প্রশ্ন করুন

প্রশ্নোত্তর



দারুল ইফতা
হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/১) : ঈদায়নের ছালাতের তাকবীর কয়টি? ছয় তাকবীরের পক্ষে কোন ছহীহ হাদীছ আছে কি? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন। 
সৈয়দ মেরাজ আলী
শিল্প ব্যাংক, খুলনা।
উত্তর : ঈদায়নের ছালাতে অতিরিক্ত তাকবীর ১২টি। আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঈদুল ফিৎর ও ঈদুল আযহাতে প্রথম রাক‘আতে সাত তাকবীর ও দ্বিতীয় রাক‘আতে পাঁচ তাকবীর দিতেন রুকূর দুই তাকবীর ব্যতীত’ এবং ‘তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত’(আবুদাঊদ হা/১১৫০; ইবনু মাজাহ হা/১২৮০, দারাকুৎনী হা/১৭০৪, ১৭১০, সনদ ছহীহ) কাছীর বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঈদায়নের প্রথম রাক‘আতে ক্বিরাআতের পূর্বে সাত তাকবীর ও দ্বিতীয় রাক‘আতে ক্বিরাআতের পূর্বে পাঁচ তাকবীর দিতেন’। কাছীর বিন আব্দুল্লাহ বর্ণিত অত্র হাদীছ সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীছটির সনদ ‘হাসান’ এবং এটিই ঈদায়নের অতিরিক্ত তাকবীর সম্পর্কে বর্ণিত ‘সর্বাধিক সুন্দর’ রেওয়ায়াত (তিরমিযী হা/৫৩৬ সনদ ছহীহ)। তিনি আরও বলেন যে, আমি এ সম্পর্কে আমার উস্তায ইমাম বুখারীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘ঈদায়নের ছালাতের অতিরিক্ত তাকবীর সম্পর্কে এর চাইতে অধিকতর ছহীহ আর কোন রেওয়ায়াত নেই এবং আমিও সে কথা বলি’ (বায়হাক্বী ৩/২৮৬; মির‘আত ২/৩৩৯)
চার খলীফা ও মদীনার শ্রেষ্ঠ সাত জন তাবেঈ ফক্বীহ ও খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয সহ প্রায় সকল ছাহাবী, তাবেঈ, তিন ইমাম ও অন্যান্য শ্রেষ্ঠ ইমামগণ এবং ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর দুই প্রধান শিষ্য আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ (রহঃ) বারো তাকবীরের উপরে আমল করতেন। ভারতের দু’জন খ্যাতনামা হানাফী বিদ্বান আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌবী ও আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী বারো তাকবীরকে সমর্থন করেছেন (মির‘আত ২/৩৩৮, ৩৪১; ঐ, ৫/৪৬, ৫২)
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ‘ছয় তাকবীরে’ ঈদের ছালাত আদায় করেছেন- মর্মে ছহীহ বা যঈফ কোন স্পষ্ট মরফূ হাদীছ নেই। ‘জানাযার তাকবীরের ন্যায় চার তাকবীর’ বলে মিশকাতে এবং ‘নয় তাকবীর’ বলে মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাতে যে হাদীছ এসেছে, সেটিও মূলতঃ ইবনু মাসঊদের উক্তি। তিনি এটিকে রাসূল (ছাঃ)-এর দিকে সম্বন্ধিত করেননি। উপরন্তু উক্ত রেওয়ায়াতের সনদ সকলেই ‘যঈফ’ বলেছেন (বায়হাক্বী ৩/২৯০; নায়ল ৪/২৫৪, ২৫৬; মির‘আত ৫/৫৭; আলবানী, মিশকাত হা/১৪৪৩)
ঊল্লেখ্য যে, ইমাম ত্বাহাবী ‘কোন কোন ছাহাবী’ থেকে ‘জানাযার তাকবীরের ন্যায়’ মর্মে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। যা তিনি ও শায়খ আলবানী ‘হাসান’ বলেছেন (ছহীহাহ হা/২৯৯৭)।যদিও নববী, আসক্বালানী, যায়লাঈ প্রমুখ প্রায় সকল বিদ্বান হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। তবে আলবানী তাঁর দীর্ঘ আলোচনা শেষে বলেছেন, সবটাই জায়েয। যদিও সাত ও পাঁচ তাকবীর আমার নিকটে অধিকতর প্রিয়। কেননা এর বর্ণনাকারী সর্বাধিক’। আমরাও বলি, সাত ও পাঁচ মোট ১২ তাকবীরের হাদীছসমূহ অধিকতর ছহীহ এবং সংখ্যায় অধিক। অতএব বিতর্কিত বর্ণনাসমূহ বাদ দিয়ে স্পষ্ট ছহীহ হাদীছের উপর আমল করাই উত্তম।
ইবনু হাযম আন্দালুসী (রহঃ) বলেন, ‘জানাযার চার তাকবীরে ন্যায়’ মর্মের বর্ণনাটি যদি ‘ছহীহ’ বলে ধরে নেওয়া হয়, তথাপি এর মধ্যে ছয় তাকবীরের পক্ষে কোন দলীল নেই। কারণ তাকবীরে তাহরীমা সহ ১ম রাক‘আতে চার ও রুকূর তাকবীর সহ ২য় রাক‘আতে চার তাকবীর এবং ১ম রাক‘আতে ক্বিরাআতের পূর্বে ও ২য় রাক‘আতে ক্বিরাআতের পরে তাকবীর দিতে হবে বলে কোন কথা সেখানে নেই (ইবনু হাযম, মুহাল্লা ৫/৮৪ পৃঃ)। অতএব ১২ তাকবীরের স্পষ্ট ছহীহ হাদীছের উপরে আমল করাই একান্তভাবে কর্তব্য।
প্রশ্ন (২/২): আমি একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। আমার প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কর্মী তাবলীগ জামা‘আতের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় দ্বীনী ব্যাপারে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। কিন্তু সমস্যা হ’ল তাদের অধিকাংশই অফিসের কাজ-কর্মে অবহেলা ও অলসতা করে। তারা রাত জেগে ইবাদত করে ও অফিসে বিশ্রাম  নিতে চায় এবং সর্বদা ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে। এক্ষণে এসব কর্মীদের বেতন গ্রহণ করা হালাল হবে কি? আর বেতন হারাম হ’লে তাদের ইবাদত কবুল হবে কি? উত্তর দানে বাধিত করবেন।
-সোহরাব হোসাইন
সাভার শিল্প এলাকা, ঢাকা।
উত্তর : যাকে যে কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সে কাজ আন্তরিকতার সাথে যথাসাধ্য পালন করার জন্য তাকে সচেষ্ট হ’তে হবে। অন্যথা ক্বিয়ামতের দিন তাকে আল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসিত হ’তে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমরা প্রত্যেকেই ক্বিয়ামতের দিন স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৮৫, ‘নেতৃত্ব ও বিচার’ অধ্যায়)। তিনি আরও বলেন, সত্বর তোমরা তোমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হবে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন’ (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/২৬৫৯)। সুতরাং দায়িত্ব পালন না করে বেতন ভোগ করলে তা হারাম হবে। আর হারাম খেয়ে ইবাদত করলে তা কবুল হবে না। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলু্ল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘কোন ব্যক্তি কাতর কণ্ঠে আল্লাহকে ডাকে। অথচ তার খাদ্য, পানীয় ও পরিধেয় বস্ত্র সবই হারাম। তার দো’আ কিভাবে কবূল হবে? (মুসলিম, মিশকাত হা/২৭৬০, ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়, ‘উপার্জন ও হালাল অন্বেষণ’ অনুচ্ছেদ)। অতএব অফিস প্রধানের অনুমতি ব্যতীত দায়িত্ব পালন থেকে সামান্যতম দূরে থাকা যাবে না।
প্রশ্ন (৩/৩): আমরা জানি তারাবীহর ছালাত ২ রাক‘আত পর পর সালাম ফিরাতে হয়। কিন্তু জনৈক ব্যক্তি বলেছেন ৪ রাক‘আত পর পর ছালাম ফিরাতে হবে। তিনি বুখারী হা/১১৪৭ দ্বারা দলীল পেশ করছেন। এক্ষণে এর সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।
-মুহাম্মাদ শফীক
চিরির বন্দর, সূখীপীর, দিনাজপুর।
উত্তর : উক্ত ব্যক্তির বক্তব্য সঠিক নয়। কেননা উক্ত চার-এর ব্যাখ্যা রাবী আয়েশা (রাঃ)-এর অপর বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূল (ছাঃ) প্রতি দু’রাক‘আত পর পর সালাম ফিরাতেন... (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১১৮৮, ‘রাত্রিকালীন ছালাত’ অনুচ্ছেদ)। ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, রাত্রির (নফল) ছালাত দু’রাক‘আত দু’রাক‘আত’ (বুখারী হা/৪৭২; মুসলিম হা/৭৪৯; মিশকাত হা/১২৫৪)
প্রশ্ন (৪/৪): জুম‘আর ছালাতের আগে ও পরে সুন্নাত কত রাক‘আত?
