মুসলিম জাহান

সিরিয়া সংঘাত ধর্মীয় যুদ্ধের সূচনা করতে পারে

-ফরাসী পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ ফেবিয়াস গত ৫ই অক্টোবর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছেন, সিরিয়ার যুদ্ধ ব্যাপকভিত্তিক ধর্মীয় যুদ্ধের সূচনা করতে পারে। তিনি বলেন, একটি গৃহযুদ্ধ যেখানে রাশিয়া, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো আন্তর্জাতিক শক্তির সম্পৃক্ততায় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, সেখানে ধর্মীয় যুদ্ধের হুমকি থেকেই যায়। এই যুদ্ধে যদি এক পক্ষ শী‘আদের সমর্থন করে এবং অন্য পক্ষ সুন্নীদের সমর্থন দেয়, তাহ’লে তা ধর্মীয় যুদ্ধের মতো মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। যেমন দেশটিতে আসাদের পেছনে রয়েছে শী‘আ অধ্যুষিত শক্তিশালী দেশ ইরান ও লেবাননভিত্তিক হিযবুল্লাহ। অন্যদিকে সঊদী আরব ও কাতারের মতো সুন্নী রাষ্ট্রসমূহ আসাদের বিরোধিতা করে ইসলামপন্থী যোদ্ধাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে একত্রে আসাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে।

[উক্ত বক্তব্যের সঙ্গে আমরাও একমত। অতএব নেতাদের উচিত হবে সর্বাগ্রে মানুষ হত্যার উন্মাদনা থামানো। আদর্শকে আদর্শ দিয়ে মোকাবিলা করুন। অস্ত্র দিয়ে নয় (স.স.)]

জাতিসংঘে ফিলিস্তীনী পতাকা উত্তোলন

নিউইয়র্কস্থ জাতিসংঘের সদর দফতরে গত ৩০শে সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মত ফিলিস্তীনী পতাকা উড়ানো হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে ফিলিস্তীনী পতাকা উড়ানো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাহমূদ আববাস। এদিন বেলা ১-টায় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সামনে এ পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলনকালে দেয়া বক্তব্যে মাহমূদ আববাস ফিলিস্তীনকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বিশ্ববাসীর কাছে আবেদন জানান। ২০১২ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তীনকে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসাবে মর্যাদা দেওয়ার পর এবার পতাকা উত্তোলনের সুযোগ দিল সংস্থাটি। তবে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইসরাঈল ও তার অন্ধ সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র সহ ছয়টি রাষ্ট্র।

পবিত্র হজ্জ ১৪৩৬ সম্পন্ন

ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোন

-হজ্জের খুৎবায় সঊদী গ্র্যান্ড মুফতী

হজ্জব্রত পালনের জন্য পবিত্র মক্কা নগরীর অদূরে আরাফার ময়দানে অবস্থানের মধ্য দিয়ে গত ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৫ মোতাবেক ৯ই যিলহজ্জ ১৪৩৬ হিজরী বুধবার পবিত্র হজ্জ পালন করেছেন গোটা বিশ্ব থেকে আগত ২০ লক্ষাধিক মুসলমান।

হজ্জের খুৎবায় সঊদী আরবের মহামান্য গ্র্যান্ড মুফতী শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ আলে শায়েখ (৭৫) মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং ইসলাম বিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহবান জানান। এবারের খুৎবার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সঊদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য, শী‘আ হাওছী, বায়তুল মুক্বাদ্দাস ও সিরীয় শরণার্থী প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, ইসলাম সত্য ধর্ম। এছাড়া কোন সত্য ধর্ম নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হ’ল ইসলাম’ (আলে ইমরান ৩/১৯)। তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন তালাশ করবে, কখনোই তা গ্রহণ করা হবে না’ (আলে ইমরান ৩/৮৫)। ইসলাম বিরোধীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, ইসলামের শত্রুরা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং ইসলামের উপর আপতিত বিপদের সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। যাতে তারা মুসলিম উম্মাহকে ও তার অস্তিত্বকে সমূলে ধ্বংস করে দিতে পারে। এদের মধ্যে কিছু আছে বাইরের শত্রু এবং কিছু  আছে এমন শত্রু যারা ইসলামের বিরুদ্ধে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এরা মিথ্যা ও প্রতারণাবশতঃ ইসলামের পোষাক পরিধান করে এবং মুসলিম উম্মাহর প্রতিরক্ষার জিগির তোলে। এরা মুসলিম উম্মাহর অকল্যাণ, ধ্বংস ও অনৈক্য বৈ কিছুই কামনা করে না।

