প্রবন্ধ


কুরআনের আলোকে ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা

আব্দুল মালেক
সিনিয়র শিক্ষক, হরিণাকুন্ড সরকারী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঝিনাইদহ।

ভূমিকা :

إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِيْ هِيَ أَقْوَمُ  ‘নিশ্চয়ই এই কুরআন সেই পথ ও পন্থা নির্দেশ করে, যা সবচেয়ে সরল-সোজা’ (ইসরা ১৭/৯)। কুরআনের দেখানো পথের নাম ইসলাম। ইসলামের প্রচারক মুহাম্মাদ (ছাঃ)। তিনি ছিলেন আল-কুরআনের বাস্তব নমুনা। আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ ‘কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র’।[1] কাজেই কুরআনে ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থাপনার বিষয় জানতে নবী করীম (ছাঃ)-এর কর্মপদ্ধতি আমাদের জানতে হবে। আল-কুরআন নিজেই আমাদের সে কথা বলেছে, لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ ‘নিশ্চয়ই তোমাদের অনুসরণের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (আহযাব ৩৩/২১)। অন্যত্র এসেছে, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا ‘রাসূল তোমাদের যা দেন, তোমরা তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক’ (হাশর ৫৯/৫)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِىْ وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّيْنَ الرَّاشِدِيْنَ ‘তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাত ও সুপথপ্রাপ্ত ধার্মিক খলীফাদের সুন্নাত মেনে চলবে’।[2] কাজেই ভূমি জরিপ ও ব্যবস্থাপনায় খলীফাদের নীতি-পদ্ধতিও জানতে এবং মানতে হবে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। মানুষের ইহকাল ও পরকাল কিভাবে কল্যাণময় হবে তার দিক-নির্দেশনা ইসলামে রয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, নবী করীম (ছাঃ)-এর ইন্তিকালের পর ছাহাবীগণ সর্বপ্রথম আবুবকর (রাঃ)-কে তাঁর খলীফা তথা ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছিলেন। খিলাফত তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থা ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আধুনিক সরকার পদ্ধতিতে আইন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মত যে তিনটি ভাগ রয়েছে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থায় তার সবগুলোর উপস্থিতি অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই আল-কুরআনের আলোকে ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থা জানতে হ’লে নবী করীম (ছাঃ) ও খলীফাদের ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব স্বীকার করতে হবে।

ভূমি ও তার প্রকার :

যার উপরে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী বসবাস করে এবং একই সাথে উদ্ভিদ  উৎপন্ন হয়,  সর্বোপরি  যার  সাহায্যেই  সকলে

জীবন ধারণ করে তাই মাটি’।[3]

ভূমি শব্দের অর্থ- পৃথিবী, ভূপৃষ্ঠ, মাটি, মেঝে, জমি, ক্ষেত, দেশ ইত্যাদি।[4] কুরআনুল কারীমে মাটির প্রতিশব্দ ‘তুরাব’ (تراب ) ও ভূপৃষ্ঠের তথা পৃথিবীর প্রতিশব্দ আরয (ارض ) বলা হয়েছে। জমির মালিকানা লাভ ও ভোগদখলের দৃষ্টিতে জমিকে চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

১. আবাদী ও মালিকানাধীন জমি। কৃষিকাজ, বসবাস, দোকান-পাট, পুকুর, শিল্পকারখানা ইত্যাদি তৈরীর মাধ্যমে কেউ তা ভোগদখল করে। এ জমি মালিকেরই অধিকারভুক্ত থাকবে।

২. কারো মালিকানাধীন হওয়া সত্ত্বেও তা অনাবাদী পড়ে রয়েছে। চাষাবাদ কিংবা কোন ভোগের কাজে লাগানো হয় না। এ জমিও মালিকের অধিকারে থাকবে।

৩. জনগণের কল্যাণার্থে নির্দিষ্ট জমি। যেমন, প্রাকৃতিক, জলাশয়, বন, চারণ ভূমি, কবরস্থান, মসজিদ, ঈদগাহ ইত্যাদি সমষ্টিগত সম্পদ। এতে সর্বসাধারণের অধিকার থাকবে।

৪. অনাবাদী ও পরিত্যক্ত জমি। ইসলামী অর্থনীতির পরিভাষায় এ ধরনের জমি আল-মাওয়াত বা মালিকানাশূন্য অনাবাদী জমি নামে পরিচিত। এ জমি সরকারী সম্পত্তি বলে গণ্য হবে। পাহাড়ী ভূমি, মরুভূমি, জলাভূমি, বনভূমি ইত্যাদি এরূপ জমির শ্রেণীভুক্ত হ’তে পারে।