-সুলতানুল ইসলাম, ঢাকা।
উত্তর : জুম‘আর পূর্বে নির্দিষ্ট কোন সুন্নাত ছালাত নেই। সময় পেলে খুৎবার আগ পর্যন্ত যত খুশী নফল ছালাত আদায় করবে (বুখারী, মিশকাত হা/১৩৮১)। অন্যথা মুছল্লী কেবল ‘তাহিইয়াতুল মসজিদ’ দু’রাক‘আত পড়ে বসবে। জুম‘আর ছালাতের পরে মসজিদে চার রাক‘আত অথবা বাড়ীতে দু’রাক‘আত সুন্নাত আদায় করবে। তবে মসজিদেও চার অথবা দুই রাক‘আত পড়া যায়। এছাড়া চার এবং দুই মোট ছয় রাক‘আতও পড়া যায় (মুসলিম, মিশকাত হা/১১৬৬; মির‘আত ৪/১৪২-৪৩)
প্রশ্ন (৫/৫): মসজিদের ডান পাশে আল্লাহ এবং বাম পাশে মুহাম্মাদ কেন লিখা যাবে না? দলীল সহ জানিয়ে বাধিত করবেন।
-আলতাফ হোসাইন
সাতক্ষীরা সরকারী কলেজ।
উত্তর : আল্লাহ ও মুহাম্মাদ পাশাপাশি প্রদর্শন করা শরী‘আত বিরোধী। এতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে আল্লাহর সমতুল্য বুঝায়। যা মুসলমানের তাওহীদী আক্বীদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাছাড়া ছূফীরা স্রেফ ‘আল্লাহ’ বলে যিকর করে। যা শরী‘আত বিরোধী। অতএব এগুলি দেওয়ালে বা কোন কাগজে বা কোন কিছুতে এককভাবে লেখা যাবে না। এগুলি সম্পূর্ণরূপে মিটিয়ে ফেলতে হবে (ফাতাওয়া আরকানিল ইসলাম, মাসআলা নং ১০৪, পৃঃ ১৯২)
প্রশ্ন (৬/৬): জানাযার ছালাতের পর হাত তুলে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা কি জায়েয?
-আবুল কালাম
শিক্ষক, মাকলাহাট সরকারী স্কুল, নওগাঁ।
উত্তর : দাফনের পরে একজনের নেতৃত্বে সকলে সম্মিলিতভাবে হাত উঠিয়ে দো‘আ করা ও সকলের সমস্বরে ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলার প্রচলিত প্রথার কোন ভিত্তি নেই। সম্মিলিতভাবে মৃত ব্যক্তির জন্য দো‘আ করার সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে ‘জানাযা’ বলা হয়। সেখানে মৃত ব্যক্তির জন্য বিভিন্ন প্রার্থনা করা হয়। সাথে সাথে মৃতব্যক্তিকে দাফন করার পর মৃতব্যক্তি যেন মুনকার ও নাকীরের প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হন, সেজন্য সকল মুছল্লীকে ব্যক্তিগতভাবেও দো‘আ করতে বলা হয়েছে। যেমন, اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَثَبِّتْهُ ‘আল্লা-হুম্মাগফির লাহূ ওয়া ছাবিবতহু’ (হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন ও তাকে দৃঢ় রাখুন’ (বিস্তারিত দ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ২৩২ পৃঃ)
প্রশ্ন (৭/৭): আমার সাথে মনোমালিন্য রয়েছে এমন একজন ভাইকে সালাম দিয়ে সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছি। কিন্তু তিনি উত্তর দিচ্ছেন না বরং দূরে থাকার চেষ্টা করছেন। কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে তার পরিণাম জানিয়ে বাধিত করবেন।
-শহীদুল ইসলাম
চারঘাট, রাজশাহী।
উত্তর : শারঈ কারণ ব্যতিরেকে এই দুই ব্যক্তির এভাবে হিংসা-বিদ্বেষ নিয়ে চলাফেরা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। আবু আইয়ূব আনছারী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তিন দিনের বেশী কোন মুসলমানের জন্য অপর মুসলিম ভাই হ’তে সম্পর্ক ছিন্ন রাখা হালাল নয়। তাদের উভয়ের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে প্রথমে সালাম করে’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫০২৭ ‘সালাম’ অনুচ্ছেদ)। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবারে জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং শিরককারী ব্যতীত প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করা হয়। তবে যে তার ভাইয়ের সাথে হিংসা জিইয়ে রেখেছে, ঐ ব্যক্তি ক্ষমা পায় না আপোষ না করা পর্যন্ত (মুসলিম, মিশকাত হা/৫০২৯)। অন্য বর্ণনায় এসেছে- ‘কোন মুসলমানের জন্য অপর মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশী সম্পর্ক ছিন্ন রাখা হালাল নয়। যে ব্যক্তি তিন দিনের বেশী সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে এবং মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (আহমাদ, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৫০৩৫)
প্রশ্ন (৮/৮): পিল খেয়ে হায়েয বন্ধ করে ছিয়াম পালন করা জায়েয কি? হায়েয অবস্থায় ওয়ায মাহফিলে যাওয়া অথবা  মাইয়েতকে দেখা যাবে কি? পুরুষ-মহিলা উভয়কেই কি নাভীর নীচের ও বগলের লোম কেটে ফেলতে হবে? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।
-মোসাম্মাৎ খাদীজা ও মিথী
পুরিন্দা, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ।
উত্তর : নাপাকীর দিনগুলিতে ছিয়াম ছেড়ে দিয়ে অন্য দিনে তা পালন করাই সুন্নাত। আয়েশা (রাঃ) বলেন, ঋতু অবস্থায় আমাদেরকে ছিয়াম ক্বাযা করার এবং ছালাত ছেড়ে দেয়ার আদেশ দেওয়া হ’ত (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৩২, ‘ক্বাযা ছিয়াম’ অনুচ্ছেদ)। তবে বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে ডাক্তারের পরামর্শে শারীরিক কোন ক্ষতি না হ’লে এবং বাচ্চা ধারণ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত না হ’লে সাময়িকভাবে ‘হায়েয’ প্রতিরোধ করে ছিয়াম পালন করা যায় (ফাতাওয়া বিন বায ‘ছিয়াম’ অধ্যায় ফৎওয়া নং ৫৭; ১৫/২০০ পৃঃ) তবে স্বাভাবিক অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া ও ক্বাযা করাই উত্তম। ঋতু অবস্থায় বক্তব্য শুনতে এবং মাইয়েতকে দেখতে পারবে। পুরুষ ও মহিলা উভয়কেই নাভীর নীচের ও বগলের লোম কেটে ফেলতে হবে (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৭৯)
প্রশ্ন (৯/৯): জনৈক আলেম বলেন, ‘তারাবীহর ছালাত আদায় করলে পূর্বের সকল গুনাহ মাফ হয়’। কথাটি কি সঠিক?