খুৎবার শেষ দিকে তিনি দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আযীযের জন্য দো‘আ করেন এবং মক্কায় ক্রেন দুর্ঘটনায় নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি সকলের জন্য হজ্জ যেন কবুল হয় আল্লাহর নিকট সেই প্রার্থনা করেন।

তিনি মুসলিম বিশ্বকে মুসলমান নামধারী সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, আমাদের মধ্যে এমন কিছু নিকৃষ্ট মানুষ গজিয়ে উঠেছে যারা তাদের চারিত্রিক অবক্ষয় ও বুদ্ধির চপলতার দ্বারা সুপরিচিত। এরা মুসলমানদের জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মুসলমানদেরকে কাফের আখ্যায়িত করে আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে তাদের রক্তকে হালাল করে নিয়েছে। তারা নিরাপদ ব্যক্তিদের মসজিদ সমূহকে ধ্বংস করেছে এবং তাদের বাজে কথা ও মন্দ যুক্তিকে মিথ্যা ও অন্যায়ভাবে ইসলামের দিকে সম্পৃক্ত করেছে। অথচ আল্লাহ ভাল করেই জানেন যে, এরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। এর মাধ্যমে তারা মুসলিম উম্মাহর পশ্চাৎপদতা কামনা করে। তিনি এই সন্ত্রাসী পথভ্রষ্ট জঙ্গী গোষ্ঠীর স্বরূপ মুসলিম উম্মাহর কাছে তুলে ধরার আহবান জানান। কেননা মুসলিম সমাজে এদের উপস্থিতি বিশাল ক্ষতিকর।

তিনি ইয়েমেনের শী‘আ হাওছীদের সম্পর্কে বলেন, হাওছী একটি পাপী-অপরাধী ও অত্যাচারী গোষ্ঠী। এরা জঘন্য চিন্তা লালন করে। তারা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণকে গালি-গালাজ করে এবং তাদেরকে কাফের আখ্যায়িত করে। বিশেষতঃ আবুবকর, ওমর ও ওছমান (রাঃ)-কে। তারা তাদের মিম্বরে, বক্তব্যের মঞ্চে ও সভা-সমিতিতে ছাহাবীগণকে গালিগালাজ করে, তাদের প্রতি লা‘নত করে এবং তাদের সম্পর্কে এমন মিথ্যা ও অপবাদমূলক কথা বলে, যে সম্পর্কে আল্লাহই সম্যক অবগত। তারা আয়েশা (রাঃ) সম্পর্কে জঘন্য মিথ্যাচার করে। তিনি আরো বলেন, হাওছী গোষ্ঠী আক্বীদাগতভাবে একটি পথভ্রষ্ট ও নিকৃষ্ট গোষ্ঠী। এরা ইসলামের দেশে ইসলামের শত্রুদেরকে সুবিধা প্রদানের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। এরা (হাওছী) তাদের প্রতিবেশীদের হুমকি দিচ্ছে।

বায়তুল মুক্বাদ্দাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাসজিদুল আক্বছা মসজিদে আকছা আজকে আল্লাহর কাছে অতঃপর মুসলিম উম্মাহর কাছে ইহূদীদের দ্বারা তাকে অপবিত্র করা, মুছল্লীদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দেয়া এবং তাদেরকে কষ্ট দেয়ার অভিযোগ করছে। যখন মানুষেরা তাদের নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং মুসলমানেরা তাদের ভুল-ত্রুটিতে নিমগ্ন রয়েছে ঠিক এই সময়টাকে ইহূদীরা বায়তুল মুক্বাদ্দাসকে বিভক্ত করা, তার মর্যাদাহানি করা এবং তাকে জ্বালিয়ে দেয়ার সুযোগ গ্রহণ করেছে। সুতরাং হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা সতর্ক হও।