সুনানে আবুদাঊদে একজন ছাহাবীর উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে,أَشْهَدُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَضَى أَنَّ الأَرْضَ أَرْضُ اللهِ وَالْعِبَادَ عِبَادُ اللهِ وَمَنْ أَحْيَا مَوَاتًا فَهُوَ أَحَقُّ بِهِ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রায় দিয়েছেন যে, জমি-জায়গা সবকিছুই আল্লাহর এবং মানুষ মাত্রই আল্লাহর দাস। অতএব যে ব্যক্তি মাওয়াত বা অনাবাদী জমি আবাদযোগ্য করে তুলবে সেই তার মালিকানা লাভের অধিক যোগ্য হবে’।[5] এ হাদীছ থেকে বুঝা যায়, অনাবাদী বা পতিত জমি যে চাষাবাদ করে নিজের আয়ত্বে রাখবে সেই তার মালিক হবে।

তবে এ ধরনের জমির মালিকানা পেতে সরকার থেকে অবশ্যই বন্দোবস্ত নিতে হবে বলে ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) উল্লেখ করেছেন।[6]

ইসলামী রাষ্ট্রের ভূমির প্রকৃতি :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُوْرِثُهَا مَنْ يَّشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ  ‘নিশ্চয়ই সকল ভূমি আল্লাহর তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তার অধিকার দান করেন’ (আ‘রাফ ৭/১২৮)।

কুরআনের এরূপ একাধিক আয়াতে আল্লাহই যে ভূমির প্রকৃত ও একচ্ছত্র মালিক তা বলা হয়েছে। তিনি মানবজাতিকে এ জমি ভোগদখল করতে দিয়েছেন। মূলতঃ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লগ্নে নবী করীম (ছাঃ) ও খলীফাদের হাতে আগত জমির কয়েকটি অবস্থা ছিল। যেমন-

১. অনাবাদী পতিত জমি।

২. পূর্ব থেকেই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বলে নির্ধারিত।

৩. মুসলমানদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি।

৪. অমুসলমানদের মালিকানাধীন জমি।[7]

অমুসলিমদের সম্পত্তি আবার তিন পর্যায়ভুক্ত।

(ক) বিজিত এলাকার অমুসলিমগণ বশ্যতা স্বীকার করে মুসলিম শাসনাধীনে থাকতে চাইলে তারা জমির মালিকানা হারালেও ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে না। মুসলমানদেরকে ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার বিনিময়ে তারা জমি চাষের অধিকার পাবে। জমির মালিক হবে সরকার ও মুসলিম যোদ্ধাগণ। খায়বারের বিজিত এলাকায় নবী করীম (ছাঃ) এই নীতি গ্রহণ করেছিলেন।

(খ) যেসব অমুসলিম জাতি স্বেচ্ছায় ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সন্ধি করবে তাদের জমি-জায়গা তাদের ভোগ দখলেই থাকবে। তারা কেবল বাৎসরিক কর প্রদান করবে। ফাদাক, তাইমা প্রভৃতি অঞ্চলে এই ভূমিনীতি নবী করীম (ছাঃ) কর্তৃক কার্যকর হয়েছিল।

(গ) যেসব অমুসলিম ভূমি মালিক মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে নিহত হয় কিংবা ইসলামী রাষ্ট্র ছেড়ে চলে যায় এবং তার মালিক বলতে কেউ থাকে না, এরূপ জায়গা জমি বিজয়ী মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রূপে গণ্য হবে। রাষ্ট্র তা জনগণের কল্যাণে তাদের মাঝে বণ্টন করে দেবে অথবা রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে চাষাবাদের ব্যবস্থা করবে।

ভূমি জরিপ :

জমির মালিকানা ও প্রকৃতি বুঝার পর একথা  বলার অপেক্ষা রাখে না যে সরকারে যারা বর্তমান আছে তারা অনাবাদী পতিত জমি কতটুকু আছে, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি কী পরিমাণ আছে, মুসলিম নাগরিকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণই বা কতটুকু এবং অমুসলিমদের চাষের বা ভোগের অধীন ভূমি কতখানি তা অবশ্যই জানার চেষ্টা করবেন। রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থেই তাদের এগুলো জানা প্রয়োজন। কেননা জমি থেকে প্রাপ্ত ওশর ও খারাজ লাভের জন্য এটা প্রয়োজন। আর জমির পরিমাণ জানতে এবং প্রাপকদের মাঝে তা বণ্টন করতে হ’লে জমি জরিপের কোন বিকল্প নেই।

এজন্যই আমরা দেখি নবী করীম (ছাঃ) খায়বারের জমি জরিপ করে ৩৬ খন্ডে ভাগ করেন। ১৮ খন্ড তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যয়ভার বহনের জন্য রাখেন এবং ১৮ খন্ড মুজাহিদদের মধ্যে ভাগ করে দেন। এই ১৮ খন্ডের প্রতি খন্ড ১০০ জন মুজাহিদের জন্য বরাদ্দ ছিল।[8]

তবে পুরো ইসলামী খিলাফতে ওমর (রাঃ)-এর যুগে সর্বপ্রথম জরিপ কাজ চালান হয়। (ইসলামের ভূমি ব্যবস্থাপনা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, পৃঃ ১৯১)। ওমর ফারূক খারাজ নির্ধারণের পূর্বেই ওছমান ইবনু হানীফকে এই সকল জমি জরিপ সংক্রান্ত যাবতীয় যরূরী কার্য সম্পন্ন করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। কেননা ওছমান ভূমি রাজস্ব বিশেষ করে খারাজ ধার্যকরণ সম্পর্কে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ফলে তিনি দীবাজ (রেশমী) কাপড় পরিমাপ করার ন্যায় এ সকল জমি জরিপ করেছিলেন।[9]