-রূহুল আমীন
বাগমারা, রাজশাহী।
উত্তর : বক্তব্যটি সঠিক। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রামাযানের রাত্রিতে ইবাদত করে (তারাবীহ পড়ে), তার পূর্বের (ছগীরা) গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়’ (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/১৯৫৮)। তবে কবীরা গুনাহ তওবা ব্যতীত মাফ হয় না (নিসা ৪/৩১, নাজম ৫২/৩২; মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৪)
প্রশ্ন (১০/১০): বিতর ছালাতের পরে ‘সুবহানাল মালিকিল কুদ্দূস’ বলা যাবে কি?
-একরামুল হক, সাতক্ষীরা।
উত্তর : বলা যাবে। রাসূল (ছাঃ) বিতর ছালাতান্তে এ দো‘আটি পাঠ করতেন এবং শেষের দিকে টেনে বলতেন(আবূদাঊদ, নাসাঈ; মিশকাত হা/১২৭৪)।
প্রশ্ন (১১/১১): মহিলারা চুল কালো করার জন্য কালো মেহদী, কালো তেল ও স্টার ব্যবহার করে থাকে। এটা করা যাবে কি?
-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।
উত্তর :উক্ত দ্রব্যাদি যদি পাকা চুল কালো করার জন্য হয়, তাহ’লে তা ব্যবহার করা যাবে না। জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা সাদা চুল কালো করা থেকে বিরত থাক (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৪২৪)। তিনি বলেন, আখেরী যামানায় কিছু লোক হবে, যারা কবুতরের বক্ষের ন্যায় কালো রংয়ের খেযাব দিয়ে চুল কালো করবে। এরা জান্নাতের সু-বাতাসও পাবে না (আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৪৪৫২, সনদ ছহীহ)
প্রশ্ন (১২/১২): জনৈক বক্তা বলেন, ওমর (রাঃ) যে রাস্তা দিয়ে হাঁটে ঐ রাস্তা দিয়ে শয়তান হাঁটে না। উক্ত হাদীছ কি ঠিক? যদি সঠিক হয় তাহ’লে হাদীছ সহ জানিয়ে বাধিত করবেন।
-আবু সাঈদ
চিরির বন্দর, সূখীপুর, দিনাজপুর।
উত্তর : বক্তব্যটি সঠিক। রাসূল (ছাঃ) একদা ওমর (রাঃ)-কে বলেন, যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, হে ওমর! শয়তান যদি তোমাকে কোন গলিতে চলতে দেখে, তবে সে অন্য গলিতে পথ চলে (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৬০২৭ ‘ওমরের মর্যাদা’ অনুচ্ছেদ)
প্রশ্ন (১৩/১৩): আমাদের স্কুলে প্রতিদিন সকালে পতাকাকে সালাম জানানোর মধ্য দিয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। শিক্ষক ও ছাত্ররা সারিবদ্ধ হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর কিছু ছাত্র সংগীত গায়। এটা শরী‘আত সম্মত কি-না তা জানিয়ে বাধিত করবেন।
সোহেল রানা, রংপুর।
উত্তর : দেশের পরিচিতি হিসাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা যায় (হুজুরাত ১৩)। কিন্তু তাকে সালাম করার বিধান নেই। বিশেষ বিশেষ সময়ে এটা করা যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যুদ্ধের সময় পতাকা উত্তোলন করতেন (তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৮৮৭-৮৯; সনদ হাসান)। জাতীয় পতাকার সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকা ও দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা ইসলামী শরী‘আতের পরিপন্থী। কেননা তা বিধর্মীদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কাজ, যা মুসলমানদের জন্য অবশ্য বর্জনীয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্যপূর্ণ কাজ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে অর্থাৎ তার হাশর-নাশর তাদের সাথেই হবে’ (আহমাদ, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৪৩৪৭ ‘পোষাক’ অধ্যায়)
দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত শিরক মিশ্রিত। যা মুখে বলা ও হৃদয়ে বিশ্বাস করা অমার্জনীয় গোনাহের কাজ। নিষ্পাপ বাচ্চাদের হৃদয়ে যারা এই বিশ্বাস প্রোথিত করে দিচ্ছেন, তারা আরও বেশি গোনাহগার হচ্ছেন। উক্ত গানে ‘বাংলা’-কে ‘মা’ সম্বোধন করা হয়েছে এবং গানের মধ্যে উক্ত কল্পিত মায়ের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে মায়ের মুখের ‘মধুর হাসি’, ‘মুখের বাণী’, মায়ের বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা ইসলামের তাওহীদ বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিরোধী।
তৃতীয়তঃ এ গানটি বাংলাদেশ-এর স্বাধীন অস্তিত্বের বিরোধী। কেননা এ গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১ খৃঃ) রচনা করেছিলেন ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদ করে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলাকে একীভূত করার উদ্দেশ্যে। অতএব এ থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
প্রশ্ন (১৪/১৪): জনৈক আলেম বলছেন, নারী-পুরুষের ছালাতের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। তার বক্তব্য কি সঠিক?
আতাউর রহমান,
বান্দাইখাড়া, নওগাঁ।
উত্তর : উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। ছালাত আদায়ের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে পদ্ধতিগত কোন পার্থক্য নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে যেভাবে ছালাত আদায় করতে দেখছ, সেভাবেই ছালাত আদায় কর’ (বুখারী, মিশকাত হা/৬৮৩)। তবে বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। যেমন- মহিলা ইমাম মহিলাদের সামনের কাতারের মাঝ বরাবর দাঁড়াবেন (আবুদাঊদ, দারাকুৎনী, ইরওয়া হা/৪৯৩)। ইমাম কোন ভুল করলে মহিলা মুক্তাদীগণ হাতে হাত মেরে আওয়ায করবেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৯৮৮)। মহিলারা সুগন্ধি মেখে মসজিদে আসবেন না। তারা পুরুষের ইমামতি করবেন না (দ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ৪র্থ সংস্করণ ১৪৩-৪৪ পৃঃ)।
প্রশ্ন (১৫/১৫): ইতেকাফরত অবস্থায় জানাযায় শরীক হওয়া যাবে কি?
