প্রবন্ধ


জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপনের আবশ্যকতা

মূল : ড. হাফেয বিন মুহাম্মাদ আল-হাকামী
অধ্যাপক, হাদীছ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
অনুবাদ : অনুবাদ : আব্দুর রহীম, নিয়ামতপুর, নওগাঁ।
গবেষণা সহকারী, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

(৫ম কিস্তি)

জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার উপকারিতা এবং তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অপকারিতা :

আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে মুমিনের কোন নিজস্ব স্বাধীনতা নেই। চাই তার কাছে নির্দেশিত কাজের উপকারিতা প্রকাশিত হোক বা না হোক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُوْلَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজেদের ব্যাপারে অন্য কিছু করার এখতিয়ার থাকে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত হল’ (আহযাব ৩৩/৩৬)। তবে কোন কাজ পালনের নির্দেশের সাথে উপকারিতাকে সম্পৃক্ত করা হ’লে তা পালনে মন উদ্বুদ্ধ হয় এবং তা বাস্তবায়নে মন আগ্রহী হয়। আদিষ্ট বিষয়ের উপকারিতা যত বেশী হয় তা পালনের প্রতি ততবেশী আগ্রহ সৃষ্টি হয়। জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং (আমীরের) আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়ার ভয়াবহতা গুরুতর হওয়ার কারণে জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার অনেক উপকারিতা এবং তা থেকে বের হওয়ার ভয়াবহ কুফল বর্ণিত হয়েছে। আমরা নিম্নে কিছু উপকারিতা উল্লেখ করব, যাতে মানুষের মনে জামা‘আতের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তা অাঁকড়ে ধরার প্রতি মন আগ্রহী হয়।

উপকারিতাসমূহের মধ্যে রয়েছে-যা রাসূল (ছাঃ)-এর বাণীতে এসেছে,يَدُ اللهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ  ‘জামা‘আতের উপরে আল্লাহর হাত রয়েছে’।[1] এ হাদীছটি জামা‘আতের জন্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পূর্ণ তত্ত্বাবধানের ফায়েদা দেয়। এ হাদীছের অর্থের ব্যাপারে আবু সা‘আদাত ইবনুল আছীর বলেছেন, ‘অর্থাৎ মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ জামা‘আত আল্লাহর তত্ত্বাবধানে থাকে। আর তাদের উপর থাকে তাঁর হেফাযত। তারা কষ্ট ও ভয় থেকে অনেক দূরে থাকে। অতএব তোমরা তাদের মধ্যে অবস্থান করো’।[2]

জামা‘আতের জন্য ঐ ইলাহী তত্ত্বাবধানের নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম হ’ল তাকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করা। যেটি প্রত্যেক অকল্যাণ ও বিপদের কারণ। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ اللهَ لاَ يَجْمَعُ أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم عَلَى ضَلاَلَةٍ،  ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ করবেন না’।[3] নিঃসন্দেহে জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধারণকারী ব্যক্তি ঐ তত্ত্বাবধান ও ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার উপকারিতা সমূহের মধ্যে আরো রয়েছে- আত্মার সংশোধন এবং হিংসা-বিদ্বেষ থেকে একে পবিত্রকরণ। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,ثَلاَثٌ لاَ يُغَلُّ عَلَيْهِنَّ قَلْبُ مُسْلِمٍ: إِخْلاَصُ الْعَمَلِ لِلَّهِ وَمُنَاصَحَةُ أَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَلُزُومِ جَمَاعَتِهِمْ فَإِنَّ دَعْوَتََهُمْ تُحِيطُ مِنْ وَرَائِهِمْ- ‘তিনটি আচরণ এমন আছে যা পালনে কোন মুসলমানের অন্তর কখনো বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় না। (১) আল্লাহর জন্য খাঁটি মনে আমল করা (২) মুসলিম শাসকগোষ্ঠীকে উপদেশ দেওয়া এবং (৩) তাদের জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা। কেননা তাদের দো‘আ তাদেরকে চারদিক থেকে হেফাযত করবে’।[4] ইবনুল আছীর (রহঃ) বলেন, والمعنى أن هذه الخلال الثلاث تُسْتَصْلَح بها القلوبُ فمن تَمسَّك بها طَهُر قَلْبُه من الخِيانة والدَّغَل والشَّر ‘এর অর্থ হ’ল- এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে আত্মা সংশোধিত হয়। যে ব্যক্তি এগুলোকে অাঁকড়ে ধরবে তার হৃদয় খিয়ানত, হিংসা-বিদ্বেষ ও অনিষ্টতা থেকে পবিত্র হবে’।[5] ইবনুল কাইয়ুম (রহঃ) বলেন, اَيْ لاَ يَحْمِلُ الغِلَّ ولا يبقي فيه مع هذه الثلاثة، فانها تنفي الغل والغش وفساد القلب وسخائمه- ‘অর্থাৎ এই তিনটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকলে অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হয় না এবং এটি তাতে অবশিষ্ট থাকে না। কারণ এগুলো হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতারণা, হৃদয়ের পচন এবং ক্রোধ দূর করে’।[6]

জামা‘আত অাঁকড়ে ধরার আরেকটি উপকারিতা হ’ল- জামা‘আতবদ্ধ মানুষের দো‘আর মাধ্যমে উপকৃত হওয়া। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, فَإِنَّ الدَّعْوَةَ تُحِيطُ مِنْ وَرَائِهِمْ ‘কেননা তাদের দো‘আ চারদিক থেকে তাদেরকে হেফাযত করবে’।[7] ইবনুল আছীর (রহঃ) হাদীছের এ অংশের অর্থ সম্পর্কে বলেন, أي تُحْدق بهم من جميع جوَانبِهم   ‘অর্থাৎ তাদের দো‘আ তাদেরকে তাদের চারদিক থেকে বেষ্টন করবে’।[8]