নবী করীম (ছাঃ) ও খলীফাদের জমি জরিপের উদ্দেশ্য :

তৎকালীন অর্থ ব্যবস্থা ছিল প্রধানত কৃষি নির্ভর। আর ইসলামী শাসন ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ইনছাফ প্রতিষ্ঠা এবং জনকল্যাণ সাধন। মূলতঃ এ দু’টি লক্ষ্য পূরণের জন্যই জমি জরিপ করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় কোষাগার স্ফীত করা এবং কৃষকদের উপর জোর-যুলুম করা কখনই তাদের লক্ষ্য ছিল না। জমি পরিমাপের সাথে সাথে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোন কোন জমি ওশর শ্রেণীভুক্ত এবং কোন কোন জমি  খারাজ শ্রেণীভুক্ত, আবার কোনগুলো রাষ্ট্রীয় খাতভুক্ত তা বুঝা যেত। ওশরী জমি সেচ ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হ’লে ১/১০ ভাগ এবং সেচের মাধ্যমে উৎপন্ন হ’লে ১/২০ ভাগ ফসল কৃষকদের থেকে নিয়ম মাফিক যাকাত হিসাবে আদায় করা হ’ত। ওশরের অর্থ ব্যয়ের নির্দিষ্ট আটটি খাত কুরআনে উল্লেখ রয়েছে (তওবা ৯/৬০)। সে খাত সমূহে তা বিতরণ করা হত। অপরদিকে খারাজি জমির উর্বরতা, সেচ, ফসল উৎপাদনের পরিমাণ ইত্যাদি লক্ষ্য করে খারাজের পরিমাণ নির্ধারণ করা হ’ত। জরিপ না করলে এসব বুঝা যেমন কঠিন হ’ত তেমনি কৃষকদের প্রতি যুলুম হ’ত। খারাজ থেকে প্রাপ্য অর্থ রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়ের সঙ্গে যোগ করে রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহ করা হ’ত এবং বায়তুল মালের একটা বিরাট অংশ মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য ভাতা হিসাবে বরাদ্দ করা হ’ত। ওমর (রাঃ) সমগ্র খিলাফতে এজন্য আদম শুমারী করান এবং রেজিষ্টারে সকলের নাম সংরক্ষণ করে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। কৃষিভূমির উন্নয়ন ও সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের জন্যও তারা ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। আবাদযোগ্য কোন জমিই যাতে চাষের আওতার বাইরে না থাকে সেদিকে খলীফাগণ গভর্ণর ও আমিলদের কড়া দৃষ্টি রাখতে বলতেন। সংরক্ষিত চারণ ভূমি সরকারী কার্যালয়, সেনাছাউনি, লোকালয়, বাজার ইত্যাদির বাইরে আবাদযোগ্য সরকারী জমি প্রকৃত কৃষকদের মাঝে বিলিবণ্টনেরও পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এজন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং তাদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থাও করা হয়।[10]

উল্লেখ্য যে, খারাজ বা খাজনা হচ্ছে ভূমিকর এবং ওশর হচ্ছে ফসলের যাকাত। সেকারণ খারাজী জমিতেও নেছাব পরিমাণ সম্পদ হলে ওশর বা নিছফে ওশর দিতে হবে।

নবী করীম (ছাঃ) গভর্ণর ও শাসকদের নিকট বিভিন্ন পত্রে ওশর ও নিছফে ওশর আদায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি কোন জমিতে খারাজ নির্ধারণ করেছেন বলে জানা যায়নি।[11] তিনি বিজিত এলাকার জমি ফাই ও খুমুস সরকারী সম্পত্তি গণ্য করে অভাবীদের মধ্যে বণ্টন করতেন। আর যুদ্ধলব্ধ গণীমতের চার পঞ্চমাংশ সৈনিকদের মধ্যে বণ্টন করতেন। আবুবকর (রাঃ)ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নীতি মেনে চলেছেন। ওমর (রাঃ)-এর আমলে ইরাক, সিরিয়া ও মিসর বিজিত হ’লে তিনি তথাকার জমি সৈনিকদের মধ্যে বণ্টন না করে পূর্বতন মালিকদের হাতে রেখে দেন। এতে ভূস্বামী বা জমিদারী প্রথা সৃষ্টি হ’তে পারেনি। নচেৎ এক একজন সৈনিক প্রচুর জমি পেয়ে এক একজন জমিদার বনে যেতেন। অন্য দিকে খারাজ নির্ধারণে প্রথমেই কৃষিজীবীদের প্রয়োজনীয় ফসল ভাগ করে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখা হ’ত। এ বণ্টনে তাদের পরিবারবর্গ এবং তাদের সারা বছরের যাবতীয় প্রয়োজনের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা হ’ত। বিপদ-আপদে সঞ্চয় করে রাখার উদ্দেশ্যেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ শস্য তাদের দেওয়া হ’ত। তারপর যা থাকত তাই খারাজ হিসাবে নেওয়া হ’ত।[12] মোটকথা, বিশেজ্ঞদের দ্বারা বিশেষ সতর্কতার সাথে জমি জরিপ ও গুণাগুণ বিচার করে খারাজের পরিমাণ নির্ধারণ করা আবশ্যক।