-মুহাম্মাদ আরাফাত হোসাইন
ধুরইল, মোহনপুর, রাজশাহী।
উত্তর : ইতেকাফরত অবস্থায় জানাযার ছালাতে অংশগ্রহণ করা যাবে না (আবুদাউদ, মিশকাত হা/২১০৬)। অর্থাৎ মসজিদের বাইরে যাওয়া যাবে না (মিরক্বাত, ঐ)
প্রশ্ন (১৬/১৬): জনৈক আলেম বলেন যে, নবী (ছাঃ) গর্ভে থাকাকালে মা আমেনা পেটের দিকে চেয়ে দেখেন একটা জ্যোতি বের হচ্ছে। এ সময় আমেনা কূয়া থেকে পানি আনতে গিয়ে দেখেন কূয়ার পানিই উপরে উঠে আসে। আল্লাহ বলেন, নবীকে নিয়ে পানি তুলতে আমেনা কষ্ট পাবে তাই কূয়ার পানি উপরে উঠে আসে। উক্ত বক্তব্য কি সঠিক? জানিয়ে বাধিত করবেন।
-মুহাম্মাদ এরশাদ মিয়া
রসুলপুর, মহিষবান্দি, গাইবান্ধা।
উত্তর : এগুলি ভিত্তিহীন কাহিনী মাত্র। তবে কিছু যঈফ বর্ণনা এ বিষয়ে এসেছে। যেমন, আমেনা বলেন, যখন তিনি রাসূলকে প্রসব করেন, তখন যেন সেখান থেকে একটা জ্যোতি বের হ’ল, যা সিরিয়ার প্রাসাদ সমূহ আলোকিত করে ফেলল’ (বায়হাক্বী দালায়েলুন নবুঅত ১/৮০; আর-রাহীকুল মাখতূম পৃঃ ৫৪)। এ সময় ইরাকের সাওয়া উপসাগরের পানি শুকিয়ে যায় ও তার তীরবর্তী গীর্জাসমূহ ভেঙ্গে পড়ে’ (ঐ, যঈফাহ হা/২০৮৫; গাযালী, ফিক্বহুস সীরাহ পৃঃ ৪৬)
প্রশ্ন (১৭/১৭) : হারাম উপার্জনকারী আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়া যাবে কি? কেননা দাওয়াত না গ্রহণ করলে আত্মীয়তা নষ্ট হয়।
-আমীর হামযা
গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।
উত্তর : স্পষ্ট ও শুধুমাত্র হারাম উপার্জনকারী আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়া থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। তবে রাসূল (ছাঃ) ইহুদীর বাড়ীতে দাওয়াত খেয়েছেন (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৫৯৩১)। সে হিসাবে আত্মীয়তার হক আদায়ের উদ্দেশ্যে তার বাড়ীতে যাওয়া ও খাওয়া যেতে পারে তাকে হারাম থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেওয়ার জন্য। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করবে। নইলে সত্বর আল্লাহ তোমাদের উপর গযব প্রেরণ করবেন। আর তখন তোমরা দো‘আ করবে। কিন্তু তা কবুল করা হবে না (তিরমিযী, মিশকাত হা/৫১৪০)।
ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, তার নিকটে জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, আমার একজন প্রতিবেশী আছে যে সূদ খায় এবং সর্বদা আমাকে তার বাড়িতে খাওয়ার জন্য দাওয়াত দেয়। এক্ষণে আমি তার দাওয়াত কবুল করব কি? জওয়াবে তিনি বললেন, مَهْنَأَهُ لَكَ وَإِثْمُهُ عَلَيْهِ ‘তোমার জন্য এটি বিনা কষ্টের অর্জন এবং এর গোনাহ তার উপরে’ (মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক হা/১৪৬৭৫, ইমাম আহমাদ আছারটি ‘ছহীহ’ বলেছেন; ইবনু রজব হাম্বলী, জামেঊল উলূম ওয়াল হিকাম (বৈরূত : ১৪২২/২০০১), ২০১ পৃঃ)
প্রশ্ন (১৮/১৮): ফজরের ছালাতের পর ইমাম-মুক্তাদী সকলে মিলে সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করা কি শরী‘আত সম্মত?
আব্দুল লতীফ, বিরল, দিনাজপুর।
উত্তর : উক্ত মর্মে বর্ণিত হাদীছটি অত্যন্ত যঈফ (তিরমিযী হা/২৯২২; মিশকাত হা/২১৫৭)।
প্রশ্ন (১৯/১৯):  হজ্জের সামর্থ্য বলতে কি গচ্ছিত টাকা না জমিজমা বুঝায়? বর্তমান সমাজে এমন অনেক ব্যক্তি আছে যাদের ১০ শতাংশ জমির মূল্য ৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এসব ব্যক্তিদের উপর কি হজ্জ ফরয নয়?
জাহাঙ্গীর আলম, বাগমারা, রাজশাহী।
উত্তর : হজ্জের ‘সামর্থ্য’ বলতে পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য আবশ্যিকভাবে প্রয়োজনীয় সম্পদের অতিরিক্ত সম্পদকে বুঝায়। যা দিয়ে হজ্জে যাওয়া-আসার খরচ সংকুলান হয়। তা সঞ্চিত অর্থ হোক বা সম্পদের বিক্রয় মূল্য হোক। কাজেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমির মালিকদের ক্ষেত্রে জমি বিক্রি করে হ’লেও হজ্জে যাওয়া ফরয। আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহর জন্য লোকদের উপর বায়তুল্লাহর হজ্জ ফরয করা হ’ল, যারা সে পর্যন্ত যাবার সামর্থ্য রাখে’ (আলে ইমরান ৩/৯৭)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘হে জনগণ! তোমাদের উপর হজ্জ ফরয করা হয়েছে। অতএব তোমরা হজ্জ কর’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২৫০৫)। তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি হজ্জের সংকল্প করে, সে যেন দ্রুত সেটা সম্পাদন করে’ (আবুদাঊদ হা/১৫২৪, মিশকাত হা/২৫২৩)
প্রশ্ন (২০/২০): আমার পিতা ও চাচারা তিন ভাই। আমার পিতা ২ ছেলে ৫ মেয়ে, ছোট চাচা ১ মেয়ে এবং সর্বশেষ আমার বড় চাচা ১ মেয়ে রেখে মারা গেছেন। এক্ষণে বড় চাচার সম্পত্তিতে আমরা কোন অংশ পাব কি? পেলে তা ভাতিজা ও ভাতিজীদের মাঝে কিভাবে বণ্টিত হবে?
-আলমগীর হোসায়েন
মাদারীপুর।
উত্তর : বিবরণ অনুযায়ী মৃত ব্যক্তি ১ কন্যা, ২ ভাতিজা এবং ৬ ভাতিজী রেখে গেছেন। তার সম্পদের ওয়ারিছ কেবলমাত্র তার কন্যা। সে পিতার সম্পত্তির অর্ধাংশ পাবে। আর ২ ভাতিজা আছাবা হিসাবে বাকী অর্ধাংশ পাবে। কিন্তু ভাতিজীগণ ভাইদের সাথে ‘আছাবা’ হ’তে না পারায় তারা অংশ পাবে না। ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তির নির্ধারিত অংশসমূহ হকদারগণকে পৌঁছে দাও। অতঃপর যা বেঁচে যাবে, সেগুলি (আছাবা সূত্রে) নিকটতম পুরুষ উত্তরাধিকারীদের দাও’ (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৩০৪২, ‘ফারায়েয ও অছিয়তসমূহ’ অধ্যায়)
প্রশ্ন (২১/২১) : কুরবানীর সাথে আকীকা দেয়া কি জায়েয?
-অধ্যাপক শফীউদ্দীন
পাঁচদোনা, নরসিংদী।
উত্তরঃ কুরবানীর সাথে আকীকা করার কোন দলীল নেই। অতএব তা জায়েয নয়। কারণ কুরবানী ও আকীকা দু’টো ভিন্ন বিষয়। কেউ দিলে তা শরী‘আত সম্মত হবে না (বিস্তারিত দ্রঃ মাসায়েলে কুরবানী ও আকীকা পৃঃ ২০)
প্রশ্ন (২২/২২) : সিজদায় যাওয়ার সময় মাটিতে আগে হাঁটু না হাত রাখতে হবে?