আমাদের শিক্ষক শায়খ আব্দুল মুহসিন আববাদ বলেন, ‘এই বাক্যটি তৃতীয় বৈশিষ্ট্যের পরে (অর্থাৎ মুসলমানদের জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা) উল্লেখ করা হয়েছে ঐ উপকারিতা বর্ণনা করার জন্য, যেটি জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধারণকারী ব্যক্তি লাভ করে। আর সেটি হ’ল তার জন্য তাদের দো‘আয় একটা অংশ রয়েছে। মর্মার্থ হ’ল, মুসলমানদের দো‘আ তাদেরকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে রাখে। অতএব যে ব্যক্তি জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরবে মুসলমানদের পক্ষ থেকে নির্গত দো‘আয় তার একটি অংশ থাকবে’।[9]

জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার সবচেয়ে বড় উপকারিতা হ’ল আল্লাহর রহমত লাভ করা, যা জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, اَلْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ ‘জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন রহমত স্বরূপ’।[10] যাকে সারগর্ভ বাণী ও বক্তব্যে অগ্রগামিতা দান করা হয়েছে তিনি (অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ) জামা‘আতকে স্বয়ং রহমত বলেছেন। জামা‘আতের সাথে ওৎপ্রোতভাবে রহমত যুক্ত থাকার কথা বর্ণনা করার জন্যই তিনি এটা উল্লেখ করেছেন। কেননা রহমত সর্বাবস্থায় জামা‘আতের সাথে যুক্ত থাকে। অবশেষে তাকে ‘জান্নাতুন নাঈমে’ পৌঁছে দেয়। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন,وَمَنْ أَرَادَ بُحْبُوحَةَ الْجَنَّةِ فَعَلَيْهِ بِالْجَمَاعَةِ ‘যে ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যস্থলে থাকতে চায় তার জন্য আবশ্যক হ’ল জামা‘আতবদ্ধ জীবন-যাপন করা’।[11]

আল্লাহর রহমত যাবতীয় কল্যাণ ও সৌভাগ্য লাভের কারণ। সেটি কোন জিনিসের সাথে সামান্য পরিমাণ মিশ্রিত হ’লে তাকে বৃদ্ধি করে দেয়, কঠিন হ’লে সহজ করে দেয়, বিপদ হ’লে দূর করে দেয় এবং জটিলতা আসলে নিরসন করে দেয়। পক্ষান্তরে কারো কাছ থেকে রহমত ছিনিয়ে নেওয়া হ’লে তা তার জন্য প্রতিশোধ ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি (রহমত) একমাত্র আল্লাহর হাতে রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكْ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ ‘আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত উন্মুক্ত করে দেন তা আটকে রাখার কেউ নেই। আর তিনি যা আটকে রাখেন, তারপর তা ছাড়াবার কেউ নেই’ (ফাতির ৩৫/২)। আর জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তিকে আল্লাহর রহমত থেকে বের করে আযাবের দিকে নিয়ে যায়। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, اَلْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ ‘জামা‘আতবদ্ধভাবে বসবাস রহমত স্বরূপ এবং বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস আযাব স্বরূপ’।[12] অতএব জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণে শাস্তি আবশ্যক হওয়া জামা‘আতবদ্ধভাবে বসবাসের কারণে রহমত আবশ্যক হওয়ার মতোই। হাদীছে বর্ণিত দু’টি বিপরীত জিনিস (রহমত ও আযাব) থেকে এটাই বুঝা যায়। আবার কখনো  কখনো জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়াই শেষ পরিণাম অশুভ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَهِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ فَمَاتَ مِيْيَةً جَاهِلِيَّةً. ‘যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেল এবং জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, সে জাহেলিয়াতের উপর মৃত্যুবরণ করল’।[13] তিনি আরো বলেন, مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ شِبْرًا، فَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ ‘যে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, সে তার গর্দান থেকে ইসলামের গন্ডি ছিন্ন করল’।[14] অনুরূপভাবে রহমত জামা‘আতকে আঁকড়ে ধারণকারীকে জান্নাতের কেন্দ্রস্থলে পোঁছে দেয়, তেমনিভাবে আযাব জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ব্যক্তিকে জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ করবেন না। আর জামা‘আতের উপরে আল্লাহর হাত রয়েছে। যে ব্যক্তি (মুসলিম জামা‘আত থেকে) বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, সে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জাহান্নামে গেল’।[15]

পূর্বের দলীলসমূহে বর্ণিত এ সকল বিষয়ের কারণে জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা, নেতার কথা শুনা ও তার আনুগত্য করার ব্যাপারে সালাফে ছালেহীনের আগ্রহ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দলাদলি ও বিচ্ছিন্নতা থেকে তারা সর্বদা সতর্ক করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) ঐ দলীলগুলো সম্পর্কে যাদের জ্ঞান অল্প এবং যারা জামা‘আতের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য থাকার কারণে কষ্টে পড়েছেন তাদের বিষয়ে বলেছেন,  وَإِنَّ مَا تَكْرَهُونَ فِي الْجَمَاعَةِ خَيْرٌ مِمَّا تُحِبُّونَ فِي الْفُرْقَةِ ‘তোমরা জামা‘আতের মধ্যে যা অপসন্দ করো, তা বিচ্ছিন্নতার মধ্যে যা পসন্দ করো তার চেয়ে উত্তম’[16]

ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেন,

إِنَّ الْجَمَاعَةَ حَبْلُ اللهِ فَاعْتَصِمُوا ... مِنْهُ بِعُرْوَتِهِ الْوُثْقَى لِمَنْ دَانَا

كَمْ يَدْفَعُ اللهُ بِالسُّلْطَانِ مُعْضِلَةً ... عَنْ دِينِنَا رَحْمَةً مِنْهُ وَدُنْيَانَا