ওশর ও খারাজ আদায়ে কৃষকদের উপর যুলুম হচ্ছে কি-না সেটাও সরেযমীনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানার চেষ্টা করতে হবে। ওমর (রাঃ) কূফার ১০ জন এবং বছরার ১০ জন অধিবাসীকে প্রতি বছর এজন্য ডেকে পাঠাতেন যে, ইরাক থেকে আগত ওশর ও খারাজ কোন অমুসলিম কিংবা মুসলিম থেকে যবরদস্তিমূলক আদায় করা হয়েছে কি-না, তারা তার সাক্ষ্য দেবে। মিসরের ভূমি রাজস্বের বিষয়েও তিনি তথাকার একজন অভিজ্ঞ ক্বিবতী নাগরিককে মদীনায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন।[13]

ভূমিকে সেচের আওতায় আনার জন্যও খারাজের অর্থ ব্যয়ের নিয়ম রয়েছে। ওমর (রাঃ) শুধুমাত্র সেচের পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা আছে এরূপ ভূমিতে খারাজ আরোপ করেছেন। এ থেকে বুঝা যায় যে, খারাজ আরোপের ক্ষেত্রে পানির উৎসও বিবেচ্য।[14]

দজলা, ফোরাত, নীল প্রভৃতি নদী ও স্থানীয় পানির উৎস থেকে অনেক খাল এ উদ্দেশ্যে খনন করা হয়। এসব নহর ও খালের সংখ্যা লক্ষাধিক বলে ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলীতে উল্লেখ পাওয়া যায়।[15]

এ প্রসঙ্গে ড. আতীকুর রহমান বলেছেন, বিজিত ভূমিতে বাঁধ নির্মাণ, পুকুর খনন এবং পানি সরবরাহের জন্য খাল ও স্লুইজ গেট নির্মাণ করে সেচের সুব্যবস্থা করা হয়েছিল। একমাত্র মিসরেই এ সমস্ত কাজে দৈনিক এক লক্ষ বিশ হাযার লোক নিয়োজিত ছিল এবং তাদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়েছিল সরকারী কোষাগার থেকে। খলীফার অনুমতিক্রমে খুজিস্তান ও আহওয়ায যেলায় অনেক খাল খনন করা হয়েছিল। এ সমস্ত খালের দরুন অনেক নতুন জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল।[16]

একটি কথা মনে রাখা আবশ্যক যে, ইসলামে খারাজের হার নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই। সমকালীন শাসক তা এমনভাবে নির্ধারণ করবেন, যাতে জমির মালিক বা কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।[17]

জমি জরিপে জনবল নিয়োগ ও তাদের গুণাবলী :

যে কোন কাজে নিয়োগ পাওয়ার প্রথম শর্ত ঐ বিষয়  সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও যোগ্যতা অর্জন করা। প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনার্থে আল্লাহ বলেছেন,اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ، اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ، الَّذِيْ عَلَّمَ بِالْقَلَمِ، عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ  ‘পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়, আর তোমার প্রভু মহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন সেসব বিষয়, যা তার জানা ছিল না’ (আলাক্ব ৯৬/১-৫)।

এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, জ্ঞানের সকল শাখাই মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও সৃষ্টির কল্যাণের নিমিত্তে হ’তে হবে। আধুনিক শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানীগণ একমত যে, শিক্ষিত মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ ও বিশ্বাস সঞ্জীবিত করতে না পারলে কখনোই দুর্নীতি, স্বার্থপরতা ও হানাহানিমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়।

ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেছেন, কথা ও কাজের আগে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। প্রমাণ হিসাবে তিনি আল্লাহর বাণী তুলে ধরেছেন, فَاعْلَمْ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ ‘তুমি জেনে নাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই’ (মুহাম্মাদ ৪৭/১৯)।

ছাহাবী ওছমান বিন হানীফ (রাঃ) তৎকালে ভূমি জরিপে পারদর্শী ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ছিলেন। এজন্য ওমর (রাঃ) তাঁকে জরিপ বিভাগের প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেন। আল্লামা সাঈদ হাভী বলেন, ওমর (রাঃ) ভূমি জরিপে অভিজ্ঞ ব্যক্তি সম্পর্কে ছাহাবীদের নিকট জানতে চাইলে তাঁরা এক বাক্যে ওছমান বিন হানীফের নাম বলেন। তাঁর এ সম্পর্কে দূরদর্শিতা, পান্ডিত্য ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। তখন ওমর (রাঃ) দ্রুত তাঁকে ডেকে পাঠান এবং ইরাকের জমি জরিপের দায়িত্ব তাঁকে অর্পণ করেন।[18]