তিনি যুবকদেরকে আল্লাহকে ভয় করার এবং বোমা বিস্ফোরণের মতো সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে না পড়ার উদাত্ত আহবান জানান। কারণ তারাই মুসলিম উম্মাহর ভিত্তি, শক্তি ও ডান হাত। তিনি তাদেরকে শত্রুদের পাতানো ফাঁদে পা না দিয়ে বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করার এবং মুসলমানদের জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার আহবান জানান। যুবকদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তোমাদেরকে ইলম ও শরী‘আতের দায়িত্ব দিয়েছেন। এই ইলম প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব তোমাদের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছে। কাজেই তোমরা সত্য কথা বল এবং সত্যের পথিক হও।

তিনি মুসলিম নেতৃবৃন্দকে আল্লাহকে ভয় করার এবং ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, আমরা ইখলাছ, সত্যবাদিতা ও সদাচারের মুখাপেক্ষী। আপনাদের শত্রুরা পরিকল্পনা করছে, সংগঠিত হচ্ছে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। অথচ আপনারা তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে উদাসীন রয়েছেন। আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং ঐক্যবদ্ধ হৌন। আর জেনে রাখুন যে, যে কোন মুসলিম দেশের উপর আপতিত বিপদ সকল মুসলিম দেশের বিপদ হিসাবে পরিগণিত।

সিরীয় শরণার্থীদের সাথে সকল মুসলমানের অন্তর জড়িয়ে রয়েছে বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন। আল্লাহ যেন তাদেরকে নিরাপদে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনেন সে দো‘আও তিনি করেন। তিনি তাদেরকে ধৈর্য ধারণ করার এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদান কামনার আহবান জানান।

[এবারের হজ্জের খুৎবা বাংলাদেশের অধিকাংশ জাতীয় পত্রিকায় যথার্থভাবে উপস্থাপিত হয়নি। তিনি যা বলেননি, তা তাঁর নামে বলা হয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক (স.স.)]

হজ্জের অন্যান্য রিপোর্ট :

মোট হাজীর সংখ্যা : এ বছর মোট হাজীর সংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ৫২ হাযার ৮১৭ জন। তন্মধ্যে ১৩ লাখ ৮৪ হাযার ৯৪১ জন বিদেশী এবং ৫ লাখ ৬৭ হাযার ৮৭৬ জন সঊদী আরবের নাগরিক। এছাড়া এবারই প্রথম সবচেয়ে বেশী সংখ্যক ১ লাখ ৩৬ হাযার হাজী ভারত থেকে হজ্জ পালন করেছেন। সঊদী নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এবছর বিনা অনুমতিতে হজ্জ করতে আসা প্রায় ৩ লাখ ৫৮ হাযার ৭৫৬ জনকে প্রতিরোধ করেছে।  

মক্কা ট্রাজেডী : এ বছরের হজ্জ নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। হজ্জের ১৩দিন পূর্বে ১১ই সেপ্টেম্বর মক্কাস্থ মসজিদুল হারামের সম্প্রসারণ কাজে ব্যবহৃত ক্রেন ভেঙ্গে পড়লে একজনবাংলাদেশীসহ ১০৭ জন নিহত ও ২৩৮ জন আহত হন। এসময় মক্কায় প্রচন্ড বালু ঝড়, বজ্রপাত ও ঝড়-বৃষ্টি হয়। যার ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে দাবী করেছেন কর্তৃপক্ষ।

মিনা ট্রাজেডী : হজ্জের পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর জামারায় পাথর মারতে যাওয়ার পথে মিনায় বহু সংখ্যক হাজী পাদপিষ্ট হয়ে মারা গেছেন। সরকারী হিসাব অনুযায়ী ৭৬৯ জন নিহত এবং ৯৩৪ জন হাজী আহত হয়েছেন। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী তা সহস্রাধিক। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন আরো সহস্রাধিক। সবচেয়ে বেশী নিহত হয়েছেন ইরানের হাজীগণ (৪৬৪)। বাংলাদেশের নিহত হাজীর সংখ্যা এ পর্যন্ত (১৬ই অক্টোবর) ৯৩ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৮০ জন। বিভিন্ন সূত্রে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করা হ’লেও সরকারীভাবে এ পর্যন্ত কোন ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। গত পঁচিশ বছরের মধ্যে হজ্জ পালনের সময় এবারই সবচেয়ে বেশী মৃত্যুর ঘটনা ঘটল।