لَوْلَا الْأَئِمَّةُ لَمْ تَأْمَنْ لَنَا سُبُلٌ ... وَكَانَ أَضْعَفُنَا نَهْبًا لِأَقْوَانَا

 ‘নিশ্চয় জামা‘আত আল্লাহর রজ্জু। অতএব তোমরা সেই মযবুত রজ্জুকে অাঁকড়ে ধর। আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় অনুগ্রহে আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ার অনেক সমস্যা বাদশার (সুলতানের) মাধ্যমে দূর করেছেন। নেতৃবৃন্দ না থাকলে আমাদের জন্য চলার পথ নিরাপদ হ’ত না। আর আমাদের মধ্যে দুর্বলেরা সবলদের লুণ্ঠিত সম্পদে পরিণত হ’ত’।

শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) লোকদের জন্য নেতৃত্বের গুরুত্ব এবং তা ব্যতীত দ্বীন ও দুনিয়ার অস্তিত্বহীনতার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি এ বিষয়ে কিছু দলীল উল্লেখ করার পর বলেছেন, বলা হয়ে থাকে-سِتُّونَ سَنَةً مِنْ إمَامٍ جَائِرٍ أَصْلَحُ مِنْ لَيْلَةٍ وَاحِدَةٍ بِلَا سُلْطَانٍ ‘নেতাবিহীন একরাত ষাট বছর অত্যাচারী শাসকের অধীনে থাকা অধিক কল্যাণকর (ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২৮/৩৯১)। অতঃপর তিনি বলেন, অভিজ্ঞতায় এটি প্রমাণিত। লেখক বলেন, শায়খুল ইসলাম (রহঃ) সত্যই বলেছেন। এর প্রমাণ বর্তমানে সোমালিয়া ও ইরাকের অবস্থা।[17] এ দেশ দু’টিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ম-শৃংখলা ছিল চরম যুলুম ও পাপাচারে ভরপুর। কিন্তু সরকার পতনের পর সেখানে রক্তপাত, সম্মানহানি, ধর্ষণ এবং ঘর-বাড়ি ধ্বংসের যে অবস্থায় পৌঁছেছে, তা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশী খারাপ। অতএব কোন উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?

অতঃপর শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, এজন্য ফুযাইল ইবনু ইয়ায, আহমাদ ইবনু হাম্বল প্রমুখ পূর্ববর্তী বিদ্বানগণ বলতেন,لَوْ كَانَ لَنَا دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ لَدَعَوْنَا بِهَا لِلسُّلْطَانِ ‘যদি আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় কোন দো‘আ থাকত, তাহ’লে তা দ্বারা আমরা শাসকের জন্য দো‘আ করতাম’।[18] উদ্দেশ্য হ’ল- শাসকের জন্য কল্যাণ কামনা, তাদের সংশোধনের জন্য দো‘আ করা এবং তাদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। বারবাহারী (রহঃ) বলেন,وإذا رأيت الرجل يدعو على السلطان فاعلم أنه صاحب هوى، وإذا رأيت الرجل يدعو للسلطان بالصلاح فاعلم أنه صاحب سنة إن شاء الله. ‘তুমি যখন কোন ব্যক্তিকে শাসকের জন্য বদদো‘আ করতে দেখবে তখন মনে করবে যে, সে কুপ্রবৃত্তির অনুসারী। আর যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে শাসকের কল্যাণের জন্য দো‘আ করতে দেখবে তখন জানবে যে, ইনশাআল্লাহ সে সুন্নাতের অনুসারী’।

অতঃপর ফুযাইল ইবনু ইয়ায থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, لو أن لي دعوة مستجابة ما جعلتها إلا في السلطان. ‘যদি আমার জন্য (আল্লাহর নিকটে) কোন গ্রহণীয় দো‘আ থাকত তাহ’লে সেটা আমি কেবল শাসকের জন্যই করতাম’। তাকে বলা হ’ল, হে আবু আলী! আপনি এটা ব্যাখ্যা করুন। তিনি বললেন, হ্যাঁ। যখন আমি এটা মনে মনে করব তখন তুমি আমাকে হুমকি দিবে না। আর যখন এটা শাসকের জন্য নির্ধারণ করব, তখন তার সংশোধনের ফলে দেশ ও জাতি সংশোধিত হবে। এজন্য আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমরা যেন তাদের সংশোধন ও কল্যাণের জন্য দো‘আ করি। তাদের উপর বদদো‘আ করার জন্য আমরা আদিষ্ট হইনি। যদিও তারা যুলুম ও অত্যাচার করে। কারণ তাদের যুলুম ও অত্যাচার তাদের বিরুদ্ধে যাবে। কিন্তু তাদের সংশোধনে তাদের নিজেদের এবং মুসলমানদের কল্যাণ হবে।[19]

যুলুম-অত্যাচার ও পাপাচার সংঘটন জামা‘আত থেকে বের হওয়ার বৈধতা প্রদান করে না :