জরিপের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও জ্ঞানের অভাবে জরিপ কাজ সুষ্ঠুভাবে হবে না। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে এক্ষেত্রে খুব সজাগ থাকতে হবে। নচেৎ তাদের দুনিয়া-আখিরাতে মহা অপরাধী হ’তে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, কোন ব্যক্তিকে যদি মুসলমানদের শাসক হিসাবে নিয়োগ করা হয়, তারপর সে যদি কোন অযোগ্য ব্যক্তিকে শুধু অনুরাগ বশে কর্মচারী হিসাবে নিয়োগ করে তাহ’লে তার উপর আল্লাহর লা‘নত বর্ষিত হয়। তার কোন দান এবং সৎ কাজ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। অবশেষে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দাখিল করবেন।[19]

কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবশ্যই আল্লাহভীরু, সৎ, দায়িত্বশীল, ন্যায়পরায়ণ, সদাচারী ও আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নকারী হ’তে হবে। তাকে মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রীয় পদ ছোট-বড় যেটাই হোক না কেন তা আমানত। এই আমানতের খেয়ানত করলে তাকে দুনিয়াতে চাকুরিচ্যুত হ’তে হবে এবং পরকালে জবাবদিহি করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এজন্যই বলেছেন, اَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، ... وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهْوَ مَسْئُوْلٌ عَنْهُ،  ‘সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। ... কর্মচারী তার মালিকের সম্পদ সম্পর্কে দায়িত্বশীল, তাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে’।[20]

অন্য একটি হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى ذَرٍّ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ أَلاَ تَسْتَعْمِلُنِى قَالَ فَضَرَبَ بِيَدِهِ عَلَى مَنْكِبِى ثُمَّ قَالَ يَا أَبَا ذَرٍّ إِنَّكَ ضَعِيفٌ وَإِنَّهَا أَمَانَةٌ وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْىٌ وَنَدَامَةٌ إِلاَّ مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا وَأَدَّى الَّذِى عَلَيْهِ فِيهَا.

আবু যার (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে আমিল বা কর্মকর্তা নিয়োগ করবেন না? তখন তিনি তাঁর হাত দিয়ে আমার কাঁধে মৃদু আঘাত করে বললেন, আবু যার! তুমি দুর্বল মানুষ, আর রাষ্ট্রীয় পদ একটি আমানত। ক্বিয়ামতের দিন এ পদ আফসোস ও অনুশোচনার কারণ হবে। কেবল তারাই রক্ষা পাবে, যারা যথাযথভাবে আমানত রক্ষা করবে এবং স্বীয় কর্তব্য পালন করবে।[21]

সরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির অধীনে কর্মরত সকল কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকের ক্ষেত্রেই এই আমানতদারীর দায়িত্ব একই রূপে প্রযোজ্য।

আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন, إِنَّ اللهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতকে তার প্রাপকদের হাতে অর্পণ কর’ (নিসা ৪/৫৮)।

এ আয়াত অনুসারে নিয়োগকর্তা যেমন যোগ্য ও অভিজ্ঞ লোককে নিয়োগ দিয়ে আমানতদারীর পরিচয় দিবে, তেমনি নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আমানত রক্ষা করবে।

যদি কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী জনগণের সাথে যুলুম ও খিয়ানত করে অথবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করে অথবা দুশ্চরিত্র বলে প্রমাণিত হয়, তবে তাকে দায়িত্বে বহাল রাখা যাবে না।[22]

মোট কথা, লোক নিয়োগকালে কর্মকর্তা-কর্মচারী যেই হোক না কেন তাদের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান, তাক্বওয়া ও বিষয় ভিত্তিক জ্ঞান ভালভাবে যাচাই করে দেখতে হবে। কোন নেতিবাচক দিক পেলে তাকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদারকি :

অফিসার ও অধীনস্থ কর্মচারীদের আচার-আচরণ এবং ক্রিয়াকলাপের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং তদারকি করা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জন্য অপরিহার্য। যদি কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী যালিম বা অত্যাচারী, খেয়ানতকারী, ঘুষখোর, প্রতারক ইত্যাদি দোষে দোষী বলে প্রমাণিত হয়, তাহ’লে তাকে অনতিবিলম্বে পদচ্যুত করা আবশ্যক।[23]

ওমর (রাঃ) এক ভাষণে বলেছিলেন, আমি আমার কর্মচারীদের এজন্য প্রেরণ করিনি যে, তারা তোমাদের লোকদের মারধর করবে কিংবা তোমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে আসবে। যদি কেউ এরূপ করে তবে যার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে; সে যেন এ বিষয়ে আমার নিকট অভিযোগ করে। আমি তার থেকে বদলা গ্রহণ করব।[24]

বেতন-ভাতা :

ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে যারাই সরকারী কাজে নিয়োজিত থাকবে, তারাই সরকারী কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা পাবে। নবী করীম (ছাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ থেকেই এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