-মাওলানা আব্দুল মালেক
 মেহেন্দীগঞ্জ, বরিশাল।
উত্তরঃ সিজদায় যাওয়ার সময় মাটিতে আগে হাত রাখতে হবে এবং পরে হাঁটু রাখতে হবে। এটাই ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ সিজদা করে, তখন সে যেন উটের মত না বসে। বরং সে যেন তার উভয় হাত উভয় হাঁটুর পূর্বে মাটিতে রাখে’ (আবুদাঊদ, নাসাঈ, দারেমী, মিশকাত হা/৮৯৯; ‘সিজদা ও তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ, সনদ ছহীহ)। এই হাদীছকে কেন্দ্র করেই দু’টি মতের সূত্রপাত হয়েছে। কারণ বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখা যায় যে, হাদীছটির প্রথম অংশ শেষ অংশের বিরোধী। কেননা উটের বসা গরু-ছাগলের বসা থেকে ভিন্ন নয়। চতুষ্পদ জন্তুর সামনের দু’টিকে হাত ও পেছনের দু’টিকে পাঁ বলা হয়। গরু-ছাগল যেমন বসার সময় প্রথমে হাত বসায়, উটও তেমন বসার সময় প্রথমে হাত বসায়। অথচ হাদীছের প্রথম অংশে উটের মত বসতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ রুকূ থেকে সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে হাত রাখতে নিষেধ করা হয়েছে এবং হাদীছের শেষ অংশে রুকূ থেকে সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে হাত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) সহ যাঁরা সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে হাঁটু রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করেন তাদের যুক্তি হ’ল, যেহেতু হাদীছের প্রথম অংশ শেষ অংশের বিরোধী, সেহেতু রাবী হাদীছটি বর্ণনার সময় শেষ অংশকে প্রথম অংশের উল্টা করে ফেলেছেন। মূলত হাদীছটির শেষ অংশ হবে ‘সে যেন হাতের পূর্বে হাঁটু রাখে’।
কিন্তু এই যুক্তি ঠিক নয়। কারণ চতুষ্পদ জন্তুর হাতেই হাঁটু। যার প্রমাণে হাদীছে এসেছে, যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও আবু বকর (রাঃ) হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে মদীনার দিকে রওয়ানা হন, তখন কুরাইশ নেতারা রাসূল (ছাঃ)-কে হত্যা করতে পারলে একশত উট পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এই পুরস্কারের লোভে সুরাকাহ বিন জু‘শুম ঘোড়া ছুটিয়ে যখন রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটবর্তী হ’ল, তখন সে বলে যে, سَاخَتْ يَدَا فَرَسِيْ فِي الأَرْضِ حَتَّى بَلَغَتَا الرُّكْبَتَيْنِ ‘আমার ঘোড়ার হাত দু’টি হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে দেবে গেল’ (বুখারী হা/৩৯০৬)। জাহেয বলেন, চতুষ্পদ জন্তুর হাঁটু হ’ল হাতে এবং মানুষের হাঁটু হ’ল পায়ে (জাহেয, কিতাবুল হায়ওয়ান, ২/৩৫৫ পৃঃ)। ইমাম ত্বাহাবী (রহঃ) বলেন, উটের হাঁটু হ’ল হাতে, যা মানুষের অনুরূপ নয়’ (ত্বাহাবী, শারহু মা‘আনিল আছার, ১/২৫৪ পৃঃ)। অতএব প্রমাণিত হ’ল যে, উট ও অন্যান্য চতুষ্পদ জন্তুর হাতেই হাঁটু। সুতরাং রাসূল (ছাঃ) রুকূ থেকে সিজদায় যাওয়ার সময় উটের মত প্রথমে হাঁটু না দিয়ে হাত রেখে সিজদায় যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এছাড়াও আবদুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে ছহীহ মরফূ রেওয়ায়াত এসেছে এই মর্মে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সিজদা কালে হাঁটুর পূর্বে মাটিতে হাত রাখতেন’ (হাকেম হা/৮২১, ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/৬২৭; সনদ ছহীহ, আলবানী, মিশকাত ১/২৮২ পৃঃ, টীকা নং ১)
ইমাম আওযাঈ বলেন, আমি লোকদেরকে পেয়েছি এই অবস্থায় যে, তারা স্বীয় হস্তগুলিকে তাদের হাঁটুর পূর্বে রাখত। ইমাম মারওয়াযী উক্ত আছারটি স্বীয় ‘মাসায়েল’ গ্রন্থে (১/১৪৭/১) ছহীহ সনদে সঙ্কলন করেছেন (আলবানী, ছিফাতু ছালাতিন নবী (ছাঃ), পৃঃ ১২২)। উল্লেখ্য যে, নবী করীম (ছাঃ) সিজদায় যাওয়ার সময় হাঁটু আগে রাখতেন বলে দারেমী ও সুনান চতুষ্টয়ের বরাতে ওয়ায়েল বিন হুজর (রাঃ) থেকে মিশকাতে (হা/৮৯৮) যে বর্ণনাটি সঙ্কলিত হয়েছে, তা যঈফ। তাছাড়া আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছটি ক্বওলী ও ওয়ায়েল (রাঃ) বর্ণিত হাদীছটি ফে‘লী। দলীল গ্রহণের সময় ক্বওলী হাদীছ অগ্রগণ্য হয়ে থাকে। যাদুল মা‘আদের ভাষ্যকার শু‘আয়েব আরনাঊত্ব ও আব্দুল কাদের আরনাঊত্ব আগে হাঁটু রাখার পক্ষে হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম প্রদত্ত সকল প্রমাণাদি আলোচনা শেষে মন্তব্য করেন যে, লেখকের সকল দলীল তাঁর বিপক্ষে গিয়েছে। আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত আগে হাত রাখার হাদীছ নিঃসন্দেহে ছহীহ এবং ওয়ায়েল বিন হুজর (রাঃ) বর্ণিত আগে হাঁটু রাখার হাদীছ যঈফ (যাদুল মা‘আদ (বৈরূত ১৪১৬/১৯৯৬) ১/২২৩ টীকা-১)। ইবনু হাযম আগে হাত রাখাকে ফরয ও অপরিহার্য বলেছেন (মুহাল্লা, মাসআলা নং ৪৫৬)।
প্রশ্ন (২৩/২৩) : বিসমিল্লাহ বলে ওযূ শুরু না করলে ওযূ হবে না (আবুদাঊদ হা/১০১)। আমার প্রশ্ন হ’ল, তবে এটা কি ফরয? সঠিক উত্তর জানিয়ে বাধিত করবেন।
-মুহাম্মাদ আব্দুল গণী, পাবনা।
উত্তর: ইমাম আহমাদ, বায়হাক্বী, নববী, বাযযার প্রমুখ বিদ্বানগণ হাদীছটি যঈফ বলেছেন। পক্ষান্তরে শায়খ আলবানীসহ অনেক বিদ্বান ‘ছহীহ’ বলেছেন। সেকারণ তাদের নিকটে বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব। অন্য বিদ্বানগণের নিকটে ‘মুস্তাহাব’। কেননা কুরআনে বর্ণিত ওযূর নিয়মে বিসমিল্লাহ বলার বিষয়টি নেই। এছাড়া রাসূল (ছাঃ)-এর ওযূর নিয়ম বর্ণনায় বিসমিল্লাহ বলার নির্দেশনা নেই (আবুদাঊদ হা/৮৫৮)। সকল শুভকাজের পূর্বে হাদীছে বিসমিল্লাহ বলার নির্দেশনা এসেছে। সে হিসাবে ওযূর পূর্বের বিসমিল্লাহ বলা আবশ্যক। যদি কেউ না বলেন তাহ’লে তিনি এই সুন্নাতের নেকী হ’তে মাহরূম হবেন। অতএব ওযূর পূর্বে বিসমিল্লাহ বলা মুস্তাহাব, তবে ফরয নয়।
প্রশ্ন (২৪/২৪) : আজকাল ছেলে-মেয়েদের অনেকেই পিতা-মাতার অজান্তে সাজানো অভিভাবকের মাধ্যমে কোর্ট ম্যারেজ করে একত্রে বসবাস করছে। অভিভাবকরাও মান-সম্মানের ভয়ে বিষয়টি প্রকাশ করেন না। পরবর্তীতে কোন এক পর্যায়ে পুনরায় ঘটা করে পূর্ণ সামাজিক প্রথায় বিবাহ প্রদান করা হয়ে থাকে। এক্ষণে দ্বিতীয় বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত বর-কনের মেলামেশা বৈধ হিসাবে গণ্য হবে কি?