পূর্বে জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার আবশ্যকতা এবং তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ও বের হয়ে যাওয়ার নিষিদ্ধতার বিবরণ পেশ করা হয়েছে। পূর্বে বর্ণিত দলীল সমূহে জামা‘আতকে আঁকড়ে ধরার প্রয়োজনীয়তা এবং তা থেকে বের হয়ে যাওয়ার ভয়াবহতার ব্যাপারে মুমিনদের জন্য পরিতৃপ্তি রয়েছে। কিন্তু জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার গুরুত্ব বেশী হওয়ার কারণে এবং তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়াবহতার কারণে নবী (ছাঃ) এ বিষয়ে তাক্বীদ দিয়েছেন। যেটি জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে এবং আনুগত্য ছিন্ন করাকে বৈধতা দানের জন্য শয়তানের কুমন্ত্রণা দেয়ার পথকে বন্ধ করে দেয়। অতএব কোন ব্যক্তির জীবন বা সম্পদের উপর  যুলুম ও সীমালংঘন করা হ’লে সম্ভাব্য সকল উপায়ে তার জীবন বা সম্পদ রক্ষার অধিকার রয়েছে। যদিও তা লড়াইয়ের দিকে ধাবিত করে। ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ! أَرَأَيْتَ إِنْ جَاءَ رَجُلٌ يُرِيدُ أَخْذَ مَالِى قَالَ: فَلاَ تُعْطِهِ مَالَكَ. قَالَ: أَرَأَيْتَ إِنْ قَاتَلَنِى قَالَ: قَاتِلْهُ. قَالَ أَرَأَيْتَ إِنْ قَتَلَنِى قَالَ: فَأَنْتَ شَهِيدٌ. قَالَ: أَرَأَيْتَ إِنْ قَتَلْتُهُ، قَالَ: هُوَ فِى النَّارِ-

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা জনৈক লোক রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! যদি একজন লোক এসে আমার মাল ছিনিয়ে নিতে চায় তাহ’লে এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? তিনি বললেন, তুমি তাকে তোমার মাল দিবে না। সে বলল, যদি সে আমার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় তাহ’লে তার ব্যাপারে আপনার মতামত কী? তিনি বললেন, তুমি তার সাথে লড়াই করবে। সে বলল, সে যদি আমাকে হত্যা করে ফেলে, তাহ’লে আপনার মন্তব্য কী? তিনি বললেন, তাহ’লে তুমি শহীদ হবে। সে বলল, আমি যদি তাকে হত্যা করি তাহ’লে কী হবে? তিনি বললেন, সে জাহান্নামে যাবে।[20]

মুসনাদে আহমাদ ও সুনান গ্রন্থ সমূহে সাঈদ ইবনু যায়েদ থেকে ছহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (ছাঃ) বলেন, مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دَمِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ ‘যে মুসলমান (১) তার সম্পদ রক্ষার্থে নিহত হয়, সে শহীদ (২) যে তার দ্বীন রক্ষার্থে নিহত হয়, সে শহীদ  (৩) যে তার জীবন রক্ষার্থে নিহত হয়, সে শহীদ এবং (৪) যে তার পরিবার রক্ষার্থে নিহত হয়, সে শহীদ’।[21]

তবে এ ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন হবে যখন ব্যক্তির উপর শাসকের পক্ষ থেকে সীমালংঘন হবে। কেননা এ অবস্থায় শরী‘আত কোন ব্যক্তিকে তার জীবন বা সম্পদ রক্ষার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগের বৈধতা প্রদান করে না। বরং শরী‘আত তাকে ধৈর্য ধারণ ও নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দেয়। এটা কেবল জামা‘আত রক্ষা ও ঐক্য বজায় রাখার জন্য।

ছহীহ মুসলিমে হুযায়ফা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে রয়েছে-

قُلْتُ فَهَلْ وَرَاءَ ذَلِكَ الْخَيْرِ شَرٌّ قَالَ: نَعَمْ. قُلْتُ: كَيْفَ؟ قَالَ: يَكُونُ بَعْدِى أَئِمَّةٌ لاَ يَهْتَدُونَ بِهُدَاىَ وَلاَ يَسْتَنُّونَ بِسُنَّتِى وَسَيَقُومُ فِيهِمْ رِجَالٌ قُلُوبُهُمْ قُلُوبُ الشَّيَاطِينِ فِى جُثْمَانِ إِنْسٍ. قَالَ: قُلْتُ : كَيْفَ أَصْنَعُ يَا رَسُولَ اللَّه!ِ إِنْ أَدْرَكْتُ ذَلِكَ، قَالَ: تَسْمَعُ وَتُطِيعُ لِلأَمِيرِ وَإِنْ ضُرِبَ ظَهْرُكَ وَأُخِذَ مَالُكَ فَاسْمَعْ وَأَطِعْ-

‘আমি বললাম, এ কল্যাণের পর কি আর কোন অকল্যাণ থাকবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, এটা কেমন হবে? তিনি বললেন, আমার পরে এমন একদল শাসক হবে, যারা আমার হেদায়াত ও সুন্নাত অনুযায়ী চলবে না। তাদের মধ্যে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যাদের দেহে শয়তানের হৃদয় বিরাজ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! যদি আমি সেই অবস্থার সম্মুখীন হই তাহ’লে কী করব? তিনি বললেন, ‘তুমি আমীরের কথা শুনবে এবং তাঁর আনুগত্য করবে। যদিও তোমাকে প্রহার করা হয় এবং তোমার সম্পদ কেড়ে নেয়া হয়। তবুও তার কথা শুনবে এবং তাঁর আনুগত্য করবে’।[22]

ছহীহায়েন তথা বুখারী ও মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন-

إِنَّهَا سَتَكُوْنُ بَعْدِى أَثَرَةٌ وَأُمُوْرٌ تُنْكِرُوْنَهَا، قَالُوْا: فَمَا تَأْمُرُنَا يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ: أَدُّوا إِلَيْهِمْ حَقَّهُمْ وَسَلُوا اللهَ حَقَّكُمْ-

‘অচিরেই আমার মৃত্যুর পরে স্বজনপ্রীতি প্রকাশ পাবে এবং এমন সব কর্মকান্ড ঘটবে, যা তোমরা অপসন্দ করবে। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! সে অবস্থায় আমাদের কী করতে বলেন? নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে তাদের হক্ব আদায় করবে এবং তোমাদের প্রাপ্যের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে’।[23] হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, سَلُوا اللهَ حَقَّكُمْ ‘তোমাদের প্রাপ্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে’ অর্থাৎ তিনি তোমাদের প্রতি ইনছাফ করার জন্য তাদের প্রতি ইলহাম করবেন অথবা তিনি তাদের পরিবর্তে তোমাদের উত্তম নেতৃত্ব প্রদান করবেন।[24]