ইসলামী অর্থনীতি অনুযায়ী সরকারী কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের ব্যাপারে কর্মচারীর যোগ্যতা ও কাজের দক্ষতা এবং কর্মচারীর প্রয়োজন ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সম্পর্কে বিশেষ বিবেচনার কথা রয়েছে। কর্মচারীদের অন্তর্নিহিত স্বাভাবিক যোগ্যতা, কর্মক্ষমতা, কাজের ও দায়িত্বের স্বরূপ এবং পদমর্যাদার স্বাভাবিক পার্থক্যকে ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় স্বীকার করা হয়েছে। সকল শ্রেণীর জন্য ‘ভরণ পোষণের দায়িত্ব পালন উপযোগী বেতন প্রদান নীতি’ এখানে গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,

مَنْ كَانَ لَنَا عَامِلاً فَلْيَكْتَسِبْ زَوْجَةً فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ خَادِمٌ فَلْيَكْتَسِبْ خَادِمًا فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ مَسْكَنٌ فَلْيَكْتَسِبْ مَسْكَنًا. قَالَ قَالَ أَبُو بَكْرٍ أُخْبِرْتُ أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنِ اتَّخَذَ غَيْرَ ذَلِكَ فَهُوَ غَالٌّ أَوْ سَارِقٌ.

‘যে লোক আমাদের কর্মচারী হবে সে (বিবাহিত না হ’লে) বিবাহের মাধ্যমে স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবে। যদি তার কোন চাকর না থাকে তাহ’লে সে একজন চাকর নেবে। তার যদি বাড়ী না থাকে তাহ’লে সে একটা বাড়ী পাবে। রাবী বলেন, আবুবকর (রাঃ) বলেছেন, আমাকে খবর দেওয়া হয়েছে যে, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, এর অধিক যে গ্রহণ করবে সে হয় বিশ্বাসঘাতক, নয় চোর’।[25]

ইসলাম উচ্চ শ্রেণীর কর্মচারী ও নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারীর মধ্যে বেতনের পার্থক্য মানলেও আকাশ-পাতাল পার্থক্য মানে না। কেননা প্রয়োজন সমান থাকা সত্ত্বেও কাউকে এক লাখ আর কাউকে দশ হাযার টাকা বেতন দিলে নিম্নবেতনভুকরা দুর্নীতি করতে পারে। তাছাড়া তাদের মনে উচ্চ শ্রেণীর প্রতি ক্ষোভ ও হিংসা জাগবে। আর উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে জাগবে অহংকার ও নিম্নশ্রেণীর উপর শ্রেষ্ঠত্ববোধ। নিম্ন শ্রেণীরা যেখানে মৌলিক প্রয়োজন পূরণে হিমশিম খাবে, সেখানে উচ্চ শ্রেণী বিলাসিতা ও অপচয়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবে। আধুনিক ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় এ পার্থক্য দিবালোকের মত স্পষ্ট।[26]

ঘুষ ও দুর্নীতি :

এ দেশে জরিপ বিভাগে ঘুষ বাণিজ্য একটি ওপেন-সিক্রেট বিষয়। কিন্তু কোন সরকার ব্যবস্থাতেই ঘুষ অনুমোদিত নয়। ইসলামে তো নয়ই। ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি ধরা পড়লে চাকুরি যাওয়ার ভয় থাকে, লোক সমাজে হেয় হ’তে হয়। সর্বোপরি আখিরাতে জাহান্নামে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তারপরও আমাদের সমাজে ঘুষের প্রচলন দিন দিন বাড়ছে। ঘুষ গ্রহণের পেছনে নিম্নের কারণগুলো প্রধানত দায়ী :

১. ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাব।

২. ঘুষ খেয়েও কোন শাস্তির মুখোমুখি না হওয়া বা পার পেয়ে যাওয়া।

৩. অফিসের কম-বেশী সবাই ঘুষ গ্রহণ ও ভাগাভাগি করে নেওয়ার প্রবণতা। এতে একে অপরের নিষেধ করার কেউ থাকে না।

৪. ঘুষ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে ঘুষখোর বসের রোষানলে পড়া এবং চাকুরীতে বদলী বা নানাবিধ হয়রানীর শিকার হওয়া।

৫. স্বল্প বেতন হেতু মৌলিক প্রয়োজন পূরণ না হওয়া।

৬. গাড়ি, বাড়ী, আসবাবপত্র ও ভোগ্যপণ্য কেনার উদগ্র লিপ্সা।

৭. ভবিষ্যত জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৮. ভুক্তভোগীর প্রতি সামান্য করুণার উদ্রেক না হওয়া।

৯. ঘুষখোরদের বিলাসী জীবন দেখে উদ্বুদ্ধ হওয়া।

১০. ঘুষের বিনিময়ে চাকুরি নিয়ে ঘুষের অর্থ তুলে নেওয়া।

১১. সম্পদের মোহ বা প্রাচুর্যের লোভ।

১২. পরকালে আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার পরোয়া না করা ইত্যাদি।