-ডাঃ আমীমুল এহসান
ধানমন্ডি, ঢাকা।
উত্তর: অভিভাবক ছাড়া বিবাহ বৈধ হয় না। রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, لاَ نِكَاحَ إِلاَّ بِوَلِيٍّ ‘অভিভাবক ছাড়া বিবাহ সিদ্ধ নয়’(আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩১৩০)অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘কোন নারী অভিভাবক ছাড়া বিবাহ করলে তা  বাতিল, বাতিল, বাতিল’ (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩১৩১)অতএব উক্ত বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবেএবং দ্বিতীয় বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত বর-কনের একত্রে বসবাস অবৈধ ও ব্যভিচারের অন্তর্ভুক্ত হবে। সঠিক পন্থায় বিবাহ সম্পাদনের পর তাদের এই ঘৃণ্য অপকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে খালেছ অন্তরে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
প্রশ্ন (২৫/২৫) : আযান চলাকালীন সময়ে সালাম দেয়া বা সালামের জবাব দেয়া যাবে কি?
-ওবায়দুল ইসলাম
শৈলেরকান্দা, জামালপুর।
উত্তর: যাবে। কেননা আযান চলাকালীন সময়ে সালাম দেয়া বা সালামের জবাব দেয়া যাবে না মর্মে কোন দলীল পাওয়া যায় না। অথচ সাক্ষাত হ’লে পরস্পরে সালাম দেয়া মুসলমানের জন্য পারস্পরিক হক-এর অন্তর্ভুক্ত (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/১৫২৪)। রাসূল (ছাঃ) ছালাতরত অবস্থাতেও হাতের ইশারায় সালামের উত্তর দিতেন (আবুদাউদ হা/৯২৬, তিরমিযী হা/৩৬৭)। অতএব আযান চলাকালীন সময়ে সালাম বিনিময়ে কোন বাধা নেই।
প্রশ্ন (২৬/২৬) : মসজিদে মহিলাদের ছালাতের জন্য পৃথক রুম করা আছে। এখন অনেক সময় গরমের কারণে মুছল্লীরা বারান্দায় ছালাত আদায় করলে মহিলারা তাদের সামনে পড়ে যায়। এ ছালাত শুদ্ধ হবে কি?
-মুহাম্মাদ উজ্জ্বল হোসেন
গাজীপুর, তেরখাদা, খুলনা।
উত্তর : মহিলারা পর্দার মধ্যে থাকলে ছালাত শুদ্ধ হবে। কোন সমস্যা নেই।
প্রশ্ন (২৭/২৭) : চার বছর অথবা পাঁচ বছরের টাকা অগ্রিম পরিশোধ করে আমের পাতা লীজ নেওয়া যাবে কি?
-মুহাম্মাদ রানা, রাজশাহী কলেজ।
উত্তর: উল্লেখিত পদ্ধতিতে লিজ নেওয়া যাবে না। কারণ রাসূল (ছাঃ) একাধিক বছরের জন্য ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন (মুসলিম, মিশকাত হা/২৮৪১)। কারণ এতে ক্রেতা অথবা বিক্রেতা ধোঁকায় পড়তে পারে। পাতা ক্রয়, মুকুল ক্রয়, ফল ক্রয় সবই এই নিষেধের অন্তর্ভুক্ত।
প্রশ্ন (২৮/২৮) : কুরআনে ‘বায়‘আত’ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা কি মেয়েদের পুরুষের হাতে হাত রেখে বায়‘আত গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে? যদি না হয় তবে কখন কুরআনের সেই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল? এর শানে নুযূল কি? বিস্তারিতভাবে জানতে চাই।
-শামসুল হক, টাংগাইল।
উত্তর : আল্লাহ তা‘আলা সূরা মুমতাহিনার ১২ নম্বর আয়াতে মহিলাদের বায়‘আত সম্পর্কে এরশাদ করেন, ‘হে নবী! যখন ঈমানদার নারীগণ আপনার নিকট এসে আনুগত্যের বায়‘আত নেয় এই মর্মে যে, তারা শিরক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, সন্তানদের হত্যা করবে না, মিথ্যা অপবাদ রটনা করবে না এবং ভাল কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের বায়‘আত গ্রহণ করুন’ (মুমতাহিনা ৬০/১২)। আয়েশা (রাঃ) বলেন উক্ত আয়াতের প্রেক্ষাপটে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট কোন নারী আসলে আয়াতে উল্লিখিত বিষয়ে তিনি আনুগত্যের বায়‘আত নিতেন কথার মধ্যমে। কিন্তু কখনো তাঁর হাত কোন নারীর হাতে স্পর্শ করেনি (বুখারী হা/৫২৮৮, মুসলিম হা/১৮৬৬)
প্রশ্ন (২৯/২৯) : আমি ৩ মাস বয়স থেকে আমার নিঃসন্তান পালক পিতা-মাতার নিকটে লালিত-পালিত হয়েছি। এক্ষণে আমার আসল পিতা-মাতার সাথে আমার সম্পর্ক ক্ষীণ হওয়ায় তারা আমার নামে সম্পত্তি লিখে দিতে চায়। প্রশ্ন হ’ল- এ সম্পত্তি গ্রহণ করা কি জায়েয হবে এবং আসল পিতা-মাতার সম্পত্তিতে কি আমার কোন অধিকার আছে?
-আব্দুল্লাহ
বাগমারা, রাজশাহী।
উত্তর : প্রশ্ন অনুযায়ী পালিত সন্তান পালক পিতা-মাতার ওয়ারিছ হবে না। তবে এরূপ ক্ষেত্রে তারা অছিয়ত করতে পারেন। যা এক-তৃতীয়াংশের বেশী হবে না (বুখারী হা/৬২৭৩)। সন্তান সর্বদা জন্মদাতা পিতা-মাতারই ওয়ারিছ হয় (নিসা ১১)। অতএব পালকপুত্র পালক পিতা-মাতার কৃত অছিয়ত গ্রহণ করতে পারবে। সাথে সাথে সে জন্মদাতা পিতা-মাতার সম্পত্তির ওয়ারিছ হবে।
প্রশ্ন (৩০/৩০) : জনৈক মাওলানা বলেন, যে মারিয়াম নামে সকল মহিলা জান্নাতে যাবে, উক্ত বক্তব্যটি কি সঠিক?