ছহীহ মুসলিমেও ওয়ায়েল ইবনু হুজর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে,

سَأَلَ سَلَمَةُ بْنُ يَزِيدَ الْجُعْفِىُّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: يَا نَبِىَّ اللَّهِ! أَرَأَيْتَ إِنْ قَامَ عَلَيْنَا أُمَرَاءُ يَسْأَلُونَا حَقَّهُمْ وَيَمْنَعُونَا حَقَّنَا؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم:  اسْمَعُوا وَأَطِيعُوا فَإِنَّمَا عَلَيْهِمْ مَا حُمِّلُوا وَعَلَيْكُمْ مَا حُمِّلْتُمْ-

‘সালামা ইবনু ইয়াযীদ আল-জু‘ফী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর নবী (ছাঃ)! যদি আমাদের উপর এমন শাসকের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় যারা তাদের হক আমাদের কাছে দাবী করে কিন্তু আমাদের হক তারা দেয় না। এমতাবস্থায় আপনি আমাদেরকে কি করতে বলেন? তিনি উত্তরে বললেন, তোমরা শুনবে এবং আনুগত্য করবে। কেননা তাদের উপর আরোপিত দায়িত্বের বোঝা তাদের উপর বর্তাবে এবং তোমাদের উপর আরোপিত দায়িত্বের বোঝা তোমাদের উপর বর্তাবে’।[25]

অনুরূপভাবে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তির (আল্লাহর) অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়াকে কখনো কখনো শয়তান এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ অতি উৎসুক ব্যক্তিদের এমন কিছু কাজে জড়িত হওয়ার পথ করে দেয়, যা আনুগত্যের বন্ধন ছিন্ন করা ও জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দিকে ধাবিত করে। এজন্য নবী করীম (ছাঃ) এ বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনা দিয়ে বক্তব্য প্রদান করেছেন। তিনি জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরতে এবং (নেতার আদেশ) শ্রবণ করতে ও তার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত (রাষ্ট্রে) ছালাত কায়েম থাকবে এবং প্রকাশ্য কুফরী সংঘটিত না হবে। ছহীহ মুসলিমে আওফ বিন মালেক আশজাঈ হ’তে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসূল (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন,

وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُبْغِضُونَهُمْ وَيُبْغِضُونَكُمْ وَتَلْعَنُونَهُمْ وَيَلْعَنُونَكُمْ. قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ! أَفَلاَ نُنَابِذُهُمْ عِنْدَ ذَلِكَ؟ قَالَ: لاَ مَا أَقَامُوا فِيكُمُ الصَّلاَةَ، أَلاَ مَنْ وَلِىَ عَلَيْهِ وَالٍ، فَرَآهُ يَأْتِى شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ فَلْيَكْرَهْ مَا يَأْتِى مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ، وَلاَ يَنْزِعَنَّ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ-

‘তোমাদের নিকৃষ্ট নেতা তারাই যাদেরকে তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ দাও এবং তারাও তোমাদেরকে অভিশাপ দেয়। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এমন সময় আমরা কি তাদেরকে প্রতিহত করব না? তখন তিনি বললেন, না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মধ্যে ছালাত কায়েম রাখবে। সাবধান! কারো উপর যদি কোন শাসক নিযুক্ত হয়। অতঃপর সে যদি শাসকের পক্ষ থেকে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কোন কাজ হ’তে দেখে, তখন সে যেন ঐ ব্যক্তির আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কাজকে ঘৃণা করে এবং তাদের আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে না নেয়’।[26]

ছহীহ মুসলিমে উম্মে সালামা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

إِنَّهُ يُسْتَعْمَلُ عَلَيْكُمْ أُمَرَاءُ فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ بَرِئَ، وَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِىَ وَتَابَعَ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ! أَلاَ نُقَاتِلُهُمْ؟ قَالَ: لاَ مَا صَلَّوْا-

‘অচিরেই তোমাদের উপর এমন কতিপয় আমীর নিযুক্ত করা হবে, যাদের কিছু ভাল কাজের কারণে তোমরা সন্তুষ্ট হবে এবং তাদের কিছু খারাপ কাজের কারণে তাদেরকে অপসন্দ করবে। এমতাবস্থায় যে ব্যক্তি তাদের খারাপ কাজকে ঘৃণা করল সে মুক্তি পেল এবং যে ব্যক্তি তাদের বিরোধিতা করল সে নিরাপত্তা লাভ করল। কিন্তু যে ব্যক্তি তাদের পসন্দ করল এবং তাদের অনুসরণ করল (সে ক্ষতিগ্রস্ত হ’ল)। তারা বললেন, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? তিনি বললেন, না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ছালাত কায়েম করবে’।[27]

ইমাম নববী (রহঃ) পূর্বোক্ত হুযায়ফা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, হুযায়ফা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে মুসলমানদের জামা‘আত এবং তাদের ইমামকে অাঁকড়ে ধরার আবশ্যকতা নিহিত রয়েছে, যদিও সে অন্যায় করে এবং সম্পদ কেড়ে নেয় বা এ জাতীয় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অতএব আল্লাহর অবাধ্যতা ব্যতীত (সকল ক্ষেত্রে) তার আনুগত্য করা ওয়াজিব। আর যে সকল বিষয়ে রাসূল (ছাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন তাঁর মু‘জিযা হিসাবে সবগুলো সংঘটিত হয়েছে।[28] তিনি উম্মে সালামা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, ছাহাবীর বাণী  أَفََلاَ نُقَاتِلُهُمْ ‘আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না?’ তিনি বললেন, لاَ مَا صَلَّوْا ‘না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ছালাত আদায় করবে’। এতে এবং পূর্বে বর্ণিত হাদীছের মধ্যে বিধান রয়েছে যে, কেবল যুলুম ও অন্যায়ের কারণে খলীফাগণের আনুগত্য থেকে বের হওয়া যাবে না, যতক্ষণ না তারা ইসলামের কোন মূল ভিত্তির কোন কিছু পরিবর্তন করে।[29]

ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে ওবাদাহ ইবনু ছামেত (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,

دَعَانَا النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم  فَبَايَعْنَاهُ، فَقَالَ فِيمَا أَخَذَ عَلَيْنَا أَنْ بَايَعَنَا عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِى الْعُسْرِ وَالْيُسْرِ وَالْمَنْشَطِ وَالْمَكْرَهِ وَعَلَى أَثَرَةٍ عَلَيْنَا وَ أَلاَّ َنُنَازِعَ الْأَمْرَ أَهْلَهُ إِلاَّ أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِنْدَكُمْ مِنَ اللهِ فِيْهِ بُرْهَانٌ-

একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের ডাকলেন। আমরা তাঁর হাতে বায়‘আত করলাম। তিনি (ওবাদা) বলেন, আমরা যে সকল বিষয়ে তাঁর কাছে বায়‘আত করেছিলাম সেগুলো হ’ল- আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে-অপসন্দে, সুখে-দুঃখে এবং আমাদের উপরে কাউকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে আমীরের কথা শুনব ও মেনে চলব। আমরা নেতৃত্ব নিয়ে পরস্পর ঝগড়া করব না। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা (আমীরের মধ্যে) প্রকাশ্য কুফরী না দেখবে (ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা তার আনুগত্য করতে থাকবে), যে বিষয়ে তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে দলীল-প্রমাণ রয়েছে’।[30] খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, كُفْرٌ بَوَاحٌ: أى ظاهرا باديا ‘সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য কুফরী’।[31] হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী  عِنْدَكُمْ مِنَ اللهِ فِيْهِ بُرْهَانٌ ‘তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট দলীল-প্রমাণ রয়েছে’ এর ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ কুরআনের আয়াত এবং ছহীহ হাদীছের এমন প্রমাণ থাকা যা অন্য ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে না। আর এর দাবী হ’ল যতক্ষণ তাদের কাজের ব্যাখ্যার সম্ভাবনা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না।[32]

নেতার আনুগত্য করা ওয়াজিব, লোকেরা সরাসরি তার বায়‘আত গ্রহণ করুক বা না করুক :

শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,

وَمَا أَمَرَ اللهُ بِهِ وَرَسُولُهُ مِنْ طَاعَةِ وُلَاةِ الْأُمُورِ وَمُنَاصَحَتِهِمْ وَاجِبٌ عَلَى الْإِنْسَانِ وَإِنْ لَمْ يُعَاهِدْهُمْ عَلَيْهِ وَإِنْ لَمْ يَحْلِفْ لَهُمُ الْأَيْمَانَ الْمُؤَكَّدَةَ كَمَا يَجِبُ عَلَيْهِ الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالزَّكَاةُ وَالصِّيَامُ وَحَجُّ الْبَيْتِ. وَغَيْرُ ذَلِكَ مِمَّا أَمَرَ اللهُ بِهِ وَرَسُولُهُ مِنْ الطَّاعَةِ...؛ إلَي أَنْ قَالَ: وَأَمَّا أَهْلُ الْعِلْمِ وَالدِّينِ وَالْفَضْلِ فَلَا يُرَخِّصُونَ لِأَحَدٍ فِيمَا نَهَى اللهُ عَنْهُ مِنْ مَعْصِيَةِ وُلَاةِ الْأُمُورِ وَغِشِّهِمْ وَالْخُرُوجِ عَلَيْهِمْ بِوَجْهِ مِنْ الْوُجُوهِ كَمَا قَدْ عُرِفَ مِنْ عَادَاتِ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالدِّينِ قَدِيمًا وَحَدِيثًا وَمِنْ سِيرَةِ غَيْرِهِمْ –

‘আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূল (ছাঃ) আমীরের আনুগত্য করা এবং তাদেরকে উপদেশ প্রদান করার যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা প্রত্যেক মানুষের জন্য পালন করা আবশ্যক। যদিও তিনি তাদের বায়‘আত না নেন এবং দৃঢ় মাধ্যমে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ না হয়ে থাকেন। যেমন তাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, যাকাত, ছিয়াম, বায়তুল্লাহর হজ্জ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক নির্দেশিত অন্যান্য সকল বিষয়ে আনুগত্য করা আবশ্যক...। এমনকি তিনি এ পর্যন্ত বলেছেন যে, ‘আল্লাহ তা‘আলা যা নিষেধ করেছেন সে বিষয়ে আলেম-ওলামা কোনভাবেই কাউকে সেটা করার অনুমতি দেননি। যেমন আমীরের অবাধ্য হওয়া, তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। যেমনটি আধুনিক-প্রাচীন সকল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত ও ধার্মিক ব্যক্তিগণের আচার-আচরণ এবং অন্যদের জীবন চরিত থেকে জানা যায়’।[33]

অনুরূপভাবে আমীর যাদেরকে দায়িত্বশীল করবেন নিযুক্ত জামা‘আত রক্ষা করা এবং বিভক্তি ও মতপার্থক্য দূরীকরণের জন্য তাদের সকলের কথা শ্রবণ করা এবং আনুগত্য করা আবশ্যক।[34]