কুরআন-হাদীছে ঘুষ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা :

কারো অধিকার বিনষ্ট করা কিংবা কোন অন্যায়কে কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যে অর্থ উপঢৌকন দেওয়া হয় তাই ঘুষ। ঘুষের ফলে গ্রহীতা প্রভাবিত হয়, হকদারের প্রতি অবিচার করে। এতে বিচার ও প্রশাসন ব্যবস্থায় ধ্বস নেমে আসে। এহেন অবৈধ সম্পদ গ্রহণ না করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلَا تَأْكُلُوْا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوْا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوْا فَرِيْقًا مِنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ-

‘তোমরা অবৈধ পন্থায় একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদ পাপের পথে হস্তগত করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের দরবারে মামলা-মোকদ্দমা পেশ কর না’ (বাক্বারাহ ২/১৮৮)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ عَلَى عَمَلٍ فَرَزَقْنَاهُ رِزْقًا فَمَا أَخَذَ بَعْدَ ذَلِكَ فَهُوَ غُلُولٌ  ‘আমরা কাউকে রাষ্ট্রীয় কোন কাজে নিয়োগ করলে তাকে অবশ্যই বেতন দেব। তারপর সে যা কিছু গ্রহণ করবে, তা হবে খেয়ানত’।[27]

আব্দুল্লাহ বিন আমর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেছেন, لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم الرَّاشِىَ وَالْمُرْتَشِىَ ‘ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়ের উপর আল্লাহর রাসূল লা‘নত করেছেন’।[28] অন্য বর্ণনায় এসেছে,

عَنْ أَبِى حُمَيْدٍ السَّاعِدِىِّ رضى الله عنه قَالَ اسْتَعْمَلَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم رَجُلاً مِنَ الأَزْدِ يُقَالُ لَهُ ابْنُ اللُّتْبِيَّةِ عَلَى الصَّدَقَةِ، فَلَمَّا قَدِمَ قَالَ هَذَا لَكُمْ، وَهَذَا أُهْدِىَ لِى. قَالَ فَهَلاَّ جَلَسَ فِى بَيْتِ أَبِيهِ أَوْ بَيْتِ أُمِّهِ، فَيَنْظُرَ يُهْدَى لَهُ أَمْ لاَ وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لاَ يَأْخُذُ أَحَدٌ مِنْهُ شَيْئًا إِلاَّ جَاءَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَحْمِلُهُ عَلَى رَقَبَتِهِ،

إِنْ كَانَ بَعِيرًا لَهُ رُغَاءٌ أَوْ بَقَرَةً لَهَا خُوَارٌ أَوْ شَاةً تَيْعَرُ-

আবু হুমাইদ সা‘এদী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বনু আযদ গোত্রের ইবনুল লুতবিয়াহ নামক এক ব্যক্তিকে যাকাত আদায়ের কর্মচারী নিয়োগ করেন। আদায় শেষে ফিরে এসে সে বলে, এগুলো তোমাদের আর এগুলো আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে। তখন নবী করীম (ছাঃ) মিম্বরে দাঁড়িয়ে একটি ভাষণ দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও গুণ বর্ণনার পর তিনি বললেন, আল্লাহ আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন তাতে আমি তোমাদের অনেক লোককে নিয়োগ দিয়ে থাকি। এদেরই একজন এসে বলে, এগুলো তোমাদের আর এগুলো আমাকে দেওয়া উপহার। সে তার বাপের কিংবা মায়ের ঘরে বসে থেকে দেখুক না কেন যে, তাকে উপহার দেওয়া হয় কি-না? যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর কসম, এই ছাদাকার যা কিছুই সে আত্মসাৎ করবে ক্বিয়ামতের দিন সে তা নিয়ে হাযির হবে। উট হ’লে সে তার সুরে ডাকবে, গরু হ’লে হাম্বা হাম্বা করবে, আর ছাগল হ’লে ভ্যা ভ্যা করবে’।[29]

এ হাদীছ থেকে বুঝা যায়, যে জিনিস কোন হারাম বা অবৈধ কাজের মাধ্যম হবে সেই জিনিসও হারাম বা অবৈধ হবে।

ঘুষ বন্ধের চেষ্টা :

জরিপ কাজে জড়িতদের ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে তাদের নিজেদেরই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে।  মনে রাখতে হবে,  শয়তান ও

কুপ্রবৃত্তি বা খেয়াল-খুশির তাড়না আমাদের মধ্যে লোভ জাগিয়ে তোলে এবং দুর্নীতিতে জড়িয়ে ফেলে। কিন্তু এজন্য দুনিয়াতে লাঞ্ছিত ও চাকুরি খোয়ানোর যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমনি আখিরাতে আল্লাহর সামনে বিচারের মুখোমুখি হ’তে হবে। দুনিয়াতে কোনভাবে পার পেলেও পরকালে পার পাওয়ার কোনই সুযোগ থাকবে না। সুতরাং জাহান্নাম থেকে বাঁচার স্বার্থেই ঘুষখোরদের ঘুষ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