-মুহাম্মাদ আরাফাত হোসাইন
ধুরইল, মোহনপুর, রাজশাহী।
উত্তর: কথাটি ভিত্তিহীন।
প্রশ্ন (৩১/৩১) : স্ত্রীর সাথে রাতের প্রথম প্রহরে সহবাস করলে মেয়ে হয় ও শেষ প্রহরে সহবাস করলে ছেলে হয়, এ বক্তব্যের কোন শারঈ ভিত্তি আছে কি?
-মুহাম্মাদ রায়হান
ধুরইল, মোহনপুর, রাজশাহী।
উত্তর: কথাটি ভিত্তিহীন। ছেলে-মেয়ে দেয়ার মালিক কেবল মাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন(শূরা ৪৯)
প্রশ্ন (৩২/৩২) : কোন ছেলের সাথে কোন মেয়ের বিবাহ হবে তা কি আল্লাহ নির্ধারণ করে রাখেন? নাকি মানুষের পসন্দমত হয়?
-মহিউদ্দীন
মাষ্টারহাট, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
উত্তর: স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়ে থাকে। আর যা কিছু ঘটে সবই আসমান-যমীন সৃষ্টির ৫০ হাযার বছর পূর্বে তাক্বদীরে লিপিবদ্ধ রয়েছে (মুসলিম, মিশকাত হা/৭৯)। তাক্বদীরে কি আছে মানুষ তা জানে না। তাই তাকে সাধ্যমত দ্বীনদার ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিবাহের চেষ্টা করে যেতে হবে এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে।
প্রশ্ন (৩৩/৩৩) : আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, সওয়ারীর পশু বন্ধক রাখলে তার পিঠে আরোহণ করা যাবে। দুগ্ধবতী পশু রাখলে তার দুধ খাওয়া যাবে। কিন্তু যে বন্ধক নিবে সে খরচ বহন করবে (তিরমিযী হা/১১৯১)। হাদীছটি কি ছহীহ? যদি তাই হয়, তাহ’লে জমির ক্ষেত্রেও কি তাই হবে?
-একরামুল হক
সাতক্ষীরা।
উত্তর: বন্ধক এবং ঋণের হুকুম একই। ঋণের বিপরীতে লাভ নেওয়া যেমন সূদ, ঠিক তেমনি বন্ধক নেওয়া জিনিস থেকেও কোনরূপ লাভ গ্রহণ করা সূদের অন্তর্ভুক্ত। বন্ধক মূলত ঋণের বিপরীতে যামানত স্বরূপ। সেটার সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঋণগ্রহীতার উপর। শর্তানুযায়ী তার ঋণ পরিশোধ করলে তাকে তার বন্ধকী বস্ত্ত ফেরত দিবে। আর ঋণ পরিশোধে অসম্মতি জানালে তার ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী সে তা থেকে উসুল করে নিবে। তবে বন্ধকী বস্ত্ত যদি পশু হয়, সে ক্ষেত্রে রাসূল (ছাঃ) বলেন, বন্ধক নেওয়া পশুর উপর সওয়ার হ’তে পারবে, তার খরচ অনুপাতে এবং তার দুধও পান করতে পারবে তার খরচ অনুপাতে (বুখারী হা/২৩৭৭, মিশকাত হা/২৮৮৬)। উল্লে­খ্য যে, একমাত্র পশুর ক্ষেত্রে উপকার গ্রহণ করার অনুমতি পাওয়া যায়। যেহেতু পশুর জীবন রক্ষার জন্য তার দেখাশুনা করা অপরিহার্য, সেহেতু তার উপর ব্যয়কৃত অর্থ অনুপাতে সে তা থেকে উপকার গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু জমির ক্ষেত্রে তা জায়েয নয় (সুবুলুস সালাম হা/৮০৯-এর ব্যাখ্যা, ৩/১০২ পৃঃ)
উল্লেখ্য যে, বন্ধকী জমির ফসল ভোগ করা অনুরূপ সূদ, যেমনভাবে কাউকে ১০০ টাকা ঋণ দিয়ে ১১০ টাকা নেওয়া সূদ। কেননা ‘ঋণের বিনিময়ে যদি কোন লাভ নেওয়া হয়, তবে সেটাই সূদ’। বন্ধক রাখা হয় কেবলমাত্র ঋণের টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তার স্বার্থে, বাড়তি লাভের জন্য নয়। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্কে উত্তম ঋণ দেয়, আল্লাহ তাকে বহুগুণ বেশী দান করে থাকেন। আল্লাহ রূযির কম-বেশী করে থাকেন এবং তার কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে’ (বাক্বারাহ ২/২৪৫)।           
প্রশ্ন (৩৪/৩৪) : রাসূল (ছাঃ) শুক্রবারে মসজিদ নববীতে ফরয ছালাত শেষে বাড়িতে গিয়ে সুন্নাত পড়তেন। বিষয়টি কি সঠিক? যদি সঠিক হয়, তবে মুছল্লীদেরকে কি সেদিকেই উৎসাহিত করতে হবে? রাসূলের এ আমল থেকে কি বিষয়টি ওয়াজিব সাব্যস্ত হবে?
-একরামুল হক আকন্দ
গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।
উত্তর: বিষয়টি সঠিক এবং এটি ফরয নয় বরং মুস্তাহাব।আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) জুম‘আর পরে বাড়িতে গিয়ে দু’রাক‘আত সুন্নাত পড়তেন (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১১৬১)। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি জুম‘আর পরে ছালাত আদায় করে, সে যেন চার রাক‘আত পড়ে (মুসলিম, মিশকাত হা/১১৬৬)। ইমাম নববী বলেন, অত্র হাদীছগুলি দ্বারা জুম‘আর পরে সুন্নাত পড়া মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়। ইসহাক্ব বিন রাহওয়াইহ বলেন, মসজিদে আদায় করলে চার রাক‘আত এবং বাড়িতে আদায় করলে দু’রাক‘আত পড়বে। ইবনু ওমর (রাঃ) মসজিদে দু’রাক‘আত এবং তারপরে চার রাক‘আত পড়তেন (মির‘আত ৪/১৪২-৪৩)।
অতএব যারা বাড়িতে এসে উক্ত সুন্নাত আদায়ে অভ্যস্ত, তারা বাড়িতে এসে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবেন। নইলে মসজিদেই দুই অথবা চার রাক‘আত আদায় করবেন। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে কোনরূপ সুন্নাত না পড়েই মসজিদ থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা যায়, তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
প্রশ্ন (৩৫/৩৫) : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছালাতের সাথে যদি আমাদের ছালাতে মিল না থাকে, তাহ’লে সে ছালাত কি আল্লাহর দরবারে কবুল হবে? যেমন মাযহাবী ভাইদের ছালাত?
-শরীফুল ইসলাম
ঘাটাইল, টাঙ্গাইল।
উত্তর : রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা ছালাত আদায় কর সেভাবে, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ (বুখারী হা/৬০০৮; মিশকাত হা/৬৮৩)। তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং  যে আমার অবাধ্যতা করল, সেই-ই জান্নাতে যেতে অসম্মত’ (বুখারী, মিশকাত হা/১৪৩)। অতএব ছহীহ হাদীছ মোতাবেক ছালাত আদায় না করা হ’লে তা কবূলযোগ্য হবে না।
প্রশ্ন (৩৬/৩৬) : যাকির নায়েকের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, হিন্দুদের ‘বেদ’ সহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলিতে বহু বক্তব্য রয়েছে, যা কুরআন ও হাদীছের বিধি-বিধান ও বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে সেগুলি কি আল্লাহ প্রেরিত ছহীফা, নাকি মানব রচিত কোন গ্রন্থ? সঠিক উত্তর দানে বাধিত করবেন।
-মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম
শিবপুর, মোহনপুর, রাজশাহী।
উত্তর : এগুলি আল্লাহ প্রেরিত ছহীফা হবার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীছে কিছুই বলা হয়নি। তবে বিভিন্ন ধর্মের সুন্দর বাণী সমূহ বিগত নবীগণের শিক্ষার ফসল হওয়াটা মোটেই বিচিত্র নয়। এ বিষয়ে আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।
প্রশ্ন (৩৭/৩৭) : পৃথিবীতে কি এমন কোন দ্বীপ থাকতে পারে, যেখানে এ পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি? যদি থাকে, তাহ’লে সেখানকার লোকজন অমুসলিম অবস্থায় মারা গেলে। মৃত্যুর পর তাদের ব্যাপারে ফায়ছালা কি হবে?