আক্বীদাহ ত্বাহাবিয়াহ-এর ব্যাখ্যাকারক আল্লামা ইবনু আবিল ইয (রহঃ) বলেন, ‘কুরআন ও হাদীছের দলীল সমূহ এবং মুসলিম উম্মাহর সালাফে ছালেহীনের ঐক্যমত প্রমাণ করে যে, ইজতিহাদের স্থান সমূহে শাসক, ছালাতের ইমাম, বিচারক, যুদ্ধের সেনাপতি ও ছাদাক্বা সংগ্রহকারীর আনুগত্য করতে হবে। তবে তিনি (আমীর) ইজতিহাদীর বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে তার অনুসারীদের আনুগত্য করা আবশ্যক নয়। বরং (অনুসারীদের) উপর তার আনুগত্য করা তাদের এবং তার মতের কাছে তাদের মত পরিহার করা আবশ্যক। কেননা জামা‘আতের কল্যাণ, ঐক্য এবং দলাদলি ও মতপার্থক্যের ফিতনা আংশিক মাসআলা-মাসায়েল অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।[35]

[চলবে]



[1]. তিরমিযী হা/২১৬৫; হাকেম হা/৩৯৪; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৫০; মিশকাত হা/১৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/১৮৪৮; শু‘আবুল ঈমান হা/৭৫১৭।

[2]. ইবনুল আছীর, আন-নিহায়াতু ফি গারীবিল হাদীছ ওয়াল আছার ৫/২৯৩।

[3]. তিরমিযী হা/২১৬৭; হাকেম হা/৩৯৪; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৫০; মিশকাত হা/১৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/১৮৪৮; শু‘আবুল ঈমান হা/৭৫১৭।

[4]. আহমাদ হা/২১৬৩০; ইবনু মাজাহ হা/৪১০৫; ইবনু হিববান হা/৬৮০; হাকেম হা/২৯৪; দারেমী হা/২২৮; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৭৬৩; ছহীহ তারগীব হা/০৪; ছহীহাহ হা/৪০৪; মিশকাত হা/২২৮।

[5]. আন-নিহায়াতু ফি গারীবিল হাদীছ ওয়াল আছার ৩/৩৮১।

[6]. মিফতাহু দারিস সা‘আদাহ, পৃঃ ৭৯।

[7]. ছহীহাহ হা/৪০৪; মিশকাত হা/২২৮।

[8]. আন-নিহায়াহ ৩/৩৮১, ১/৪৬১।

[9]. দিরাসাতু হাদীছ নাযযারাল্লাহু, পৃঃ ১৯৫।

[10]. ছহীহাহ হা/৬৬৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৩১০৯।

[11]. তিরমিযী হা/২১৬৫; হাকেম হা/৩৮৭; আহমাদ হা/১১৪; ইবনু হিববান হা/৪৫৭৬; ছহীহাহ হা/৪৩০; আবু ইয়া‘লা হা/১৪৩।

[12]. ছহীহাহ হা/৬৬৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৩১০৯; আলবানী, যিলালুল জান্নাহ হা/৯৩; শু‘আবুল ঈমান হা/৯১১৯।

[13]. মুসলিম হা/১৮৪৮; আহমাদ হা/৭৯৩১; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৪৮; ছহীহাহ হা/৯৮৩; নাসাঈ হা/৪১১৪; মিশকাত হা/৩৬৬৯।

[14]. আবুদাঊদ হা/৪৭৫৮; হাকেম হা/৪০১; আহমাদ হা/২২৯৬১; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৪১০; ছহীহ তারগীব হা/০৫; মিশকাত হা/১৮৫।

[15]. তিরমিযী হা/২১৬৭; হাকেম হা/৩৯৪; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৫০; মিশকাত হা/১৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/১৮৪৮।

[16]. হাদীছটির পূর্ণরূপ হ’ল- আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ عَلَيْكُمْ بِالطَّاعَةِ وَالْجَمَاعَةِ، فَإِنَّهَا حَبْلُ اللَّهِ الَّذِي أَمَرَ بِهِ، وَإِنَّ مَا تَكْرَهُونَ فِي الْجَمَاعَةِ خَيْرٌ لَكُمْ مِمَّا تُحِبُّونَ فِي الْفُرْقَةِ، ‘হে মানব মন্ডলী! আপনাদের উপর আবশ্যক হ’ল নেতার আনুগত্য করা এবং জামা‘আতবদ্ধভাবে বসবাস করা। কেননা এটি আল্লাহর সেই রজ্জু, যা আঁকড়ে ধরতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। (হাকেম হা/৮৬৬৩; সিলসিলাতুল আছার আছ-ছহীহাহ হা/৫৭; মু‘জামুল কাবীর হা/৮৯৭১; মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/৯১২৬।

[17]. বর্তমানে ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন, তিউনিসিয়া, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে যে সংঘাত চলছে সেটা নেতার আনুগত্য না করা এবং জামা‘আতবদ্ধভাবে বসবাস না করার জ্বলন্ত প্রমাণ। তারা যদি বিদ্রোহ না করে জামা‘আতবদ্ধবাবে বসবাস করত এবং ধৈর্য ধারণ করে নেতার আনুগত্য করত, তাহলে আজ লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্ত্তহারা এবং হাযার হাযার নিরাপরাধ মানুষকে হত্যার শিকার হতে হত না।-অনুবাদক।

[18]. ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২৮/৩৯১।

[19]. বারবাহারী, শারহুস সুন্নাহ পৃঃ ১১৬।

[20]. মুসলিম হা/১৪০; মিশকাত হা/৩৫১৩।

[21]. আহমাদ হা/১৬৫২; তিরমিযী হা/১৪২১; ইরওয়া হা/৭০৮; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৪৪৫; মিশকাত হা/৩৫২৯ ‘ক্বিছাছ’ অধ্যায়।

[22]. মুসলিম হা/১৮৪৭; ছহীহাহ হা/২৭৩৯; মিশকাত হা/৫৩৮২।

[23]. বুখারী হা/৩৬০৩,৭০৫২; মুসলিম হা/১৮৪৩; মিশকাত হা/৩৬৭২।

[24]. ফাতহুল বারী ১৩/৮

[25]. মুসলিম হা/১৮৫৪; তিরমিযী হা/২১৯৯; ছহীহাহ হা/৭১৭৬; মিশকাত হা/৩৬৭৩।

[26]. মুসলিম হা/১৮৫৫; ছহীহাহ হা/৯০৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৩২৫৮; মিশকাত হা/৩৩৭০।

