরোদমে অব্যাহত রাখি। কে আমাকে মন্দ বলল, আর কে ভাল বলল, সে দিকে চিন্তা না করে বন্ধুমহলে হক্ব প্রচার করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাই। কিছুদিন পর লাকসাম শহরেই আমার বাসার পাশে মসজিদে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা টাঙ্গাইলের মাস‘ঊদ ভাই আমার মতো ছালাত আদায় করলেন। আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করি এবং তার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের আরেক ভাইকে সঙ্গী হিসাবে পাই। মাস‘ঊদ ভাই আমাকে একদিন বললেন, লাকসামের পশ্চিমগাঁয়ে আম্মাজান মসজিদে নাকি ছালাতে অনেকেই জোরে আমীন বলে এবং সেখানে নাকি বেলাল নামে এক ব্যক্তি আছেন যিনি কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুসারী। এ কথা শুনে আমি একদিন জুম‘আর ছালাত আদায় করতে সেখানে যাই। দেখতে পাই, সত্যি সত্যি কিছু সংখ্যক লোক ছালাতে জোরে আমীন বলছে। আমি ছালাত শেষে বাড়ী রওনা হওয়ার পথে বেলাল ভাই আমার পরিচয় জানতে চাইলেন এবং বসতে বললেন। আমি বিস্তারিত পরিচয় দেয়ার পর তিনি আমার কাছে দাওয়াতী কাজের জন্য সহযোগিতা চাইলেন। তখনও তিনি জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইসলামী ফাউন্ডেশন থেকে কুতুবে সিত্তার কিতাবগুলো সংগ্রহ করে নিয়মিত অধ্যয়ন করা শুরু করেন এবং নিজ পারিবারিক মসজিদে তা‘লীম চালু করেন। অতঃপর কিছু সংখ্যক লোক তাদের ছালাতে জোরে আমীন বলা, রাফঊল ইয়াদায়ন করা ও বুকের উপর হাত বাঁধা শুরু করে। কিন্তু আহলেহাদীছ সংগঠনের সাথে কেউই সরাসরি জড়িত নয়।

কিছুদিন পর বেলাল ভাই আমাকে ফোনে দাওয়াত দিলেন যে, কুমিল্লা থেকে দাওয়াতী কাজে লাকসামে মেহমান আসবেন, আমি যেন সেখানে উপস্থিত থাকি। আমি সেদিন উপস্থিত হয়ে দেখি ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর কুমিল্লা যেলা সভাপতি মাওলানা মুহাম্মাদ ছফিউল্লাহ ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা শরাফাত আলী উপস্থিত লোকদেরকে দ্বীনী বিষয়ে দাওয়াত দিচ্ছেন। আমি অনুষ্ঠান শেষে ছফিউল্লাহ ভাই ও সেখানে উপস্থিত সঊদী প্রবাসী দু’জন ভাইয়ের সাথে পরিচিত হ’লাম। মনে সেদিন গভীর প্রশান্তি পেলাম এবং দিন দিন হক্বের জোয়ার বাড়তে লাগল।