-মুহাম্মাদ ইসমাঈল হুসাইন
অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
উত্তর : ভূপৃষ্ঠে এমন কোন স্থান থাকবে না যেখানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছবে না (আহমাদ হা/২৩৮৬৫, মিশকাত হা/৪২)। এরপরও কারু নিকটে যদি ইসলামের দাওয়াত না পৌঁছে, তবে আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন তাদের আনুগত্যের পরীক্ষা নিবেন। এতেই তারা জান্নাতী বা জাহান্নামী হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, কিয়ামতের দিন চার ব্যক্তি ঝগড়া করবে। (১) বধির (الأصم) (২) বোকা (الأحمق) (৩) অতিবৃদ্ধ (الهرم) এবং (৪) যে ইসলামের দাওয়াত পায়নি (من ماة في الفةرة)। বধির বলবে, হে আমার প্রতিপালক! ইসলাম এসেছে অথচ আমি কিছুই শুনতে পাইনি। বোকা বলবে, ইসলাম আগমন করেছে। অথচ শিশুরা আমার দিকে পশুর বিষ্ঠা নিক্ষেপ করেছে। অতিবৃদ্ধ বলবে, ইসলাম আগমন করেছে। অথচ আমি কিছুই বুঝতে সক্ষম হইনি। আর ইসলামের দাওয়াত না পাওয়া ব্যক্তি বলবে, হে আল্লাহ! তোমার কোন দাওয়াতদাতা আমার নিকট আসেনি। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিকট হ’তে আনুগত্যের শপথ নিবেন। এরপর তাদের নিকট একজন দূত প্রেরণ করবেন এই মর্মে যে, তোমরা আগুনে প্রবেশ কর। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যার হাতে আমার জীবন নিহিত, তার কসম করে বলছি, যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে, আগুন তার উপর ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি প্রবেশ করবে না, তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে (ত্বাবারাণী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৪৩৪)। 
প্রশ্ন (৩৮/৩৮) : অমুসলিম-কাফের-মুশরিকদের বাড়িতে এবং যে সকল মুসলিম ছালাত আদায় করে না, ছিয়াম রাখে না, তাদের বাড়িতে খাওয়া যাবে কি? তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে কি?
-হাবীবুর রহমান সিরাজী
বোয়ালকান্দি মাদরাসা, এনায়েতপুর, সিরাজগঞ্জ।
উত্তর : অমুসলিম-কাফের-মুশরিকদের বাড়িতে খাওয়া যাবে। শর্ত হ’ল খাদ্যটি হালাল ও পবিত্র হবে। কারণ রাসূল (ছাঃ) ইহুদীর দাওয়াত খেয়েছেন, যাদের অধিকাংশ উপার্জন হারাম পন্থায় হয়ে থাকে (বুখারী হা/২৬১৭, আবুদাঊদ হা/৪৫০৮)। তাদেরকে মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে এবং তাদের সাথে দুনিয়াবী ক্ষেত্রে সদাচরণ করতে হবে। যদি তারা আমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না থাকে এবং যদি তা দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা না হয় (মুমতাহিনাহ ৬০/৮)। একই বিধান যারা ছালাত আদায় করে না, ছিয়াম পালন করে না তাদের জন্যও প্রযোজ্য। এর মধ্য দিয়ে তাদেরকে উপদেশ দেওয়ারও সুযোগ লাভ করা সম্ভব হবে।
প্রশ্ন (৩৯/৩৯) : সূরা বাক্বারাহ ৪১ আয়াতের মাঝে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আমার আয়াত সমূহের পরিবর্তে তুচ্ছ বিনিময় গ্রহণ করো না এবং আমাকে ভয় কর’। প্রশ্ন হ’ল, আয়াত সমূহের পরিবর্তে তুচ্ছ বিনিময় কি? বিস্তারিত জানতে চাই।
-মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম
জাফরপুর, চারঘাট, রাজশাহী।
উত্তর : সূরা বাক্বারার এ আয়াত দ্বারা মদীনার ইহুদীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। যাতে তারা দুনিয়াবী স্বার্থের বিনিময়ে তাওরাত ও ইঞ্জীলে রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী সহ অন্যান্য বিধানাবলী গোপন না করে এবং হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম না করে। তবে এর ভাবার্থ ব্যাপক, যা সকল যুগের জন্য প্রযোজ্য। এখানে দ্বীনের বিনিময়ে দুনিয়া অর্জন করাকে ‘তুচ্ছ বিনিময়’ বলা হয়েছে। ইহুদী ধর্মনেতাদের ন্যায় মুসলিম ধর্মনেতাগণ যেন এরূপ না করে সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর দ্বারা অর্থের বিনিময়ে কুরআন ও হাদীছের অপব্যাখ্যা করাকেও বুঝানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, শরী‘আত সম্মত পন্থায় কুরআন ও হাদীছ শিক্ষা দেয়ার বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয। যেমন কুরআন পাঠের দ্বারা রোগীকে ঝাড়ফুঁক করে ছাহাবীগণ বিনিময় গ্রহণ করেছেন (বুখারী হা/৫০০৭; মিশকাত হা/২৯৮৫, ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়, ১৪ অনুচ্ছেদ)
প্রশ্ন (৪০/৪০) : মেয়ের পক্ষ থেকে ডিভোর্স দিয়ে তা ছেলের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর অভিভাবক ছাড়াই মেয়ে কাজী অফিসে গিয়ে অন্যত্র বিবাহ রেজিস্ট্রি করেছে। কিন্তু মুখে কবুল বলেনি। তখন প্রচলিত ছিল যে, রেজিস্ট্রি করলেই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যায়। এখন সে জানতে পেরেছে তার বিবাহ শুদ্ধ হয়নি। কিন্তু তার তিনটা সন্তান রয়েছে। এখন এই বৃদ্ধ বয়সে তার করণীয় কি? জানিয়ে বাধিত করবেন।
-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : এমতাবস্থায় কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর নিকটে ইখলাছের সাথে তওবা করবে ও ক্ষমা প্রার্থনা করবে। কারণ অভিভাবকের অনুমতিবিহীন বিবাহ বাতিল (আবুদাঊদ হা/২০৮৩)। পরবর্তীতে অভিভাবক বিয়ে মেনে নিয়ে থাকলে তখনই শরী‘আত সম্মতভাবে পুনরায় বিয়ে হওয়া উচিৎ ছিল। এক্ষণে অভিভাবক মেনে না নিয়ে থাকলে তাদের অনুমতি সাপেক্ষে নতুন করে শরী‘আতের বিধান অনুযায়ী বিয়ে পড়াতে হবে এবং তার আগ পর্যন্ত স্বামীর সাথে মেলামেশা বন্ধ রাখতে হবে।

HTML Comment Box is loading comments...