[27]. মুসলিম হা/১৮৫৪; আহমাদ হা/২৬৫৭১; ছহীহাহ হা/৩০০৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৬১৮; মিশকাত হা/৩৬৭১।

[28]. নববী, শারহু ছহীহ মুসলিম ৪/২৩৭

[29]. শারহু ছহীহ মুসলিম ৪/১২/২৩৭; ফাতহুল বারী ১৩/১০।

[30]. বুখারী হা/৭০৫৫,৭০৫৬; মুসলিম হা/১৭০৯; ছহীহাহ হা/৩৪১৮; ইরওয়া হা/২৪৫৭; ছহীহ তারগীব হা/২৩০৩; মিশকাত হা/৩৬৬৬।

[31]. ফাতহুল বারী ১৩/১০।

[32]. ফাতহুল বারী ১৩/১০।

[33]. ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৩৫/৯-১২।

[34]. নেতার হাতে বায়‘আত গ্রহণ করার পর তা ভঙ্গ করার ভয়াবহতার ব্যাপারে ছহীহ বুখারীতে এসেছে,

عَنْ نَافِعٍ قَالَ لَمَّا خَلَعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ يَزِيدَ بْنَ مُعَاوِيَةَ جَمَعَ ابْنُ عُمَرَ حَشَمَهُ وَوَلَدَهُ فَقَالَ إِنِّى سَمِعْتُ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ:  يُنْصَبُ لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَإِنَّا قَدْ بَايَعْنَا هَذَا الرَّجُلَ عَلَى بَيْعِ اللهِ وَرَسُولِهِ، وَإِنِّى لاَ أَعْلَمُ غَدْرًا أَعْظَمَ مِنْ أَنْ يُبَايَعَ رَجُلٌ عَلَى بَيْعِ اللهِ وَرَسُولِهِ ، ثُمَّ يُنْصَبُ لَهُ الْقِتَالُ، وَإِنِّى لاَ أَعْلَمُ أَحَدًا مِنْكُمْ خَلَعَهُ، وَلاَ بَايَعَ فِى هَذَا الأَمْرِ، إِلاَّ كَانَتِ الْفَيْصَلَ بَيْنِى وَبَيْنَهُ -

নাফে‘ (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন মদীনার লোকেরা ইয়াযীদ ইবনু মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর বায়‘আত ভঙ্গ করল, তখন ইবনু ওমর (রাঃ) তাঁর আত্মীয়-স্বজন, অনুসারীবৃন্দ ও সন্তানদেরকে একত্রিত করে বললেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য একটি করে পতাকা উঠানো হবে যার মাধ্যমে তাকে চেনা যাবে। আমরা এই লোকটির (ইয়াযীদ) প্রতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বর্ণিত শর্তানুযায়ী বায়‘আত গ্রহণ করেছি। বস্ত্তত কোন একজন লোকের প্রতি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দেয়া শর্ত মুতাবেক বায়‘আত গ্রহণ করার পর তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নেওয়া অপেক্ষা আর বড় কোন বিশ্বাসঘাতকতা আছে বলে আমি জানি না। ইয়াযীদের বায়‘আত ভঙ্গ করেছে অথবা তার আনুগত্য করছে না আমি যেন কারো সম্পর্কে এমনটা জানতে না পারি। অন্যথা তার এবং আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। ছহীহ মুসলিমে অনুরূপ আরেকটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ نَافِعٍ قَالَ: جَاءَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ إِلَى عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُطِيعٍ حِينَ كَانَ مِنْ أَمْرِ الْحَرَّةِ مَا كَانَ زَمَنَ يَزِيدَ بْنِ مُعَاوِيَةَ فَقَالَ اطْرَحُوا لِأَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ وِسَادَةً فَقَالَ إِنِّي لَمْ آتِكَ لِأَجْلِسَ أَتَيْتُكَ لِأُحَدِّثَكَ حَدِيثًا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُهُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ خَلَعَ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ لَقِيَ اللَّهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا حُجَّةَ لَهُ وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً-

নাফে‘ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়াযীদ ইবনু মু‘আবিয়ার শাসনামলে হার্রার সংকটকালে আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) আব্দুল্লাহ ইবনু মুত্বী-এর কাছে আসলে সে বলল, আবু আব্দুর রহমানের জন্য বিছানা বিছিয়ে দাও। তখন তিনি বললেন, আমি তোমার নিকট বসার জন্য আসিনি। আমি রাসূল (ছাঃ) থেকে শ্রবণকৃত একটি হাদীছ বর্ণনা করার জন্য এসেছি। আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘যে আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নিল সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, তার পক্ষে কোন দলীল-প্রমাণ থাকবে না। আর যে ব্যক্তি মারা গেল আর তার কাঁধে বায়‘আত থাকল না, সে জাহেলিয়াতের অবস্থায় মারা গেল’। আব্দুল্লাহ ইবনু মুতী ৬৩ হিজরীতে হার্রার যুদ্ধের দিন ইয়াযীদের সাথে কৃত বায়‘আত ভঙ্গ করে ইয়াযীদ কর্তৃক প্রেরিত সেনাপতি মুসলিম ইবনু উক্ববার বিরুদ্ধে যুদ্ধে কুরাইশদের নেতৃত্ব দিয়েছিল, যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু হানযালা আনছারীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আছে কী কোন উপদেশ গ্রহণকারী?-অনুবাদক।

[35]. শারহুল আকীদাতিত ত্বাহাবিয়া, পৃঃ ৪২৪

 

HTML Comment Box is loading comments...