কিছুদিন পরে আমি এবং শাহেদ ভাই কুমিল্লার তুলাগাঁও-এ আবদুর রায্যাক বিন ইউসুফের মাহফিলে উপস্থিত হ’লাম। এরপর থেকে সরাসরি ‘আহলেহাদীছ আন্দোলনে’র একজন সদস্য হয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করি, যা আজও অব্যাহত আছে আলহাম্দুলিল্লাহ। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, দাওয়াতী কাজ করতে গিয়ে দেখি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী বাধা আসে হক্ব কথা বলাতে। এই পথ যে এত পিচ্ছিল, দৃঢ়পদে টিকে থাকা খুবই দুষ্কর। আর যারা হক্ব কথা প্রচারে সবচেয়ে বেশী বাধা সৃষ্টি করে, তারা হ’ল এক শ্রেণীর নামধারী আলেম ও মসজিদের ইমাম। হঠাৎ একদিন লাকসাম বাইপাস মসজিদে জুম‘আর ছালাতে মাহফূয নামে র‌্যাবের এক ভাই সিভিল পোষাকে এসে আমার আমল দেখে এগিয়ে আসেন। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি আমার বিস্তারিত পরিচয় দিলে আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহে তিনি আমাকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন এবং আমাকে হক্ব প্রচারে উৎসাহ যোগালেন। যদিও মাহফূয ভাই তখনও আহলেহাদীছ হননি। দীর্ঘ ২ বছর তার সাথে কথা বলার পর এখন তিনি মনের দিক থেকে পুরো আহলেহাদীছ। এভাবে আল্লাহর একান্ত ইচ্ছায় আমি আমার দাওয়াতী কাজে একটুও পিছপা হইনি। দিন বদলের সাথে সাথে যখন যুবকশ্রেণীর অনেকেই আহলেহাদীছ আক্বীদায় বিশ্বাসী হয়ে আমার সাথে সম্পর্ক করা শুরু করল, তখন আমিও তাদেরকে যথারীতি বই, সিডি সরবরাহ করতে লাগলাম। ঠিক তখনই কে বা কারা লাকসাম থানায় আমার নামে মিথ্যা জঙ্গীবাদের অপবাদ আরোপ করে অভিযোগ করল। ইনফরমেশন অনুযায়ী পুলিশ এসে আমাকেসহ আমার দোকানের বই-পুস্তক সবকিছু তল্লাশী করল। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর অশেষ রহমতে কোন সমস্যা হয়নি।

আমি যতদিন বাঁচি আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল (ছাঃ) প্রদর্শিত এই বিশুদ্ধ জ্ঞানের ফল্গুধারা সমাজের বুকে ছড়িয়ে দেয়ার কাজেই সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ। মনকে শুধু এটুকুই বলছি যে, ইবরাহীম (আঃ)-কে তাঁর পিতা পাথর মেরেছেন প্রাণনাশ করার জন্য, গৃহ থেকে বের করে দিয়েছিলেন শুধু হক্ব বলার কারণে। রাসূল (ছাঃ)-এর রক্ত ঝরেছে এই হক্বের দিকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য। সুতরাং পৃথিবীর যেখানেই হক্ব কথা বলা হবে সেখানেই বাধা আসবে। কয়েক বছর পূর্বেও যে লাকসামে আমি একজন আহলেহাদীছের সন্ধান পেতে ব্যাকুল হয়ে ঘুরতাম, আজ সে লাকসামে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে ছালাত আদায়কারীর সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। ফালিল্লাহিল হাম্দ। দিন দিন এ সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে লাকসামের ইমাম-মুয়াযি্যন সবাই মিলে আমাদের বিরোধিতা শুরু করেছে। লাকসাম বাজারের দু’টি মসজিদে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে যে, কোন আহলেহাদীছ যেন সে মসজিদে ছালাত না পড়ে। মসজিদের ইমামগণ জুম‘আর খুৎবায় সরাসরি আমার দোকান ও আমাকে উদ্দেশ্য করে বক্তব্য দিচ্ছে এবং আমার বিরুদ্ধে উপস্থিত মুছল্লীদের ক্ষেপিয়ে তুলছে। তারপরও আলহামদুলিল্লাহ তাতে হক্বের দাওয়াতের প্রসার বাড়ছে বৈ কমছে না। তাই বলছি, হক্বের পথে যত বাধাই আসুক না কেন, হক্বপিয়াসী মানুষের অন্তর সর্বদা হক্বের সন্ধান করবেই। কোন বাধাই তার জন্য অন্তরায় হ’তে পারে না। আল্লাহ এ দেশের সকল মানুষকে হক্বের অনুসারী হয়ে বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমল নিয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফীক দান করুন এবং এর মাধ্যমে আমাদের সকলকে জান্নাতী হিসাবে কবুল করে নিন- আমীন!! 

-কামাল আহমাদ

লাকসাম, কুমিল্লা।

 

 

HTML Comment Box is loading comments...