ঘুষ থেকে বিরত রাখতে রাষ্ট্রীয় তদারকি যোরদার করা প্রয়োজন। কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার সময় তার সম্পদের হিসাব নিতে হবে। পরবর্তীতে চাকুরিকালে গৃহীত হিসাবে যদি সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়, তাহ’লে বর্ধিত সম্পদ বাযেয়াফ্ত করতে হবে এবং অনিয়ম করার দরুন চাকুরিচ্যুত করতে হবে। ওমর (রাঃ) তাঁর শাসনামলে এভাবে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি বিভাগ গঠিত হয়েছিল।

মূলকথা রাষ্ট্রের কোন শাসনকর্তা, কর্মকর্তা বা কর্মচারী অত্যাচারী কিংবা সম্পদ আত্মসাৎকারী প্রমাণিত হ’লে সাথে সাথেই তাকে পদচ্যুত করতে হবে। তাকে এরপরও ঐ পদে বহাল রাখা হারাম হবে।[30]

                  [চলবে]



[1]. আহমাদ, ছহীহুল জামে‘ হা/৪৮১১, সনদ ছহীহ।

[2]. আবূদাউদ হা/৪৬০৭; ইবনু মাজাহ হা/৪২; মিশকাত হা/১৬৬, সনদ ছহীহ।

[3]. ড. মোহাম্মদ আতীকুর রহমান ইসলামে ভূমি ব্যবস্থাপনা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, ঢাকা : ইফাবা, পৃঃ ১৭।

[4]. বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, ৯ম মুদ্রণ ২০০৮, পৃঃ ৯৩৫।

[5]. আবুদাঊদ হা/৩০৭৬, সনদ ছহীহ।

[6]. আবুল হাসান ইসলামাবাদী, তানজিমুল আমাতাত, ৩য় খন্ড, (দেওবন্দ, ভারত : ইসলামী কুতুবখানা ১ম প্রকাশ ১৯৮২), পৃঃ ২৭৭-৭৮।

[7]. মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, ইসলামের অর্থনীতি (ঢাকা : খায়রুন প্রকাশনী, ৭ম প্র. ১৯৯৮), পৃঃ ১৪০।

[8]. ইসলামের অর্থনীতি, পৃঃ ১৪৪। (অর্থাৎ ১২০০ পদাতিকের ১২০০ এবং ২০০ অশ্বারোহীর ৬০০ ভাগ। মোট ১৮০০ ভাগে গণীমত বণ্টন করা হয়। দ্রঃ সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) ৪৫৬ পৃঃ।

[9]. ইসলামের অর্থনীতি, পৃঃ ২১৬।

[10]. ইসলামে ভূমি ব্যবস্থাপনা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, পৃঃ ১৪৩-১৪৫।

[11]. তদেব, পৃঃ ২৪১-২৪২।

[12]. ইসলামের অর্থনীতি, পৃঃ ৯৩।

[13]. ইসলামে ভূমি ব্যবস্থাপনা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, পৃঃ ২৪৭।

[14]. ইয়াহইয়া ইবনু আদম, কিতাবুল খারাজ, পৃঃ ২৫-২৬; ইসলামের ভূমি ব্যবস্থাপনা, পৃঃ ৮৮।

[15]. দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, (ঢাকা : ইফাবা ১০ম সংস্করণ, ২০১২), পৃঃ ৪৭৭, গৃহীতঃ কুতুবুল বুলদান, পৃঃ ৩৫৩।

[16]. ইসলামে ভূমি ব্যবস্থাপনা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, পৃঃ ১৭৪-১৭৫।

[17]. ইসলামের অর্থনৈতিক মতাদর্শ, পৃঃ ২০৬।

[18]. আল-ইসলাম, ৩/৬০ পৃঃ।

[19]. দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, পৃঃ ৫৬৩-৬৪।

[20]. বুখারী ১/৩০৪, ৪৩১, ২/৮৪৮, ৯০১, ৯০২; মুসলিম ৩/১৪৫৯।

[21]. মুসলিম হা/১৮২৫।

[22]. দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, পৃঃ ৫৬৩।

[23]. দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, পৃঃ ৫৬৩।

[24]. তদেব, পৃঃ ৫৬৩।

[25]. আবুদাঊদ, হা/২৯৪৫ খারাজ’ অধ্যায়; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৪৮৬

[26]. ইসলামের অর্থনীতি, পৃঃ ২৫০-২৫৩

[27]. আবুদাঊদ হা/২৯৪৩; মিশকাত হা/৩৭৪৮, সনদ ছহীহ

[28]. আবু দাউদ হা/৩৫৮০; ইবনু মাজাহ হা/২৩১৩; মিশকাত হা/৩৭৫৩, সনদ ছহীহ

[29]. বুখারী হা/২৫৯৭; মুসলিম হা/১৮৩২; মিশকাত হা/১৭৭৯ ‘যাকাত’ অধ্যায়

  [30]. দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, পৃঃ ৫৬৪

 

 

 

HTML Comment Box is loading comments...